জিনে আক্রান্ত ব্যক্তির অদ্ভুত ঘটনা
একদা চৌধুরী বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। এমন সময় বাড়ির ভিতর থেকে এক মহিলা আমার নাম ধরে ডাকছেন! বাড়ির চারিদিক দিয়ে বেড়ায় ঘেরা। কথা আছে সেই বাড়ীতেও নাকি জিনে আক্রান্ত কেউ একজন আছেন।
যাক, চিন্তা করলাম ভুল শুনেছি কিনা? কান পেতে ভাল করে শুনলাম। ঠিকই তো! আমাকে কেউ ডাকছে। কি আশ্চর্য!
যেখানে দাড়িয়ে আছি সেখান থেকে বাড়ির কেউ আমাকে দেখার কথা নয়! এটা আমার আত্মীয়ের বাড়ী, তবে কোনদিন তাদের ওখানে যাওয়া হয়নি। তাছাড়া এই রাস্তা ধরে আত্মীয়ের বাড়ীতে যাবার কালে কদাচিৎ আসা যাওয়া হয়।
এই গ্রামে আমার গ্রামের এক পাড়াতো বোনের শ্বশুর বাড়ী আছে বটে, তবে তাঁর গলার স্বর আমার মুখস্থ। সন্দেহের ঘোর না কাটতেই, সেই মহিলা কণ্ঠ আমার পিতার নাম ধরেই আমাকে ডাকতে থাকলেন। অনিচ্ছা স্বত্বেও বাড়ীটির দিকে পা বাড়ালাম।
বাড়ীতে ঢুকার মুহূর্তেই আমার সেই পাড়াতো বোনের সাথে দেখা! তিনিও সেই মহিলার ডাক শুনে কৌতূহলে বাড়ীর বাহিরে এসেছেন। তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম কেউ যেন আমার পিতার নাম ধরে আমাকে ডেকেছেন!
তিনি হেসে বললেন, হ্যাঁ তোমাকে এমন একজন ডেকেছেন যার সাথে তোমার পরিচয় নাই! তুমি তো আমাদের এদিকে কখনও আস না। তিনি আমার ‘জ্যা’! বড় ভাসুর, চৌধুরী সাহেবের স্ত্রী!
তাঁর মুখে তোমার ও তোমার পিতার নাম শুনেই আমি বাড়ির বাহিরে এসেছি। তিনি ঘরের ভিতর থেকেই তোমার নাম ধরে ডাকছেন। বাড়ীর সীমানা দেওয়ালের বাহির দিয়ে কে হেঁটে যায় তা, তিনি ঘরের ভিতরে বসেই দেখতে পান।
বাহির বাহিরে কে হেঁটে যায় সেই কথা রোগিকে জানিয়ে দেয় জিন
তোমাকেও তিনি দেখেন নাই। তবে তোমার ও তোমার পিতার নাম ধরে ঢাকার বুঝেছি, তুমি নিশ্চয়ই বাড়ির বাহিরের রাস্তা দিয়ে কোথাও যাচ্ছ। সে কারণে আমি বের হলাম। আর তিনি ঘর থেকেই তোমাকে ডাকছেন, সেটা তো তুমি নিজেই দেখলে!
বোন আমাকে তাঁদের বাড়ীতে নিয়ে গেলেন। বাড়ীতে ঢুকা মাত্র দেখতে পেলাম এক মহিলা ঘরের ভিতরে খোলা জানালার রড ধরে দাঁড়িয়ে। ঘরটি বাহির থেকে বন্ধ, তিনি আমাকে যেন বহুকাল ধরে চিনেন এমন বাক্য ব্যবহার করে আমার নাম ধরে বললেন, ‘তুমি আমাকে এই বাড়ি থেকে বের করে নাও। দরজাটি খুলে দাও, তারা অনর্থক আমাকে বাড়িতে বন্ধী করে রেখেছে’। কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম!
জিন তথ্য আদান প্রদান করতে পারে ফলে আক্রান্ত ব্যক্তিও সেই কাজ করে
সম্বিৎ ফিরে পেলাম। আগেই জানা ছিল জিনে ভর করা মানুষদের কে, তার সাথে ভর করা জিন এভাবে মানুষকে তথ্য দেয়। সেটা আজ নিজ চক্ষে জ্যন্ত প্রমাণ পেলাম। একটু পরেই দেখলাম তিনি নিজে নিজে বকাবকি করছেন এবং আমাকে হুমকি দিয়ে বললেন, যদি দরজা না খুলি তাহলে আমার চরম ক্ষতি হবে।
পর মুহূর্তে আবার নিজে নিজেই হাঁসতে রইলেন। বোনের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম, প্রকৃতই তাঁকে জিনে ধরেছে এবং সেই জিন কোন মতেই মুক্ত করতে পারছেনা। চৌধুরীর বাচ্চারা এখনও ছোট, অনেক টাকা কড়ি খরচ করেছেন, কোন কুল কিনারা হয়নি।
জিন তাড়াতে আজ বিকেলে তাদের বাড়িতে একজন বৈদ্য আসবেন। এই খবর ওনাকে কেউ না বললেও, হয়ত জিনের মাধ্যমে খবরটা তিনি জেনেছেন, ফলে আজ তার পাগলামির পরিমাণটা বেড়ে গেছে।
জিন তাাড়নোর ওস্তাদ বৈদ্য মৌলভী বাচা মিয়ার আগমন
মৌলভী বাচা মিয়া, জিন ভুত তাড়ানোর ওস্তাদ। এতদঞ্চলে তিনি এই কাজে সিদ্ধহস্ত। নিজের সন্তানাদি জন্মের অসুস্থ ও বাঁচেনা বিধায় তিনি এই পেশা ছেড়ে দেবার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন।
অগত্যা চৌধুরী সাহেবের অনুরোধ, কান্নাকাটি ও পীড়াপীড়ির জন্য তাঁকে শেষবারের মত আবারো বৈদ্যের বোঁচকা হাতে নিতে হচ্ছে! খবরটি আমার কাছে কৌতুহলী এবং ঘটনাটি দেখার বিরাট সুযোগ বলে মনে হল। আমি সুযোগটি হারাতে চাইলাম না।
জিনে আক্রান্ত ছেলে হিসেবে আমার নিজেরও কিছু বদনাম আছে! আমার জিন দৌড়ানোর নানা উপায় দেখেছি, যা ছিল পুরোটাই মনগড়া এবং ভূয়া। মানুষ মনে করে যে, আমার সাথে জিন আছে কিন্তু আমিতো জানি আমার সাথে কোন জিন নেই। সেটা প্রমাণ করতেও ব্যর্থ হলাম।
জিনের কল্পিত কান্ডে নিজে ত্যক্ত বিরক্ত হলেও আজ নিজেও তাজ্জব হলাম
এই জিন সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আমি ইতিমধ্যে যথেষ্ট ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে উঠেছিলাম। কিন্তু আজকে আমার মনে ভিন্ন ধরনের আনন্দ লাগছে এই কারণেই যে, প্রকৃতই আমি আজকে একজন জিনে আক্রান্ত মানুষ দেখলাম এবং তার চিকিৎসা পদ্ধতি দেখব।
বৈদ্যকে প্রথমে দেখে ভদ্র ও নিরীহ মনে হলেও, তিনি যখন জিনের রোগীকে পাকড়াও করলেন, দেখলমা তার আচরণ ভয়ঙ্কর রূঢ় হয়ে গেল। রোগী ভয়ে নানা আচরণ করছিল। স্বামী দাঁড়িয়ে স্ত্রীর অসহায় আচরণ দেখে রুমাল দিয়ে চোখের পানি মুছে নিচ্ছিল। সে এক বিদঘুটে দশা।
রোগীকে আগুনে পোড়ার ভয় লাগাচ্ছিল। নাকে সরিষার তৈল লাগিয়ে বিরক্ত করছিল। দৃশ্যত বুঝাচ্ছিল কষ্ট মানুষে পেলেও, আসল কষ্ট কিন্তু জিনে পাচ্ছে। সে কারণে বৈদ্য অনেকটা কড়া আচরণের ভূমিকা নেয়। এক পর্যায়ে রোগী কিছুটা ধাতস্তের মত কথা বলা শুরু করল। শরীরটা প্রায় নিস্তেজ হয়ে গেল। রোগী স্বেচ্ছায় পানি পান করতে চাইলেন।
নিজের চোখের সামনে এভাবে একটি রোগী ভাল হতে দেখলাম। বিশ্বাস না করি কিভাবে। বৈদ্য কিতাব খুললেন, তাবিজ লিখলেন। যথারীতি আমি স্ক্যান করতে থাকলাম। এই বৈদ্যের বই, কিতাবের লেখা, তাবিজের ধরণ আমাদের ছালেক মৌলভির চেয়ে ভিন্ন। দুই মৌলভীর দুই ধরনের বৈদ্যগিরি দেখে, বিষয়টা নিয়ে আমার আগ্রহ ও কৌতুহল বরাবরের চেয়ে আরো বহুগুনে বেড়ে গেল।