১২ ই রবিউল আউয়াল রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর মৃত্য দিবস

১২ ই রবিউল আউয়াল রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর মৃত্য দিবস

১২ই রবিউল আউয়াল রাসুলের মৃত্যু বেশী কষ্টের না জন্মদিন নিয়ে বেশী আনন্দের

১২ই রবিউল আউয়াল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাত তথা মৃত্যু দিবস। এই দিনে পৃথিবীর বুক থেকে বিদায় নিয়েছিলেন মানবজাতির শ্রেষ্ঠ শিক্ষক, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ, আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)

রাসুল (সাঃ) এর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মুসলিম উম্মাহ তো বটেই, পুরো মানবজাতি এক অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছিল। তাঁর মৃত্যু কেবল একজন মানুষের বিদায় ছিল না, বরং তা ছিল সমগ্র পৃথিবীতে আল্লাহর সরাসরি নির্দেশনার যুগের পরি-সমাপ্তি।

রাসুল (সাঃ) এর মৃত্যুতে কুরআনের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি থমকে গিয়েছে

রাসূল (সা.) ছিলেন কোরআনের ব্যবহারিক রূপ। তিনি শুধু আল্লাহর বাণী শোনান নি, বরং প্রতিটি আয়াতকে বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ করতে হয়, তা নিজের জীবন দিয়ে দেখিয়েছেন।

তিনি ছিলেন ক্ষমা, ধৈর্য, ন্যায়বিচার ও দয়ার মূর্ত প্রতীক। তার মৃত্যুতে মানবজাতি আল্লাহর কালামকে সরাসরি একজন মানুষের চরিত্রে ও কর্মে দেখতে পাওয়ার সুযোগ হারিয়েছে।

রাসুল (সাঃ) মৃত্যুতে সরাসরি ওহীর ধারা বন্ধ হয়ে যায়

রাসূল (সাঃ) এর মৃত্যুর পর জিবরাঈল (আঃ) এর মাধ্যমে আল্লাহর পক্ষ থেকে সরাসরি ওহী আসা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর মানবজাতির কোনো নতুন নবী আসবেন না!

মানুষের সমস্যা সমাধানে আসমানি সুযোগ রহিত হয়ে গেল। মানুষ আকল, বুদ্ধি, বিবেক ও জ্ঞান দিয়ে চলতে বাধ্য হল। ফলে পৃথিবীতে নিত্য-নতুন সমস্যার জট বেধে চলছে।

রাসুল (সাঃ) মৃত্যু দুনিয়ায় আগত সমস্যা সমাধানে আদর্শ নেতৃত্বের উন্মেষ রহিত হয়েছে

রাসূল (সা.) ছিলেন একজন আদর্শ নেতা, যিনি যুদ্ধের ময়দানে সেনাপতি, মদিনায় রাষ্ট্রপ্রধান, ঘরে পিতা ও স্বামী এবং সমাজের একজন ন্যায়পরায়ণ বিচারক হিসেবে নিখুঁত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।

তার মৃত্যুতে জাতি-গোত্রের মধ্যে ভেদাভেদ দূর করে সকলকে এক পতাকা-তলে আনার মতো একজন মহান নেতাকে মানবজাতি হারিয়েছে।

সামনের দিনেও দুনিয়া বহু ধরনের সমস্যা, সংঘাত, গোলযোগ ও মহাদামামার মুখোমুখি হবেন কিন্তু রাসুল এর মত  নেতা, নেতৃত্ব আর সৃষ্টি হবেনা। ফলে দুনিয়াতে শান্তির স্থলে অশান্তির বাতাবরণ বাড়তে থাকবে।

রাসুল (সাঃ) সিরাত তথা ধারাবাহিক জীবনী পড়তে এই লিঙ্কগুলো পড়তে পারেন

জন্ম তারিখ ১২ রবিউল আউয়াল নিয়ে ঐতিহাসিকদের মতভেদ

 

রাসুল (সাঃ) এর মৃত্যু জ্ঞান ও হেদায়েতের চিরন্তন উৎস হারিয়ে ফেলল

তিনি মানুষকে অজ্ঞতা, কুসংস্কার এবং অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে এসেছিলেন। তার উপস্থিতিতে সাহাবীরা যেকোনো সমস্যার সমাধান সরাসরি তাঁর কাছ থেকে পেতেন। তার মৃত্যুতে মানবজাতি সেই জ্ঞান ও হেদায়েতের কেন্দ্রবিন্দুকে হারিয়েছে।

রাসুল (সাঃ) এর মৃত্যু সংবাদ শুনে সাহাবীরা পাগল-পারা হয়ে পড়েছিল

রাসুল (সাঃ) এর মৃত্যু সংবাদে সাহাবীরা হত-বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন। তারা বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে, রাসুল (সাঃ) আর তাদের মাঝে নেই।

ওমরের মত প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি পর্যন্ত খেই হারিয়ে উন্মুক্ত তরবারি হাতে নিয়ে ঘোষণা দেন, “যে বলবে মুহাম্মদ মারা গেছেন, আমি তার শিরশ্ছেদ করব।”

রাসুল (সাঃ) এর মৃত্যতে নিকটজনের খাদ্য খাওয়া ও বিশ্রামের কথা ভুলে গিয়েছিলেন 

যে ফাতিমা আকৃতি কেউ দেখেছি, যার কণ্ঠও যেখানে সেখানে শোনা যেত না। সেই ফাতিমা রাসুল (সাঃ) কন্যা পিতার বিছানায় মৃত্যুর যন্ত্রনার কষ্ট দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।

রাসুল (সাঃ) সেই মুহূর্তে কন্যাকে কানে কানে বলে দেন। আজকের পর থেকে তোমার বাবার আর কষ্ট হবে না। আর আমার মৃত্যুর পর অচিরেই তোমার সাথে সবার আগে দেখা হবে।

আলী, হাসান ও হোসাইন (রাঃ) এতটুকু নিশ্চল হয়ে পড়েছিলেন যে, এদেরকে কি বলে প্রবোধ দেওয়া যাবে, মানুষের মন থেকে বাক্য হারিয়ে গিয়েছিল। ওসমান (রা) রীতিমত বাকরূদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন, তার মুখ থেকে শব্দ বের হচ্ছিল না।

আয়েশা (রাঃ) বলেন, রাসুল (সাঃ) মৃত্যুতে উম্মেহাতুল মোমিনীনদের ঘরে অন্ধকার নেমে এসেছিল। তাদের ঘরে সন্ধ্যার পরে আর আলো জ্বলত না। আকাশে নতুন চাঁদ উঠত, সেটা নিভে যেত। তাদের চুলোয় আগুন জ্বলেনি। পরের মাসে এভাবে আরেকটি চাঁদ উদিত হয়েছে, আগুন জ্বলেনি। পরের মাসে আকাশে আবারো নতুন চাদ উঠেছে এবং যথারিতী নিভে গেছে কিন্তু রাসুল (সাঃ) এর পত্মীদের ঘরের চুলোয় আগুন জ্বলেনি। এমন ছিল তাদের মর্মবেদনদার জ্বালা, অন্তরের দহন, অব্যক্ত বাক্য কাউকে বলে মনের ভার হালকা করার সুযোগ ছিল নাভ

রাসুল (সাঃ) এর মৃত্যেতে মদিনার মানুষের বিহ্বলতা

রাসুল (সাঃ) এর মৃত্যু সংবাদে মদিনার মানুষ এতটাই বিহ্বল ও শোকার্ত হয়ে পড়েছিল যে তাদের মনে হয়েছিল পৃথিবী বুঝি ধ্বংস হয়ে গেছে। সকল সাহাবিরা গুমোট কান্নায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। কে কাকে প্রবোধ দিবে, কে কার কার কাছে প্রশ্ন করবে, এটাই তারা ভুলে গিয়েছিল। যে যার মত একাকী, নীরবে, নিভৃতে বসে কান্নায় বুক ভিজাচ্ছিল।

আনাস (রাঃ) বলেন, “রাসূল (সাঃ) যখন মদিনায় আগমন করেছিলেন, তখন মদিনার প্রতিটি জিনিস আলোকিত হয়ে গিয়েছিল। আর যেদিন তিনি ইন্তেকাল করলেন, সেদিন মদিনার প্রতিটি জিনিস যেন অন্ধকারে ছেয়ে গেল।”

রাসুল (সাঃ) এর মৃত্যুর পর সাহাবীরা মদিনার গলিতে হাঁটতেন কিন্তু রাসুল তাদের মাঝে নেই; এটা মনে পড়লে তারা পাগলপারা হয়ে যেতেন। তাদের কাছে যেন মদিনা একটি অচেনা নগরীতে পরিনত হয়ে হল! উম্মেহাতুল মোমেনিনদের কেউ কেউ মক্কায় চলে গেলেন। সাহাবীদের বেশীর ভাগই নবী বিহীন মদিনার থাকার চেয়ে, যুদ্ধের ময়দানে প্রাণ উৎসর্গ করারেই অনেক উত্তম বিবেচনা করলেন।

সেই রাসুল (সাঃ) এর নিশ্চিত মৃত্যুর দিনে, জন্মদিন পালন করার যৌক্তিকতা

রাসূল (সাঃ) এর মৃত্যুতে মানবজাতি একজন বন্ধু, একজন পথপ্রদর্শক এবং একজন করুণাময় পিতৃতুল্য ব্যক্তিকে হারিয়েছে।

যদিও তিনি সশরীরে আমাদের মাঝে নেই, তার রেখে যাওয়া সুন্নাহ এবং পবিত্র কোরআনের মাধ্যমে তাঁর আদর্শ আজও জীবিত আছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতিকে পথ দেখিয়ে যাবে।

মানবজাতির জন্যে রাসুলের আগমন ছিল খুশীর কিন্তু তার মৃত্যু ততোধিক যাতনার। তাই এই দিনে রাসুল (সাঃ) জন্মদিন পালন না করে, ওফাত দিবস পালন করা বাঞ্ছনীয়।

জন্মদিবসের আনন্দ-ফুর্তি তাঁর মৃত্যুকে অবহেলা-উপেক্ষা করে। এমন আনন্দ রাসুলের আগমন তিরোধানের ব্যাথা, কষ্টকে ম্লান করে দেয়। ১২ই রবিউল আউয়ালে রাসুল (সাঃ) এর মৃত্যুর বদলে জন্মদিনকে বেশী গুরুত্ব দিয়ে পালনের মাধ্যমে তাঁর ত্যাগ, কোরবানি ও প্রচেষ্টা সবই চাপা পড়ে যায়।

রাসুল (সাঃ) এর জীবনী ধারাবাহিক ভাবে পড়তে চাইলে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *