মন্ত্রী পুত্রের শাশুড়ির বিয়ে ও ইবনে বতুতার অঘটন

বিয়ে

অবশেষে ১৩৪৩ খ্রীষ্টাব্দের দিকে জগত বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা মালদ্বীপে এসে পৌঁছুলেন এবং বিদেশ মন্ত্রীর সাথে দেখা করে তার দেশ দেখার অনুরোধ জানালেন।

মন্ত্রী তার পরিচয় পেয়ে খুশী হলেন এবং মালদ্বীপে অবস্থান করে ঘুরার সুযোগ দিলেন। কিছুদিন পরেই উজির (মন্ত্রী) সুলেমানের সাথে তার শত্রুভাবাপন্ন সম্পর্ক তৈরি হয়।

কেননা উজির তার বিধবা কন্যাকে বিয়ে করার জন্য ইবনে বতুতাকে অনুরোধ করেছিলেন এবং বতুতা এই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন! এভাবে উজিরের কথাকে উড়িয়ে দেবার দরুন, বতুতার উপর নাখোশ হন। বতুতা যাতে সে দেশ ত্যাগ করতে না পারে, উজির সে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। 

আরো পড়তে পারেন…

  • যোগ্য লোক অলস হলে কূটচালে অভ্যস্ত হয়
  • সিনেমা দেখে ইতিহাস শেখা
  • অলস পুরুষ মেয়েলী পুরুষ

ইবনে বতুতা জেনেছিলেন, ইতিপূর্বে সে মেয়ের দু’বার বিয়ে হয়েছিল এবং দুটো স্বামীই মারা গিয়েছে! তাই জনগণের কাছে মেয়েটি অপয়া হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল।

মন্ত্রী জনগণের এসব কথা না জানলেও, পর্যটক বতুতা নানা মানুষের সাথে মেলা-মেশার কারণে ব্যাপারটি জানতে পেরেছিলেন। নারী অপয়া এই বিশ্বাস বতুতার মনে প্রভাব বিস্তার করেনি।

তিনি ভাবছিলেন ভিন্ন কথা। সারা দেশ যে নারীকে নিয়ে মাতামাতি হয়, তাকে বিয়ে করলে উল্টো তিনিই আলোচনার কেন্দবিন্দুতে পরিণত হবেন। তাছাড়া তিনি যদি এই বিয়ে করেনই।

তাহলে তাকে মালদ্বীপের প্রধান কাজির পদ ধরিয়ে দিয়ে আজীবন মালদ্বীপে আটকিয়ে রাখতে চাইবে। এই দুই কারণে তিনি বিয়ের জন্য রাজী নন কিন্তু মন্ত্রী তাকে ছেড়ে দেবার মানুষও নন। প্রয়োজনে বল প্রয়োগ করে হলেও, বতুতাকে মালদ্বীপে আটক রাখবেন।

অবশেষে ইবনে বতুতা মন্ত্রীর বিধবা কন্যাকে বিয়ে করতে রাজী হন। শহরে বিয়ের ডঙ্কা বেজে উঠে। বিয়ের দিন গণ্যমান্য ব্যক্তি, বর-মেহমান সবাই হাজির।

কিন্তু কনের পিতা মন্ত্রী সুলেমান অনুপস্থিত! তিনি কন্যার পিতা এবং ওয়ালী। উপস্থিত মানুষদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিল। পরে বহু নাটকীয়তার পরে মন্ত্রী উপস্থিত হয়ে এক নতুন কথা জানাল।

তার মেয়ে ইবনে বতুতাকে বিয়ে করতে রাজী নয়! মন্ত্রীর মেয়ে সম্পর্কে বতুতার মনে যে একটি নেতিবাচক ধারণা কাজ করছিল, তলে তরে সেটা মেয়েও খবর পেয়েছিলেন। সে ও তাকে অপমান করার ধান্ধায় ছিল।

তাই বিয়ের দিনে বতুতাকে তাদের বাড়ি পর্যন্ত বর বানিয়ে এনে ঘোষণা দিল সে তার সাথে বিয়েতে রাজি নয়!

মেয়ে রাজী নয় কিন্তু মন্ত্রী তো এই বিষয়ে অপদস্থ হলেন। তার বাড়ী থেকে এভাবে বিয়ের সাজে বর এসে, ফিরে যাবে, এটা তো হতে পারেনা! তাহলে বতুতাকে অন্য কোন বিধবা নারী হলেও বিয়ে করতে হবে। মন্ত্রী পুত্রের শাশুড়ির বিয়ে ও ইবনে বতুতার অঘটন

মেয়ের সাথে বিয়ে হচ্ছেনা এটাতে বতুতার অত পেরেশান ছিল না। কেননা ওটা তো তার জন্য জবরদস্তির বিয়েই ছিল।

সেই বিয়ে না হলেও, বিয়ে করার সমস্যা থেকে বতুতার পরিত্রাণ মিলছে না। বিয়ে একটা তাকে করতেই হবে। ওদিকে মন্ত্রীর অন্দর মহলে জানা শোনা বিধবা রমণীদের সন্ধান চলতে রইল।

