ওহী নাযিলে বিরতি ও বিশ্বনবী (সাঃ)-এর মানসিক অস্থিরতা

ওহী নাযিলে বিরতি ও বিশ্বনবী (সাঃ)-এর মানসিক অস্থিরতা

ওহী আসায় বিরতী শুরু হওয়ায় বিশ্বনবী (সাঃ) অস্থিরতা বেড়ে যায়

হেরা নামক গুহায় বিশ্বনবী (সাঃ)-এর ওপরে কদরের রাতে প্রথম ওহী অবতীর্ণ হবার পরে মহান আল্লাহ কিছু দিন হযরত জিবরাইল (আঃ) -এর মাধ্যমে আর ওহী প্রেরণ করেননি।

ওহীর বিরতির কারণ সম্পর্কে গবেষকগণ বলেছেন, ওহী অবতীর্ণের বিষয়টি বিশ্বনবী (সাঃ)-এর কাছে ছিল তাঁর চেতনার অগোচরে। তিনি কোনদিন আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেননি বা তাঁর মনে এ ধরণের কল্পনাও আসেনি যে একে নবী হিসেবে নির্বাচিত করা হোক, সকাল সন্ধ্যায় তাঁর কাছে জিবরাইল (আঃ) আগমন করুক, এ ধরণের কোন কথা তাঁর মনের নিভৃত জগতে কোন অসচেতন মুহূর্তেও উঁকি দেয়নি।

বিশ্বনবী (সাঃ) এর উপর ওহীর বিরতী হওয়ার কারণ পর্যালোচনা

ফলে প্রথম ওহী অবতীর্ণ যখন হলো তিনি স্বাভাবিকভাবেই অস্থির হয়ে পড়েছিলেন। এই অস্থিরতা দূরীভূত করার জন্য সময়ের প্রয়োজন ছিল। এরপর আসে ওহী ধারণ করার প্রশ্ন। মুহাম্মদ (সাঃ) যখন দেখলেন তাঁর কাছে জিবরাইল (আঃ) এলেন এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে তিনি বিশ্বনবী হিসাবে নির্বাচিত হলেন, তাঁকে একটা বিশাল দায়িত্ব দেয়া হলো, এ সমস্ত দিকগুলো হৃদয়ঙ্গম করার জন্যে বিশ্বনবী (সাঃ)-কে অবকাশ দেয়া প্রয়োজন ছিল।

তাছাড়া তাঁকে যে দিক নির্দেশনা দেয়া প্রয়োজন, একাজ থেমে ছিল না বলে পবিত্র কোরআনে দেখা যায়। যখন যা করা প্রয়োজন তা বিশ্বনবীর (সাঃ) মন-মস্তিষ্কে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে উদয় করে দেয়া হতো। ওহীর বিরতি চললেও স্বয়ং আল্লাহ ছিলেন তাঁর পথ প্রদর্শক।

ওহী আসায় বিরতী নিয়ে নিন্দুকদের কথিত কাল্পনিক ধারণার অপনোদন

ওহী অবতীর্ণ হচ্ছে না বিরতি চলছে, এ কারণে নবী (সাঃ) বড় অস্থির হয়েছিলেন বলে বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। ওহীর বিরতির কারণে তিনি এতটা মানসিক অস্থিরতায় নিমজ্জিত ছিলেন, তিনি নির্জন স্থানে ভ্রমণ করতেন বা কখনো পাহাড়ের ওপরে ওহীর চিন্তায় ঘুরতে থাকতেন।

অবস্থা কখনো এমন হতো যে, তিনি উঁচু পাহাড় থেকে নিচে পড়ে যাবেন। এমন সময় হযরত জিবরাইল (আঃ) এসে তাকে বলতেন, ‘আপনি আল্লাহর নবী।’ তারপর তিনি মানসিক শান্তি লাভ করতেন এবং তাঁর মনের অস্থিরতা দূরীভূত হত। (ইমাম যুহরী, ইবনে জারীর)

ওহীর বিরতীর কারণে বিশ্বনবী (সাঃ) পাহাড় থেকে লাফিয়ে পড়তে চাইলেন

কোন কোন বর্ণনায় দেখা যায়, ওহী অবতরণ হতে যত দেরী হতে থাকে ততই নবী (সাঃ)-এর মানসিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ অবস্থায় তাঁর অবচেতন মনে হেরা পাহাড় বা ছাবির পাহাড়ে গিয়ে নিজেকে পাহাড়ের ওপর থেকে নিজেকে ফেলে দিতে প্রস্তুত হতেন। এভাবে তিনি যখন পাহাড়ের এমন স্থানে যেতেন, আরেকটু অগ্রসর হলেই তিনি নিচে পড়ে যাবেন।

এমন সময় তিনি আকাশ থেকে কণ্ঠ শুনে থেমে যেতেন। তিনি ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখতেন হযরত জিবরাইল (আ) আকাশ এবং এই পৃথিবীর শূন্য-মার্গে একটা সিংহাসনে উপবিষ্ট এবং তিনি তাঁকে ডেকে বলছেন, ‘হে মুহাম্মদ (সাঃ)! আপনি নিশ্চিত হন, অবশ্যই আপনি আল্লাহর রাসুল এবং আমি জিবরাইল!’

বোখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ এবং মুসনাদে আহমাদে এ সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে। আব্দুর রাজ্জাক তাঁর আল্লু মুসান্নাফে ইমাম যুহরী থেকে উদ্ধৃত করেছেন। ইবনে জারীর তাঁর তাফসীরে এ কাহিনী উল্লেখ করেছেন। ইবনে সাআদ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে উল্লেখ করেছেন। আল্লামা শিবলী নোমানী (রাহ) তাঁর সীরাতুন্নবীতে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

তাঁর আলোচনা থেকে ধারণা করা হয় বিষয়টি বিতর্কিত। অনেকে বিষয়টি এভাবে উত্থাপন করেছেন যে, ‘ওহী অবতরণ হচ্ছে না এ কারণে নবী (সাঃ) একটা সন্দেহ সংশয়ের ভেতরে নিপতিত হয়েছিলেন। এ কারণে তিনি নিজেকে পাহাড়ের ওপর থেকে নিক্ষেপ করতে অগ্রসর হতেন।’

ওহীর জন্যে বিশ্বনবী (সাঃ) আবেদন করেন নাই কিন্তু সেটা স্থবির হওয়ায় পেরেশান হতেন

এ কথা গ্রহণ করা যায় না, কেননা কোন নবীই তাঁর নবুওয়তের প্রতি সন্দেহ পোষণ করতে পারেন না। এমন কখনো হয়নি। নবীদের নবুওয়তের ইতিহাস সাক্ষী, কোন জনীও তাঁর নবুওয়ত সম্পর্কে সামান্যতম দ্বিধা দ্বন্দ্বে ছিলেন না। আর বিশ্বনবী (সাঃ)-এর ক্ষেত্রে এ ধরণের প্রশ্নই উঠতে পারে না।

আমাদের মতে বিষয়টি এমন হতে পারে যে, কোন একজন মানুষ যদি চরম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে দিনরাতের প্রতি মুহূর্তে চিন্তা করতে থাকে, তাহলে সে মানুষ স্বাভাবিকভাবে আপনভোলা বা আনমনা হয়ে পড়ে।

পথ দিয়ে সে যখন বিষয়টি নিয়ে মনে মনে চিন্তা করতে থাকে আর সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে, তখন তাঁর এ চেতনা জাগ্রত থাকে না যে, সে কোন পথ দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে বা তাঁর সামনে কোন গহ্বর আছে, বা তাঁর সামনে দিয়ে কোন যান বাহন এসে তাকে চাপা দেবে।

এভাবে বহু মানুষ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে, এমন দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে বিরল নয়।

বিশ্বনবী (সাঃ)-এর কাছে হযরত জিবরাইল (আঃ) একবারই ওহী নিয়ে এলেন আর আসছেন না, এ চিন্তা বিশ্বনবীর মনের জগতে তরঙ্গ সৃষ্টি করা স্বাভাবিক কিছু নয়।

প্রথম বার যেহেতু পাহাড়ের নির্জন গুহায় ওহী অবতীর্ণ হয়েছিল, আবার সেখানে গেলে ওহী অবতীর্ণ হতে পারে বা জিবরাইল (আঃ) -এর সাক্ষাৎ ঘটতে পারে, এ কথা চিন্তা করেও তিনি (সাঃ) পাহাড়ে যেতে পারেন।

পাহাড়ের ওপরে ভ্রমণ করছেন আর ওহীর চিন্তা করছেন, এ অবস্থায় অবচেতন মনে তিনি হয়তো পাহাড়ের এমন অবস্থানে চলে আসতেন যে, আরেক ধাপ অগ্রসর হলেই তিনি নিচে পড়ে যাবেন। এ মুহূর্তে জিবরাইল (আঃ) তাকে ডাক দিতেন যেন তিনি এক দিকে নিচে পড়ে যাওয়া থেকে সচেতন হন।

অপর দিকে জিবরাইল (আঃ) -কে দেখে তাঁর মনে যেন শান্তি ফিরে আসে। ওহীর বিরতির কারণে তিনি স্বেচ্ছায় আত্মহত্যা করতে যাবেন, এ কথা মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।

ওহী কিছুদিন বন্ধ থাকার কারণে বিশ্বনবী (সাঃ) মনঃকষ্টে ছিলেন এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে সমস্ত অলীক কাহিনী রচনা করা হয়েছে যার কোনই ভিত্তি নেই। এ সম্পর্কে যেসব হাদিস বলা হয় সেসব হাদিস সনদের দিক থেকে কতটুকু শক্তিশালী তা অবশ্যই পর্যালোচনার বিষয়।

ওহী আসায় বিরতী সম্পর্কে বিভিন্ন সীরাত গ্রন্থের ব্যাখা

আল্লামা শিবলী (রাহ) বোখারী শরীফে যে বর্ণনা এসেছে সে সম্পর্কে বলেন, এ বর্ণনা ইমাম যুহরী পর্যন্ত শেষ হয়েছে। এর ওপরে আর কোন বর্ণনাকারী নেই। বর্ণনাটি প্রকৃত পক্ষে ছেদ-পূর্ণ। স্বয়ং বোখারীর ভাষ্যকারেরা বলেছেন, এতবড় একটা ঘটনার ব্যাপারে ছেদ-পূর্ণ বর্ণনা ধর্তব্য নয়। সুতরাং এ বর্ণনা গ্রহণ করা যায় না। (সীরাতুন্নবী)

অবশেষে দ্বিতীয়বার ওহী নিয়ে যেভাবে এলেন জিরবাইল (আঃ)

দ্বিতীয় পর্যায়ে ওহী অবতীর্ণ হওয়া সম্পর্কে স্বয়ং বিশ্বনবী (সাঃ) বলেছেন, একদিন আমি রাস্তা অতিক্রম করছিলাম। এমন সময় হঠাৎ আমার কানে একটা শব্দ প্রবেশ করলো। আমার মনে হলো শব্দটা আকাশ থেকে হলো।

‘আমি ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম ফেরেশতা, যাকে আমি হেরার গুহায় দেখেছিলাম। তিনি আকাশ এবং পৃথিবীর শূন্য-মার্গে একটা কুরসিতে উপবিষ্ট। এ দৃশ্য দেখে আমি ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে বাড়িতে এসে বললাম, আমাকে কম্বল দিয়ে জড়িয়ে দাও। বাড়ির লোকজন আমাকে কম্বল দিয়ে জড়িয়ে দিল এ সময়ে আমার প্রতি ওহী অবতীর্ণ হলো।’

(ইমাম যুহরী, হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ), বোখারী, মুসনাদে আহমাদ, মুসলিম, ইবনে জারীর) এই ঘটনাটি তুলে ধরেছেন

👈পূর্বের পোষ্ট 𝕋 পরের পোষ্ট 👉