কলেমার পতাকার চাদরে যেন নতুন জেএমবি, বাংলা ভাই সুযোগ না পায়! বাংলাভাই, জেএমবির নাম শুনেছিলেন তো। ওদের উদ্ভব হয়েছিল একটি ভাল কাজের আড়ালেই। তাই সাবধান এবং সতর্ক হউন।
.
ইদানীং সাদা কলেমা খচিত সাদা পতাকার ছড়াছড়ি। ওদিকে ভারত থেকে আশঙ্কা ছড়াচ্ছে বাংলাদেশে হামাসের আক্রমন হতে পারে (পড়ুন আক্রমনের ছক প্রস্তুত করা হচ্ছে)। কোন ব্যক্তি বিশেষ বা গোষ্ঠী বিশেষের নিরেট ভাল কাজকে, তাবা করে দিতে পারে, সুযোগ সন্ধানী ভিন্ন গোষ্ঠী। কথাগুলো বিবেচনার জন্যে, বাংলা ভাইয়ের উদ্ভব ও জেএমবির উত্থানের পিছনের কিছু ঘটনার উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করছি। পাঠকগন মনদিয়ে পড়লে বহু বিষয়ে ফখফখা হয়ে যাবে। চলুন আল্লাহর নামে শুরু করি…
২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসে। প্রধানমন্ত্রী হন বেগম খালেদা জিয়া। দেশের সার্বিক অবস্থা ভালই চলছিল। দেশে হরতাল নাই, হাঙ্গামা নাই, ভাঙচুর নাই, অবরোধ নাই, সংসদে অচলাবস্থা নাই এমনকি অর্থনৈতিক গতিশীলতা ও বাজারে প্রানচঞ্চলতা ফিরে এসেছে! আওয়ামীলীগ দেখতে পেল, এভাবে চলতে থাকলে তো, কেয়ামত পর্যন্ত তাদের আর ক্ষমতায় আসার সুযোগ নাই! কাজেই কিছু একটা করা দরকার, প্রয়োজনে কিছু ঘটানো দরকার! একাজে অর্থ-বিত্ত নিয়ে এগিয়ে আসে, তাদের প্রভুদেশ ভারত। বানায় নানা ইভেন্ট, জোটানো হয় টকশো। টাকা ঢালে বুদ্ধিজীবী মহলে ও মিডিয়া পাড়ায়! ভাড়া করা হয় নানা শ্রেণী-পেশার বুদ্ধিজীবি দালাল!
প্রথম ইভেন্ট সর্বহারা পার্টির নাশকতা
হঠাৎ করে উত্তর বঙ্গে সর্বহারা পার্টির নাশকতা ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। কোন কারণ ও দাবি দাওয়া ছাড়াই মানুষ হত্যা নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। প্রশাসন দায়ী ব্যক্তিদের ধরা কিংবা দমন করা কোনটাই পারল না। তারা বরাবরই হিমশিম খেতে থাকে। জনগণ সর্বহারাদের উপর ক্ষিপ্ত হতে থাকে। কথা উঠে পুলিশ বিভাগ টাকা খেয়ে সর্বহারাদের উৎপাতে সাহায্য করছে। কেউ কেউ তাদের হয়ে কাজ করছে!
উত্তর বঙ্গের কোন এক কলেজের বাংলার বিভাগের শিক্ষক ছিলেন ছিদ্দিকুল ইসলাম। বাংলা বিষয় পড়াতেন বলেই তিনি আলোচিত বাংলাভাই! সর্বহারাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হওয়া মানুষদের নিয়ে তিনি একটি কমিটি গঠন করলেন। এই কমিটি বাছাই করে, এলাকা থেকে সর্বহারাদের ধরে ধরে পুলিশে ধরিয়ে দিতে লাগলেন। পুলিশের ঘুষ খাওয়ার ঘটনা আগেই চাউর ছিল। তাদের কারো মাধ্যমে এসব সন্ত্রাসী আবার আবার ছাড়া পেতে লাগল। এতে জন অসন্তোষ আরো বাড়তে রইল।
বাংলা ভাইয়ের দল আবারো পাকড়াও করল। কয়েকজনকে পিটিয়ে মেরেও ফেলল। একজন সর্বহারা নেতার লাশ, বেগুন খেতের পাশে, গাছের ডালে লটকে দেওয়া হয়! এনালগ যুগের প্রত্যন্ত অঞ্চলের এই ছবি কিভাবে, দ্রুত প্রথম আলোর অফিসেও চলে এল। সকল ভারতবান্ধব পত্রিকা একযোগে রে-রে করে উঠল। মিডিয়া পাড়া তেতে উঠল। প্রকাশিত হল প্রতিবেদন, শোক, গাঁথা। প্রকাশিত হতে থাকল সরকারের দায়-হীনতা ও সাধারণ নাগরিক হত্যার বীভৎস নাট্য-কাহিনী।
ও হ্যাঁ একটি কথা বলা হয়নি, সর্বহারা মানে বামপন্থি, বামপন্থি মানেই চরমপন্থি, চরমপন্থি মানে ভারতপন্থি, ভারতপন্থি মানেই বাংলাদেশের শান্তি বিনষ্টকারী। এরা সবই আবার প্রথম আলো গ্রুপের ভাবপন্থি। যাক, বাংলা ভাইয়ের হাতে এভাবে সর্বহারা নিধনের বিষয়টি, ভারতের আঁতে ঘা লাগে। বাংলা ভাইয়ের দল, এভাবে বাছাই করে সর্বহারাদের নির্বংশ করে দিলে, তাদের হয়ে লড়াই করার মত ভাড়াটে সন্ত্রাসী কোথায় পাবে? এমন আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়ে।
ওদিকে আক্রান্ত এলাকা ও ক্ষতিগ্রস্ত জনপদে দিন দিন বাংলা ভাইয়ের সুনাম সুখ্যাতি বেড়েই চলছে। সর্বহারা নির্বংশ করার প্রত্যয়ে, তার দল দিন দিন ভারি হচ্ছিল। ভারত সিদ্ধান্ত নেয়, যেভাবেই হউক, এটা থামাতেই হবে। ফলে তারা আগে থেকেই তৈরি করা রেজিমেন্ট জেএমবিকে মাঠে কার্যকর করায়। জেএমবি বানানো হয়েছিল, তদানীন্তন যুবলীগ প্রধান মির্জা আজম, নানক সহ নানা কুশীলবের তত্বাবধানে। ভারতীয় পৃষ্ঠপোষকতায়। সামনে রাখা হয়, নাভি অবধি লম্বা সাধা দাড়ীর দরবেশ সমতূল্য মির্জা আজমের বোনের জামাই শায়খ আবদুর রহমানকে।
জেএমবি’র উত্থান
জেএমবির নাম নিশ্চয়ই শুনে থাকবেন। সারা দেশের সকল উপজেলায় এক যোগে একসাথে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তাদের শক্তিমত্ত্বার পরিচয় দেয়। উত্থানেই বুঝা যায়, এর পিছনে বিরাট শক্তি সক্রিয় ছিল। অচিরেই বুঝা যায়, অস্ত্র, বারুদ সবগুলোই সীমানার ওপার থেকেই আনা। উন্নত তত্বাবধানে সারাদেশে সংগোপনে পাঠানো হয়েছিল। যাক জেএমবি উত্থানের সোপান শুরু হয় বাংলা ভাইয়ের একটি জন-সম্পৃক্ত কার্যক্রমের মাধ্যমে। কিভাবে?
আগেই বলা হয়েছে, বাংলা ভাইকে দমাতে কিংবা থামাতে মূল পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। সেই হিসেবে জেএমবির উচ্চ পর্যায়ের কিছু ব্যক্তি বাংলা ভাইয়ের সাথে হাত মিলিয়ে তার শক্তিকে আরো বাড়িয়ে তোলার বাহানা বানায়। সর্বহারাদের হাতে আরো কিছু নিরাপদার ব্যক্তি মারা যায় এবং বাংলা ভাইয়ের হাতেও মারা পড়ে সর্বহারাদের কেউ কেউ। এই সর্বহারা মারতে বাংলা ভাইয়ের সাথে জেএমবি যোগ দেয়। উদ্দেশ্য বাংলা ভাইয়ের আস্তা অর্জন ও আরো অপরাধ ঘটিয়ে তার দায় বাড়ানো, চরম মাত্রার দায়িত্ব কাঁধে চাপানো। যাতে করে বাংলা ভাইয়ের পক্ষে, দোষ স্বীকার করে আর সাধারণ জীবনে ফিরে আসা না যায়। এগুলো সবই পরিকল্পনার ছকে এগুচ্ছিল।
ওদিকে ঢাকা থেকে প্রকাশিত প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, আজকের কাগজ, ভোরের কাগজ, জনকণ্ঠ সহ সকল মিডিয়া গাইতে শুরু করল, এটা বিএনপি সরকারের প্রশ্রয়ে হচ্ছে এবং বাংলা ভাই বিএনপি ও চারদলীয় জোটের এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করছে। বাংলাদেশ থেকে পত্রিকার হেডিং হয়, ভারত থেকে সেটা ইংরেজি আরবি হয়ে সারা দুনিয়ায় চাউর করা হয়। এতে বাংলা ভাই ভয় পেয়ে, জেএমবি প্রধান শায়খ আবদুর রহমানের পুরোপুরি আশ্রয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়। ওপাড়ের পরিকল্পনাকারীরা তো এটাই চাচ্ছিলেন।
এক ঢিলে বহু পাখি মারার ফন্দি আটা হল। বাংলা ভাই থামল, ভারতীয় এজেন্টের কাছে আশ্রয় নিল, তাদের হয়ে চলতে বাধ্য হল, সরকার নিজেদের রক্ষণাত্মক পর্যায়ে নিয়ে গেল, মিডিয়া গুলো ওপারের টাকায় একচেটিয়া সরকার বিরোধী হয়ে গেল, আওয়ামীলীগ নতুন রাজনৈতিক ইস্যু পেল, কমিউনিস্টেরা উপযাচক, পরামর্শক হয়ে সরকারে ভীতি ছড়াতে লাগল। এমন সময় ঘটল সারা দেশে এক সাথে সমন্বিত বোমা হামলা। এই হামলার ব্যাপকতা অনুপাতে মানুষ মরেটি বটে, কিন্তু সারা দেশে তাদের দৃঢ় সক্ষমতার প্রমাণ দিয়ে দিল।
খালেদা জিয়া বিষয়টি পুরোপুরি টের পেলেন। তিনি চারদলীয় জোটকে আরে সুদৃঢ় করে সারা দেশে একযোগে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করলেন। মসজিদ-মাদ্রাসার খুতবায় জেএমবি ইসলামের নামে সন্ত্রাসী কার্যক্রমের নিন্দা ও বিরোধিতা করা হল। যেখানেই পাওয়া যাবে জেএমবিকে প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়ার দাবী জানানো হল। মাওলানা মরহুম সাঈদী সারাদেশে ইসলামের নামে সন্ত্রাস বিরোধী ওয়াজ-নসীহত করে মানুষদের বুঝাতে লাগলেন। এত সমন্বিত প্রচেষ্টায় জেএমবি সুবিধা তো করতেই পারেনি উপরন্তু চৌকশ সামরিক অফিসারদের প্রচেষ্টায় চিরতরে নির্মূল হয়ে যায়।
জেএমবির নির্মূল মানে ভারতীয় আধিপত্য বাদ নির্মূল। সর্বহারাদের রক্ষা করতে গোপনে জেএমবি বানিয়েছিল কিন্তু নাম ও কামটা রেখেছিল ইসলামের নামে। যেহেতু ইসলাম পন্থিদের সমর্থনে বিএনপি ক্ষমতায়। তাদের কুলষিত করতে এটাই দারুণ মাধ্যম। জেএমবির গুরুত্বপূর্ণ সবাই আওয়ামীলীগের সাথে সম্পৃক্ত, এতে প্রমাণিত হয়ে যায় এর পিছনের ওপারের দাদা আর এপারের ভাড়াটিয়া গাধা দুটোই একাকার হয়েছিল। পরবর্তীতে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে এর শোধ নেওয়া হয়।
পাঠক, এটা পুরানো কাহিনী। নূতন করে তুলে ধরা হল। আপনাদেরও স্মৃতি কিছুটা সজাগ হল।
সাদা পতাকা উড়ানোর কথা প্রথমে বলেছিল, মুফতি হারুন ইজহার। বোধহয় তিনি নিরেট দেশপ্রেমের অনুপ্রেরণা থেকেই কথাটি বলেছিলেন। তিনি বলেছেন, সারা দেশে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার পতাকায় ছেয়ে গেছে। সবার উচিত সারাদেশে কলেমার পতাকা উড়ানো। অনভিজ্ঞ, অদূরদর্শী ধর্মীয় এই আলেম প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি ব্রাজিল আর্জেন্টিনার পতাকার স্থলে বাংলাদেশী পতাকার কথা না বলে, অজানা এমন এক কলেমার পতাকার কথা বলেছেন, যার মাধ্যমে ভীতি ছড়ানোর জন্যে সীমান্তের ওপাড়েই শত্রু হামাস নামে ওৎপতে আছে, মুখিয়ে আছে সুযোগের জন্যে। যেমনটি বাংলা ভাই করে দিয়েছিলেন।
ভবিষ্যতে এই পতাকার ছপ্দবেশে, হামাসের নামে জেএমবির মত সারাদেশে অঘটন ঘটে গেলে আশ্চর্য হবার কিছু থাকবে না। ২০০১ সালের মত বর্তমানেও একই স্টাইলের সরকার দ্বারা দেশ পরিচালিত হচ্ছে। শত্রু, সমস্যা, সংকট একই ধরনেরই আছে। সুতরাং পদ্ধতিও একই হতে পারে। বিষয়টা হয়ত সরকার বুঝে নিবে কিন্তু যারা জনগণের নেতা, তাদেরও ভূমিকা আছে। যাতে ধর্মীয় অনুভূতির রং লাগিয়ে, মানুষকে উত্তেজিত করে, কলেমার পতাকা টাঙ্গানোর মত ঠুনকো কর্মসূচী দিয়ে; অন্যের হিংসাত্মক কর্মসূচী বাস্তবায়নের সুযোগ না ঘটে যায়। এতে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার ক্ষতি। ধর্মের উন্নতি ঘটে শিক্ষা বিস্তার, প্রচার, প্রসার, লানল, পালন ও মান্য করার মাধ্যমে। উত্তেজিত ক্ষিপ্ত জনতাকে রাস্তায় নামিয়ে, কখনও ধর্মীয় কাজ সাধন হয় না। ওটাই অধর্মের পরিচায়ক।