অপার্থিব প্রেম : টম শুধু জিহ্বা খুলতে পেরেছিল

অপার্থিব প্রেম
বর্ষার এক বৃষ্টি ভেজা দিনে ‘পুলি’ তাদের বাসায় আশ্রয় নিয়েছিল। তরুণী পুলিকে দেখে টমের মনে প্রেমের শিহরণ উঠে। ইচ্ছে জাগে আজই তাকে প্রস্তাব দিয়ে দেয়। আবার ভাবে নাহ! সামনের আশ্বিনেই ঘটা করে এ প্রস্তাব রাখা যাবে। অপার্থিব প্রেম : টম শুধু জিহ্বা খুলতে পেরেছিল
 আরো পড়তে পারেন…
অতীতের একটি রোমাঞ্চকর বেদনাদায়ক স্মৃতির পাতায় কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে গিয়েছিল ‘টম’। বরাবরের মত ঠিক তখনিই ঘটে বিপত্তি। শাঁ করে কানের পাশ দিয়ে কিছু একটা যেন ছুটে গেল। মোটা আকৃতির মুগুর টা অনতিদূরে আছড়ে পড়ে মাটিতে গড়াচ্ছে। ভাগ্যিস একটু এদিক ওদিক হলেই মাথাটা ফেটে যেত! ওদিকে বুড়ো চৌধুরী সমান তালে গালি দিচ্ছে, “তুই আবারো আমার ঘরের পাশে দাঁড়িয়ে আছিস! হতচ্ছাড়া কোথাকার”। এই বুড়ো টম কে মোটেই সহ্য করতে পারে না। অতীতের এক বৃষ্টি ভেজা দিনে, বুড়ো বাড়িতে ফিরছিল, বুড়োকে খুশী করার জন্য সামনে দাঁড়িয়েছিল ‘টম’। কপাল খারাপ! তাকে দেখেই বুড়োর মাথার মেজাজ চরমে উঠে। হাতে রাখা ছাতা ছুঁড়তে গিয়ে নিজেই আছাড় খেয়ে কোমরে ব্যথা পায়। সে থেকেই তিনি ‘টম’ কে আর দু’চোকে দেখতে পারেনা। এতদিন তিনি হাতের বাঁকা লাঠিটি ছুড়ে মারত। ওটা গায়ে লাগলেও অত ব্যথা পেত না। আজ মুগুর মারার দৃশ্য দেখে বুঝা যায়, সামনে বিপদের মাত্রা আরো বাড়বে। আজ মাথায় লাগেনি, অন্যদিন যে লাগবে না, সে নিশ্চয়তা কোথায়?

টমের নানীকে এই বাড়ীতে বিষ খেয়ে মরতে হয়েছিল। মা তাকে বলেছিল, এই বাড়ীতে বিপদ থাকলেও সুযোগ-সুবিধাও কম নয়। পেট ভরে লোভনীয় খাদ্য পেতে চাইলে, এই বাড়ীর মানুষের মন জুগিয়ে চলো, তাহলে মহাসুখে দিন কেটে যাবে। মায়ের কথা একেবারে মিথ্যে নয় কিন্তু তার সেই মাকে মরতে হয়েছিল বাড়ীর সামনের রাস্তায় গাড়ীর চাকার তলে। একদা বাড়ীর ছোট সদস্য ‘তন্ময়’ তাকে ডাক দিয়ে বলে, ‘টম’ বার্গার খাবি? আ, হা, হা, এটার মন মাতানো সুগন্ধেই তো পুরো বাড়ী মৌ মৌ করছে। ঘ্রাণে টমের জিবে পানি চলে আসে। ‘তন্ময়’ তাকে এক টুকরো বার্গার এগিয়ে দেয়। না বলার বদ-অভ্যাস টমের নেই, তাই কাল বিলম্ব না করে ঝটাপট বার্গারের টুকরা টুকু খেয়ে নেয়। সারা জীবনে এমন স্বাদ আগে কখনও পেয়েছে বলে মনে করতে পারেনি। সেই চিন্তায় টম তন্ময়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে আর বারবার নিজের ঠোট জোড়াকে জিহ্বা দিয়ে বারবার চেটে, হারিয়ে যাওয়া স্বাদের কিছুটা উদ্ধার করতে ব্যর্থ চেষ্টা করে। ঠিক তখনই ‘তন্ময়ের’ দাদী এ দৃশ্য দেখে ফেলে। তিনি গলা খেঁকিয়ে চিল্লায়ে বলে উঠে, হায়! হায়! তুমি পুরো বার্গার টা তাকে দিয়ে দিয়েছ?


টম চিন্তা করে, এ ধরনের মিথ্যা অপবাদের প্রতিবাদ করা উচিত। সে তো যেচে গিয়ে খেতে চায় নি, তাকে ডেকে এনেই খাইয়েছে! তাও সামান্য একটা টুকরা। কিন্তু শুনতে হচ্ছে, পুরো বার্গারই নাকি টম খেয়েছে! অসহ্য অপবাদ, কপালে আবারো মার-গুঁতো জোটতে পারে। অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা মনে আছে।


বাড়ীর দারোয়ান পান্টু মিয়া এগিয়ে এলেন। টম তার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে চাইল, কেমন প্রতিক্রিয়া হতে পারে। মানুষটা ভাল। তাকে খেতে দেয়, আদর করে মাথায় হাত বুলায়, কখনও সাথে করে নিয়ে যায়। কিন্তু বাড়ীর কর্ত্রী কিছু বললে, সে নির্দয় আচরণ করে! হাতের কাছে যা পায় তা দিয়েই মারে। তাই টম প্রস্তুত ছিল নতুন অঘটন মোকাবেলায়।


জানোয়ার! তুই ছোট সাহেবের বার্গার কেড়ে খেয়েছিস! আজকে তোর কল্লা ফাটাব, বলেই হাতের কাছের ইটের টুকরাটি তুলে নিতে যাচ্ছিল। দৌড় দিতে প্রস্তুত টমের কাছে আর এক সেকেন্ড বরবাদ করার সুযোগ নেই। ভাগ্যিস সীমানা প্রাচীরের এক জায়গায় ফাঁক ছিল, দ্রুত সেটার ফোঁকর গলিয়ে বাহিরে গিয়ে চিন্তা করে দেখে নাহ, ধড়ে এখনও প্রাণ আছে। তবে,


ইটের কানার সম্ভাব্য আঘাত থেকে মুক্ত হতে পারলেও, ভাঙ্গা ইটের মাঝে বের হয়ে যাওয়া পুরানো লোহার গুঁতোয় চামড়াটা ছিঁড়ে গেছে। শরীরের বিভিন্ন স্থানের ব্যথার সাথে আরেকটি নতুন ব্যথার স্থান যোগ হল। হ্যাঁ এটাই আমাদের জীবন, এভাবেই মেনে নিতে হবে। মৃত্যুর আগে ‘মা’ এই ধরনের পরামর্শই দিয়েছিল। পরিবেশ শান্ত হবার আশায় সদর দরজার সামনে এসে একটু ভাব নিয়ে দাঁড়ায় টম; ততক্ষণে দারোয়ানের মেজাজও ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।


বাড়ীর ভেতরে টমের জীবন কেমন তা কেউ না দেখলেও তার সতীর্থরা ভাবে, সে আছে মহাসুখে! তার এই সুখ কারো সহ্য হয়না। তাই সবাই মিলে তাকে এ বাড়ী থেকে তাড়াতে চায়। কোর্মা, বিরিয়ানি, মাছ-মুরগী ফ্রাইয়ের সুঘ্রাণ সর্বদা এই বাড়িকে মাতিয়ে রাখে। তখনই তার সতীর্থরা খবর নিতে আসে, ভিতরে হচ্ছেটা কি? টম কাউকে কোন সুযোগ দিতে চায়না। সে আর দারোয়ান ‘পান্টু’ মিয়ার চোখ ফাঁকি দিয়ে এ বাড়ীতে কেউ ঢুকলে তার খবর আছে। পালাবার কোন সুযোগ পাবেনা। সে কারণে টম সারা গ্রামের সবার চোখের শত্রু। দুশমনেরা তাড়াতাড়ি বাড়ির ভেতরে ঢুকতে না পারলেও দিনের কোন এক সময় তাদের বাড়ীর সামনে দিয়ে ঘুরে যায়। গেইটের সামনে ঠিক ডান পার্শ্বে জবা ফুলের গাছ আছে না? সেই গাছেই তাদের উপস্থিতির প্রমাণ রেখে যায়। এ কারণে গোস্বায় টমের মেজাজ সর্বদা রুক্ষ থাকে। ইচ্ছে করে পুরো গাছটাকেই যেন উপড়ে ফেলে! কিন্তু তার সে সুযোগ নেই। তবে সারাদিন সারারাত চোখ-কান খাড়া করে রাখে, কে কখন চুপি চুপি জবা তলায় আসে! সুযোগ মত একবার ধরতে পারলেই হবে, জীবনের তরে বাপের নাম ভুলিয়ে দিবে।


আশ্বিন মাস দুয়ারে হানা দিয়েছে। টম আগের মত নেই। শরীরে কেমন জানি একটা নায়ক নায়ক ভাব সৃষ্টি হয়েছে। সর্বদা মনটা উচাটন থাকে। কিচ্ছু ভাল লাগেনা। কিছু খেতেও মন চায়না! উচাটন মনে শুধু ফুর্তি করার ইচ্ছে করে। ‘পুলির’ কথা মনে পড়ে যায়। সদর দরজার বাহিরে, বাড়ীর সামনে যে মাঠ রয়েছে, সেদিকে নজর যায়। আরে একি! টমের মাথা ভোঁ করে ঘুরে উঠে। পাশের বাড়ির বল্টুর সাথে পুলি মাঠে দাঁড়িয়ে গল্প করছে। যা সে কল্পনায় ভাবেনি, তা তার চোখের সামনে ঘটছে। বল্টু এলাকার একটা বড় চামচা! সে চৌধুরী বাড়ি আর ধোপার বাড়ীর সবার সাথে দু’কুল রক্ষা করে চলে। হাড়ের সাথে চামড়া লেপটে আছে এমন একজনের সাথে পুলি সময় কাটায়! বরদাশত করতে পারেনা।


টম সজোরে চিল্লায়ে বলে “এই কুত্তার বাচ্চা! তোর একদিন কি আমার এক দিন। তুই আমার মনের মানুষের সাথে গোপনে মেলামেশা করছিস, আজ তোর রক্ষে নেই” ঘেউ….। ভগ্ন শরীরের বল্টু সটান দাঁড়িয়ে উত্তর দেয় আস, কাছে আস, নাগালে পেলে তোর দু’চোখ আস্ত তুলে ফেলব”! কেঁউ…। দাঁড়া, তোর মজা নেবার স্বাদ এখনি ভুলিয়ে দেব, বলেই টম তার দিকে দ্রুত দৌড় দেয়। বল্টু বুড়িয়ে যাচ্ছিল, ইহ জনমে কোনদিন নারী সঙ্গ পায়নি কিন্তু এ লড়াইয়ে সে টিকতে পারবে না। মার খাবার চেয়ে বরং জীবন নিয়ে কেটে পরাকেই ভাল মনে করল। ফলে সমুদয় গোস্বা গিয়ে পড়ল পুলির উপর। এই অকামের জন্য তার ঘাড়ে দুটি কামড় বসিয়ে দিয়ে বলল, খবরদার দ্বিতীয়বার যাতে এই ভুল না হয়। তাছাড়া বল্টু মানুষের মল খেয়ে বড় হয়েছে আর আমি বড় হয়েছি বিরানি-কোর্মা-কোপ্তা খেয়ে। সুতরাং আমার সাথে থাকলে তোমার ভাগ্যেও ওসব জুটবে।


পুলি মন দেয়ার শর্তে আবদার করেছিল, তাকে যেন একটু ধোপার বাড়ীর ওদিকে বেড়াতে নিয়ে যায়। তার বহুদিনের শখ, ধোপা বাড়ি দেখবে। টমের জন্য এটা নিষিদ্ধ স্থান, ভয়ঙ্কর যায়গা। তার মা নিষেধ করেছিল কখনও যেন ওদিকে না যায়। সেখানে তার পিতা ও দাদার মৃত্যু হয়েছিল। টম ভাবল তারপরও সুযোগ মত একবার সাহস দেখানো যায়। তাছাড়া পুলির মন পেতে এ কাজে একবার সাহস দেখানো চায়ই। সামনের মাঠের পরেই তো বড় পুকুর, সেটা পেরুলেই খানিকটা ফসলী জমি, তার পরেই তো ‘ধোপা বাড়ী’। একেবারে অসম্ভব নয়! সময় সুযোগ মত, পুলিকে সেই পুকুর পর্যন্ত ঘুরিয়ে আনা যায়ই। কোন এক সুন্দর দিনে এ কাজটি করে ফেলা যাবেই।


সাত সকালে টম আবিষ্কার করে গত সন্ধ্যায় ধোপা বাড়ির আজন্ম শত্রুরা সদলবলে জবা গাছের গায়ে প্রস্রাব করে গেছে। আবার এই সাত সকালে তাদের দলের ‘টান্টু’ তাজা মূত্রের নমুনা রেখে গেছে! কান খাড়া করে সতর্কতার সহিত চারিদিকে দেখে নেয়। না কাউকে দেখা যাচ্ছেনা। প্রস্রাবের নমুনা পুনঃ পরীক্ষা করে নিশ্চিত হল একেবারেই তাজা মূত্র। সে বেটা দূরে যায়নি, আশে পাশের কোথাও লুকিয়ে আছে। চিৎকার দিয়ে গর্জে উঠে, ‘এই কুত্তীর বাচ্চা টান্টু, তুই কই? আমার বাড়ীর সীমানায় চুরি করে প্রস্রাব করেছিস, সাহস থাকলে এখন কাছে আয়, ঘেউ ঘেউ…’। টান্টু নিকটেই ছিল। উত্তর আসে, ঘেউ… আমি জঙ্গলে এসেছি পায়খানা করতে, আবারো দল নিয়ে আসব। তখন দেখব কি করিস ঘেউ….উ..। উত্তরে টম জানায় সাহস থাকলে একাকী আয়, দাঁত দিয়ে কান ছিঁড়ে নেব, কামড়িয়ে কলিজা বের করব…. ঘেউ, ঘেউ উ উ। পাশের বাড়ির মল খাওয়া, বল্টু, ধোপা বাড়ীর কেউ উত্তর দেয়, লেগে দেখাও কার গায়ে কি শক্তি। ঘেউ, ঘেউ…..উ।


এক বিকেলে টম পুলিকে নিয়ে বের হয়েছিল ধোপা বাড়ি দেখাবে বলে। মাঠ পেরিয়ে, পুকুর পাড় ঘুরিয়ে যেই বা মাত্র ফসলী জমির কিনারে দাঁড়িয়েছে, তখনই কোত্থেকে জানি সবাই মিলে একযোগে হামলে পড়ে টমের উপর। তারা সুযোগের অপেক্ষায় লুকিয়ে ছিল। বহু ক্ষোভ জমে আছে মনে, বহু শোধ বাকি আছে। চৌধুরী বাড়ির মনোহর ঘ্রাণের খাদ্যে কোনদিন ভাগ বসাতে দেয়নি! আজ তাকে না মরা পর্যন্ত আঘাতে জর্জরিত করা হবে। ভয়ঙ্কর এই অসম লড়াইয়ে টমের ঘাড়ের গোশত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।


সে অবস্থায় মনে পড়ে যায় মায়ের কথা, ভুলেও কোনদিন ওদিকে যাবেনা। কিন্তু জীবনে এবারই আসা হয়েছে, আর এই একবারেই যেন জীবন লীলা সাঙ্গ হবে! এলাকার মানুষ এই যুদ্ধ থামায় কিন্তু প্রতিপক্ষের গোস্বা থামে না। তারা গোস্বায় বলতে থাকে, তোমার বাড়ীতে গিয়ে তোমাকে কামড়িয়ে আসব। ‘পুলি’ এখন আমাদের দখলে, তার পেটে আমাদের বীজ তোমার এলাকায় ছড়াব। তার সন্তানেরাই তোমাকে কামড়িয়ে ছিঁড়ে ফেলবে। আহত টম ভাবতে থাকে, এটা তো ভয়ঙ্কর হুমকি! নাহ্! সে সুযোগ কোনদিন দেওয়া যাবেনা, পুলির সাথে কোন সম্পর্কের দরকার নেই। তার বাচ্চাগুলোকে প্রথম সুযোগেই চিরতরে শেষ করে দিতে হবে। নতুবা তাদের হাতেই নির্জীব হতে হবে! তাছাড়া কুকুর গোত্রের শত্রু নিধনের এটাই তো অন্যতম নিয়ম।


আহত টম চৌধুরী বাড়ীর একটি ঝোপে আশ্রয় নেয়। চারিদিকে বিপদ, কুকুরের আপন বলতে কেউ থাকেনা। একটি মাঠ আর একটি পুকুর পাড়ি দিতেই জীবনের ইতি টানতে হচ্ছে। টমের অসুস্থতার সুযোগে, ধোপা বাড়ির কুকুর দল, এই প্রথম চৌধুরী বাড়ীতে ঢুকার সুযোগ পেয়েছে। বাড়িতে ঢুকেই কর্তৃত্ব নিয়ে নিজেরা মারামারি শুরু করে। এবারো দারোয়ান দাঙ্গা থামায়, সবাই পালায়। বৃদ্ধ চৌধুরী তেতে-মেতে ঘর থেকে বের হয়েই আহত ‘টম’ কে সামনে দেখে। এতে মেজাজ আরো তিরিক্ষি হয়ে উঠে। দারোয়ানকে নির্দেশ দেয় এটাকে মেরে যেন আজই বাড়ী ছাড়া করে। টম আবারো এক নিভৃত কোনায় আশ্রয় নেয়।


টমের ঘা থেকে পুঁজ বের বের হচ্ছিল কয়েকদিন ধরে। এখন পচা গন্ধে চারিদিকে রি-রি দশা। শরীর এখন কঙ্কালসার। একদিন গোশতের ঝোল এনেছিল দারোয়ান। তার ঘ্রাণে খিদে আরো বহুগুণ বেড়ে গিয়েছিল। খুশিতে টগবগ করে টম আড়াল থেকে বের হল। দারোয়ান তার কান ধরে পুরো গরম ঝোল তার কাটা ঘায়ে মেখে দিয়েছিল! মরিচের ঝাল আর টগবগে গরম ঝোলের জ্বালায় প্রাণ যেন বের হতে চাইছিল। পুরো দুই দিন কান্না করেছিল। টম মরেনি, আবার ভালও হয়নি। চলৎশক্তি প্রায় হারিয়ে ফেলেছিল, সাথে সাথে পুরো বাড়ীতে চামড়া পচা দুর্গন্ধে ভরিয়ে তুলেছিল। একদিন নাক-মুখ বন্ধ করে চুপি চুপি দারোয়ান ‘টমের’ পিছনে এসে দাঁড়াল। হাতে একটি বড়, ভারী লাকড়ির টুকরা। টমের মনে পড়ে তার নানীকে এই বাড়ীতে বিষ খাইয়ে মারা হয়েছিল। আর দারোয়ানের হাতে লাটি থাকলে তার আচরণ কেমন হয়, টম তো আগেই দেখেছিল।


টম এখন আগের মত হাঁটতে পারেনা দৌড়ানোর চিন্তা বাদ। দারোয়ান হয়ত দয়া দেখাতে পারে। নতুন অযাচিত কিছুই ঘটবে না এমন একটা চেহারা নিয়ে, টম উঠে বসে, জিহ্বাটা বের করে, লেজ খানা তির-তির করে নাড়াচ্ছিল। টমের দাঁড়াবার শক্তি ছিলনা, পালাবারও সুযোগ নেই। সাক্ষাৎ যমদূত হয়ে লাকড়ি হাতে দাড়িয়ে দারোয়ান! এক মুহূর্ত বিলম্ব, দারোয়ান কি যেন ভাবছিল! অতঃপর সজোরে আঘাত হানে মাথায়। টম দ্রুত মাথা সরিয়ে নেয় কিন্তু আঘাত গিয়ে পড়ে মুখের উপরে, লিকলিকে জিহ্বাটি ছিদ্র হয়ে, লম্বা দাঁতের মধ্যে গেঁথে যায়। চিৎকার দেবার এতটুকু সুযোগ পায়নি, চোখে-মুখে ঝাঁঝালো পানি চলে আসে। চারিদিক অন্ধকার যেন। শুয়ে পড়ে মাটিতে।


পরবর্তী আঘাত বুক বরাবর, মনে হচ্ছিল ফুসফুস যেন শুটকির মত চ্যাপ্টা হয়ে গেল। একটি পূর্ণ নিঃশ্বাস নেবার চেষ্টা করল, ফুসফুস অর্ধেক ফুলে উঠেছে, দারোয়ান তার দেহের সমুদয় শক্তি দিয়ে পরবর্তী আঘাত হানে টমের শরীরের একই জায়গায়! পুনঃ শ্বাস নেবার সুযোগ নেই। মৃত্যুর পূর্বক্ষণে একটি পরিপূর্ণ নিঃশ্বাস নিতে শেষ চেষ্টা করে যাচ্ছিল। পৃথিবীতে আরো দশ সেকেন্ড বাঁচতে, একটি নিঃশ্বাসের আশায় টম। শরীর টাকে পূর্ণ শক্তিতে ঝাঁকি দিল, কিছুটা বাতাস ঢুকেছে বলে মনে হল। পুনরায় লাকড়ির কঠিন আঘাত! এক বিন্দু বাতাসের আশায় টমের চোখ যেন বের হয়ে আসতে চাচ্ছিল। অতঃপর লাকড়ির মরণ আঘাত পড়ে মাথার উপরে। মগজ নরম হয়ে পড়ে একটি চোখ ছিটকে বাহিরে গিয়ে পড়ে। টম তখনও চেষ্টা করছিল বেঁচে উঠতে কিন্তু টম শুধু দাঁত থেকে নিজের জিহ্বাটি খুলতে পেরেছিল।