সুফল হজ্জ ও ওমরাহ করার দর্শনীয় দিক

হজ্জ ও ওমরা

স্বয়ং রাসুল (সাঃ) ৩ বার ওমরাহ ও ১ বার মূল হজ্জ করেছিলেন। তনুমধ্যে একটি ওমরাহ কাজা পালনের জন্যে, একটি ওমরাহ যুদ্ধ করতে গিয়ে, সর্বশেষ ওমরাটি বিদায় হজ্জের সময় করেছেন। বিদায় হজ্জ রাসুল (সাঃ) একমাত্র হজ্জ এবং একটি মাত্র হজ্জ। ষষ্ঠ হিজরিতে ওমরাহ করতে গিয়ে মক্কার অদূরে হুদাইবিয়া নামক স্থানে কাফের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হন। ফলে মক্কায় না গিয়েই ফিরে আসেন। বাধাপ্রাপ্ত এই ওমরাটি রাসুল (সাঃ) পরবর্তী বছর কাজা আদায় করতেই মদিনা থেকে প্রথমবার মক্কায় যান।
.
সাধারণ সাদা কাপড়ের, সেলাই বিহীন চাদরে, দীন-হীন কাঙ্গাল বেশে, ধনী-দরিদ্র, আমির-ওমরাহ, আল্লাহর কাছে হাজির হয়ে বলে, ‘লাব্বাইক!’ দেখুন হে প্রভু, দুনিয়ার সকল কিছু পিছে ফেলে, তোমার ডাকে এসে গেছি। দুনিয়াকে ভুলে যাওয়া এই প্রেরণা, কেউ কোন অবস্থাতেই লিখে জানাতে পারে না। হাজিদের আকুতি, অন্তরের কোমলতা, হৃদয়ের অনুভুতি আর আর চোখের পানি সারাদেহে একাকার হয়ে যায়। শিল্পপতি, রাষ্ট্রপতি, বিচারপতি, সেনাপতি মুহুর্তের মধ্যেই তার রাষ্ট্রিয় মর্যাদার কথা ভুলে যায়। কাঙ্গালের মত, শিশুর আর্তি নিয়ে আল্লাহর কাছে অভিব্যক্তি প্রকাশ করে বলে, আল্লাহ তুমি আমায় ক্ষমা কর। মূলত সেখানেই, সে মুহূর্তেই মানুষের গুনাহ মাফ হয়ে যায়। প্রতিটি মানুষ নিজেকে নিজের মধ্যে আলাদা একজন ব্যক্তি হিসেবে উপলব্ধি করতে পারে। বুঝতে পারে এখানে এসে ভুল করেনি বরং আসতে পারাটাই মহা সৌভাগ্যের হল। হজ্জ  ও ওমরাহ
.

সাধারণের হজ্জ

যে চাকরিজীবী সারা জীবনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চিত সম্বল একত্র করে পড়ন্ত বয়সে, একবার হজে যায় তার অনুভূতি আর ধনাঢ্যতায় ডুবে থাকা সম্পদশালীর হজে যাওয়ার অনুভূতি কোনদিনই এক হয় না। সন্তানের প্রেস্টিজ পাংচারের চাপে পড়ে, উপায় হারিযে, অতিবৃদ্ধ লাটি হাতে খুঁড়িয়ে, হজে গিয়ে হারিয়ে যাওয়া যাওয়া পিতার অনুভূতি উপরের দুটোর সমান নয়!
.

বদলি হজ্জ

কিছু মানুষকে দেখি বদলি হজের কার্ড চাপায়। মানে তিনি এটাকে পেশা ও ব্যবসা বানিয়ে নিয়েছেন। নিজে কৌশলে বলেও বেড়ায়, তিনি বদলা হিসেবে শ্রম দেন। অথচ এমন একটা ব্যক্তি তো তাকওয়া, পরহেজগারী, নিলোর্ভ মানসিকতা, উদার মনোবৃত্তির হওয়া বাঞ্চনীয়। মুখে দাড়ী ও সুন্দর কথা শুনেই তাকেই বদল হাজির দায়িত্ব তুলে দিলেই কি দায়িত্ব শেষ! কেননা অন্যের হয়ে ভাড়ায় বদলী হজ কারীর অনুভূতি আর কোন অসচ্ছল-গরীব রাসুল প্রেমিককে কেউ উপহার হিসেবে হজে পাঠালে, সেই গরীবের অনুভূতিও কোনদিন এক হবেনা। এমনকি এক পাল্লায় মাপাও যাবেনা।
.

উচ্চ মূল্যের হজ্জ কাফেলা

এক অধিক উচ্চমূল্যের হজ কাফেলার ঘটনা বলি। তিনি কেন এত হাজি পেয়ে থাকেন প্রশ্ন করায় বলেন, তিনি হাজিদের আরামে রাখেন! সহজে গুনাহ মাফ করিয়ে দেবার বন্দোবস্ত করেন! তার কাফেলার খরচ বেশী হবেনা, তো ফ্রি হবে নাকি? তিনি জানালেন, তিনি কাফেলার হাজিদের প্রতি ওয়াক্তের খাদ্যে ডাল, ভর্তা, ভুনা, শুটকি, ভাজি, শাক, সবজি, মাছ পরিবেশন করান এবং নিজ দায়িত্বে রান্না করান। তাছাড়া তিনি এমন জায়গায় ঘর ভাড়া করেন, যাতে করে হাজিদের আর কষ্ট করে হারামের মাটিতে পা রাখার দরকারও পড়েনা। তারা সর্বক্ষণ কাবা, হারামের পানে তাকিয়ে থাকতে পারেন। জিকির-গুজার করতে পারেন। সালাতে যখন যেদিকেই সালাম ফেরায়, তখনই কাবার চেহারা দেখতে পায়! যেসব জায়গায় গুনাহ মাফ হয়, সেখানে সবাইকে ফ্রি সময়ে সংগোপনে দাড় করিয়ে গোনাহ মাফের দোয়া পড়িয়ে, আমলনামা ছাপ-চুতুর করিয়ে আনেন। তাই ঘুষখোর, সুদখোর বড়-বড় কর্তা ব্যক্তিরা তার কাফেলার স্বস্তি পায়, লাইন লাগায়। হজ্জ ও ওমরাহ
.

সাধারণ মূল্যের হজ্জ কাফেলা

আরেকটি সাশ্রয়ীমূল্যের কাফেলার কথা বলি। প্রশ্ন করে জানতে পারি তিনি তওবা করেছেন এবং এই কাজটি একেবারেই বন্ধ করে দিয়েছেন! কেন? কেন?? বললেন, হাজিদের সাধ্যমত যেভাবেই সহযোগিতা করি না কেন, তারা সন্তুষ্ট হয় না। অন্যের উদাহরণ টানেন। লাখো মানুষের ভিড়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও কিছু দুর্বলতা অসঙ্গতি হয়ে যায়। ফলে হাজিরা বিরক্ত হয়, ক্রুদ্ধ হয়। কেউ ত্যক্ত হয়ে হয়ে কটু-কথা বলে, কেউবা বিরক্ত হয়ে বাজে মন্তব্য করতেও ছাড়ে না। অনেকেই হজ থেকে আসার পরে মৃত্যু অবধি সেই হজ কাফেলা সমালোচনা কিংবা গালি দিতে থাকে। তাই চিন্তা করেছি এই কাজে দুটো ঝুঁকি; এক, হাজিদের আমল বরবাদ করা। দুই, নিজের আখলাখের ক্ষতি করা। তাই যার হজ সে উষ্ঠা খেয়ে হজে যাক, আর তরতড়িয়ে যাক, সেই চিন্তা আমার না রাখাই ভাল।
.
এখানে দুটো দৃষ্টান্ত উল্লেখ্য, প্রথমোক্ত ব্যক্তি আল্লাহর ঘরের মেহমানদের সহজে গুনাহ মাফ করিয়ে, আরামে রেখে বিষয়টিকে সহজসাধ্য করেছেন। আবার দ্বিতীয় ব্যক্তি তিনি আল্লাহর ঘরের মেহমান তথা হাজিদের অসস্তুষ্টিকে ভয় পেয়েছেন। আবার এই শহরেই বহু পকেটমার আছে, মিথ্যা অভিনয় করে হাজিদের সাথে প্রতারণা করে। অনেক ব্যবসায়ী গলা কাটা দামে খাদ্য-পন্য বিক্রি করে।
.
বর্তমানে হজ করা সহজ হয়েছে বলেছে বলে, কেউ হজকে ভ্রমণের মত চরিত্র দেয়। কেউ লোক দেখানো চাতুর্য দেখায়। কেই ধনাঢ্যতা-খ্যাতির চাদরে মোড়ায়। ফেসবুকে পোষ্ট দেয়। রিল বানায়, স্টোরি প্রকাশ করে। হজ্জ ও ওমরাহ
.
অথচ হজ হল এক প্রকার দায়বদ্ধতা থেকে পালানোর উপায়। নিজের এবাদতের পরিশুদ্ধতা সংগ্রহের মাধ্যম এবং দুনিয়াতে সম্পদশালী হবার কারণে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা, বদান্যতা ও উপকারের পরাকাষ্ঠা দেখানোর কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতির অসহায় বাস্তবায়নের নাম।
.

আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রাঃ) দৃষ্টান্ত

মক্কা-মদিনার শাসক আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রাঃ) এর সময়কালে, তিনি যখন মক্কায় থাকেন। তখন প্রতিদিন প্রতুষ্যে তিনি বহুদূরে গিয়ে সকালের নাপাকি ত্যাগ করতেন। প্রশ্ন করা হলে বললেন, এটা বড় নেয়ামতের স্থান এবং বড় সতর্কতার শহর। এখানে ভালকাজের যেমন চড়া মূল্য আছে, তেমনি বাজে কাজেরও কড়া দায় আছে। তাই আমি এই শহরে চলাফেরায় সতর্ক থাকি। না জানি নিজের অজান্তে কোন ভুল-ত্রুটি হয়ে যায়। তাই সম্ভাব্যতা অবলম্বন করি। এটা ওনার ব্যক্তিগত উপলব্দি। দৃষ্টান্তের জন্যে টানা হল
.

ইবনে বতুতার দৃষ্টান্ত

ইবনের বতুতা আফ্রিকা মহাদেশের মরক্কোর তাঞ্জিয়ার থেকে ২২ বছর বয়সে হজ করতে বের হয়েছিলেন। পথিমধ্যে নানা বিপদ, মুসিবত, ঘাত, প্রতিঘাত মোকাবেলা করে ২২ হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে, যখন নিজ দেশে ফিরে যান, তখন তার বয়স হয়েছিল ৫০ বছর। শুধুমাত্র হজের উদ্দেশ্য বের হওয়া এই ব্যক্তি ২৮ বছরে মাত্র ৪ বার হজ করতে সক্ষম হয়েছিলেন!
.

সালাউদ্দীন আইয়্যূবি (রঃ) দৃষ্টান্ত

জেরুজালেম বিজয়ী মুসলিম বীর সেনাপতি সালাউদ্দীন আইয়্যুবি (রহ) খ্রিষ্টানদের সম্মিলিত বাহিনীর ক্রুসেড মোকাবেলা করতে গিয়ে, সারা জীবন ব্যয় করে দেন। আজীবন জিহাদের ময়দানে লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে, মনের আকুতি থাকার পরও একটি বারের জন্যে না ওমরাহ করতে পেরেছেন আর না হজ করতে পেরেছেন! অথচ তিনি লড়েছেন ইসলামকে বিজয়ী করার প্রত্যয়ে। আর মুক্ত করেছেন বিশাল মুসলিম অঞ্চল।
.
কোন তুর্কী সুলতানের কপালে হজ জুটেনি। মোগল সম্রাটদের জৌলুস বিশ্বজোড়া ছিল। তাদের অনেকের মনে বাসনা থাকার পরও কেউ হজ করতে পারে নাই। সম্রাট হুমায়ুন বড় আশা নিয়ে হজের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছিলেন। পথিমধ্যে পারস্য সম্রাট বাধা দেন এবং তার হাতে গ্রেফতার হন। শর্ত দেন শিয়া ধর্মমত গ্রহণ করলে বিবেচনা করা হবে। তিনি জানালেন তার স্ত্রী শিয়া (সম্রাট আকবরের মা হামিদা বানু শিয়া ছিলেন)। তবুও তাকে হজে যেতে দেওয়া হয়নি!
.
কেন তবে এত কথা। হজ যেমন একটি এবাদত, তেমন একটি বড় নেয়ামত। ইচ্ছে, আগ্রহ, ক্ষমতা, প্রতিপত্তি, সহায় সম্পদ, সম্পত্তি, থাকার পরও অনেকের কপালে হজ্জ জুটেনি। তাই হজ্জ নিয়ে লোক দেখানো ভাব নিলে, কিংবা হজ্জ করে এসেছে সেটা ব্যক্ত করার জন্যে নানা উপায় অবলম্বন করলে; ‘রিয়া’ তথা লোক দেখানো সৎকাজ হয়ে যাবার সমুহ সম্ভাবনা থাকে। নিয়মিত সালাত পড়া যেমন আমাদের ব্যক্তি কর্তব্য, জীবনে একবার হজ্জ করাও স্বচ্চল ব্যক্তির দায়িত্ব। কারো উপর অর্পিত দায়িত্ব-কর্তব্য পালন কোনদিন বাহাদুরীর বিষয় হয় না। হজ্জও তেমন। হজ্জ করলে মানুষের পাপ মুছে, আমলনাম মাসুম শিশুর মত হয়ে যায়। একজন হাজির চরিত্রও অবিকল শিশুর মত কোমল, লোভহীন, স্বচ্চ হওয়ার তাগিদ এসেছে। নচেৎ হজ্জের ফল তো নষ্ট হবেই, নিজের যাবতীয় আমল হুমকির মুখে পড়তে পারে। হজ্জ করার সুযোগ কারো জুটেনা, যেমন জুটেনি অনেক সম্রাটের কপালে। তাই সেটাকে যেন আমরা গুরুত্বের সাথে মূল্য দেই। হজ্জ ও ওমরাহ