হাজরে আসওয়াদ পুনঃস্থাপনের ঘটনা
হাজরে আসওয়াদ পাথর খানিকে কুরাইশগন খুবই সম্মানিত হিসেবে বিবেচনা করত। এটা কাবা ঘরের উপরে রক্ষিত ছিল। এই পাথর নিয়ে একবার মক্কায় বিরাট গৃহযুদ্ধ লাগার উপক্রম হয়েছিল, সেটার যুগান্তসৃষ্টিকারী সুন্দর সমাধান দিয়েছিলেন মুহাম্মদ (সাঃ) যা ইতিহাসে বার বারআলোচনার বিষয়।
সে সময়ে কুরাইশরা প্রতি বৃহস্পতি এবং সোমবারে কাবার দরোজা খুলে দিত। সে দরোজায় তাঁরা প্রহরী নিয়োগ করেছিল। মানুষ যখন সিঁড়ি বেয়ে উঠতো তখন প্রহরী যাকে ইচ্ছে প্রবেশ করতে দিত, আবার যাকে ইচ্ছে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দিত।
তারপর নির্মাণ কাজ ঐ স্থান পর্যন্ত গিয়ে উপনীত হলো, যে স্থানে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তাঁর সন্তান হযরত ইসমাইল আলাইহিস সালাম -এর সহযোগিতায় কালো পাথর বা হাজরে আসওয়াদ স্থাপন করেছিলেন। বর্ণনা করা হয়েছে, এই পাথর হযরত আদম আলাইহিস সালাম জান্নাত হতে এই এনেছিলেন।
এই পাথর স্থাপন করা নিয়ে সমস্ত গোত্রের মধ্যে তর্কবিতর্ক শুরু হলো। প্রতিটি গোত্রেই আকাঙ্ক্ষা, এই জান্নাতি পাথর স্থাপন করার দুর্লভ সম্মান তাঁরাই অর্জন করবে। এ তর্কবিতর্ক শেষ পর্যন্ত এমন পর্যায়ে গিয়ে উপনীত হলো যে, প্রতিটি গোত্র যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করল। পাঁচদিন পরে তাঁরা একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার জন্য কাবার প্রাঙ্গনে উপস্থিত হলো।
হাজরে আসওয়াদ পুনঃস্থাপনের জন্যে ঐতিহাসিক ঐক্যমত্য ঘটল যেভাবে
এ সময়ে বনী মখজুম গোত্রের সব থেকে বয়স্ক ব্যক্তি ওয়ালীদ ইবনে মুগীরার ভাই আবু উমাইয়া (এ নামের বিষয়ে মতানৈক্য আছে) উঠে দাঁড়িয়ে প্রস্তাব করেলা, ‘হে কুরাইশগণ! তোমরা এই একটা বিষয়ে এ ধরনের ঝগড়া না করে একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হও যে, কাল সকালে সর্ব প্রথমে যে ব্যক্তি কাবার দরোজা দিয়ে প্রবেশ করবে, তিনি যে সিদ্ধান্ত প্রদান করবেন তোমরা তা সবাই গ্রহণ করবে।’
বয়স্ক ব্যক্তির এ কথা সবাই গ্রহণ করল। সেদিনের মত তাঁরা বিদায় নিল এবং পরদিন তাঁরা অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করলো, তাদের আল আমীন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাবায় প্রবেশ করছে। সমবেত জনতা আনন্দে চিৎকার করে উঠলো, ‘হায়াল আমীন রাদিনা, হায়াহা মুহাম্মদ ! আতা কুমুল আমীন ! অর্থাত এ তো আমীন! আমাদের অমত নেই, তোমাদের কাছে আমীন এসেছে!’
মুহাম্মাদ (সাঃ) হাজরে আসওয়াদ পাথর পুনঃস্থাপনের এক যুগান্তসৃষ্টিকারী সিদ্ধান্ত দিলেন
বিষয়টা তারা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে প্রকাশ করলো। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানতে পারলেন, তাকেই এই সমস্যার সমাধান করতে হবে। তখন তিনি বললেন, ‘আমাকে তোমরা একটা বড় কাপড় এনে দাও।’
একজন একটা বড় কাপড় এনে দিল। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে কাপড়টা বিছিয়ে কাপড়ের ওপরে নিজের হাতে পাথরটা রাখলেন। তারপর তিনি সমস্ত গোত্র প্রধানদেরকে বললেন, ‘আপনারা সবাই এই পাথরসহ কাপড় ধরে উঠতে থাকুন।’
তারা সবাই কাপড়ের বিভিন্ন অংশ ধরে উঁচু করতে থাকল। যে স্থানে পাথর স্থাপন করার সিদ্ধান্ত সে পর্যন্ত কাপড় পৌঁছলে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাপড় থেকে পাথর উঠিয়ে যথাস্থানে তা স্থাপন করলেন।
সেই জান্নাতি পাথর কোন মুশরিক যথাস্থানে স্থাপন করুক এটা বোধহয় মহান আল্লাহর অভিপ্রায় ছিল না। এ কারণেই তাদের ভেতরে পাথর স্থাপন করা নিয়ে বিবাদের সৃষ্টি হলো এবং তাদেরকে দিয়ে মহান আল্লাহ ঐ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করালেন, আবার যথা সময়ে তাঁর প্রিয় বন্ধু বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে সেখানে উপস্থিত করলেন।
হাজরে আসওয়াদ পুনঃস্থাপনের মাধ্যমে আল্লাহ বুঝিয়ে দিলেন মুহাম্মদ (সাঃ) কে স্পেশাল প্রজ্ঞা দিয়েছেন
আবার এই ঘটনার মাধ্যমে আল্লাহ এটাও মানুষের কাছে প্রমাণ করে দিলেন, যে তাঁর নবীর ভেতরে নেতৃত্ব দাসের অদ্ভুত অনুপম গুণাবলী বিদ্যমান। পাথর স্থাপনের ব্যাপারে বর্তমানে তিনি যেমন সমস্ত মানুষের ওপরে নেতৃত্ব প্রদান করলেন এবং তোমরা নিজেদেরকে তাঁর সিদ্ধান্তের কাছে সমর্পণ করলে, তাঁর নেতৃত্বের কারণে তোমরা ভয়ংকর গৃহযুদ্ধ থেকে নিজেদের মধ্যে পূর্ণ শান্তি ও স্বস্তি ফিরে পেলে, রক্তপাত এড়াতে সক্ষম হলে,
‘হে মানুষ! আগামী দিনে যখন সে তোমাদের ওপরে নেতৃত্ব দানে এগিয়ে আসবে, তখন তোমরা যদি তাকে আজকের মতই সহযোগিতা করো, তাহলে তোমরা আজ যেমন শান্তি লাভ করলে তেমনি তখনও শান্তি লাভ করবে, কিয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ আগমন করবে তারা যদি সবাই আমার নবীর নেতৃত্ব অকুন্ঠ চিত্তে গ্রহণ করে, তাহলে তাঁরাও আজকের এই দিনের মতই শান্তি এবং নিরাপত্তা লাভ করবে।’
হাজরে আসওয়াদ পুনঃস্থাপনের ঘটনাটি ঘটেছিল যখন মুহাম্মদ (সাঃ) এর বয়স প্রায় ৩৫ বছর
আমাদের ধারণা, মহান আল্লাহ সেদিনের সেই পাথর স্থাপনের ঘটনার মধ্যে মানুষের জন্য বিভিন্ন ধরনের ইঙ্গিতের মধ্যে আমাদের বর্ণিত ইঙ্গিতও সমগ্র মানব জাতির জন্য প্রকাশ করেছিলেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুধু এই ঘটনার মীমাংসাই করেননি, এই ধরনের বহু ঘটনার-সমস্যার সমাধান তিনি করেছেন নবুওয়্যাত পূর্ববর্তী জীবনে।
কাবার পাথর স্থাপনের সমস্যার সমাধান যখন তিনি করেন, ঐতিহাসিকগণ বলেছেন, তখন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বয়স ছিল পঁয়ত্রিশ অর্থাৎ নবুওয়্যাত লাভের মাত্র পাঁচ বছর পূর্বে তিনি এভাবে নেতৃত্ব দিয়ে মক্কার বিভিন্ন গোত্রের ভেতরে শান্তি স্থাপন করলেন।
নবুওয়্যাত লাভ অর্থাৎ তাকে আর মাত্র পাঁচ বছর পরেই সমগ্র মানব জাতির নেতা নির্বাচিত করা হবে, ঠিক এই সময়ে মহান আল্লাহ তাকে দিয়ে উদ্ভূত চরম সমস্যার সমাধান করালেন। আমাদেরকে এটা বুঝতে হবে, এই ঘটনা বিশ্বনবীর নবুওয়্যাত লাভের পরে বা তাঁর কিশোর তরুণ বয়সে ঘটতে পারতো।
মহান আল্লাহ তা ঘটান নাই। নেতৃত্বদানের যথাযথ বয়সেই এ ঘটনা আল্লাহ তাঁর নবীকে দিয়ে ঘটিয়ে এটাই মানুষকে শিক্ষা দিলেন, বর্তমান দিনে তাঁর নেতৃত্বের কাছে আত্মসমর্পণ করে তোমরা যেমন শান্তি লাভ করেছ তেমনি অনাগত দিনে তাঁকে নেতা হিসেবে গ্রহণ করে তাঁর আদর্শ গোটা পৃথিবীতে বাস্তবায়ন করলে বর্তমান দিনের মতই শান্তি লাভ করবে।
| 👈পূর্বের পোষ্ট | 𝕋 | পরের পোষ্ট 👉 |
-
হাজরে আসওয়াদ পুনঃস্থাপন, Placement of Al-Hajar al-Aswad, কাবা ইবাদতের জন্য প্রস্তুত, Kaaba Ready for Worship, নবীজির প্রজ্ঞা ও ফয়সালা, Wisdom of the Prophet in Conflict Resolution, কুরাইশদের কাবা পুনর্নির্মাণ, Reconstruction of Kaaba by Quraysh