কাবা ঘর ভাঙ্গার উদ্যোগ গ্রহণ ও পুনর্নির্মাণ

কাবা ঘর ভাঙ্গার উদ্যোগ গ্রহণ ও পুনর্নির্মাণ

কাবাঘরের সংস্কার দরকার হয়ে উঠেছিল

দীর্ঘ দিনের সংস্কারের অভাবে বাইতুল্লাহ শরীফ তথা কাবা ঘর একেবারে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছিল। কোন বর্ণনায় বলা হয়েছে, কাবাঘরের দেয়াল ছিল হযরত আদম আলাইহিস সালাম -এর দেহের উচ্চতার সমান।

এর ওপরে কোন ছাদ ছিল না। বন্যার কারণে এ ঘর প্রায় ধ্বংসোন্মুখ হয়ে পড়েছিল। ফলে বৃষ্টি হলে হেরেমে শরীফে প্রচুর পানি জমা হয়ে এক সরোবরের আকার ধারণ করতো।

হারাম শরীফে যেন পানি প্রবেশ করতে না পারে এ কারণে বাঁধ নির্মাণ করে পানি প্রবেশে বাধা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হলেও বাঁধ ভেঙ্গে পানি প্রবেশ করতো। কাবাঘরের দেয়াল ছিল এমনিতে নিচু তারপরে পানির স্রোতে দেয়াল প্রায়ই বিধ্বস্ত হয়ে যেত।

দেয়ালের গাঁথুনি ছিল এমন যে, শুধু পাথরের ওপর পাথর সাজিয়ে রাখা হয়েছিল। কোন মজবুত গাঁথুনি ছিল না। দেয়ালের পাথরগুলো একটার সাথে আরেকটার কোন বন্ধন ছিল না।

এ ঘরের দরোজা ছিল প্রায় মাটির সমান। কাবা ঘরের ভেতরে একটা গর্ত করা হয়েছিল, এ গর্তে কাবার নিজস্ব ধন-সম্পদ জমা করে রাখা হতো। কিছু সংখ্যক অসৎ শ্রেণীর মানুষ কাবার দেয়াল পার হয়ে ভেতরে প্রবেশ করে সে সমস্ত সম্পদ আত্মসাৎ করতো।

কাবাঘরের আমানৃতক সম্পদ আবু লাহাব চুরি করেছিল

একবার এ সমস্ত সম্পদ গোপন করেছিল বনী মুলায়হরমের এক দাস। কেউ বলেছেন, তাঁর কাছে সে সমস্ত সম্পদ চুরি করে রাখা হয়েছিল।

ইবনে সাআদ বলেছেন, এ সম্পদ চুরির কারণে যে তিনজনকে সন্দেহ করা হয়েছিল তার ভেতর আবু লাহাবের নাম ছিল। তারপর কাবার সম্পদ উদ্ধার করা হয়েছিল দুয়াইকের কাছ থেকে এ জন্য তাকেই দণ্ডভোগ করতে হয়েছিল।

এ ধরণের নানা সমস্যার কারণে কাবা মেরামত করা জরুরী হয়ে পড়েছিল এবং তারা সবাই একত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল, এবার তাঁরা কাবার ছাদ নির্মাণ করবে। সে সময় মিশর থেকে এক রাজমিস্ত্রি এসেছিল মক্কায়। মক্কার লোকজনের আকাঙ্ক্ষা ছিল, তাঁরা সে মিস্ত্রীকে দিয়ে কাবার পুনর্নির্মাণের কাজ করাবে।

রোমানের কাঠের জাহাজ জেদ্দা বন্দরে ক্ষতি হয়, সেটা কিনে কাবা ঘর নির্মানের চিন্তা করা হয়

আরেকটি ঘটনা তাদেরকে কাবা মেরামত করতে উৎসাহিত করেছিল। হঠাৎ করে তাদের হাতে কিছু নির্মাণ সামগ্রী এসে পড়েছিল। একজন রোমান ব্যবসায়ীর বাণিজ্যিক জাহাজ সমুদ্রের দুর্যোগে নিপতিত হয়ে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে পড়েছিল। সে জাহাজ এসে ভিড়েছিল জেদ্দা বন্দরে বা শুয়াইবাহ বন্দরে।

জাহাজ ধ্বংস হয়েছে শোনার পরে ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা কিছু লোকজনসহ বন্দরে গিয়ে জাহাজ কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ আলোচনা করে জাহাজের কাঠ ক্রয় করেছিল।

আরেকজন রোমান স্থপতি বাকুমের সাথে কথা বলে কাবা মেরামতে তাঁর সহযোগিতা লাভের আশ্বাস পেয়েছিল। কিন্তু অসুবিধা দেখা দিল একটা বিষধর সাপকে কেন্দ্র করে। কাবার সম্পদ যে গর্ভে সংরক্ষণ করা হতো, সে গর্ভে একটা ভয়ংকর সাপ এসে বাস করতো।

সে সাপ প্রতিদিন গর্ভ থেকে বের হয়ে কাবার দেওয়ালে অবস্থান করতো। সাপের গর্জন শুনে কেউ দেওয়ালের পাশে যাবার সাহস করতো না।

এর মধ্যে মহান আল্লাহর রহমতে একটা ঈগল জাতীয় পাখি এসে একদিন সাপকে ছোঁ দিয়ে নিয়ে গেল। এবার তাঁরা কাবা মেরামতে এগিয়ে গেল। আবু ওয়াহহাব ইবনে আমর কাবা দেওয়াল থেকে একটা পাথর উঠিয়ে নেওয়া মাত্র সে পাথর তাঁর হাত থেকে ছুটে গিয়ে পুনরায় যথাস্থানে লেগে গেল।

যে কারণে কাবা পুনঃনির্মাণে সুদ, জিনা ,ব্যভিচার, জুলুম ও লুটের অর্থ ব্যবহার না করা সিন্ধান্ত হয়

এ ধরণের বিস্ময়কর ঘটনা ঘটতে দেখে সে ঘোষণা করলো, ‘হে কুরাইশবন্দ! তোমরা এমন কোন অর্থ সম্পদ কাবা নির্মাণে ব্যবহার করবে না, যা অর্থ সুদ, জিনা ব্যভিচার, লুটতরাজ, ছিনতাই, অন্যায় ভাবে দখল করা ইত্যাদি মাধ্যমে অর্জন করা হয়েছে। যে অর্থ সম্পদ বৈধ পন্থায় উপার্জন করা হয়েছে, এমন সম্পদই কেবল মাত্র আল্লাহর ঘর মেরামতে ব্যয় করবে।’

আল্লাহর ঘর কাবার সামান্যতম খেদমত করাকে সময়েও পরম সৌভাগ্যের বিষয় বলে মনে করা হত। তাদের ভেতরে এ চেতনা জাগ্রত ছিল এবং তা ছিল হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম -এর আন্দোলনের ফসল।

তাঁর প্রচারিত আদর্শের প্রভাব সে সময় পর্যন্ত কিছু ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হতো। কাবার সেবা-যত্ন করা এক বিরাট মর্যাদার কাজ, এ কাজ থেকে কেউ যেমন বঞ্চিত হতে আগ্রহী ছিল না এবং কোন গোত্র এককভাবে এ কাজ করতে সাহস পেত না।

কারণ অন্য গোত্র অবশ্যই এসে বাধা দেবে এবং পরিণতিতে যুদ্ধ বেধে যাবে। এ ধরণের আশংকার কারণে কাবা মেরামতের কাজ বিভিন্ন গোত্রের ভেতরে ভাগ করে নেওয়া হলো।

কাবা পুনঃনির্মাণে সব গোত্র ভাগাভাগি করে দায়িত্ব পালন করে

কাবার দরোজার দিকটা নির্মাণের দায়িত্ব গ্রহণ করলো বনী আবদে মানাফ এবং বনী যুহরা। হাজরে আসওয়াদ বা কালো পাথর যেদিকে ছিল, সেদিকের নির্মাণের দায়িত্ব গ্রহণ করলো বনী আদী ইবনে কা’ব, বনী আবদ্দাড়, বনী আসাদ ইবনে আব্দুল উজ্জা এবং বনী কুসাই।

রুকুনে ইয়েমেনি এবং রুকুনে আসওয়াদ-এর মাঝের অংশ নির্মাণের দায়িত্ব গ্রহণ করলো বনী মাখজুম গোত্রসহ বেশ কয়েকটি গোত্র। আর বনী জুমা ও বনী সাহাম দায়িত্ব গ্রহণ করলো তাঁরা কাবার নিচের অর্থাৎ মেঝের অংশ নির্মাণ করবে।

এভাবে এই সম্মানজনক কাজ ভাগ করে নেয়ার পরে তাঁরা আরেকটি মারাত্মক সমস্যায় নিপতিত হলো। আল্লাহর ঘর তাঁরা ভেঙে আবার নতুন করে নির্মাণ করবে, এ কাজে আল্লাহ রাজি আছেন কিনা-এ চিন্তায় তাঁরা কেউ প্রথমে জরাজীর্ণ ঘর ভাঙ্গার কাজে হাত দিতে সাহস করলে না।

যে কাবা ভাঙবে-তাঁর যদি কোন মারাত্মক ক্ষতি হয়? এক অজানা আশঙ্কায় তারা কেউ-ই প্রথমে অগ্রসর হলো না! শেষে ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা সাহস করে এগিয়ে গেল। সে কাবার পাশে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করলো, ‘হে আল্লাহ! আমরা তোমার ধর্ম ছেড়ে দিইনি। আমরা এখন যা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি, তা এই ঘরের কল্যাণের জন্যই করেছি।’

কাবা সংস্কারে তো ভাঙ্গতে হবে কিন্তু প্রথম কে দিবে সেই আঘাত! কোরাইশদের ভীতির যত কারণ

এ কথা বলে সে এগিয়ে গিয়ে হাজরে আসওয়াদ এবং রুকুনে ইয়েমেনের কোণা থেকে কিছুটা ভেঙে ফেললো। সেদিন আর কেউ কোন কাজে হাত দিল না। তাঁরা পরীক্ষা করতে চাইলো, আজ রাতের ভেতরে যদি ওয়ালীদ ইবনে মুগীরার কিছু হয় কিনা!

তাহলে তাঁরা বুঝবে আল্লাহ তাদের এ কাজে রাজি নেই সুতরাং তারা কাবা আর ভাঙে না এবং যা ভাঙ্গা হয়েছে তা নির্মাণ করে দেবে। আর যদি কোন অঘটনা না ঘটে তাহলে ধরে নেবে আল্লাহ তাদের কাজে রাজি আছেন। এভাবে তাঁরা অপেক্ষা করলো, ইবনে মুগীরা পরদিন পর্যন্ত যখন অক্ষত থাকলো তখন তারা ধরে নিল তাদের এ মহৎ কাজে আল্লাহ রাজি আছেন।

ইবনে মুগীরা পুনরায় গিয়ে কাবার দেওয়াল ভাঙতে শুরু করলো এবং হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম -এর নির্মাণ করা ভীত পর্যন্ত গিয়ে থামলো। তাঁর সাথে তখন অন্যান্য গোত্রও কাজ শুরু করে দিয়েছিল।

এরপর তাঁরা এমন মূল্যবান পাথর সংগ্রহ করলো, যা পাথর ছিল সবুজ রঙের এবং বর্শার ফলকের মত। পাথরগুলো একটার সাথে একটা যুক্ত ছিল। এই পুনর্নির্মাণ কাজে নির্মাণ সামগ্রীর অভাবের কারণে কাবার একটা নির্ধারিত অংশ বাইরে রাখা হয়েছিল। একে অংশটাকে হেজাস বা হাতিম বলা হয়।

এখানে হযরত হাজেরা এবং হযরত ইসমাইল আলাইহিস সালাম -কে দাফন করা হয়েছিল। তাঁরা এর পাশে একটা প্রাচীর নির্মাণ করেছিল, যেন বুঝতে অসুবিধা না হয় যে এটা কাবারই একটা অংশ। এরপর কুরাইশবৃন্দ কাবার দরোজা এতটা বড় করেছিল যা বর্তমানে রয়েছে।

👈পূর্বের পোষ্ট 𝕋 পরের পোষ্ট 👉