পাকিস্তান সৃষ্টির মহানায়ক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ

পাকিস্তান সৃষ্টির মহানায়ক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ছিলেন ভারতীয় গুজরাটের অধিবাসি 

কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। তিনি শুধু পাকিস্তান সৃষ্টির জনক নন বরং তিনি একজন কালোত্তীর্ণ মহানায়ক। ভারতীয় গুজরাটের অধিবাসী হয়েও তিনি মুসলমানদের জন্যে সৃষ্টি করে গেছেন দুটো ভূখণ্ড এবং দুটি আলাদা মুসলিম রাষ্ট্র।

বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের ১৯০ বছর পরে যার হাত ধরে বাংলার মুসলমান নিজের মাটিতে দাঁড়িয়ে বুক-ফুলিয়ে জয়ধ্বনি দিতে পেরেছিল তার নাম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ।

ইতিহাসের আজ সেই সন্ধিকাল। ব্রিটিশ রাজত্ব ভেঙ্গে পাকিস্তান ও হিন্দুস্থান নামে দুটো দেশের জন্ম হয়েছে। মুসলমানেরা পেয়েছে আলাদা একটি ভূখণ্ড। বাঙ্গালী পেয়েছে আলাদা একটি দেশ।

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ শত চেষ্টা করেও উত্তর দিনাজপুরকে বাংলার সাথে রাখতে পারেন নাই

উত্তর দিনাজপুর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল এবং সেটাকে বাংলার অংশ করা হয়। যাকে ইতিহাসে গৌড় হিসেবে চিত্রিত করা হয়। বাংলার প্রথম রাজধানী লক্ষণাবতী এই অঞ্চলে থাকে।

ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে বৃহত্তম মসজিদ, তথা আদিনা মসজিদ এই এলাকায় স্থাপিত হয়।

ক্ষমতাশালী হিন্দুদের সাথে ব্রিটিশও চক্রান্তে অংশ নিয়ে, এমন একটি মুসলিম প্রধান অঞ্চল উত্তর দিনাজপুর কেড়ে নেয় পদ্মা ও তিস্তা নদীর গতিপথ দখলের জন্যে।

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তানের দায়িত্ব না নিলে বাংলার অবস্থা হত গাজার মত

আজ পদ্মা ও তিস্তা দুটোই শুকনো। ভারতীয় কুচক্রী হিন্দুত্ব-বাদী রাজনীতিবিদদের হাত থেকে আমরা এখন বেচে উঠতে পারিনি।

আমরা এখন বর্ষায় বন্যায় ভাসি আর শীতে পানির অভাবে মরি। এটা সম্ভব হয়েছিল উত্তর দিনাজপুর হারানোর কারণে।

এই অঞ্চল আমাদের থাকলে ভারত ফারাক্কা বাদ দেবার জন্যে জায়গা পেত না।

জিন্নাহ না হলে, পাকিস্তান সৃষ্টি হতো না। পাকিস্তান না হলে বাংলাদেশ হতো না।

বাংলার মানুষকে আজো ভারতীয় হিন্দুদের দ্বারা অচ্যুত ও নমশূদ্রের মত, ইঁদুর-ছুঁচোর মত মুসলমানদের এই ভূখণ্ডে বসবাস করতে হত।

তাদের জিল্লতি গাজার মানুষদের ভাগ্য বরন করতে হত।

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দু ভাষায় কথা বলতে পারতেন না, তার মাতৃভাষা ছিল গুজরাটি

৪৮ সালের ২১শে মার্চের ভাষনে তিনি বলেছিলেন একমাত্র উর্দু’ই হবে রাস্ট্র ভাষা। জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবনে এটাই ছিল একমাত্র নেগেটিভ পয়েন্ট। মূলত এই ঘটনাকে ভারতীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নেতিবাচক বানানো হয়েছিল। কেননা কথাটা ছিল রাষ্ট্রভাষা উর্দুর জন্যে আর আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে মাতৃভাষা কাইড়া নিতে চায় এই প্রচারণায়। জিন্নাহ মাতৃভাষা উর্দু করতে চায়নি! মাতৃভাষা বদলানো এটা কারো পক্ষে সম্ভবও নয়। তাহলে চট্টগ্রাম আর সিলেটি ভাষা বহু আগেই হাইরা যাইত।

ভারত বহু ভাষার দেশ হলেও, সকল অঞ্চলে তাদের মাতৃভাষা ভিন্ন কিন্তু রাষ্ট্রভাষা নিদ্দিষ্ট। জিন্নাহও এই কাজটি করতে চেয়েছিলেন। যাতে মুসলমানেরা এক থাকার সুযোগ পায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলায় নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার পরও, মহাত্মা গান্ধিকে লিখেছিলেন শুধুমাত্র হিন্দিকেই রাষ্ট্রভাষা করতে! সেটা নিয়ে পশ্চিম বাংলার শিক্ষিত মহলে আন্দোলন হয়নি।

যা’হোক ঘটনাটি ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চের এবং জিন্নাহ সেখানেই থেমে গিয়েছিলেন কথা আর বাড়ান নাই। আর তিনি মারা যান একই বছর অর্থাৎ ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর।

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন জিন্নাহর মৃত্যুর ৪ বছর পর কিন্তু ঘটনার দায় তার মাথায় তুলে দেওয়া হয়। কারণ সেই একটাই ভারতীয় আধিপত্যবাদ। পরবর্তী প্রজন্ম যাতে জিন্নাহর কর্মকান্ড নিয়ে আগ্রহ না দেখায়। সে কারণেই জিন্নাহর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ায়।

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বাংলার বিপ্লবীদের পক্ষে বিনা অর্থে আদালতে মামলা লড়েছেন

বিশিষ্ট আইনজীবি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দত্ত ও বিপ্লবী সুভাস চন্দ্র বসুর নাম নিশ্চয়ই শুনেছেন। চিত্তরঞ্জন বোম্বের হাইকোটে অর্থের বিনিময়ে সাধারণ মানুষদের মামলা লড়ে হয়ে যান দেশবন্ধু।

সুভাস চন্দ্র বসুর মামলাও তিনি দেখতেন। একদা তিনি মামলার টাকা জোগাতে মানে দেশবন্ধুর পকেট ভারী করতে জায়গা জমি বিক্রি করে ফতুর হয়ে যান। তিনি হয়ে পড়েন দেউলিয়া।

উপায়হীন সুভাস চন্দ্র বসু মোহাম্মদ আলী জিন্নার দারস্ত হলে তিনি বলেন, বিপ্লবীরা দেশের সম্পদ। যারা দেশের জন্যে লড়াই করবে, তারাই যদি ফতুর হয়, তাহলে জাতিই ফতুর হবে। সুতরাং বিপ্লবীদের বাঁচানো আমার দায়ীত্ব তাই সকল বিপ্লবীদের মামলা আমি (জিন্নাহ) বিনা টাকায় লড়ব।

সুতার মিস্ত্রী শহীদ ইলমুদ্দিনের (লিঙ্কে গিয়ে পড়তে পারেন) মামলা ব্যতিরেকে, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সারা জীবনে কোনদিন মামলায় পরাস্ত হয় নাই। হাইকোটে রাজবন্ধী ও রাট্রদ্রোহীতার সকল মামলা বিনা লাভে লড়েছেন। আর বেশীর ভাগ বিপ্লবীই ছিল বাংলা মুল্লুকের। ফলে জিন্নাহর আইনী সুফল সমগ্র বাংলার উপর প্রভাব পড়ে।

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বোম্বে হাইকোটের বিচারকের অফার ফেরত দিয়েছিলেন

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর তেজোদ্দীপ্ত ব্যক্তিত্ব ও মামলায় আশ্চর্যজনক সফলতা ও রাষ্ট্রদোহীদের পক্ষে মামলা লড়ার কারণে তাকে, ব্রিটিশ সরকার চাকরির লোভ লাগিয়ে থামাতে চেয়েছিল।

ফলে বোম্বে প্রেসিডেন্সির বিচার বিভাগীয় সদস্য স্যার চার্লস অলিভ্যান্ট মুহাম্মদ আলী জিন্নাহে বোম্বে হাইকোর্টের আওতাধীন একটি কোটে বিচারক হবার অফার দেন।

জিন্নাহ প্রশ্ন করেন, কত বেতন দিবেন, বলা হল মাসিক ১৫০০ টাকা। তৎকালীন সময়ে এমন অঙ্কের বেতন পেত উচ্চপদস্থ ব্রিটিশ কর্মকর্তা (ICS), বড় লাটের কাউন্সিল, কেন্দ্রীয় দপ্তরের সচিব, শীর্ষস্থানীয় ইউরোপীয় এক্সিকিউটিভ। এই বেতন স্কেল ইউরোপীদের জন্যে বরাদ্দ ছিল। তারা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে টোপে ফেলে স্বাধীনতা পন্থিদের হয়ে, মামলা লড়ার মানুষটিকে থামিয়ে দিল চাইল। জিন্নাহ বললেন, এই বেতনে আমার চলবে না। আমি ১৫০০ টাকা এক দিনের কম সময়ে কামাতে চাই। ব্রিটিশ কর্তারা তাজ্জব হয়ে তাকিয়ে থাকেন এই হারা না মান, দম না ফেলা স্বাধীনতা সংগ্রামী বীরের দিকে।

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর টিবি রোগ হয়েছিল কিন্তু সেটা গোপন রাখেন

তিনি ছিলেন টিবি রোগে আক্রান্ত। এই কথা তার একান্ত ডাক্তার ব্যতিত আর কেউ জানত না। এমনকি পরিবারের বাইরের সদস্যদেরকেও জানতে দেয়নি। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ জানতেন এই কথা কংগ্রেস নেতারা জানলে, পাকিস্তান নামক একটি রাষ্ট্র সৃষ্টির যে কথাবার্তা চলছে, তা পিছিয়ে দেওয়া হবে এবং পাকিস্তান নামে আর কোন দেশের জন্ম হবে না।

তার মৃত্যুর পরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু যখন জানতে পারেন যে, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ টিবি রোগে মারা গিয়েছেন। তিনি চরম আফসোস করে বলেছিলেন, ইস! ওর টিবি রোগ হয়েছে জানতে পারলে ভারত-পাকিস্তানের স্বাধীনতার বিষয়টি আরো কয়েক বছর পিছিয়ে দিতাম। ফলে পাকিস্তান নামক কোন রাষ্ট্রই হতো না।

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তানের স্বাধীনতার জন্যে দেহের ভিতরে বিষ লুকিয়ে হাঁসতেন

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ একটি মুসলিম দেশ হবে এই স্বপ্নের দোলায়, নিজের দেহের ভিতরে বিষ লুকিয়ে বাইরে কৃত্রিম হাসি দেখাতেন। এই হাসি নিয়েই তিনি দুনিয়া ত্যাগ করেছেন কিন্তু একজন মুসলিম হিসেবে মাথানত করে নাই। তিনি তার সমুদয় আয় পাকিস্তানের স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্যে খরচ করেছেন।

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ শুধু ব্যক্তি নয়। সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানদের নমশুদ্র, অচ্চুত আর দলিত হওয়া থেকে বাঁচিয়েছে। প্রতিটি মানুষের জীবনে ভুল আছে। মোহাম্মদ আলীর জিন্নার পুরো জীবনটাই অবদানে ভরপুর, একটি ভুল আছে, চাদেরও কলঙ্ক আছে।

কিন্তু সেটাই সব নয়, যেভাবে আমাদের জানানো হয়। বুঝানো হয়। শুধু আমরা জানিনা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ না হলে, এখন আমরা পরনে ধুতি পরতাম, কপালে তিলক লাগাতাম আর লুলু দিয়ে নিজেদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করতাম।

সুতরাং চলুন যার যেখানে যতটুক অবদান আছে, তাকে সেখানে ততটুকু মর্যাদা দেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *