সুরা আল আছর – দারসুল কোরআন

sura-al-asr, সময়, মহাকাল, সুরা আছর, পড়ন্ত বেলা, জীবন সায়াহ্ন

সুরা আল আছর – দারসুল কোরআন

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
﴿ وَالْعَصْرِ﴾﴿إِنَّ الْإِنسَانَ لَفِي خُسْرٍ﴾﴿إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ﴾

১) সময়ের কসম (মহাকালের শফত)। ২) নিশ্চয়ই মানুষ বড় ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত রয়েছে। ৩) তবে তারা ছাড়া যারা ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করতে থেকেছে এবং একজন অন্যজনকে হক কথার ও সবর করার উপদেশ দিতে থেকেছে।

ওয়াল আছর - সময়ের কছম, ইন্না – নিশ্চয়ই, ইনছানা – মানুষ, লাফি – নিমজ্জিত রয়েছে, খুচরিন – ক্ষতির মধ্যে, ইল্লা – তারা (ছাড়া), লাজিনা – যারা, আমানু – ইমান এনেছে, ওয়া আমেলু – এবং করেছে (করতে থেকেছে) ছোয়ালিহাতে – সৎকর্ম, ওয়া তাওয়া’সাও - এবং পরস্পরকে উপদেশ দিয়েছে হাক্কে – সত্যের (পথে), ওয়া তাওয়া’সাও - ও পরস্পরকে   উপদেশ দিয়েছে, বিস’সাবরে - ধৈর্য্যের (নীতি অবলম্বন করতে) [উচ্চারণ বাংলায় নির্ঘাত ভুল হবে, তা অবশ্যই আরবীতে করতে হবে]

সুরা আছর পবিত্র কোরআনের ১০৩ নম্বর সুরা এবং এই সুরাটি ৩ আয়াত বিশিষ্ট

সুরা আছর নামকরণ:

এই সুরার ওয়াল-আছর আয়াত থেকে সুরার নাম ‘আছর’ হয়েছে

সুরা আছর অবর্তীর্ণ হবার সময়কাল:

মক্কী যুগের প্রথম দিকে। সে সময়ে ইসলামের শিক্ষাকে সংক্ষিপ্ত ও হৃদয়গ্রাহী বাক্যের মাধ্যমে বর্ণনা করা হতো, যাতে করে মুখস্থ থাকে।

সুরা আছর এর মূল বিষয়বস্তু:

শুরুতেই মানুষকে সময়ের মূল্য প্রদান ও তাকে যথাযত ব্যবহার করার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। আবার স্রেফ সময়কে মূল্য দানের মধ্যেই মানবজীবন সীমাবদ্ধ নয়। বহু গুরুত্বপূর্ণ পদের মানুষ প্রতিটি মিনিটকে কাজে লাগাতে সারাদিন এমনকি সারা জীবনের কাজকে সুনিদ্দিষ্ঠ রুটিনের অধিনে বিন্যস্তের মাধ্যমে কাজ করে। এই সুরার আলোকে তারাও ক্ষতিগ্রস্থের মধ্যে থাকবে; যদি না তার কাছে (১) আল্লাহর উপর ঈমান না থাকে (২) নির্মোহ সৎকাজ না করে (৩) পরস্পরকে হকের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে উপদেশ না দেয় এবং (৪) একে অন্যকে সবর অবলম্বন কিংবা ধৈর্যের সাথে সমস্যা মোকাবেলার করার সাহস না জোগায়।

সূরা আছর নাজিলের ভিন্ন একটি প্রেক্ষাপট:

সুরা আছরের সাথে একটি ঘটনা আছে। জাহেলি যুগে আবু বকর সিদ্দিকের সাথে কালাদাহ ইবনে উসায়েদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। আবু বকরের ইসলাম গ্রহণের পর, একদিন কালাদাহ তাঁর নিকট এসে বললো, “হে আবু বকর! তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেল? ব্যবসা-বাণিজ্যে তো লাটে উঠেছে! তোমার আয়-রোজগার তো প্রায় বন্ধই! তুমি কোন ধারণায় নিমজ্জিত রয়েছ? নিজেদের পৈত্রিক ধর্মকর্মের সাথে দুনিয়াও হারিয়েছ! তুমি তো উভয় দিক থেকেই পূর্ণ লোকসানে নিপতিত হলে।”

আবু বকর বললেন, “হে নির্বোধ! যে লোক আল্লাহ তা’আলা ও তার রাসুলের গোলাম হয়ে যায়, সে কখনো লোকসানে নিপতিত হয় না। যারা পরকাল সম্পর্কে কোন চিন্তাভাবনা করে না; মূলত তারাই ক্ষতিগ্রস্ত, তারাই লোকসানে নিপতিত! যারা কেবল জাগতিক উন্নতি লাভের জন্যই সদা চিন্তামগ্ন ও ব্যস্ত থাকে, তারাই উভয় কূল হারায়।”

আবু বকরের কথার সত্যতা প্রমাণ এবং এ ঘটনাকে উপলক্ষ করেই পরবর্তীতে মক্কী যুগে সূরা আছর অবতীর্ণ হয়। তাছাড়া সাহাবীগন একে অপরের সাথে মোলাকাত হলে, বিদায় কালে এই সুরাটি তেলাওয়াত করে, জীবনের অন্তনিহিত গন্তব্যের কথা মনে করিয়ে দিতেন।

وَالْعَصْرِ – সময়ের কছম (মহাকালের শফত); এখানে আছর অর্থ সময় বা মহাকাল।

– শুরুতে ‘আছর’ অর্থ সময় এই বিবেচনায় আলোচনা চলবে মহাকালের আলোচনা শেষে থাকবে

– ‘আছর’ শব্দটি আরবি ‘আছ্‌র’ (عَصْر) ধাতু থেকে এসেছে, যার মূল অর্থ হলো ‘নিঙড়ানো’ বা ‘চিপে রস বের করা’ মানব জীবনকে নিঙড়ে বা চিপে চ্যাপ্টা করে সময় বের করে নিয়ে যাচ্ছে।

– আবার আছর অর্থ সময় (পড়ন্ত বেলা, জীবন সায়াহ্ন, দিনের প্রান্ত সীমা)

– দুনিয়াতে সবচেয়ে মুল্যবান সম্পদের বা উপাদানের নাম সময়।

– ফাঁসিতে ঝুলতে যাওয়া ব্যক্তি শেষ সময়ে বুঝে সময়ের মূল্য। সে আফসোস করে যদি আরো কয়েকটি সেকেন্ট অতিরিক্ত পাওয়া যেত, তাহলে আল্লাহর কাছে মনে কথা বলার সুযোগ হত!

– প্রতিনিয়ত শ্বাস-কষ্টে ভোগা রোগী, বুঝে সময়ের দূরত্ব কত! সে যখন বিশ-ত্রিশ বার চেষ্টা করে একটি পরিপূর্ন নিঃশ্বাস নেয়, সে বুঝে সময় কত লম্বা!

– একজন দৌড় প্রতিযোগী বুঝে, সময় কত দ্রুত শেষ হয়ে যায়। যদি আরো ৫ সেকেন্ট সময় লম্বা হত, তাহলে সামনের দু’জন প্রতিযোগিকে পিছনে ফেলা যেত!

– সঙ্গিহীন একা হয়ে পড়া অশীতিপর বৃদ্ধ জীবন সায়াহ্নে বুঝতে পারে, জীবনটা কত সংকোচিত! এই সেদিনও তারা দু’জন ছিল একে অন্যের অবলম্বন হয়ে, এখন নিঃস্ব একা!

– সময়কে নদীর স্রোতের সাথে তুলনা করা হয়; যেখানে পরিষ্কার পানি ও ঘোলা পানি আসতে থাকে। যে পরিষ্কার পানিতে বাটি ঢুকিয়ে তুলে নিলেন, মুহূর্তেই সেটা দূরে চলে গেল।

– সময়কে জলন্ত মোমবাতির সাথে তুলনা করা যায়, সেটা জ্বলে বটে কিন্তু একসময় নিঃশেষ হয়ে যায়। তখন বুঝা যায় আলোর মূল্য কত এবং ক্ষয়ে যাওয়া মোমবাতি পূনরায় সৃষ্টি হয়না।

– সময়কে তাফসিরে আল-কাবিরে আল্লামা রাজির সেই বরফ বিক্রেতার চিল্লানোর সাথে তুলনা করেছেন, যে ব্যক্তি চিল্লাচ্ছিল এমন ব্যক্তির উপর দয়া করুন, যার মূলধন গলে যাচ্ছে

– সময়কে চার কোনা একটি চাদরের সাথে তুলনা করা যায়, যে চাদরের সুতাগুলোর দৈর্ঘ হল মানুষের হায়াত। যেখান থেকে একটি সুতা বের করলে, চাদরের স্থায়িত্ব ও ঘনত্ব কমতে থাকে।

– সময়কে সম্রাট আলেক্সান্ডারের সম্পদ ও ক্ষমতা অর্জনের ঘটনার সাথে উল্লেখ করা যায়। মৃত্যুকালে কফিনের বাইরে দুটি খালি হাত দেখিয়ে বুঝিয়েছিল, সব কিছুই রয়ে গেছে কিন্তু সময়টা অপচয় হয়েছে।

– দুনিয়াতে আমরা যারা জীবিত আছি, আমরা সবাই সেই দৌড় প্রতিযোগীর মত বিজয়ী হতে প্রানান্তকর গতিতে দৌড়াচ্ছি আবার নিজের জমানো সময়টাকে ক্ষয় করে ওজন কমাচ্ছি, কখন প্রান্ত সীমায় পৌছব সেই আশায়। যে প্রান্তে পৌঁছলে ফিরাটা অসম্ভব। এটাকে কাজে লাগানোই হল মহা সাফল্য। তাই মহান আল্লাহ এই বিষয়টিকে অতীব গুরুত্ব দিতে বান্দাদের তাকিদ করেছেন।

إِنَّ الْإِنسَانَ لَفِي خُسْرٍ – নিশ্চয়ই মানুষ বড় ক্ষতির মধ্যে রয়েছে।

– জন্মের পর থেকেই মানুষের ক্ষয়, ক্ষতির গতি শুরু, ইচ্ছায় হউক অনিচ্ছায় হউক এটা চলমান

– সেটার শেষ পরিমান নির্ধারিত, যেটা প্রতিদিন প্রতিনিয়ত জ্বলন্ত মোমবাতির ন্যায় ক্ষয়ে যাচ্ছে

– সময় চলে যাবার আরেকটি কথা হচ্ছে, মানুষের মৃত্যুর সময় নিকটতর হচ্ছে

– শুধু দুনিয়ার জীবনকে, ব্যস্ত থেকে যেন সদা পাপ নাফরমানিতে ব্যস্ত না থাকি

– এই পৃথিবীতে আসতে পারাই মহা সৌভাগ্যের বিষয়, সুতরাং সেটার অবহেলা যেন না হয়

– ধরুন কোন ব্যাংকের আমানতের লভ্যাংশ প্রতিদিন তুলে নিতে হয়, পরের দিন পাওয়া যাবে না। এ অবস্থায় প্রতিদিনের লভ্যাংশ তুলতে সকল কিছু বাদ দিয়ে, ব্যাংকের পিছনেই পড়ে থাকত

– সময়ের বিষয়টাও এমনি গুরুত্বপূর্ন, যেন প্রতিটি দিনকে মানুষ কাজে লাগায়, নয়ত সর্বনাশ

إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ – তবে তারা ছাড়া যারা ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করতে থেকেছে এবং একজন অন্যজনকে হক কথার ও সবর করার উপদেশ দিতে থেকেছে।

– এত কিছুর পরেও কিছু মানুষ এই ক্ষতি থেকে বাঁচতে পারবে বা বাঁচার চেষ্টা হিসেবে ধরা হবে

– এই ক্ষতি থেকে তারাই বাঁচতে পারছে, পারবে যাদের কাছে নিচের ৪টি গুরুত্বপূর্ন পূঁজি রয়েছে

– যারা ইমান এনেছে, অব্যাহত সৎকাজে ব্যস্ত থাকে, নিজে হকের উপরে থাকে এবং অন্যকে হকের উপরে থাকতে বলে এবং একে অপরকে ধৈর্য ধরার নসিহত করে। চলুন ব্যাখা দেখি…

১. সুরা আছরের বর্ণিত প্রথম গুণটি হচ্ছে ঈমান

ঈমান শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে স্বীকৃতি দেয়া। আর শরীয়তের পরিভাষায় এর অর্থ অন্তরে বিশ্বাস, মুখে স্বীকার এবং কাজকর্মে বাস্তবায়ন। [মাজমু ‘ফাতাওয়া ৭/৬৩৮]

ঈমান কি, তা বর্তমান সময় দিয়ে বিবেচনা করা সম্ভব নয়। ইসলাম আগমনের সময়, ঈমানের বিষয় আজকের চেয়েও খুব কঠিন বিষয় ছিল। সুরা কাফিরুনের দিকে তাকালে বুঝতে পারি রাসুল (সাঃ) ঈমান বিল্লাহর ভিত্তিতে ইসলাম পুরো সমাজের মানুষকে আলাদা করে দিচ্ছিলেন! এমনকি একজন কাফির ঈমান আনার সাথে সাথে তার স্ত্রী তালাক হয়ে যাচ্ছিল। বেলাল (রাঃ) দোষ খুব সামান্যই ছিল। তিনি সঠিকভাবে কাজ করেও মুনিব উমাইয়ার মন পেতেন না। মুনিব বলত, মুহাম্মদ (সাঃ) এর জন্যে অন্তরে ভালবাসাও রাখা যাবে না।

