নবী (সাঃ) এর উপর ওহী অবতীর্ণ হওয়ার ধরন এবং প্রাচ্যবিদদের অপবাদ খণ্ডন

ওহী অবতীর্ণ হওয়ার ধরন এবং প্রাচ্যবিদদের অপবাদ ও তার খণ্ডন

ওহী নাজিল হবার সময় নবী (সাঃ) যেমন অনুভব করতেন

‘ওহী’ আরবি শব্দ, এর অর্থ হলো, গোপন ইঙ্গিত। শরিয়তের পরিভাষায় ওহী বলতে বোঝানো হয়, যা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নবীদের অন্তরে প্রবেশ করানো হয় বা ফেরেশতার মাধ্যমে অবতীর্ণ করা হয়। এ কারণে নবীদের অন্তরে বিশ্বাস এমন দৃঢ় হয় যে, সাধারণ মানুষের থেকে সে বিশ্বাসের মর্যাদা পৃথক।

তাঁকে যে মহান আল্লাহ তাঁর পক্ষ থেকে বাণী প্রেরণ করা হলো এ সম্পর্কে নবীর অন্তরে সামান্যতম দ্বিধা থাকে না। আরেক কথায় বলা যায়, জ্ঞান বৃদ্ধি হবার সর্বশ্রেষ্ঠ মাধ্যমের নাম হলো ওহী যা সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়ে থাকে এবং তা শুধু মাত্র নবী রাসুলদের জন্য নির্দিষ্ট।

এর সম্পর্ক সরাসরি আলমে কুদস এবং আলমে গায়েবের সাথে। ওহী যে কিভাবে অবতীর্ণ হয় তা বিশ্বনবী (সাঃ) সাহাবিদের প্রশ্নের জবাবে দৃষ্টান্ত দিয়ে বুঝিয়েছেন। নবী (সাঃ) এ সম্পর্কে বলেছেন, ‘কখনো তা আমার কাছে মনে হয় যে, ঘণ্টার শব্দ অবিরাম গুঞ্জন সৃষ্টি করেছে, আবার কখনো মৌমাছির গুঞ্জনের ন্যায়, আবার কখনো ফেরেশতা মানুষের আকৃতিতে এসে আমাকে শোনায় আমি তা শুনি আল্লাহ আমার অন্তরে সুরক্ষিত করে দেন।’

বিশ্বনবীর কথায় ওহী অবতীর্ণের অবস্থাকে যেভাবে উপমার মাধ্যমে বা ফেরেশতার আগমনের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে, তা মানুষের বোধশক্তির কাছাকাছি হলেও এ কথা বলতে দ্বিধা নেই, প্রকৃত অবস্থা মহান আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল ব্যতীত অন্য কোন মানুষ উপলব্ধি করতে পারবে না। যতদূর উপলব্ধি করা যায় ওহী অবতীর্ণের সময় যে প্রকৃত অবস্থা কি হয় তা বুঝিয়ে বলা নবীর আয়তের বাইরে। তাই বলে এটা নবীর অক্ষমতাও নয়।

যেমন যে ব্যক্তি সাগরের অতল তলদেশে বিশেষ পোশাক পরিধান করে অবতরণ করে, সেখানে তাঁর প্রকৃত অবস্থা কেমন হয় তা দৃষ্টান্তের মাধ্যমে সে প্রকাশ করে তাদের কাছে যারা কখনো সাগরের তলদেশে অবতরণ করেনি। কিন্তু পানির নিচে সে যেমন অবস্থা উপলব্ধি করে,

তাঁর সে উপলব্ধি বোধটাকে সে অন্যের ভেতরে সংক্রমিত করতে পারে না। তেমনি নবীগণ ওহী অবতীর্ণের সময় কেমন অবস্থার সৃষ্টি হয় তা বর্ণনা করতে পারেন কিন্তু তাঁর নিজস্ব উপলব্ধি বোধটাকে তো আর শ্রোতার মনে প্রবেশ করাতে পারেন না।

নবী (সাঃ) নিজের জবানীতে বলেছেন ওহী নাজিলের সময় তার অবস্থা কেমন হয়

বিশ্বনবী (সাঃ) এ কথাও বলেছেন যে, ‘এবং ওহীর এ অবস্থাটা আমার ওপর ভীষণ কঠিন বোধ হতে থাকে। পুনরায় যখন এই কষ্টকর অবস্থার অবসান ঘটে তখন মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে যা বলা হয়ে থাকে তা আমার মনের মধ্যে সংরক্ষিত হয়ে যায়।’

ফেরেশতা যখন মানুষের আকৃতি ধারণ করে ওহী নিয়ে আসেন বা পর্দার আড়াল থেকে মহান আল্লাহর সাথে কথা হয় সে সময়ের অবস্থা হয় খুব সহজ। কিন্তু ওহী অবতীর্ণ করার প্রথম অবস্থা অর্থাৎ ওহী যখন মৌমাছির গুঞ্জনের মত বা ঘণ্টার অবিরাম শব্দের মত আসতে থাকে তখন ভীষণ কষ্ট অনুভব হয়। প্রশ্ন হলো এমন কেন হয় ?