মন্ত্রীর ছেলে, পুত্র বধুর মাধ্যমে, অবশেষে একজন বিধবা রমণীর সন্ধান পাওয়া গেল। তিনি আর কেউ নন। স্বয়ং মন্ত্রী পুত্রের শ্বশুরী তথা পুত্রবধুর মাতা। ইবনে বতুতা এই বিয়ে করা মাত্রই মন্ত্রীর বেয়াই হয়ে যাবেন।

অগত্যা সেই বরের সাজে, বরযাত্রীদের সাথে নিয়ে ইবনে বতুতা মন্ত্রীর বেয়াইনকে বিয়ে করে ঘরে ফিরেন এবং রাষ্ট্রীয় মেহমান হিসেবে পরিগণিত হন। (তথ্য সূত্র ইবনে বতুতার সফরনামা- পৃ ১৪০-১৮২) বিধবা বিয়ের এই ধরন বর্তমান সময়ে দৃষ্টিকটুর মত লাগলেও তখনকার সময়ে এটাই ছিল উন্নত সমাজিক রীতি। মন্ত্রী পুত্রের শাশুড়ির বিয়ে ও ইবনে বতুতার অঘটন

এমন একটা জমানা ছিল, যখন একটি কুমারী মেয়েকে বিয়ে দেবার চেয়েও বিধবার বিয়ে দেওয়াটাকে অধিকতর গুরুত্ব দিত।

যে জাতি বিধবাদের সমস্যাকে আগে সমাধান করেছে, সে জাতি তত বেশী নৈতিক, নিরাপদ জাতি হিসবে বিবেচিত হয়েছে। মন্ত্রীর বেয়াইনকে বিয়ে দেওয়া হবে এবং সেই মহিলার জামাতা ও কন্যা এই বিয়ের মূল কারিগর।

সে ধরনের একটি সমাজের কথা বর্তমান সময়ে কি কল্পনা করা যায়, চিন্তার রাজ্যে একটু বিবেচনা করুন তো। আমাদের সমাজে বিষয়টাকে কেমন ভাবে নিবে! ক্ষমতাশালী কারো শাশুরীকে বিয়ে করার পয়গাম পাঠালো তো, থাপরিয়ে গালের চামড়া লাল করে দেবে!

বর্তমানেও বৃদ্ধ পিতা বিয়ে করলে সন্তানেরা ছি ছি করে পিতার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন এবং বন্ধুদের কাছে পিতার পরিচিতি দিতে চায় না। আর সেখানে মায়ের বিয়ে? কেউ ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারে না।

বেশী দিন আগের কথা নয়। সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমদের পত্নী গুলতেকিন বিয়ে করেছিল একজন অবসর প্রাপ্ত সচিবকে। তার মধ্যে এই বিয়ের আয়োজক ছিল, নিজের ঔরসজাত সন্তান।

এটা আমাদের দেশের জন্য বিরল, শিক্ষণীয় ও যুগান্তকারী ঘটনা হবার পরও কত মানুষ ফেসবুকে এই বিয়ে নিয়ে ট্রল করেছিল! প্রচণ্ড সাহসী মানুষ না হলে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া যে কারো পক্ষেই কঠিন।

অথচ প্রেম করে ব্যভিচার, অজাচারে লিপ্ত হলে এরা চুপ থাকে। আজকের দিনে প্রচুর বিয়ে ভাঙ্গছে কিন্তু সে সব কন্যাদের নতুন করে বিয়ে হচ্ছেনা।

এসব মহিলা গুলোই সবচেয়ে বেশী অসহায় অবস্থায় পতিত হয়, নিত্য নতুন পদ্ধতিতে আক্রমনের শিকার হয়। এ কারণে সামাজিক অবক্ষয় ও অপরাধ মারাত্মক হারে বাড়ছে। মন্ত্রী পুত্রের শাশুড়ির বিয়ে ও ইবনে বতুতার অঘটন

সমাজের এই চরিত্র পাল্টে দিতে, স্বয়ং আল্লাহর রাসুল (সা) কে নির্দেশ দিয়েছেন বিধবা বিয়ে করে উপমা ও দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে।

রাসুল (সা) শুধু বিধবা বিয়ে করেই ব্যাপারটিকে শেষ করেন নি। তিনি তাদের আগের ঘরের সন্তানাদি সহ সবার দায়িত্বও কাঁধে নিয়েছেন। বর্তমান সমাজে
বহু পুরুষ স্ত্রীর খবর নিবে দূরের কথা, নিজের সন্তানের দায়িত্বও নেয় না!

তাই বিধবা কারো বিয়ে হলে, সবার উচিত সেটাকে উৎসাহিত করা এবং এসব জুটিকে অভিনন্দন জানিয়ে ফেসবুকের ওয়াল ভরিয়ে দেওয়া। তাহলে সমাজের চিত্র আরো ভাল হয়ে উঠবে।

নারীরা স্ব-সম্মানের সহিত অধিকার নিয়ে বাঁচতে পারবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *