রবের আদর্শ প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব প্রদানে নবী (সাঃ) কে সতর্কতা
বিশ্বনবীর ওপরে মহান আল্লাহ তাঁর প্রথম ওহীকেই তার রবের আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য ময়দানে এগিয়ে দেননি। যে দায়িত্ব দিয়ে তাঁকে এই পৃথিবীতে প্রেরণ করা হয়েছিল, সে দায়িত্ব সম্পর্কে প্রথম ওহীতে কোন নির্দেশ দান করা হয়নি।
দ্বিতীয় পর্যায়ে যখন তাঁর ওপরে ওহী অবতীর্ণ করা হলো, তখন তাঁর প্রতি নবুওয়তের দায়িত্বে সাথে রেসালাতের দায়িত্ব অর্পণ করা হলো। দ্বিতীয় পর্যায়ে তাঁর ওপর অবতীর্ণ করা হলো পবিত্র কোরআনের ৭৪ নং সূরার প্রাথমিক সাতটি আয়াত। এই সুরার নাম হলো সুরায়ে আল্ মুদ্দাস্সির।
বিশ্বনবী (সাঃ)-এর আরেকটি নাম হলো মুদ্দাস্সির। বিশ্বনবী (সাঃ)-এর মুদ্দাস্সির নামটি হলো গুণবাচক বা উপাধি বিশেষ। হযরত জিবরাঈল (আঃ) কে দ্বিতীয় বার দেখে তিনি (সাঃ) অস্থির হয়ে বাড়িতে এসে শয্যায় শুয়ে তাঁকে কম্বল দিয়ে আবৃত করে দিতে বলেছিলেন।
এই সময় তাঁর ওপরে সুরা মুদ্দাস্সিরের প্রথম সাতটি আয়াত অবতীর্ণ হয়েছিল। (ইবনে জারীর, বোখারী, মুসলিম, মুসনাদে আহমাদ)
রবের আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্যে কম্বল আচ্ছাদন-কারীকে আহবান
বিশ্বনবী (সাঃ)-কে আহ্বান করা হলো, ‘হে কম্বল আবৃত শয্যা-গ্রহণকারী! ওঠো এবং সাবধান করো। এবং তোমার রবের শ্রেষ্ঠত্ব ও বিশালত্বের ঘোষণা দাও। এবং নিজের পরিধেয় পোশাক পবিত্র রাখো। আর মলিনতা অপরিচ্ছন্নতা থেকে দূরে অবস্থান করো। আর অনুগ্রহ করো না অধিক লাভের আকাঙ্ক্ষায়। এবং নিজের রবের জন্য ধৈর্য অবলম্বন করো।’ (সুরায়ে আল্ মুদ্দাস্সির, আয়াত নং-১ থেকে ৭)
এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, বিশ্বনবী (সাঃ)-কে এভাবে সম্বোধন করা হলো না, হে মুহাম্মদ ওঠো! মহান আল্লাহ পক্ষ থেকে বিশ্বনবীকে আহ্বান করা এখান থেকেই শুরু হয়েছে।
মহান রব কখনও পবিত্র কোরআনে নবী (সাঃ) এর নাম ধরে ডাকেন নাই
গোটা কোরআন পাঠ করলে দেখা যায়, এভাবে মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় বন্ধুকে নানা ধরণের মধুর নামেই না আহ্বান করেছেন। কিন্তু বিশ্বনবী (সাঃ)-এর যে ব্যক্তি বাচক দুটো নাম রয়েছে, মুহাম্মদ এবং আহমাদ, এ দুটো নামে আল্লাহ তাঁকে কখনো আহ্বান করেননি।
মুহাম্মদ শব্দটা পবিত্র কোরআনে চারটি সুরায় মোট চার-স্থানে উল্লেখ করা হলেও সেটা প্রাসঙ্গিক-ভাবে, তাঁকে আহ্বান করে নয়। আর আহমাদ শব্দটা একটি সুরায় মাত্র একস্থানে উল্লেখ করা হয়েছে হযরত ঈসা (আঃ) -এর কথা থেকে, তাঁকে আহ্বান করে নয়।
অথচ মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পৃথিবীর প্রথম মানুষ, প্রথম নবী ও রাসুল, প্রথম বিজ্ঞানী হযরত আদম (আঃ) -কে সৃষ্টি করেই তাঁর নাম ধরে আহ্বান করে বলেছিলেন, ‘হে আদম! তুমি এবং তোমার স্ত্রী এই বেহশতের মধ্যে বসবাস করো কিন্তু ঐ বৃক্ষের কাছে যেওনা।’
মহান আল্লাহ কর্তৃক নবীদেরকে আহ্বানের এই ধারা অব্যাহত থাকলো হযরত ঈসা (আঃ) পর্যন্ত। এই পৃথিবীতে যত নবী এবং রাসুল প্রেরণ করা হয়েছে, তাদের সবাইকে মহান আল্লাহ সরাসরি নাম ধরে সম্বোধন করেছেন। প্রয়োজনের মুহূর্তে আহ্বান করা হয়েছে, হে আদম, হে নূহ, হে মুসা, হে ইবরাহীম, হে লুত অর্থাৎ নাম ধরে আহ্বান করা হয়েছে।
একমাত্র ব্যতিক্রম হলেন বিশ্বনবী (সাঃ)। তাঁকে কখনো তাঁর ব্যক্তিবাচক নামে আহ্বান করা হয়নি। তাঁর গুণবাচক নাম বা উপাধি দিয়েছেন আল্লাহ এবং সেই উপাধি ধরে বা গুণবাচক নামেই আল্লাহ তাঁকে আহ্বান করেছেন।
মহান রব অন্য নবীদের চেয়ে, মুহাম্মদ (সাঃ) কে বেশী সম্মান দিয়েছেন
এর কারণ হলো বিশ্বনবীর বিশাল মর্যাদা এবং সম্মান। আল্লাহ তাঁকে যে কত সম্মান এবং মর্যাদা প্রদান করতেন, যে ভাষায় এবং ভঙ্গীতে আহ্বান করা হতো, সেদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে অবাক হতে হয়।
কম্বল দিয়ে নিজের শরীর আবৃত করে তিনি শয্যায় শায়িত, তাঁকে কি সুন্দর বিশেষণে কি মধুর ভঙ্গিতে আহ্বান করা হলো, হে কম্বল গায়ে দেয়া শয্যায় শায়িত ব্যক্তি, ওঠো! আমরা যথাস্থানে বিশ্বনবীর পবিত্র নাম সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ।
দ্বিতীয় পর্যায়ে ওহী অবতীর্ণ করে তাঁকে বলা হচ্ছে, হে আমার প্রিয় বন্ধু! আপনি এমন করে কম্বলে আবৃত হয়ে শুয়ে আছেন কেন! এভাবে শুয়ে থাকা তো আপনার কাজ নয়।
মানুষ পশুত্বে নেমে গেছে, অসহায় মানুষ অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে আর্তনাদ করছে, মিথ্যে রবের কাছে মানুষ নিজের কামনা বাসনা পেশ করছে, এসব দেখে আপনার মনে যে যন্ত্রণার ঝড় শুরু হতো, সে যন্ত্রণার অবসানের জন্যই আপনি কাজ শুরু করে দিন।
আপনার ওপরে যে দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে, সে দায়িত্ব পালন করুন। এ জন্য আপনি সংকল্পের দৃঢ়তা নিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হন। আপনি মানব এবং জিন জাতিকে আদেশ করুন, তোমরা আল্লাহর সৃষ্টি পৃথিবীতে বাস করছো, তাঁর দেয়া নেয়ামত ভোগ করছো, তাঁর অনুগ্রহ ব্যতীত এক মুহূর্ত জীবিত থাকতে সক্ষম হবে না।
তোমার মহান রবের দাসত্ব গ্রহণ করুন সেটাই প্রচার করো
সুতরাং তাঁরই বিধান অনুসরণ করে তাঁর দাস হয়ে যাও। একমাত্র তাঁরই দাসত্ব করো, আর কারো দাসত্ব করো না। কেননা, তাঁরা দাসত্ব লাভের উপযোগী নয়। তাঁরা যদি তাদের রবের বিধান অনুসরণ না করে, তাহলে তাদেরকে সতর্ক করে দিন, তাদেরকে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে এবং তাদের পরিণাম শুভ হবে না।
এ কথা মহান আল্লাহ তাঁর নবীকে বলার পরেই আদেশ করলেন, আপনি যাকে রব বলে জানেন, তিনিই প্রকৃত রব। আয়তনটিতে ওয়া রাব্বাকা শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। আল্লাহ শব্দ ব্যবহার করা হয়নি। রব আরবি শব্দ। এই শব্দের অর্থ বড় ব্যাপক। রব শব্দের ব্যাখ্যা এই গ্রন্থে করার অবকাশ নেই।
এখানে শুধু এতটুকু বলাই যথেষ্ট যে, মানুষের জীবনে যা কিছু প্রয়োজন, যত আইন-কানুনের প্রয়োজন এ সমস্ত যিনি পূরণ করেন তিনিই হলেন রব।
পৃথিবীতে যত নবী রাসুল প্রেরণ করা করা হয়েছে, তাদের সাথে যাদের সংঘর্ষ বেধেছে, তাঁরা আল্লাহকে অবশ্যই স্বীকৃতি দিয়েছে, কিন্তু আল্লাহকে রব হিসাবে গ্রহণ করতে আপত্তি করেছে। ফেরাউন ঘোষণা করেছিল, আমি তোমাদের বড় রব। সে নিজেকে আল্লাহ হিসাবে ঘোষণা দেয়নি, দিয়েছিল রব হিসাবে।
দুনিয়ার সকল সংঘর্ষ একমাত্র রবের শ্রেষ্ঠত্বকেই কেন্দ্র করে আবর্তিত
আজ পর্যন্ত এই পৃথিবীতে এই রব নিয়েই সত্য-পন্থীদের সাথে বাটিল শক্তির সংঘর্ষ চলছে। সত্য-পন্থীগণ দাবি করছে, এই পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন মহান আল্লাহ, সুতরাং তিনিই আমাদের রব তিনিই আমাদের জীবন বিধানদাতা। আর বাতিল শক্তি দাবি করে, আল্লাহ পৃথিবী সৃষ্টি করলে করতেও পারেন।
কিন্তু আইন আইন তৈরি এবং জীবন বিধান তৈরি করবো আমরা, এ ব্যাপারে আমরা স্বাধীন। আমাদের যে আদর্শ, আমাদের যে মতবাদ, সে অনুসারেই দেশ চলবে এবং দেশের মানুষকে তা অনুসরণ করে চলতে হবে।
আল্লাহর নবীগণ তাদের এ কথা যখন গ্রহণ করেন নি, তখনই সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে উঠেছে। তাদের কারো নাগরিকত্ব বাতিল হয়েছে, কাউকে ধরে কারাগারে আবদ্ধ করা হয়েছে, কাউকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, শুধুমাত্র এই রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করার কারণে। বিশ্বনবী (সাঃ)-কে মহান আল্লাহ আদেশ করলেন, ‘আপনি শুয়ে থাকবেন না, উঠুন এবং আপনার রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করুন।’
পৃথিবীতে নিজেদেরকে যারা রব বানিয়ে বসেছে, তাদেরকে সতর্ক করে দিন, তোমরা রব নও। রব হলেন একমাত্র মহান আল্লাহ। কোন আইন-কানুন বিধান রচনা করার কোন এখতিয়ার তোমাদের নেই। রব সেজে যে গদিতে তোমরা বসে আছো, সে গদি ছেড়ে দাও।
আল্লাহর বিধান ঐ গদিতে বসে দেশের বুকে, আল্লাহর বান্দাদের ওপরে আইন জারি করবে। পৃথিবী ব্যাপী উচ্চ কণ্ঠে ঘোষণা করে দাও, আল্লাহ আমাদের রব এবং আল্লাহর সৃষ্টি এই পৃথিবীতে একমাত্র আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বই চলবে, আল্লাহর রবুবিয়াত প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যেই আল্লাহ আমাকে প্রেরণ করেছেন।
এই পৃথিবীতে নবী হিসাবে নির্বাচিত হয়ে একজন নবীর হলো এটাই সব প্রথম কাজ এবং দায়িত্ব। এই পৃথিবীতে যারা নিজেদেরকে রব বলে ধারণা করেছে, মূর্খ মানুষ যে সমস্ত দুর্বল অথর্ব বস্তুকে নিজেদের রব বানিয়ে দিয়েছে, তাদেরকে বলে দাও, রব হলেন একমাত্র আল্লাহ।
রব কি, রব কাকে বলে, রবের প্রয়োজনীয়তা কি
রব কি, রব কাকে বলে এবং রবের প্রয়োজনীয়তা কি, একমাত্র আল্লাহকে কেন রব হিসাবে স্বীকৃতি দিতে হবে, এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ মক্কায় অবতীর্ণ সুরা সমূহে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। মক্কী সুরা সমূহে এই রবের আলোচনা এবং রেসালাত ও আখেরাতের আলোচনায় পরিপূর্ণ। তাওহীদ রেসালাত ও আখেরাত এ তিন বিষয়ে মক্কী সুরায় বিস্তারিত বর্ণনা এসেছে।
বলা হয়েছে, তোমরা যাকে রব হিসাবে পূজা করছো, সেও ঐ আল্লাহর দাস এবং ইচ্ছায় হোক ইচ্ছায় হোক ঐ আল্লাহরই মুখাপেক্ষী। সুতরাং তাদেরকে রব হিসাবে গ্রহণ করার কোনই প্রয়োজন নেই, রব হিসাবে গ্রহণ করো তাকেই যিনি তোমাদেরকে জমাটবাঁধা রক্ত থেকে সৃষ্টি করেছেন, তোমাদেরকে জ্ঞান দান করেছেন, তোমাদের যাবতীয় প্রয়োজন যিনি পূরণ করছেন।
তোমরা তোমাদের সমস্ত কাজে তাকেই রব হিসাবে ঘোষণা করবে, তাকেই একমাত্র দাসত্ব লাভের যোগ্য বলে বিবেচনা করবে, তাকেই একমাত্র আইন-দাতা হিসাবে গ্রহণ করবে।
মহান আল্লাহ প্রথম অবতীর্ণ-কৃত বাণীতে তাঁর নবীকে আদেশ দিলেন, আমিই যে শ্রেষ্ঠ এবং একমাত্র রব এ কথার ঘোষণা করে দাও। তুমি কোন দ্বিধা করো না। তোমার রবের শ্রেষ্ঠত্বের কথা ঘোষণা করো এবং কোন শক্তিকে দেখে ভয় করো না। কেননা, সমস্ত শক্তির শ্রেষ্ঠ শক্তি তোমার সাথে রয়েছে।
তোমার রবের শক্তির সামনে কোন শক্তিই শ্রেষ্ঠ নয়। তুমি তাদের সামনে এ কথা স্পষ্ট করে বলে দাও, তুমি যে কাজ শুরু করছো, এ কাজের গতি কেউ রুদ্ধ করতে পারবে না।
মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসুলকে কোথায় কি কাজ করতে আদেশ করলেন, তা বিশ্লেষণ করলে আমাদের সামনে একটা দিক পরিষ্কার হয়ে যায় যে, গোটা পৃথিবীও যদি সত্যের বাহকের বিরুদ্ধে চলে যায় তবুও সত্যের ঘোষণা দেওয়া থেকে নিজেকে বিরত রাখত না।
মহান আল্লাহ তাঁর রাসুলকে যে ঘোষণা দান করতে আদেশ করলেন, সেই ঘোষণার বিপরীত অবস্থা বিরাজ করছিল তদানীন্তন পৃথিবীতে। রাসুল যে সমাজে উপস্থিত ছিলেন সে সমাজ এই ঘোষণা শুনতে আদৌ প্রস্তুত ছিল না।
এই ঘোষণা দেওয়ার সাথে সাথে রাসুলকে তাঁর আপনজনেরাই যে বন্য হায়েনার মত ঘিরে ধরবে এতেও কোন সন্দেহ ছিল না। যারা রবের দাবি নিয়ে সে সমাজে দীর্ঘকাল ব্যাপী নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত রেখেছিল, নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করছিল, কা’বাঘরসহ নিজের ঘরে ঘরে মূর্তিকে রব বানিয়ে তাদের পূজা অর্চনা করছিল,
তাঁরা রাসুলের এ ঘোষণা শুনেই রাসুল একজন সৎ এবং সুন্দর চরিত্রের লোক হবার কারণে তাঁর ঘোষণাকে তাঁরা স্বাগত জানাবে অবস্থা এমন ছিল না।
বরং এ ঘোষণা দেওয়ার সাথেই বিপদ মসিবতের পাহাড় নিজের ওপরে আপতিত হবে, আপন আত্মীয়-স্বজন প্রাণের শত্রুতে পরিণত হবে, তাঁকে দেশ থেকে বহিষ্কার করবে, তাঁকে হত্যা করার জন্য সমাজের কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠী তৎপর হয়ে উঠবে-পরিস্থিতি এমনই ছিল।
| 👈পূর্বের পোষ্ট: সুরা আলাক অবতীর্ণের পেক্ষাপট, ইতিহাস ও বিশ্বনবীর (সাঃ) প্রস্তুতি |
| ওহী সংরক্ষণে নবী (সাঃ) এর পোশাকে পবিত্রতা পরিছন্নতার শিক্ষা পরের পোষ্ট 👉 |