এ সম্পর্কে গবেষকগণ ধারণা করেন, ‘মহান আল্লাহ মানুষকে মানুষের আবশ্যকীয় শর্ত ও স্বভাব চরিত্রের সাথে এমনভাবে জড়িত করে দিয়েছেন যে নবী ও রাসুলদের মত পবিত্র এবং নিষ্পাপ সত্ত্বাও নিজেদের সমস্ত পবিত্রতা থাকার পরেও মানবীয় প্রভাবে প্রভাবিত না হয়ে উপায় থাকে না।

এ কারণে তাদের ওপরে যখন ওহী অবতীর্ণ হয় সে সময়ে তাদেরকে সেই ঊর্ধ্ব জগতের প্রভাব আচ্ছন্ন করে রাখে এবং আল্লাহর নূরের ছায়ায় তাঁরা মহান আল্লাহর কথা গ্রহণ করেন।’

একদিকে তাঁরা মানবীয় দেহধারী অপরদিকে তাঁরা আল্লাহর নূরের ছায়ায়-এ কারণে তাদের ওপরে উভয় জগতের প্রভাব নিপতিত হয়। সে সময়ে তাদের মানবীয় বৈশিষ্ট্যগুলোকে দমন করে তাঁকে এমন এক জগতের উপযোগী করা হয় যে, তাঁরা যেন ওহী শ্রবণ এবং ধারণ করতে সক্ষম হন।

মানুষ নবীর মানবীয় বৈশিষ্ট্য অবদমিত করে তাকে যখন আল্লাহর নূরের জগতের উপযোগী করা হয় তখন তাঁর ভেতরে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়, সেটাই হলো মানুষের চর্ম চোখে অস্থিরতা, নবীর কাছে তখন সেটাই কষ্টানুভব হয়। সেই কষ্টের অবসান যখন হয় তখন নবীকে সেই জগতের যাবতীয় পবিত্রতা আচ্ছন্ন করে রাখে এবং তিনি তখন অপূর্ব শান্তি অনুভব করেন।

ওহী নাজিলের সময় নবী (সাঃ) এর দেহ-মনের অবস্থার ধরন

যে সময়ের ভেতরে এ অবস্থার সৃষ্টি হয় সে সময় অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী। ওহী অবতীর্ণের বিশেষ অবস্থায় যখন মানবসুলভ অনুভূতি ও বোধ শক্তির ওপর ঊর্ধ্ব জগতের প্রভাব প্রবল হয়ে ওঠে, তখন মানবদেহে এক ধরণের অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। সে সময় নবীর শ্রবণ শক্তির সম্পর্ক স্থাপন হয় ওহী শ্রবণের সাথে, তখন তাঁর কাছে এ জড় জগতের কোন শব্দ স্থান পায় না।

ওহীর ব্যাখায় বলেছেন ইউরোপীয় গবেষকেরা বলেছেন, ওটা ছিল নবী (সাঃ) মৃগীর আলামত

প্রথম প্রকারের ওহী অবতীর্ণের সময় নবীর যে অবস্থা হতো এই অবস্থাকে ইউরোপীয় গবেষকগণ রোগ হিসাবে বর্ণনা করেছেন। তাঁরা বলেছেন, ‘মুহাম্মদ (সাঃ) সেই শিশু কাল থেকেই মৃগী-রোগী। এ রোগ তাঁর মাঝে মধ্যেই দেখা দিত।’

তাদের কথা যে কত বড় মিথ্যা কথা তা তাঁরা জেনে বুঝেই শুধুমাত্র ইসলাম এবং মুসলমানদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য লিখেছেন। হযরত হালিমা (রাঃ) এর বাড়িতে থাকতে বিশ্বনবী (সাঃ)-এর যে বক্ষ-বিদারন করা হয় তখন থেকে নাকি মুহাম্মদ (সাঃ)-এর এ রোগের সৃষ্টি।

ওহী নিয়ে ইউরোপীয় গবেষকদের ঘৃণা নিন্দার বিপক্ষে আমাদের অভিমত

আমাদের বক্তব্য হলো, সে সময়ে নবী (সাঃ)-এর বয়স ছিল পাঁচ। ঐ পাঁচ বছর বয়সেই শুধুমাত্র একবার সে রোগ দেখা দিল আর মাঝের ৩৫ বছর দেখা দিল না, ঠিক তিনি যখন নবুওয়ত লাভ করলেন ৪০ বছর বয়সে, তখন পুনরায় সে রোগ দেখা দিল, এ সমস্ত প্রশ্ন ঐ সমস্ত গবেষকদের মনে জাগে নি কেন?

প্রকৃত পক্ষে তাঁরা জেনে বুঝেই, বিশ্বনবীর নবুওয়তকে অস্বীকার এবং ইসলামকে কোন ঐশী বিধান হিসাবে স্বীকৃতি না দেবার লক্ষ্যেই তাঁরা বিশ্বনবীর ওপরে মৃগী রোগের অপবাদ চাপানোর ব্যর্থ চেষ্টা করেছে।

 

👈পূর্বের পোষ্ট: ওহী নাযিলে বিরতি ও বিশ্বনবী (সাঃ)-এর মানসিক অস্থিরতা
পরের পোষ্ট 👉

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *