আমাদের দেশীয় শিক্ষার গোড়াপত্তন

 

সংখ্যালঘু হয়ে সংখ্যাগুরু মানুষদের উপর কিভাবে প্রভুত্ব বিস্তার করা যায় এই জ্ঞান অর্জন ও বাস্তবায়নে ইংরেজেরা যে সুদক্ষ তা ইতিহাসে বারংবার প্রমাণিত হয়েছে। ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী জাতিকে ভেঙ্গে টুকরো করার কিতাবি জ্ঞান ইংরেজদের করায়ত্ত। তাদের থেকেই এই বিদ্যা পৃথিবীর অন্যজাতি শিখেছে। ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ তথা ‘বিচ্ছিন্ন করেই শাসন করো’। একটি সুসংঘটিত জাতিকে বিচ্ছিন্ন করে, আবার তাদেরকে শাসন করা ও সদুপদেশ দেবার মত কূটনৈতিক জ্ঞানে তারা এতই সমৃদ্ধ যে, ব্রিটেন আজ একটি ছোট রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া স্বত্বেও, তারা সারা দুনিয়াকে পরামর্শ দিয়ে নিজের অস্তিত্বের প্রকাশ ঘটায়। আজকের দুনিয়ায় লাখো-কোটি গ্যাঁটের টাকায় যে শিক্ষা অর্জনের জন্য মানুষ হাহাকার করছে, এটা তাদের মগজ থেকেই বেরিয়ে এসেছিল এবং একচ্ছত্র ভাবে সেখানে ভূমিকা রাখছে। এটা তাদের গভীর চিন্তাপ্রসুত বিজয়।

 

বিশাল ভারতকে শাসন করতে, মুসলমানদের সহযোগিতা দরকার হয়। কয়েকটি রাষ্ট্রীয় সেক্টরে মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব অপরিহার্য হয়ে উঠে। এসবের কয়েকটি ছিল, পরিসংখ্যানবিদ, জজ ও মুনশি তৈরি ছিল এর প্রধান উদ্দেশ্য। মুসলমানদের বিয়ে ও রেজিস্ট্রি সংক্রান্ত বিষয়ে তথ্য দরকার হত। তালাক নিয়ে ঝামেলা মিটানো, ফৌজদারী অপরাধ হলে ইসলামী রীতি অনুযায়ী বিচার করার জন্য বিচারক সৃষ্টি। ওয়ারিশী সম্পত্তি বণ্টন ও বিতাড়নে মুন্সীর দরকার হয়ে পড়ে। ইসলামী রীতির এসব মামলা যেত ইংরেজ পরিচালিত আদালতে। ইংরেজেরা এসব ধর্ম বিষয়ক ঝামেলায় দক্ষ ছিলনা; থাকলেও তাদের বিচার মেনে নেবার গ্যারান্টি না থাকায় সমস্যা জিইয়ে থাকত। আবার মাদ্রাসায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আরবি-ফার্সির শিক্ষক তৈরি সহ, মুসলমানদের মধ্য থেকে লোভনীয় সরকারী চাকুরী করার মন-মানসিকতা সম্পন্ন একদল মানুষের দরকার হয়ে পড়ে। সে লক্ষ্যে ইংরেজ প্রশাসন সরকারী আলীয়া মাদ্রাসার সৃষ্টি করে। এসব মাদ্রাসার প্রধান থাকতেন ব্রিটিশেরা; বাকি শিক্ষকেরা হতেন মুসলমান আলেম। আলেমদের সহযোগিতায় একটি গ্রহণযোগ্য সিলেবাস ও কারিকুলাম তারাই বানিয়ে দিতেন। আলিম, ফাজিল, কামিল এই স্তরগুলো তাদেরই সৃষ্টি। এই সিলেবাসে পড়ে যে যতটুকু পাশ করে তার মান অনুযায়ী তারা সরকারী চাকুরীতে নিয়োগ পেত। সেই থেকে মাদ্রাসায় সিলেবাস প্রথা চালু হয়, আজ অবধি তা চালু আছে। একই ধরনের সিলেবাস প্রথা্য় আমাদের দেশের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে রাষ্ট্রিয় শিক্ষা ব্যবস্থায় আজো চলছে।

 

কিন্তু আলেম সমাজের একটি বিরাট অংশ, ইংরেজ প্রবর্তিত এই পন্থায় আলেম সৃষ্টির এই প্রথায় সায় দেয়নি। তারা ইংরেজদের এই পলিসির মধ্যে দুর্বিঃসন্ধি খুঁজে পান। ইসলামকে বিকলাঙ্গ, ইসলামের মৌলিকত্ব হরণ এবং সুবিধাভোগী কিছু ধর্মীয় আলেম জন্ম দেবার প্রজেক্ট হিসেবে ভাবে।

 

এর বিপরীতে, ইংরেজ শাসন বিতাড়ণ, মুসলিম ছেলেদের ইসলামী শিক্ষা ও আমৃত লড়াই করার প্রেরণা যোগানোর লক্ষ্যে ভারতের দেওবন্ধে আল্লামা কাশেম নানুতু্বীর তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠিত হয় দেওবন্ধ মাদ্রাসা। তিনিও ব্যক্তি জীবনে ছিলেন, গ্রহণযোগ্য আলেম, খাঁটি দেশপ্রেমিক ও বিপ্লবী যোদ্ধা। এই মাদ্রাসার শিক্ষা ব্যবস্থায় অতীতের শিক্ষা পদ্ধতিকেই আদর্শ হিসেবে মানা হয়। এই শিক্ষা পদ্ধতিকেই বর্তমানে কওমি শিক্ষা হিসেবে অভিহিত করা হয়।

 

‘কওম’ শব্দটি আরবি। এর অর্থ গোষ্ঠী, গোত্র, জাতি, সম্প্রদায়, জনগণ। সে হিসেবে কওমি শিক্ষা অর্থ জনগণের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট শিক্ষা পদ্ধতি। আরব দেশে ইংরেজি শিক্ষা সহ যে কোন স্কুলকে মাদ্রাসা বলে। মাদ্রাসা, স্কুল, বিদ্যালয়, বিদ্যাপীঠ একই কথা। সে হিসেবে ‘কওমি মাদ্রাসা’র মানে হলো জাতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা জাতীয় বিদ্যাপীঠ। আজকের কওমি মাদ্রাসা সৃষ্টির অন্যতম সংক্ষিপ্ত ইতিহাস হল এটিই।

 

চলবে…..