২. সুরা আছরে ক্ষতি থেকে বাঁচাবার জন্য দ্বিতীয় যে গুণটি অপরিহার্য সেটি হচ্ছে সৎকাজ

কুরআনের পরিভাষায় একে বলা হয় ‘আমালে সালেহা’। সমস্ত সৎকাজ এর অন্তর্ভুক্ত। কোন ধরনের সৎকাজ ও সৎবৃত্তি এর বাইরে থাকে না। কিন্তু কুরআনের দৃষ্টিতে যে কাজের মূলে ঈমান নেই এবং যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল প্রদত্ত হেদায়াতের ভিত্তিতে সম্পাদিত হয়নি তা কখনো সৎকাজের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না। তাই কুরআন মজীদের সর্বত্রই সৎকাজের আগে ঈমানের কথাটি শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছে।

ঈমানের সাথে সৎকাজ আর ঈমান বিহীন সৎকাজ আসমান জমিন তফাত। যারা ঈমানের সাথে সৎকাজ করে তারা আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে দেখানোর জন্যে করেনা। এটা বহু কঠিন কর্ম। মানুষের প্রবৃত্তিতে, প্রদর্শনের ইচ্ছা, ভাল কাজের প্রচার পাওয়া, বাহবাতে খুশী হওয়া ইত্যাদি। ফলে মানুষ সামান্য সৎ কর্ম করেও সেটার বাহবা তারা লোক সমাজ থেকে কুড়াতে চায়। তারা রমজানে জাকাত দিতে ঢোল পিটাবে আবার নির্বাচনে সেই জাকাতের খোঁটা দিয়ে ভোট আদায় করবে। রাজনৈতিক নেতারা জন-দুর্ভোগে দশ লাখ টাকা খরচ করেনা কিন্তু দলের প্রধানের হাতে ৫ কোটি দিতে দ্বিধা করেনা। কারণ একটাই নেতার চোখে প্রশংসিত হওয়া। কারো মেয়ের বিয়ে কিংবা রাস্তাঘাট উন্নয়নে অন্যের থেকে দান সংগ্রহ করে ভূমিকা রাখবে কিন্তু নিজে অংশ নেয়না।

৩. সুরা আছরে তৃতীয় যে গুনাবলীর কথা বলা হয়েছে সেটা হল ‘হক’ এর পক্ষে কথা বলা

সার্বিকভাবে আয়াতের অর্থ হচ্ছে; সঠিক, নির্ভুল, সত্য, ন্যায় ও ইনসাফ অনুসারী এবং আকীদা ও ঈমান বা পার্থিব বিষয়াদির সাথে সম্পর্কিত প্রকৃত সত্য অনুসারে কথা বলতে হবে। আর এটা না করলে অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বরং আল্লাহর লা’নতে পতিত হবে।

এখানে হক বলতে সদা সত্য কথা বলা বুঝানো হয়নি। এমন হক কথা তো, ইমাম সাহেব মিম্বরে দাড়িয়ে প্রতিনয়ত বলে থাকে। মূলত হক কথা হল সেটি, অন্যায়ের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে সত্য ও ন্যায়ের কথা তুলে ধরে, সকল ব্যক্তিকে প্রতিপক্ষ বানানোর ঝুঁকি নিয়ে, ন্যায়ের পক্ষে থাকার সাহসিকতা দেখানো। রাসুল (সা) আবু লাহাবের ঘরে দুটো কন্যা বিয়ে দেবার পরেও, অন্যায়ের প্রতিবাদে, দৃঢ় কণ্ঠে সুরা লাহাব উচ্চারণ করেছিলেন। এই সুরায় লাহাবের কাজকে নিন্দা করা হয়েছে। রাসুল (সাঃ) দুটো কন্যার সুনিশ্চিত তালাকের ঝুঁকি নিয়েই আবু লাহাবের কাজের প্রতিবাদ করেছেন। এক মহিলাকে পাপিষ্ঠ বলে হত্যা করতে বনী ইসরাইল একত্র হয়, সেই মহিলা ইসা (আঃ) এর সাহায্য চায়, নবী ইসা পুরো সম্প্রদায়ের বিপক্ষে দাড়িয়ে মহিলাকে বাঁচান।

একথাটিই পবিত্র কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে এভাবে, “দাউদ ও ঈসা ইবনে মারইয়ামের মুখ দিয়ে বনি ইসরাঈলদের ওপর লা’নত করা হয়েছে। এই কারণে যে, তাদের সমাজে গোনাহ ও যুলুম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং লোকেরা পরস্পরকে খারাপ কাজে বাধা দেয়া থেকে বিরত থেকেছিল। [সূরা আল মায়িদাহ: ৭৮–৭৯]

৪. সুরা আছরে বর্ণিত চতুর্থ গুনাবলী হল সবরের পথে অবিচল থাকা

সবর শব্দের মূল ভাবার্থ হল, ‘আনন্দ, প্রতিকূলতা, দুঃখ এবং উদ্বেগের সময়ে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং মন্দ কাজ এড়িয়ে চলা’।

হকের কথা বলতে গেলে কিংবা হকের পথ সমর্থন করা কিংবা তার অনুসারী হতে গেলেই নানা সমস্যা ও বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়। আপনজন পর হয়, কাছের মানুষ দূরে রয়। এপথে যেসব কষ্ট, পরিশ্রম, বিপদ-আপদ, ক্ষতি ও বঞ্চনা মানুষকে নিরন্তর পীড়িত করে তার মোকাবেলায় তারা পরস্পর অবিচল ও দৃঢ়পদ থাকার উপদেশ দিতে থাকবে।

হক কথা যে বলে, প্রথমেই তিনি তার কাছের মানুষের কাছে চক্ষুশূল হয়ে উঠেন। সন্তান, স্ত্রী, ভাই, বন্ধু এরা সবাই। তার মনোবেদনার কথা কাউকে বলতে পারেন না, ফলে তিনি সমাজে একাকি হয়ে পড়বেন। ঠাট্টা তামাশার পাত্র হবেন। এলাকার মাস্তান, মাদকসেবী, টাউটশ্রেণী তাকে হুমকি হিসেবে দেখবে। সুযোগ পেলে পথে ঘাটে বেইজ্জত করবে। এমন ঘটনায় তিনি তো বিচার পাবেন না, উল্টো হকপন্থী না হয়ে, সমজোতা পন্থি হতে সবাই পরামর্শ দিবে। বলা হবে, কেন তুমি ওদের সাথে লাগতে গেলে? এটা অনুধাবনের জন্যে নিজের হয়ে যদি আত্ম-সমালোচনা করি এভাবে যে, আচ্ছা আমিই যদি হক পন্থি হয়ে এসব কাজ করতাম, তাহলে আমার চারিদিকে প্রথম বিরোধিতা কারি করা হবে। নিশ্চয়ই দেখতে পাবেন, সবই পাড়া প্রতিবেশী ও আত্মীয়। সে কারণেই ধৈর্য ধরার তাগিদ।

সুরা আছরে মহাকালের শফত অর্থ মহাকাল বা সামগ্রিক সময়টা কি (Epoch / Endless Time)

সূরা আল-আছরের তাফসীরে অধিকাংশ তাফসীর-কারক (যেমন: ইমাম ইবনে কাসীর, ইমাম রাযী ও ইমাম তাবারী) উল্লেখ করেছেন যে, এখানে ‘আছর’ বলতে ‘দেহর’ (الدهر) বা মানবজাতির সমগ্র ইতিহাস ও মহাকালকে বোঝানো হয়েছে। এটি খুবই দ্রুত শেষ হয়ে যায় গতিশীল বিষয়। প্রতিটি মিনিট, প্রতিটি সেকেন্ড এখানে বিবেচ্য। ফলে দ্রুত ধাবমান ও ক্ষীয়মাণ সময় বা যুগের নামই মহাকাল। এই মহাকালের ঘড়িকে কেন্দ্র করে বিজ্ঞান জগতে ঘটেছে এই অবিস্মরণীয় ঘটনা।

পদার্থ বিজ্ঞানী নিউটন 3D তথা Three Dimensions থিউরি দিয়ে বলেছেন, বিশ্ব জগত হল ৩ মাত্রার সমন্বয়। দৈর্ঘ্য – (Length), প্রস্থ – (Width), উচ্চতা – (Height) হল বস্তুর অবস্থান। যেভাবে আমরা 3D দিয়ে ভবনের অঙ্কন করি।

বিজ্ঞানী নিউটন বলেছেন “স্থান হলো পরম ও স্থির” যাকে ইংরেজিতে Absolute Space বলা হয়। নিউটনের এই কথাটি দুনিয়ার আভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার জন্যে কিছুটা ঠিক মনে হয়। কেননা দুনিয়াতে মানুষ সবকিছু 3D দিয়ে সহজেই বুঝে থাকে।

বিজ্ঞানী আইনস্টাইন নিউটনের এই ধারনাকে অপূর্ণাঙ্গ হিসেবে দাবী করেন। তিনি বলেন,

দুনিয়ার কোন কিছুই পরম ও স্থির নহে! বরং মহাবিশ্বের সবকিছুই একটি সুনিদ্দির্ষ্ট পক্রিয়ার অধিনে নিজ অক্ষে ঘুরছে। যেহেতু সবকিছুই চলমান, সেহেতু এসবের অবস্থা, অবস্থান নির্ণয় করার জন্যে সময়কে হিসেবের মধ্যে রাখতেই হবে। আইনস্টাইনের অতিরিক্ত 1D টা হল ‘সময়’। যাকে নিয়ে পবিত্র কোরআনে কসম করা হয়েছে।

আইনাষ্টানের এই তত্ত্বের মাধ্যমে পবিত্র কোরআনের সেই কথাটিই প্রতিষ্ঠিত হল, যা মহান আল্লাহ এভাবে বলেছেন, 

وَهُوَ الَّذِي خَلَقَ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ ۖ كُلٌّ فِي فَلَكٍ يَسْبَحُونَ – আর তিনিই রাত ও দিন এবং সূর্য ও চাঁদ সৃষ্টি করেছেন; প্রত্যেকেই নিজ নিজ কক্ষপথে সাঁতার কাটছে/বিচরণ করছে [সূরা আল-আম্বিয়া : ৩৩]

আইনস্টাইনের সময়ের থিউরি বুঝার জন্যে শুধুমাত্র চিন্তাশক্তি ও কল্পনাশক্তির সমন্বয় দরকার। চলুন তারপরও কিছুটা আলোচনা করি।

আইনস্টাইন বলেছেন, পৃথিবীতে ১ সেকেন্ড মানে হাতের ঘড়ির চিকন কাঁটার একটি দুর্বল ধাক্কা মাত্র কিন্তু এই ১ সেকেন্ড মহাকাশে কি ভয়ঙ্কর বিপর্যয় ডেকে আনছে, তা পৃথিবীর মানুষ বুঝতে পারছে না। মহাকাশে প্রতি সেকেন্ডে পৃথিবী নিজের অবস্থান বদলাচ্ছে। ১ সেকেন্ড আগে পৃথিবী মহাকাশের যেখানে ছিল, পরের সেকেন্ডেই বহু মাইল দুরে চলে গেছে, পূর্বের স্থানে আর নাই! ১ সেকেন্ডে আগে কোথায় ছিলাম এবং পরের সেকেন্ডে কোথায় থাকব, এটাই মহাকালের হিসাব। দুনিয়ার বুকে চেয়ার-টেবিলে বসে, স্পেশাল ক্যালকুলেটর হাতে নিয়ে, জটিল সমীকরণের মাধ্যমে লাখো বিজ্ঞানী ব্যস্ত সময় পার করছেন এক সেকেন্ড সময়ের হেরফের নিয়ে।

দুনিয়াতে ১ সেকেন্ডের মূল্য হয়ত তেমন একটা নাই কিন্তু মহাকাশে ১ সেকেন্ডের মূল্যও পৃথিবীর অস্তিত্বের চেয়ে অনেক বেশী। বিষয়টি বুঝার আগে দেখুন, পৃথিবী নিজ অক্ষে লাটিমের মত করে ১ সেকেন্ডে ৪৬০ মিটার প্রায় আধা কিলোমিটার (ঘণ্টায় ১৬৭০ কিমি) ঘুরছে, অর্থাৎ পূর্বের স্থান থেকে ঘুরে যাচ্ছে! আবার পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ১ সেকেন্ডে ৩০ কিলোমিটার (ঘণ্টায় ১ লাখ ৭ হাজার কিমি) বেগে ঘুরছে।

আবার সূর্য তার পুরো পরিবার তথা সৌরজগত নিয়ে মিল্কিওয়ের বৃত্তের চক্করে ১ সেকেন্ডে ২২০ কিলোমিটার (ঘণ্টায় ৮ লাখ কিমি) গতিতে মৃত্যু তথা আসন্ন কেয়ামতের দিকে ধাবিত হচ্ছে। অর্থাৎ আমরা যে কেয়ামতের অপেক্ষায় বসে আছি, সেই কেয়ামত সংঘটিত হবার জন্যে, পৃথিবী আমাদের সবাইকে নিয়ে আত্মাহুতি দিতে, ১ সেকেন্ডে ২২০ কিলোমিটার গতিতে দৌঁড়ে যাচ্ছে!

তাহলে চিন্তা করুন মহাকাশে ১ সেকেন্ডের মূল্য কত। যেখানে ১ সেকেন্ডের হিসাব কষেই মহাকালের ব্যাপ্তি বিস্তৃতির হিসেবে কষতে হয়। তাহলে ভাবুন আমরা সময়কে কোথায় কিভাবে কি কাজে লাগাই।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৮ সালে) জার্মানি ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসকে আক্রমণ করার জন্য একটি বিশাল দানবীয় কামান বানায়। যার নাম দিয়েছিল “প্যারিস গান” (Paris Gun)। ১২০ কিলোমিটার দূর থেকে প্যারিসে কামানের গোলা নিক্ষেপ করা হলে, সেটি নির্দিষ্ট জায়গায় না পরে অন্যত্র পড়ত। কেননা তখনও বিজ্ঞানীরা জানত না যে, ১ সেকেন্ডে পৃথিবী ৪৬০ মিটার সরে যায়! ফলে বিশাল কামানের কাজ বিফলে যায়।

বর্তমানে আকাশে যে স্যাটেলাইট ছোড়া হয়, সেটা আবার দুনিয়াতে ফিরেও আসে। সেখানেও সময় একটি বিরাট কিছু। যে সময়ে যেখান থেকে স্যাটেলাইট ছোড়া হয়েছিল, সময়কে ঠিক না করে যদি সেভাবে পাঠানো হয়, তাহলে সেই স্যাটেলাইট আর পৃথিবীতে আসবে না, অন্য কোথাও হারিয়ে যাবে। ভবিষ্যতের জন্যে সময়টাকে এমন বিন্দুতে সেট করে স্যাটেলাইট ছোড়া হয়, যখন স্যাটেলাইট সেখানে ফিরে আসবে, পৃথিবীও ঘুরতে ঘুরতে সেখানে গিয়ে পৌছবে।

আধুনিক জিপিএস (GPS) সিস্টেমে সময় এবং আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা

আরেকটি বাস্তব উদাহরণ হল, স্মার্ট-ফোনে যে গুগল ম্যাপ বা জিপিএস (GPS) ন্যাভিগেশন ব্যবহার করি, তা আইনস্টাইনের ‘সময়’ সংক্রান্ত তত্ত্ব ছাড়া এক মুহূর্তও কাজ করবে না!

মহাকাশে ঘুরতে থাকা স্যাটেলাইট গুলোর ঘড়ি আর পৃথিবীর ঘড়ির মধ্যে সময়ের সূক্ষ্ম পার্থক্য ঘটে (আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার কারণে মহাকাশে সময় সামান্য দ্রুত চলে)। বিজ্ঞানীরা যদি প্রতিদিন এই ‘সময়ের ব্যবধান’ টুকুকে গাণিতিকভাবে সংশোধন না করতেন, তবে আমাদের মোবাইল আমাদেরকে রাস্তার বদলে নদীতে বা ঘরের বদলে পুকুরে নিয়ে ফেলত! ড্রোন বিদ্যা আর ক্ষেপণাস্ত্র বিদ্যা সবই মুখ থুবড়ে পড়ত যদি না, সময়কে বিবেচনায় না নেওয়া হত। কত সময় ভাবছেন কিছু! প্রতিটি সেকেন্ডের হিসাব আর প্রতি সেকেন্ডে আধা কিলোমিটার (৪৬০ মিটার) স্থান পরিবর্তন।

ঠিক এই কারণে মহান বারি তায়ালা সময়কে বেশী গুরুত্ব দিতে বলেছেন এবং তিনি নিজেও কছম করেছেন। মহাকাশের প্রতি সেকেন্ডে ঘটে চলা প্রলয়ঙ্করী ঘটনার মুহূর্তগুলো আমরা দুনিয়াতে বড় অলস ভাবে পার করি। নিজের জীবনটাকে ক্ষয় করি। দুনিয়াতে দাঁড়ালে একদিনও যেন সামান্য কিছু আর মহাকাশে ১ দিন মানে কোটি কোটি মাইলের পরিভ্রমণের সমান।

তিনি (আল্লাহ) বলবেন: “তোমরা পৃথিবীতে কত বছর অবস্থান করেছিলে? তারা বলবে: আমরা অবস্থান করেছিলাম এক দিন অথবা দিনের কিছু অংশ; সুতরাং আপনি গণনাকারীদের জিজ্ঞেস করুন। তিনি বলবেন: তোমরা তো অল্পকালই অবস্থান করেছিলে, যদি তোমরা জানতে!” — [সূরা আল-মুমিনুন: ১১২-১১৪]

“তারা নিজেদের মধ্যে চুপিসারে বলবে, তোমরা মাত্র দশ দিন অবস্থান করেছিলে। তারা যা বলবে তা আমি সম্যক জানি; তাদের মধ্যে যে অপেক্ষাকৃত উত্তম পথের অনুসারী সে বলবে, তোমরা তো মাত্র এক দিন অবস্থান করেছিলে।” — [সূরা ত্বাহা: ১০৩-১০৪]

“যেদিন তারা তা (কেয়ামত) প্রত্যক্ষ করবে, সেদিন তাদের মনে হবে—তারা যেন দুনিয়ায় কেবল একটি বিকাল অথবা তার একটি সকাল অবস্থান করেছিল।” — [সূরা আন-নাযিআত: ৪৬]

“আর যেদিন তিনি তাদেরকে একত্রিত করবেন, সেদিন তাদের মনে হবে—তারা যেন দিনের সামান্য এক মুহূর্ত ছাড়া অবস্থান করেনি। তারা একে অপরকে চিনতে পারবে…” — [সূরা ইউনুস: ৪৫]

“যেদিন তারা তাদের প্রতিশ্রুতি-প্রাপ্ত শাস্তি দেখতে পাবে, সেদিন তাদের মনে হবে—তারা যেন দিনে কেবল এক মুহূর্তকাল অবস্থান করেছিল…” — [সূরা আল-আহকাফ: ৩৫]

সুরা আছরের মূল শিক্ষা:

– এই সুরাটি ছোট কিন্তু প্রতিটি শব্দে রয়েছে কঠোর দায়িত্ব পালনের নির্দেশ এবং নিজেকে নিরাপদ রাখার পথ নির্দেশনা।

– এসব করতে না পারলে, আমি, আমরা এবং জনপদের মানুষ ক্ষতির মধ্যেই নিমজ্জিত হতে থাকব।

– আমরা যে সমাজে বাস করছি, আলহামদুলিল্লাহ এখানে এখনও মানুষ, মানুষের কথা শুনে, মানে এবং আল্লাহর রাস্তায় চলার মত কিছু মুমিনকে পাওয়া যায়।

– তাহলে চলুন, আমরা অন্যের কাজে কোরআনের দাওয়াত পৌঁছে দেই।

– মানুষকে ক্ষতি থেকে বাঁচতে হলে অন্তত মুমিন ইমানদার হতে হবে।

– সর্বদা সৎ কাজ করতে হবে, সৎ কাজের মাধ্যমেই জীবনকে অতিবাহিত করতে হবে

– সৎ কাজ মানে সর্বদা হাতে তসবিহ-তাহলিল করা নয়, ওটি সৎ আমলের একটি ক্ষুদ্র অংশ

– আল্লাহর পথে সৎ কাজে নিজদের দেহের প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে কাজে লাগাতে হয়

– চোখ, কান, নাক, জিহবা, মুখ, হাত-পা, মগজ, বুদ্ধি, জ্ঞান সবই সৎ কাজের মূল উৎস

– তাই ভাল কথা বলা, ভাল কথা শুনা, ভাল মানুষের সাথে বন্ধুত্ব বজায়, ভাল কাজে উৎসাহ প্রদান, ভাল কাজের সহযোগী হওয়া এবং ভাল কাজ প্রতিষ্ঠায় আজীবন লেগে থাকার নাম সৎ কাজ করা

– আল্লাহ আমাদের যোগ্যতা বাড়িয়ে দিন, একাজে তৌফিক দিন এবং আমাদের আমলকে রক্ষা করুন। আমিন।

[এই নোটখানা মোবাইলে পড়ার উপযোগী। সাইজ A5 তথা A4 কাগজকে অর্ধেক করে দুটো প্রিন্ট করার জন্যে সেট করা। কেউ প্রিন্ট করতে চাইলে এক পৃষ্টায় দুটো প্রিন্ট করবেন]

সুরা আছর এর দারসটি তৈরি করেছেন বিশিষ্ট লেখক, ব্লগার, কলামিষ্ট নজরুল ইসলাম টিপু। কোন প্রকার পরিবর্তন, পরিমার্জন করার দরকার হেতু পরামর্শের জন্যে নিচের লিঙ্ক www.tipuvai.com/darsul-quran-surah-al-asr/ বক্সে মন্তব্য করে জানানোর অনুরোধ রইল।

সুরা আল আছর দারসুল কোরআনের পিডিএফ পেতে চাইলে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন…. 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *