জিবরাইল (আঃ) হেরা গুহায় মুহাম্মদ (সাঃ) এর কাছে প্রকাশিত হলেন
সে সময়ের অবস্থা সম্পর্কে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। এ সময় হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম এসে আমার সামনে উপস্থিত হলেন।
তাঁর কাছে ছিল একখণ্ড রেশমী কাপড়। সে কাপড়ে কিছু লেখা ছিল। হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম আমাকে বললেন, ‘পড়ুন’।
আমি জবাব দিলাম আমি পড়তে পারি না। তখন জিবরাইল আমাকে জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গন করলেন। তাঁর সে আলিঙ্গন এমন ছিল যে, আমার মনে হলো আমার প্রাণ বায়ু নির্গত হবে।
জিবরাইল আমাকে পুনরায় বললেন, ‘পড়ুন’। আমি পূর্ববৎ বললাম, আমি পড়তে পারিনা। তিনি সেই আগের মতই আমাকে এমন জোরে জড়িয়ে ধরলেন যে, এবারেও আমার ধারণা হলো আমার প্রাণ বের হয়ে যাবে।
আবারও জিবরাইল আমাকে আদেশ করে বললেন, ‘পড়ুন’। এবার বললাম, আমি কি পড়বো?
জিবরাইল বললেন, ‘পড়ুন আপনার খোদার নাম সহকারে। যিনি সৃষ্টি করেছেন। জমাট বাঁধা রক্তের এক পিণ্ড হতে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। বলুন, আর আপনার খোদা খুবই অনুগ্রহশীল। যিনি কলমের দ্বারা জ্ঞান শিখিয়েছেন। মানুষকে এমন জ্ঞান দান করেছেন যা সে অবগত ছিল না।
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘জিবরাইল যা পড়লেন আমিও তাকে তা পড়ে পড়ে শোনালাম। তখন তিনি বিদায় নিলেন। তারপর আমার ঘুম ভেঙে গেলে আমি জাগ্ৰত হলাম। তখন আমার উপলব্ধি হলো সমস্ত ঘটনাটা এবং যা আমাকে পড়ানো হয়েছিল তা আমার স্মরণে জাগরূক হয়ে আছে।’
জিবরাইল (আঃ) আগমন ও ঐতিহাসিকদের বর্ণনা
ঐতিহাসিক ও গবেষকগণ বলেন, বিশ্বনবীর সাথে বাস্তবে হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম যে আচরণ করবেন সে আচরণ তাঁর ঘুমের ভেতরে করার অর্থ হলো তা ছিল ঘটিতব্য ঘটনার ভূমিকা।
ইবনে হিশাম বর্ণনা করেছেন, এরপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে পাহাড়ের গুহা থেকে বের হয়ে এলেন। পাহাড়ের মাঝামাঝি অবস্থানে আসার পরে তিনি তাঁর মাথার ওপর থেকে এক অশ্রুত কণ্ঠ শুনতে পেলেন।
তাকে ডেকে বলা হচ্ছে, ‘হে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি আল্লাহর রাসুল এবং আমি জিবরাইল!’
এ কণ্ঠ শ্রবণ করে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলেন, হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম একজন অপূর্ব সুন্দর মানুষের আকৃতি ধারণ করে আছেন, কিন্তু তাঁর দুটো পাখা রয়েছে এবং সে পাখা দুদিকে ছড়িয়ে দিয়েছেন।
তিনি পুনরায় বললেন, ‘হে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি আল্লাহর রাসুল এবং আমি জিবরাইল!’
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম-এর দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন।
এরপর তিনি আকাশের যেদিকেই দৃষ্টি দিলেন সেদিকেই তাকে দেখতে পেলেন। সমস্ত আকাশ জুড়েই জিবরাইল আলাইহিস সালাম -কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিরাজ করতে দেখলেন।
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবিচল থেকে সেই দৃশ্য দীর্ঘক্ষণ ধরে দেখতে থাকলেন। তিনি তাঁর কদম মোবারক কোন দিকেই সরাতে পারছিলেন না।
তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন তাঁর সন্ধানে তাঁর সহধর্মিণী লোক প্রেরণ করেছে এবং সে লোক তাঁর সন্ধান করছে কিন্তু তিনি সে লোকটিকে বলতে পারছেন না যে, তাঁর নিজের অবস্থানের কথা। লোকটি ফিরে চলে গেল।
জিবরাইল (আঃ) চলে যাবার পর রাসুল (সাঃ) খাদিজা (রাঃ) কাছে ঘটনা যেভাবে তুলে ধরলেন
এরপর আকাশে আর কোন দৃশ্য দেখলেন না। তারপর তিনি ভীত কম্পিত অবস্থায় বাড়িতে ফিরে গেলেন এবং হযরত খাদিজাকে বললেন, ‘আমাকে কম্বল দিয়ে জড়িয়ে দাও! আমাকে কম্বল দিয়ে জড়িয়ে দাও!’
হযরত খাদিজা (রাঃ) তাকে কম্বল দিয়ে জড়িয়ে দিলেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ভীত কম্পিত অবস্থার অবসান হলে তিনি তাঁর স্ত্রীকে বললেন, ‘হে খাদিজা! আমার এ কি হলো!’
তারপর তিনি সমস্ত ঘটনা তাঁর স্ত্রীকে শুনিয়ে বললেন, ‘আমার নিজের জীবনের ভয় হচ্ছে।’
হযরত খাদিজা (রাঃ) তাকে আশ্বস্ত করে বললেন, ‘অসম্ভব! বরং আপনি সন্তুষ্ট হোন। আল্লাহর শপথ! আপনাকে আল্লাহ কখনো অপমানিত করবেন না। আপনি সব সময় সত্য কথা বলেন এবং আত্মীয়-স্বজনের সাথে উত্তম আচরণ করেন তাদের হক আদায় করেন। মানুষের আমানত প্রত্যাহার করেন। অসহায় মানুষের বোঝা নিজের কাঁধে উঠিয়ে নেন। গরীবদেরকে নিজে উপার্জন করে সাহায্য করেন। মেহমানের হক আদায় করেন এবং উত্তম কাজে সহযোগিতা করেন।’
কোন বর্ণনায় দেখা যায়, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের বাড়িতে শয্যায় অবস্থান করেও হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম-কে দেখেছিলেন এবং তাঁর কানে সেই কণ্ঠস্বর আসছিল।
তিনি অস্থিরতা প্রকাশ করছিলেন আর খাদিজা (রাঃ) স্বামীকে আশ্বস্ত করছিলেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন না, তাঁর স্বামীকে কোন ফেরেশতা এরূপ করছে না শয়তান এরূপ করছে।
জিবরাইল (আঃ) এর বিষয়ে নিশ্চিত হতে খাদিজা (রাঃ) স্বামীর পরীক্ষা নিলেন
এবার তিনি এক বিস্ময়কর প্রক্রিয়া অবলম্বন করলেন। বিশ্বনবীকে তাঁর বাম দিকের উরুর ওপর বসিয়ে বললেন, ‘এবার কি আপনি তাকে দেখতে পাচ্ছেন?’
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘আমি এখনো দেখতে পাচ্ছি।’
খাদিজা (রাঃ) এবার তাকে নিজের ডান উরুর ওপর বসিয়ে জানতে চাইলেন, ‘এবারও কি আপনি সে দৃশ্য দেখছেন?’
আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘হ্যাঁ, এখনো দেখতে পাচ্ছি।’
হযরত খাদিজা এবার তাঁর শরীরের বস্ত্র কিছুটা উন্মুক্ত করে তাঁর স্বামীকে বললেন, ‘আপনি কি এবারও সেই দৃশ্য দেখছেন?’
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘না, এবার দেখতে পাচ্ছি না।’
হযরত খাদিজা তাঁর স্বামীকে আনন্দের সাথে জানালেন, ‘আপনি সুসংবাদ গ্রহণ করুন, আপনি যাকে দেখেছেন তিনি আল্লাহর ফেরেশতা।
শয়তান হলে আমার পরিধেয় বস্ত্র উন্মুক্ত দেখে সরে না গিয়ে নির্লজ্জের মত আমার দিকে তাকিয়ে থাকতো। আল্লাহর ফেরেশতা এমন করে না।’
জিবরাইল (আঃ) প্রকৃত অবয়ব রাসুল (সাঃ) জীবনে ২ বার দেখেছিলেন
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম-কে তাঁর নিজের আকৃতিতে মাত্র দু’বার অবলোকন করেছেন। প্রথম ওহী অবতীর্ণের সময় এবং মেরাজে যাবার সময়। এ ছাড়া তিনি সব সময় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে কোন মানুষের আকৃতিতে আগমন করতেন।
প্রথম দিন জিবরাইল আলাইহিস সালাম এমনভাবে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দিকে শূন্য থেকে ঝুঁকে এসেছিলেন যে, উভয়ের মধ্যে সামান্যই ব্যবধান ছিল। তিনি তাঁর নিজস্ব আকৃতিতে সমগ্র ঊর্ধ্ব পরিমণ্ডল ছেয়ে ছিলেন।
স্বয়ং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আমি তাকে ঐ রূপে দেখেছি, যে রূপে আল্লাহ তাঁকে সৃষ্টি করেছেন। আকাশ এবং পৃথিবীর মধ্যবর্তী সমগ্র শূন্য-মার্গ তাঁর বিশাল আকৃতিতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়।’ (মুসলিম)
মুসনাদে আহমাদে এক হাদিসে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেছেন-নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি জিবরাইল আলাইহিস সালাম -কে সিদরাতুল মুনতাহার কাছে দেখেছি। তাঁর ছয় শত ডানা ছিল। (মুসনাদে আহমাদ)
ওয়ারাকা ইবনে নওফেল
এরপরে হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সাথে করে ওয়ারাকা ইবনে নওফলের কাছে গেলেন।
এ লোক ছিলেন বয়সে বৃদ্ধ ও অন্ধ। তিনি ছিলেন খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা এর চাচাত ভাই। তিনি পৌত্তলিকতা সহ্য করতে না পেরে পরবর্তীতে খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন।
তিনি আরবী এবং হিব্রু ভাষায় ইনজিল লিখতেন। হযরত খাদিজা তাকে সমস্ত ঘটনা জানালেন। তিনিও বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে প্রশ্ন করে সমস্ত ঘটনা জেনে নিলেন।
সবকিছু শুনে তিনি বলে উঠলেন, ‘এ তো সেই ফেরেশতা যাকে মহান আল্লাহ হযরত মুছা আলাইহিস সালাম -এর কাছে প্রেরণ করেছিলেন। আফসোস! আপনার নবুওয়ত যুগে আমি যদি যুবক থাকতাম! আফসোস! আপনার জাতি যখন আপনাকে বহিষ্কৃত করবে! সে সময়ে যদি আমি জীবিত থাকতাম!’
তাঁর এ সমস্ত কথা শুনে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতে চাইলেন, ‘আমার জাতি আমাকে বের করে দেবে?’
ওয়ারাকা ইবনে নওফল জানালো, ‘অবশ্যই! আপনার ওপরে যে দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে, এ দায়িত্ব যার ওপরেরই অর্পিত হবে অথচ তাঁর সাথে শত্রুতা করা হবে না, এমন কখনো হয়নি। সে সময় পর্যন্ত আমি যদি জীবিত থাকি তাহলে আমি অবশ্যই আপনাকে সাহায্য করবো।’
কিন্তু তিনি আর বেশি দিন পৃথিবীতে জীবিত ছিলেন না। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নবুওয়ত লাভের কিছু দিন পরেই ওয়ারাকা ইন্তেকাল করেন।
মুহাম্মদ (সাঃ) স্বপ্নে দেখেছেন ওয়ারাকা ইবনে নওফেল জান্নাতে আছেন
কোন বর্ণনায় এসেছে, তিনি এ ঘটনার দ্বিতীয় কি তৃতীয় বছর পরে ইন্তেকাল করেন। তাঁর ইন্তেকালের পরে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সুন্দর পোশাকে স্বপ্নে দেখতে পেয়েছেন। যার অর্থ ছিল তিনি জান্নাত বাসী হয়েছেন, কেননা তিনি হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম -এর প্রচারিত তাওহীদে বিশ্বাসী ছিলেন।
গবেষকগণ বলেছেন, সাধারণত বর্ণনা করা হয়ে থাকে যে, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নবুওয়ত দান করা হয়েছিল চল্লিশ বছর বয়সে। কিন্তু গবেষণায় প্রমাণ হয়, তাঁর আগমন ঘটেছিল হস্তী বছর রবিউল আউয়াল মাসে।
তাকে নবুওয়ত দান করা হয়েছিল হস্তী বছর হিসাবে রমজান মাসে। এ হিসেবে প্রথম ওহী অবতীর্ণের সময় তাঁর বয়স ছিল চল্লিশ বছর ছয় মাস। (সীরাতে সরওয়ারামে আলম, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-১০৯)
কোন নবীকেই চল্লিশ বছর বয়স পূর্ণ হবার পূর্বে রেসালাত দান করা হয়নি। চল্লিশ বছর বয়সটা মানব জীবনের স্থিতিকাল। রেসালাতের দায়িত্ব অর্পণের ঐতিহ্য অনুসারে বর্ণনা করা হয়েছে, ‘At the age of forty, according to the traditional account, God called Muhammad to be a prophet and began to send his revelations. (Ibid; P-39-40) প্রথম ওহী ও পর্যালোচনা
| 👈পূর্বের পোষ্ট | 𝕋 | পরের পোষ্ট 👉 |