রাসুল (সা) সীরাত গ্রন্থ রিভিউ

সীরাত

বিশ্ব-মানবতার মুক্তির দূত মোহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ বিন আবদুল মুত্তালিব (সা) কে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর পক্ষ হতে রাসুল বানিয়ে; লিখিত দলীল কোরআন দিয়ে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। তিনি নবী ও রাসুল উভয় সম্মানে ভূষিত, মহা সম্মানিত আদম সন্তানদের অন্যতম। আল্লাহ তাঁর কর্মকে সকল মতাদর্শের উপরে শ্রেষ্ঠতম আদর্শ তথা মানদণ্ড হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। রাসুল (সা) সীরাত গ্রন্থ রিভিউ

 

তাঁর প্রকৃত নাম ‘মোহাম্মদ’।এই শব্দটি আরবি মূল ‘হামদ’থেকে উৎপন্ন হয়েছে। আরবি তিন বর্ণ ‘হা, মীম, দাল’ এর সমন্বয়ে সৃষ্ট ‘হামদ’ শব্দটি আমরা প্রায়শই শুনে থাকি। ‘হামদ’ শব্দের মূল অর্থ ‘প্রশংসা’। এই ‘হামদ’ শব্দ থেকেই মুহাম্মদ, আহাম্মদ, মাহমুদ, মাহমুদা, হামিদ, হামিদা নামের শব্দগুলোর উৎপত্তি। সকল শব্দের ভাবার্থই প্রশংসা সম্পর্কিত। উপরোক্ত নামের প্রভাব ও বৈশিষ্ট্য সমূহ মুহাম্মদ (সা) এর জীবনকে আলোকিত করেছে। আর  মুহাম্মদ শব্দের অর্থ ‘প্রশংসিত’। তাই তো দুনিয়াতে তিনি এত উচ্চমার্গের প্রশংসা পেয়ে যাচ্ছেন। যার কারণে সারা দুনিয়াতে পাঁচ শতাধিকের উপরে বৃহদাকায় গ্রন্থ রচনা হয়েছে শুধু তার জীবনকে কেন্দ্র করেই! মধ্যম ও ছোট গ্রন্থগুলোর হিসেব করা কঠিন ও মানুষের জন্য দুঃসাধ্যও বটে।

আরো পড়ুন…

  • সীল মোহরের প্রচলন ও রাসুল (সা) এর অলৌকিক মোহর
  • মুয়ায ইবনে যাবালের প্রতি রাসুল (সাঃ) এর একটি গুরুত্বপূর্ন চিঠি
  • মহামারি মোকাবেলায় সিরিয়া বিজয়ী আবু উবায়দা (রা) ও আজকের করোনা ভাইরাস প্রেক্ষিত

মোহাম্মদ শব্দটি গুণবাচক নাম। তাঁর জন্মের সময়ে, আরবের ভাষা শৈলী উন্নত থাকার পরও, ‘মোহাম্মদ’ শব্দ দিয়ে নাম হতে পারে, এই ধারণা কারো ছিল না। এই নাম কেউ কখনও শোনেনি! এই নামের অর্থ ও স্বভাব গ্রহণকারী একজন জগৎবিখ্যাত মানব সন্তানের আগমনের কথা ইনজিলে (বাইবেল) বলা ছিল। মোহাম্মদ (সা) এর মা ও দাদা আবদুল মুত্তালিব স্বপ্নে আদিষ্ট হয়েই নবজাত শিশুর নাম মোহাম্মদ রাখেন। কারণ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন স্বীয় কুদরত দ্বারা এই নামটি তাঁর বন্ধুর জন্যই সংরক্ষিত রেখেছিলেন। ফলে এই নাম নিয়ে জন্মগ্রহণকারী দুনিয়ার প্রথম শিশু ছিলেন মোহাম্মদ (সা)।

 

ফেসবুক গ্রুপ পাঠশালায় নিজেদের পঠিত ‘সীরাত রিভিউ’ নামে একটি চমৎকার আয়োজনের ব্যবস্থা করেছে। মহামানব মোহাম্মদ (সা) কে নিয়ে কিছুটা লিখতে পারাকে, আমি সৌভাগ্যের অংশ মনে করি। তাই আমার ক্ষুদ্রতম লেখার যোগ্যতা নিয়ে হাজির হয়েছি এই অঙ্গনে। সময়ের অনেক সীমাবদ্ধতার মাঝেও অন্যতম গ্রন্থের রিভিউ লিখার সাড়িতে নিজেকে দাঁড় করিয়েছি। আমার রিভিউর কারণে একটি ব্যক্তিও যদি সীরাত অধ্যয়নে আগ্রহী হয়, সেটা আমার জন্য বিরাট পাওনা। আল্লাহ আমাকে লিখার যথাযথ যোগ্যতা দিন। রাসুল (সা) সীরাত গ্রন্থ রিভিউ

 

নবম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় কবি গোলাম মোস্তফার অন্যতম সেরা গ্রন্থ ‘বিশ্বনবী’ দিয়ে সীরাত পড়ার সৌভাগ্য লাভ করি। তারই ধারাবাহিকতায় জীবনের এই বেলা পৌছা অবধি আরো বেশ কিছু সীরাত গ্রন্থ পড়ার সুযোগ হয়েছে। সবগুলোতেই আনন্দ, ব্যতিক্রমতা ও ভিন্নতার স্বাদ পেয়েছি। এসবের কোনটাই একটি অন্যটির মত নয়। তাইতো দুনিয়াতে এত সীরাত লিখিত হয়েছে এবং আজ অবধি হচ্ছেই। ব্যক্তি জীবনের অন্যতম উপলব্ধি হল, সীরাতের জ্ঞান থাকার কারণে যখনই কোরআন পড়েছি, হাদিস পড়েছি সাথে সাথেই ওসব কথার পটভূমি মনে পড়ে যায়। তাই কোরআন-হাদিস বুঝতে হলে অবশ্যই সীরাত তথা রাসুল (সা) এর জীবনী জানাটা অপরিহার্য। নিজেকে মানুষ দাবী করে এমন প্রতিটি মানুষের উচিত, জীবনে একবার হলেও যেন মহামানব মোহাম্মদ (সা) সীরাত তথা জীবনীটি পড়ে।

 

আমার অভিজ্ঞতার আলোকে এবারের নির্বাচিত সীরাত গ্রন্থের নাম,

বিশ্বনবী – সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম।

লিখক – মাহবুব মোজাচ্ছাম আল হোদায়বি

অনুবাদ – আবদুস সালাম

 

বাংলাভাষায় অনুদিত সীরাত গ্রন্থের মধ্যে আমার কাছে এই গ্রন্থটিকেই একটি সেরা পছন্দ বলে মনে হয়েছে। বইটি লিখা হয়েছে  ‘সিঙ্গাপুরে’। লেখক মাহবুব মোজাচ্ছম আল হোদায়বী একজন মিশরীয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তি। ভাগ্য বিড়ম্বনায় তাঁর মিশরী পিতা সিঙ্গাপুরে চলে আসেন। সেখানেই তার লেখাপড়া ও ব্যক্তিজীবন গড়ে উঠে। ফলে আরবি ভাষী মাহবুব শিক্ষার ব্যবস্থার প্রভাবে ইংরেজিতেও দক্ষতা অর্জন করেন। তিনি সিঙ্গাপুরে থেকেই পাশ্চাত্য থেকে দূর প্রাচ্যের অগণিত পর্যটক, বহু ধর্ম-বর্ণের মানুষের ভাবাবেগ, কৌতূহল, প্রশ্ন, জিজ্ঞাসার সাথে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। আধুনিক মনস্ক বিশ্বের বহু প্রান্তের মানুষ, ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ, রাসুল (সা) সম্পর্কে মিশ্র ধারণার বশবর্তী, আরব সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা ও নিজ ধর্মের প্রভাবে ইসলামকে ঘৃণা করার মানসিকতা সম্পন্ন বহু মানুষের সাথে দেখা হয়েছে। তাদের চিন্তা-চেতনা, উপলব্ধি সম্পর্কে জেনেছেন। এমনতর মানুষদের লক্ষ্য করেই তিনি গ্রন্থটি রচনায় হাত দিয়েছেন।

 

ইতিহাস, ঐতিহ্য নিয়ে যারা বরাবরই আগ্রহী, তাদের জন্য এই গ্রন্থটি একটি উত্তম উপকরণ। রাসুল (সাঃ) জন্মের সময়ে তদানীন্তন আরবের সামাজিক অবস্থাকে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। ঠিক সে সময়ে পৃথিবীর অন্যত্র শক্তিশালী জাতিগুলোর কি অবস্থা সেটা তিনি দারুণ দক্ষতার সহিত আলোকপাত করেছেন। রাসুল (সা) এর জীবনী পড়তে গিয়ে ইতিহাসের এই দিকটি পাঠক যখন পড়বে, তখন নিজেই জানতে পারবে যে, একজন মহামানব ব্যতীত এর উত্তরণ অসম্ভব। ইতিহাসের এই জ্ঞান পাঠককে খুবই উপকৃত করবে। সে কারণে আধুনিক ইংরেজি-বাংলা শিক্ষিত মানুষদেরকে এই বইয়ের তথ্য-উপাত্ত ও উপস্থাপনা প্রবলভাবে আগ্রহী করে তুলবে।

 

রাসুল (সা) এর জন্মকালে দুনিয়াতে অন্যান্য সকল ধর্মই প্রতিষ্ঠিত ছিল। ধর্মের মাধ্যমে পৃথিবীর ভূভাগ বহুখণ্ডে বিভক্ত ছিল। আন্ত-ধর্মীয় হানাহানি, রাজ্যধিপতিরা ধর্মকে ব্যবসা ও সুবিধা হাতিয়ে নেবার কেন্দ্রবিন্দু বানিয়ে ফেলেছিল। নিজেদের মর্জিমত ধর্মকে পরিবর্তন-পরিবর্ধন করে অধীনস্থ রাজ্যের জন শাসন চলছিল। চারিদিকে অরাজকতা, হাহাকার ও মানবতা বিপর্যয়ের মাত্রা সর্বনিম্নে নেমে এসেছিল। প্রতিটি জাতিই নিজের দেশের অধিকর্তাদের হাতেই নিপীড়িত হচ্ছিল। এমন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দুরবস্থার নিখুঁত ছবি অঙ্কন করার হয়েছে এই সীরাত গ্রন্থে।

 

রাসুল (সা) এর জন্মকালে ইহুদী, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ, মাজুসি, হিন্দু ধর্মের প্রবল প্রতাপ ছিল। বাহিরের দৃশ্যত এসব ধর্মের প্রবলতা থাকলেও ভিতর থেকে সকল ধর্মের আহবানই ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েছিল। ইহুদী ও মাজুসী তথা জরথুস্ত বাদের সামাজিক পতন কেন, কিভাবে হয়েছিল তার বিস্তারিত ঐতিহাসিক বিবরণ রয়েছে এই গ্রন্থে। সমাজ ও জনগণের সাথে দূরত্বের কারণগুলো নিখুঁত ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন বিশ্বনবী নামক সীরাত গ্রন্থে। রাসুল (সা) সীরাত গ্রন্থ রিভিউ

 

যেসব পাঠক কম পড়ে বেশী জানতে চায়, তাদের জন্য এই গ্রন্থে বিভিন্ন ধর্ম সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান অর্জনের বিরাট সুযোগ রয়েছে। লেখক সকল বড় ধর্ম গুলো নিয়ে তথ্যভিত্তিক তাত্ত্বিক আলোচনা করেছেন। এসব আলোচনা গুলো নোট করার মত। কোন বক্তা যদি বিভিন্ন ধর্ম বিষয়ে তথ্য ভিত্তিক উপাত্ত হাজির কিংবা আলোচনা করতে চায়। তাহলে তার জন্য এটি একটি দারুণ গ্রন্থ।

 

উপরের বিভিন্ন জাতির ইতিহাস গুলো পড়ার সময় মনে হবে, আমরাও বুঝি সে জাতির ঘটনাগুলো এখনও দেখছি এবং নিজেরাও শিহরিত হচ্ছি। নিজের অজান্তেই মন বলে উঠবে, এই কদাকার সমাজ বদলানোর জন্য একমাত্র আসমানি শক্তি ও সাহায্য ছাড়া সম্ভব নয়। তখনই লিখক নতুন এক অধ্যায়ে পাঠকদের নিয়ে হাজির হবেন। সেটা হল মরু দিগন্তে নতুন আলোর সন্ধান মিলেছে।

 

মোহাম্মদ (সা) এমন এক সমাজে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যেখানে মানুষের কোন অধিকার ছিল না। অশিক্ষিত ও বর্বরতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ ছিল সে সমাজ। সেখানে পরিপূর্ণ চরিত্রের কোন ভাল মানুষ ছিল না। কেবল একজনই ভাল মানুষ ছিলেন! তিনি আল্লাহর নবী মোহাম্মদ (সা)।  মাত্র একজন ভালমানুষের প্রচেষ্টায় পুরো জনপদের সকল বিবেকহীন মানুষগুলো দয়ার্দ্র হয়ে উঠে। মূর্খ মানুষগুলো আলোকিত হয়ে উঠেন এবং তাদের কাছে পারস্য-রোম সাম্রাজ্য পদানত হয়। এবং তাদের চেয়েও অধিকতর উত্তম শাসন ব্যবস্থা দিয়ে জগতে আলোচিত হয়ে উঠেন। এই দিকগুলো সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এই গ্রন্থে।

 

সকল সীরাত গ্রন্থেই ঘটনা তো একই থাকে। তাই ঘটনার সন্নিবেশতা একই থাকে তবে পর্যালোচনা ভিন্নতার কারণে সেটা একটা ভিন্নরূপ ধারণ করে। সমাজ দ্রুত পরিবর্তনশীল, রাসুল (সা) এর সীরাত তথা জীবনী দিয়ে, যখন আজকের সমাজের পার্থক্য নির্ণয় করতে বসা হবে; তখনই সীরাতের আরেকটি ভিন্ন-দিক শুরু হয়ে যাবে। সে কারণে কেয়ামত পর্যন্ত কোরআনের তাফসির হতে থাকবে এবং রাসুল (সা) এর সীরাতের সাথে সমসাময়িক জীবনযাত্রাকে তফাৎ করার কারণেও সীরাত পর্যালোচনার ভিন্নতাও চলতে থাকবে।

 

এই গ্রন্থে রাসুল (সা) পুরো জীবনীটাই আলোচনা করা হয়েছে। রাসুল (সা) এর সম্মানিতা স্ত্রী-গনকে উম্মেহাতুল মোমেনীন তথা মুমিনদের মা হিসেবে পরিগণিত করা হয়। তাঁদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাসও এই বইয়ে আলোচনা করা হয়েছে। যা গ্রন্থটিকে একটি ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। রাসুল (সা)কে জড়িয়ে দুনিয়ার অনেক নিন্দুক লেখক যেসব মনগড়া কাহিনী ফেঁদেছেন। সে সবের প্রমাণিত তথ্য নির্ভর বক্তব্য এই গ্রন্থে পেশ করা হয়েছে। নিন্দাবাদের বস্তুনিষ্ঠ জবার দেওয়া হয়েছে। এই কারণে গ্রন্থটির কলেরব একটু বড় হয়েছে। লিখা কিংবা তথ্যের জন্য বইটি খুবই উপযোগী। তাই যে কারো পাঠাগারে বইটি থাকার অর্থ হল, তিনি তার পাঠাগারকে সমৃদ্ধ করেছেন। আমি নিজেও প্রবাস জীবনের পঁচিশ বছর ধরে এই বইটির সাহচর্যকে বরণ করেছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *