বিশ্বনবী (সাঃ) এর সুমহান চরিত্রের অন্যতম সাক্ষী তাঁর স্ত্রী খাদিজা (রাঃ)
ওহীর সূচনায় মুহাম্মদ (সাঃ) ও হযরত খাদিজা (রাঃ) এর এ সব ঘটনা অকাট্য এবং স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, হযরত জিবরাইল (আঃ) এর আগমনের মুহূর্তকাল পূর্বেও বিশ্বনবী (সাঃ) অবগত ছিলেন না বা কল্পনাও করেননি তাকে নবী হিসাবে নির্বাচিত করা হয়েছে।
নবী পদের জন্য আকাঙ্ক্ষা পোষণ করা তো অনেক পরের বিষয়, তাকে নিয়ে এমন ঘটনা ঘটবে এ ধরণের চিন্তাও তাঁর মনে কোনদিন জাগেনি। জিবরাইল আলাইহিস সালাম -এর আগমন তাঁর কাছে ছিল সম্পূর্ণ আকস্মিক বিষয়।
বিশ্বনবী (সাঃ) এর চরিত্র নিয়ে মক্কায় কাফের শত্রুরাও প্রশ্ন তুলেনি
এ ধরণের একটা অলৌকিক ঘটনা কোন সাধারণ মানুষের সাথে ঘটলে সে মানুষের মধ্যে যে প্রতিক্রিয়া হত, মুহাম্মদ (সাঃ) -এর মধ্যেও তাই হয়েছে। তাঁর এই প্রতিক্রিয়া ই প্রমাণ করে, তিনি এ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অসচেতন ছিলেন।
এ কারণেই দেখা যায়, তিনি যখন ইসলামের দাওয়াতী কাজ শুরু করলেন, তখন মক্কার লোকজন তাকে বিভিন্ন ধরণের অবাঞ্ছিত প্রশ্ন করলেও এ কথা তাকে তাঁরা বলেন নি যে, ‘আপনি বহুদিন ধরে নবী হবার চেষ্টা সাধনা করছেন এবং একদিন আপনি এমন একটা কিছু দাবি করবেন এটা আমরা জানতাম।’
কিন্তু ইতিহাস বলে, তাঁরা এ ধরণের কোন প্রশ্ন কোনদিন করেননি। না করার কারণ হলো, তাদের সামনে বিশ্বনবীর গোটা জীবন ছিল। দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে তাঁরা তাকে দেখছিল।
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ভেতরে তাঁরা এমন কোন কিছু দেখেননি, যার কারণে তাদের কাছেও মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নবুওয়ত ছিল সম্পূর্ণ আকস্মিক ঘটনা। ফলে তাঁরা তাকে নানা প্রশ্ন বাণে জর্জরিত করলেও এ প্রশ্ন কখনো করেননি।
বিশ্বনবী (সাঃ) এর চরিত্র নিয়ে কাফেরদের অন্তরেও কুধারণা ছিল না
গোটা পৃথিবীর ভেতরে তখন একমাত্র বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ই ছিলেন ব্যতিক্রমধর্মী চরিত্রের ব্যক্তিত্ব। এ কারণেও তিনি এক মুহূর্তের জন্যে মনে করেননি, তাঁর মত সৎ এবং পবিত্র মানুষের একটা কিছু হওয়া উচিত।
নবী হওয়া তো দূরের কথা, তাদের মধ্যে সাধারণ কোন নেতা হওয়ার প্রবণতাও ছিল না। তারপর তাঁর ওপরে প্রথম ওহী অবতীর্ণ হওয়ার পরে তিনি এই গুরু দায়িত্বের কথা চিন্তা করে অস্থির হয়ে পড়েছিলেন।
সাধারণ কয়েকজন মানুষের ওপরে নয়, বিশেষ কোন দেশ বা এলাকা অথবা শুধু মক্কার দায়িত্ব তাঁর ওপরে অর্পণ করা হয়নি। তাকে নির্বাচিত করা হয়েছে বিশ্বনবী-বিশ্বনেতা। তিনি শুধু গোটা পৃথিবীর মানুষের জন্য নির্বাচিত হলেন না, সমস্ত সৃষ্টি জগতের জন্য নির্বাচিত হলেন।
এ যে কত বড় দায়িত্ব তা আমরা সাধারণ মানুষ কল্পনাও করতে পারি না। এই দায়িত্বের কথা চিন্তা করেও তিনি অস্থির ছিলেন।
প্রথম ওহী অবতীর্ণের ঘটনা থেকে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে ইউরোপীয় গবেষক এবং ঐতিহাসিকদের ছড়ানো কথাবার্তা যে সম্পূর্ণ জঞ্জাল তা স্পষ্টভাবে প্রমাণ হয়ে যায়।
বিশ্বনবী (সাঃ) এর চরিত্রের ভিতর ও বাহির দুটো দিকই খোলা
একজন মানুষের চরিত্রের অপ্রকাশিত দিক সম্পর্কে জানার প্রথম সূত্র আমাদেরকে মনে রাখতে হবে। একজন মানুষের চরিত্র বাইরের জগতের কাছে অদ্ভুত সুন্দর বলে প্রমাণ হতে পারে। কিন্তু কোন মানুষের চরিত্র তাঁর স্ত্রী এবং একান্ত সেবকের কাছে অপ্রকাশিত থাকে না।
স্বামীর চরিত্রের দুর্বল দিক তাঁর স্ত্রী জানে। স্বামী তাঁর যৌন জীবনে স্ত্রীর কাছে নির্লজ্জ কিনা, লজ্জাশীল কিনা, যৌন জীবনে স্বামী পশুর মত আচরণ করে কিনা, স্ত্রীর সামনে স্বামী বস্ত্রহীন হয়ে পড়ে কিনা, এ সমস্ত দিক বাইরে প্রকাশ না হলেও স্ত্রীর কাছে অপ্রকাশিত থাকে না।
ব্যক্তির একান্ত সেবক জানে তাঁর মনিবের অভ্যাস, চলাফেরা, সে কোথায় কোথায় যায়, কি আহার করে, তাঁর আচরণ, কথাবার্তা, ভাষার মাধুর্যটা বা কাঠিন্য ইত্যাদি দিক সম্পর্কে সেবক বাইরের লোকদের থেকে বেশী জানে।
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রীর কাছে যদি মানবশ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত না হতেন, তাহলে তিনি কোন ক্রমেই ঈমান আনতে পারতেন না। আর খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা কোন অপ্রাপ্ত বয়সের নারী ছিলেন না।
বিশ্বনবী (সাঃ) স্ত্রীদের কাছেও উত্তম চরিত্রের মানুষ হিসেবে পরিগণিত ছিলেন
ইতিপূর্বে তাঁর জীবনে দু’জন স্বামী অতিবাহিত হয়েছে। তিনি বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে স্বামী-রূপে লাভ করার পূর্বেই আগের স্বামীর সন্তানের জননী ছিলেন। তারপরেও গোটা মক্কায় তাঁর চরিত্র এবং বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে সুনাম ছিল।
একজন বিখ্যাত ব্যবসায়ী হিসেবে তাঁর পরিচিতি ছিল। অধিক বিচক্ষণ না হলে সাধারণ কোন জ্ঞান নিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী হওয়া যায় না। খাদিজা ছিলেন সেই পর্যায়ের ব্যবসায়ী। সুতরাং ব্যক্তি নির্বাচনে তাঁর মত নারী ভুল করতে পারেন না।
প্রতিটি মানুষের জীবনের দুটো দিক থাকে, দুটো চরিত্র থাকে। একটা হলো ব্যক্তিগত দিক বা চরিত্র, আরেকটা হলো সাধারণ দিক বা চরিত্র। Personal character and public character, এ দুটো চরিত্র কোন মানুষের কখনো একই ধরণের হতে পারে না।
কিন্তু একমাত্র বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন ব্যতিক্রম ধরণের ব্যক্তিত্ব। যার দুটো চরিত্র ছিল না। তাঁর দিনের এবং রাতের চরিত্রে কোনই পার্থক্য ছিল না।
তিনি তাঁর স্ত্রীদেরকে আদেশ দিয়েছেন, ‘আমি রাতে কি করি এবং দিনে কি করি, সমস্ত কিছুই মানুষকে ডেকে ডেকে জানিয়ে দাও।’
পৃথিবীর বুকে বিশ্বনবীর পূর্বে বা পরে এমন কোন মানুষের অস্তিত্ব ছিল না-কিয়ামত পর্যন্ত অস্তিত্ব লাভ করবে-যিনি তাঁর দাম্পত্য জীবনের সঙ্গিনীকে আদেশ দেবেন, ‘তোমরা আমার দিন রাতের সবদিক সাধারণ মানুষকে জানিয়ে দাও?’
বিশ্বনবী (সাঃ) চরিত্রের ত্রুটি থাকলে সর্বাগ্রে খাদিজা (রাঃ) জানতেন
তাঁর চরিত্রে যদি কোন সামান্য কালিমা থাকতো, তাঁর দাম্পত্য জীবনে যদি কোন ধরণের উশৃঙ্খলতা মুহূর্তের জন্যেও হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা এর কাছে প্রকাশ পেত, তাহলে তিনি তাঁর স্বামীর দাবির প্রতি তথা নবুওয়তের প্রতি সর্ব প্রথম বিশ্বাস স্থাপন করতেন না।
খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা এর মত একজন বয়স্কা, ঐশ্বর্যশালিনী, বিচক্ষণ, দূরদর্শী, দাম্পত্য জীবনের পূর্ব অভিজ্ঞতা সম্পন্ন নারীর সাথে এমন এক ব্যক্তিত্বের বিয়ের ব্যবস্থা মহান আল্লাহ করলেন, যার ছিল না কোন ধন-সম্পদ, বয়সে খাদিজার তুলনায় পনের বছরের ছোট অথচ তাঁকেই নির্বাচিত করা হবে বিশ্বনবী হিসেবে।
এমন একটা অসম বিয়ের ঘটনার মধ্যেও একটা কারণ নিশ্চয়ই নিহিত আছে। আমাদের ধারণায় সে কারণ হলো, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওয়াসাল্লাম-এর চরিত্রের নিষ্কলুষতার দিক।
কেননা, খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহার কাছে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কোন একটি দিকও অপ্রকাশিত থাকবে না, অন্য কোন পনের বিশ বছর বা সমবয়স্কা নারীর দৃষ্টিতে যা ধরা পড়তো না, খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহার দৃষ্টিতে তা অবশ্যই ধরা পড়তো।
এ কারণেই বোধহয় তাঁর মত মহিষী অভিজ্ঞতা সম্পন্ন নারীকেই মহান আল্লাহ বিশ্বনবীর জন্য স্ত্রী হিসাবে নির্বাচিত করেছিলেন। যে নারী দিনের আলোয় এবং রাতের অন্ধকারে অতি কাছে থেকে ঐ মানুষটাকে দীর্ঘ পনের বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করতে পারে, যে মানুষটাকে বিশ্বনবী-বিশ্বনেতা হিসাবে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্বাচিত করা হবে।
বিশ্বনবী (সাঃ) এর চরিত্রের বর্ণনা তাকে কাছে থেকে দেখা জানা-শোনা মানুষেরাই করেছেন
একজন মানুষ নিজের স্ত্রী ব্যতীত পরিবারের সমস্ত সদস্য এমন কি পিতা-মাতা ও নিজের সন্তান-সন্ততির কাছেও ভড়ং ধরতে পারে, ভণ্ডামি করতে পারে। এ সমস্ত কাজে সে সফলও হতে পারে। কিন্তু নিজের স্ত্রীর কাছে এসব করে সফল হওয়া যায় না।
প্রকৃত রহস্য উন্মোচিত হয়ে পড়ে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কথা যে মানুষটা সর্ব প্রথম নিজের সমস্ত সত্তা দিয়ে গ্রহণ করেছিলেন তিনি হলেন তাঁর পনের বছরের জীবন সঙ্গিনী হযরত খাদিজা (রাঃ)। দীর্ঘ পনের বছরে তিনি দেখেছিলেন, এই মানুষটা কত বিশাল উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন। দীর্ঘ পনের বছর সংসার ধর্ম পালন করলেন যার সাথে, তাঁর সামান্য কোন ত্রুটিও তিনি দেখতে পাননি।
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে ছিলেন তাঁর তের চৌদ্দ বছর বয়সের কন্যা, চাচাত ভাই আলী, যিনি সেই শিশুকাল থেকে বিশ্বনবীর সাথে ছিলেন। হযরত যায়েদ (রাঃ), তিনিও ছিলেন পনের বছরের।
হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু তা’য়াল আনহু শিশুকাল থেকেই নবীর খেদমতে ছিলেন। তাঁর একান্ত বন্ধুও ছিল, অসংখ্য আপন আত্মীয়-স্বজন ছিল। প্রাণের দুশমন চাচা আবু লাহাব ছিল।
ওয়ারাকা ইবনে নওফল তিনিও ছিলেন মক্কার একজন বৃদ্ধ জ্ঞান তাপস। তিনিও মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে তাঁর শিশুকাল থেকে দেখেছেন।
বিশ্বনবীর দাবির প্রতি তিনিও সামান্য সন্দেহ পোষণ না করে বিশ্বাস স্থাপন করলেন। তাঁর কাছেও মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উচ্চ সম্মান এবং মর্যাদা ছিল, তা না হলে তিনি তাঁর ওপরে বিশ্বাস স্থাপন করতেন না।
মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মত উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন মানুষের কাছে ফেরেশতার আগমন এবং তাঁর নবী নির্বাচিত হওয়া ওয়ারাকার কাছে আশ্চর্যের কিছু ছিল না। তাঁরা কেউ কোন দিন বিশ্বনবীর চরিত্রে সামান্য দুর্বলতা সম্পর্কে কোন কথা উত্থাপন করতে পারেননি।
অথচ ইউরোপীয় ঐতিহাসিক গবেষকদের চোখে বিশ্বনবীর দুর্বলতা আবিষ্কার হলো। হবারই কথা, তাঁরা অতীতেও নিজেদের চরিত্র দিয়ে অপরকে পরিমাপ করেছেন বর্তমানেও করবেন এতে আমাদের অবাক হবার কিছু নেই।
| 👈পূর্বের পোষ্ট | 𝕋 | পরের পোষ্ট 👉 |