নবীর শিক্ষা কবিতার পরিবর্তিত দরগাহ ভার্সন
মহানবী (সাঃ) এক ভিখারীকে তার পরিবারের একমাত্র সম্বল, কম্বল বিক্রি করিয়া একটি কুঠার কিনে, অর্ধেক দিয়াছিলেন খাদ্য কেনার জন্যে। বাকী অর্ধেক দিয়া একটি কুঠার কিনে দিয়ে বললেন, যাও বনে গিয়ে কাঠ কেটে খাও। ভিক্ষুক বনের কাঠ কেটে অচিরেই ভাগ্য ফিরালেন। এ কথা অনেকেই জানেন।
কিন্তু এখন জমানা বদলে গেছে। তাই ভিক্ষুকের অভ্যাসও বদল হয়েছে! তারা এখন আর কাজ করে ভাগ্য বদলাতে চায় না। বরং তারা যদি ভাগ্যক্রমে রাসুলের দেওয়া একটি কুঠার পেয়ে যায়; তাহলে কাঠ না কেটে এমন কি আজীব কাজ করত, সেই নতুন ফিরিস্তি তুলে ধরা হয়েছে এই কবিতায়। তাই কবিতাটি কুঠার হাতে পাবার পর থেকেই শুরু হয়েছে।
বিরক্ত বদনে, কুঠার হাতে, ভিক্ষুক যায় বাজারে
দরদাম ছাড়া সেই কুঠার খানা বেচে দিল দুই হাজারে!
ছয়শত দিয়া কিনে আলখেল্লা, চারশত দিয়া এক থলে,
দুইশতে কিনে প্লাস্টিকের কুঠার, আটশ গেল জলে
রং লাগানো কুঠার খানা, দেখিতে লাগে চকমকে,
মাটিতে ঘষিয়া, কাদায় ডুবাইয়া করিল তাহা খসখসে,
পুরানা প্রাচীন আভাস আসিল, সেই কুঠারের গায়ে,
অলস ভিখারি খুশীতে দাঁড়ায়, নতুন ফন্দি পেয়ে,
মাজারের পাশে বসিয়া ভিক্ষুক,
প্রচারিল তাহা মানুষের তরে,
শোন হে অবুঝ আদম, আল্লাহ বিমুখ!
নবীজির দেওয়া এক কুঠার আছে মোর ঘরে!
আলখেল্লা গায়ে, তসবিহ গলায়, মাথায় তাহার টুপি,
সাথে আছে তার সেই থলে-খানি, জ্বালানো হয়েছে কুপি,
বলিল ওরে, ওহে জিয়ারতকারী, হাতে নবীজির কুঠার!
সওয়াবের নিয়তে কিছু দাও, নইলে নবীজি, হইবে বেজার
মূর্খ জাহেলদের দল ভিড় লাগাইয়া
দলাদলি আর ঠেলাঠেলি করিয়া,
ভরিতে লাগিল সেই থলে খানি, নিজ হাত দিয়া
খোর্মা-খেজুর, তোহফা, তবরুক আরো নানা হাদিয়া
দিনে দিনে বাড়িল ওহায়, নানা ভক্তের-কুল
রাতভর জিকিরেতে তারা, হল মশগুল
নবীজীর কুঠারেতে ফুটিল, এক মহা ভাগ্যের ফুল
অলস ভিখারি হইয়া উঠিল, হক মারেফতের মূল
নবীর শিক্ষা কবিতার পরিবর্তিত দরগাহ ভার্সনে বর্তমান সমাজের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে
উপরে “নবীর শিক্ষা কবিতার দরগাহ ভার্সন” কবিতাটি দিয়ে আমাদের সমাজ ও কৃষ্টির মানুষদের বর্তমান চরিত্র আঁকা হয়েছে মাত্র। পরিশ্রমী মানুষ সামান্য সহযোগিতা পেলে অনেক উপরে উঠতে পারে কিন্তু অলস মানুষের কাছে সহযোগিতা এলে সে ওটাকে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয় অনেক ক্ষেত্রে অবমূল্যায়ন করে। আমাদের দেশে এমন দৃষ্টান্ত অগণিত।
“ওদিকে ধর্ম ব্যবসায়ীরা অলসতাকে প্রশ্রয় দেয়। তারাও মানুষকে স্বাবলম্বী হবার বদলে, উল্টো মানুষকে ভাগ্য নির্ভর করে তুলে। আচানক একদিন ভাগ্য সুপ্রসন্ন হবে এবং ধনী ও সৌভাগ্যশালী হয়ে উঠবে। জীবনটা একটা লটারীর মত, যা বদলাতে ভাগ্যের দরকার। আর ভাগ্য বদলানোর জন্যে একমাত্র জায়গা হল মাজার, দরগাহ, দরবার এগুলোর খাদেম, পীর, বুজুর্গরা। এদের কাছে নবীর শিক্ষা বলতে, বেশী প্রশ্ন না করে, আন্তরিকতার সাথে উন্মুক্ত মনে, বিনা বাক্য ব্যয়ে হাদিয়া-তোহফা দান করা এবং তাদের সম্মান ও মান্য করা “
এমন অমুলক কথায় কিছু মানুষ সুভাগ্যের আশায়, জীবনকে বিলম্বিত করে। এই সময়টা অলসতায় কাটায়। যখন বুঝতে পারে সময় মত কাজে হাত না দেওয়ায়, দুর্ভাগ্য তাকে ঘিরে ধরেছে। তখন আর শোধরানোর পথ থাকে না এবং নব উদ্যোমে কাজ শুরুর হিম্মত, অন্যের সহযোগীতা কিংবা মানুষের গ্রহণযোগ্যতা হারায়।
নবীর শিক্ষা কবিতায় একজন কর্মমুখর ব্যক্তি গরীবি পর্যায় থেকেও নিজের সুদিন ফিরিতে আনতে পারেন
একদা এক দোকানদার ব্যক্তি রাসুল (সাঃ) বাজারে দেখতে পেয়ে বললেন, হে মুহাম্মদ! (সাঃ) আপনি কি আমাকে চিন্তে পেরেছেন? আমি সেই ভিক্ষুক যাকে একদা একটি কুঠার কিনে হাতল লাগিয়ে দিয়েছিলেন। আমি বাজারে কাঠ বিক্রি করে আজ স্বাবলম্বী এবং একজন ব্যবসায়ী হয়েছি।
নবীর শিক্ষা কবিতাটি আক্ষরিক অর্থেই কার্যকর ছিল একজন কর্মমুখর ব্যক্তির জীবনে। নবীর শিক্ষা কবিতায় বুঝানো হয়েছে মানুষ হয়ত গরীব হতে পারে কিন্তু তার চরিত্র যদি গরীব না হয় (অলস, অকমর্ণ্যতা) তাহলে কারো সামান্য সাহায্যেও সেই ব্যক্তি একদিন স্বাবলম্বি হতে পারে।
আর চরিত্র গরীব হয়, তার দ্বারা নিজেরও যেমন উপকার হয়না, সমাজেরও উপকার নাই। উপরোন্ত বহু মানুষের জন্যে সে একটি পথভ্রষ্টতা উপহার দেয়। যেমনটি ধর্মীয় কাজের চাদরের আড়ালে মাজার, দরগাহ, দরবার কেন্দ্রিক করে থাকে। সেটা তুলে ধরতেই নবীর শিক্ষা কবিতার বাংলা ভার্সনের সৃষ্টি।
প্রখ্যাত কবি শেখ হাবিবুর রহমান কর্তৃক লিখিত নবীর শিক্ষা নামক মূল কবিতাটি এখানে দেওয়া হয়েছে।
“নবীর শিক্ষা” (মূল কবিতা) : শেখ হাবিবুর রহমান
“তিন দিন হ’তে খাইতে না পাই, নাই কিছু মোরে ঘরে,
দারা পরিবার বাড়িতে আমার উপোষ করিয়া মরে।
নাহি পাই কাজ তাই ত্যাজি লাজ বেড়াই ভিক্ষা করি,
হে দয়াল নবী, দাও কিছু মোরে নহিলে পরাণে মরি।
আরবের নবী, করুণার ছবি ভিখারির পানে চাহি
কোমল কণ্ঠে কহিল, – “তোমার ঘরে কি কিছুই নাহি?
“বলিল সে, “আছে শুধু মোর কম্বল একখানি।
“কহিল রসুল, “এক্ষুণি গিয়া দাও তাহা মোরে আনি।
“সম্বল তার কম্বলখানি বেচিয়া তাহার করে,
অর্ধেক দাম দিলেন রসুল খাদ্য কেনার তরে,
বাকি টাকা দিয়া কিনিয়া কুঠার, হাতল লাগায়ে নিজে,
কহিলেন, “যাও কাঠ কেটে খাও, দেখ খোদা করে কি-যে।
“সেদিন হইতে শ্রম সাধনায় ঢালিল ভিখারি প্রাণ,
বনের কাষ্ঠ বাজারে বেচিয়া দিন করে গুজরান।
অভাব তাহার রহিল না আর, হইল সে সুখী ভবে,
‘নবীর শিক্ষা ক’রো না ভিক্ষা, মেহনত কর সবে’
আরো পড়ুন: বিশ্বনবী (সাঃ) এর জীবনী, ধারাবাহিক অনলাইন ভার্সন
উল্লেখ্যে, শেখ হাবিবুর রহমান কর্তৃক লিখিত নবীর শিক্ষা কবিতাটি পাকিস্তান পরবর্তী স্বাধীনতা প্রাপ্ত বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ কিংবা পঞ্চম শ্রেণীর বইতে পড়ানো হত। পরে সিলেবাস থেকে কবিতাটি বিতাড়ন করা হয়!