উপকারী সন্তানের বাবা-মা হতে চাইলে, তাকে প্রতিদান শিক্ষা দিন

প্রতিদান-শিক্ষা-দিন
আমাদের সমাজে বড় ভাই কিংবা বড় বোন কখনও পিতা-মাতার পাশাপাশি তাদের ছোট ভাই-বোন দের জন্য অনেক অবদান রাখেন। কখনও তাদের আয়ের সিংহভাগ অর্থও খরচ করে থাকে। প্রবাসীদের বেশীর ভাগের অবস্থাই প্রায় এমন। তাদের কোলে-পিটে বড় হয়ে ছোট গুলো যখন স্বাবলম্বী হয়, তখন বড় জনের উপকারের কথা ভুলে যায়। উপরন্তু সে এমন কি করেছে বলে গুনের কথা অস্বীকার তো করেই, এমনকি বণ্টনের ক্ষেত্রেও তাকে খোঁচা-খোঁটার আঘাতে জর্জরিত করে!
 
এটার একমাত্র কারণ পিতা-মাতা স্বীয় সন্তানকে কখনও কৃতজ্ঞতা বোধ না শেখানো এবং উত্তম প্রতিদান দেবার মানসিকতায় বড় না করা! সকল ইতর প্রাণীরাই রাত-দিন চুরি, ছিনতাই, দখল করে কিংবা অন্যের আহারে হানা দিয়ে নিজের বাচ্চাদের উদর পূর্তি করে। প্রাণীরা অসামাজিক জীব, তাদের কাছে প্রতিদান, কৃতজ্ঞতার বালাই নাই। তাই তাদের সন্তানেরা ইতর জানোয়ার হিসেবে পরিচিত। মানুষেরাও যদি তাদের সন্তান পালনে একই নিয়ম নীতির অনুসরণ করে তাহলে, প্রাণীদের মত কাছাকাছি প্রভাব মানব জীবনেও ছায়াপাত করতে পারে।
 
সবচেয়ে চরম সত্য কথা হল, প্রতিদানে অনভ্যস্ত সন্তান পিতা-মাতার ক্ষেত্রেও একই আচরণ করতে থাকবে; যেভাবে সে বড় ভাই-বোনদের সাথে করে থাকে। আজকের সমাজে বেশীর ভাগ পিতা-মাতা সন্তানের অবজ্ঞা ও অবহেলার শিকারে পরিণত হচ্ছে এই কারণেই। কেননা এই পিতা-মাতাই, শিশুকালে তাদের কে মানুষ বানানোর জন্য এই গুণাবলী হাতে-কলমে শিক্ষা দেয়নি!
 
প্রতিদান কিভাবে দেওয়া যাবে? সে সম্পর্কে জানতে হলে সর্বপ্রথম বুঝতে হবে, মানুষ অন্যের উপকারের সমান প্রতিদান কখনও দিতে পারে না, সম্ভবও নয়। কেননা বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি উপকার নেবার সময় তার বয়স, স্থান, কাল, পাত্র, অভাব, সমস্যা, বিপদের ধরন, পেরেশানি, জ্বালাতন, ইচ্ছা, অভিলাষের সাথে প্রতিদান প্রদানের সময় সেই ব্যক্তির জীবন চক্র হুবহু মিলবে না। সেই কারণেই প্রতিদান দিয়ে কারো উপকার পরিশোধ করা সম্ভব নয়।
 
কিন্তু কোরআন-হাদিস, সমাজ ব্যবস্থায় প্রতিদানের কথা বলা আছে। প্রতিদান দেবার বহু উপমা কোরআন-হাদিসে দেওয়া আছে। যা অন্য কোন মৌলিক গ্রন্থে পাওয়া যায় না। যথাযথ কৃতজ্ঞতার স্বীকার ও উপকারীর উপকার স্বীকারের মাধ্যমে প্রতিদান দেবার পরামর্শ এখানে আছে। কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের মাধ্যমেই কেবল প্রতিদানের স্বীকার করা হয়। আল্লাহ মানুষের জন্য যা করেন, তার বিনিময় দেওয়া কখনও সম্ভব নয়। ঠিক এই মানদণ্ডেই সকল মানুষকে, আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হয়। আর অকৃতজ্ঞ মানুষ কোন হিসাব ছাড়াই জাহান্নামী। আল্লাহ বলেছেন, যে ব্যক্তি আমার বান্দার প্রতি অকৃতজ্ঞ, সে আমার প্রতিও অকৃতজ্ঞ। অর্থাৎ পিতা-মাতা, ভাই-বোন থেকে দুনিয়াবি ক্ষুদ্র স্বার্থ-লাভেও যে ব্যক্তি অকৃতজ্ঞ, সে মহান আল্লাহর বিশাল উপকারের মূল্য বুঝতে পারবে না এবং আল্লাহর নেয়ামতকে উপেক্ষা-অবহেলা করবে। তাই পিতা-মাতার সাথে স্বার্থ-লাভের ক্ষুদ্র কাজে যে ব্যক্তি অকৃতজ্ঞ সে তো আল্লাহর নেয়ামত উপভোগেও অকৃতজ্ঞ হবে।
 
আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেন, “সদাচরণের বিনিময় সদাচরণ ছাড়া আর কিছু নয়।” সূরা রহমান-৬০। উপকার, সহযোগিতা, দান এসবই সদাচরণের অংশ। বড় ভাই-বোন কিংবা অন্য কারো আদর-সহযোগিতায় যে বড় হয়েছে, তাদের পিতা-মাতার কর্তব্য সে ব্যাপারে পরিষ্কার ধারনা দেওয়ার। উপকার কারীদের প্রতিদান দেওয়ার ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম পদক্ষেপটি হচ্ছে, তাদের অবদান স্বীকার করা, তারা যে কৃতজ্ঞতা পাওয়ার উপযুক্ত, তার স্বীকৃতি দেওয়া। কোন অবস্থাতেই যেন অনুগ্রহকারীদের কথা ভুলে না যায়, সে ব্যাপারে সতর্ক করা। 
 
কৃতজ্ঞ সন্তান বানাতে, হাসি দিয়ে সালাম দেবার অভ্যাস করাতে হবে। সালামের উত্তরে বাড়িয়ে দোয়া করাও প্রতিদান হিসেবে বিবেচিত হয়। সন্তানকে কেউ যদি আদর করে, কিছু উপহার দেয় তার বিনিময়েও কৃতজ্ঞতা শেখাতে হবে। বড়দের উপকার ও ভালবাসার কথা প্রতিনিয়ত তার মস্তিষ্কে ঢুকাতে হবে। এমনকি শিশুকালে কারা তাকে বেশী আদর করত সে ব্যাপারেও সম্যক ধারণা দিতে হবে। শিশু থেকে পিতা-মাতা ওয়াদা নিবে, তুমি যখন সেরা হবে, বড় হবে তখন ওদের অনুদানের কথা ভুলো না। পবিত্র কোরআনেই সেটা বলে দিয়েছে এভাবে, “আর তোমরা তোমাদের পারস্পরিক অবদানের কথা ভুলে যেও না।” বাকারা-২৩৭।
 
শিশুকালে সন্তান পিতা-মাতাকে বেশী ভালবাসে। সে সময়ই শিশুকে বলতে থাকুন, তুমি যখন বড় হবে তখন আমার জন্য বাড়ী বানাবে, গাড়ী কিনবে, রাজকীয় সুবিধা দিবে ইত্যাদি। বিশটি বিশাল সখের বিষয় তার সামনে হাজির করুন। তার থেকে ওয়াদা নিন। সে সহজে আকাশে বাড়ী করে দেবারও ওয়াদা করবে! না শিশুর এই আন্তরিক কাল্পনিক ওয়াদা বৃথা যাবেনা। পরদিন থেকেই সে কল্পনাতে এসব নিয়ে ভাবতে থাকবে। পিতা-মাতাকে ভালবেসেই এসব পাইয়ে দেবার জন্য তার কল্পনা শক্তি তৈরি হবে। চিন্তায় ইতিবাচকতা আসবে। পরিণত বয়সে কিছুই দিতে না পারলেও অন্তত খালি হাতে ফিরাবে না। শিশুকে ভুলে কখনও, কোনদিন ওকে ওটা দিবে না, মামার বাড়িতে যা পাও নিয়ে আস, নানা-নানী, চাচা-চাচীর কাছে ওটা চাও! এই দীক্ষা দেওয়া যাবে না। তাহলে সে নিতে শিখেই আনন্দ পাবে। দেবার হাত প্রশস্ত হবেনা, তাই দিতেও জানবে না!
 
সর্বোপরি, সন্তানের কাছে নিজেদের চাহিদার কথা নিজেরা না বলে; পরিকল্পিত নিয়ম অনুসরণ করলে ভাল ফল পাওয়া যায়। মায়ের অবর্তমানে পিতাকে বলতে হবে, তোমার আম্মা খুব ভাল, তোমাদের জন্য অনেক কষ্ট করে, তোমাকে খুব ভালবাসে। মায়ের জন্য এটা-ওটা করবে, ইজ্জত করবে, কাজে সহযোগিতা করবে এবং তাকে খুশী করে চলবে। একই ভাবে পিতার কথা মা বলবে। এভাবে একে অপরের সম্মান বাড়াতে চেষ্টা করতে হবে। কোন অবস্থাতেই কেউ কারো জন্য অমর্যাদাকর কথা না বলাই উত্তম। সন্তান এসব ক্ষেত্রে কোন প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে চুপ থাকে। রক্তের বন্ধনের কারণে, সন্তান উভয়কে ভালবাসে কিন্তু এই জাতীয় কথাকে তারা কু-পরামর্শ বলে ভাবতে থাকে। এ ব্যাপারে সারা জীবনই খারাপ ধারণায় বড় হবে। বাস্তব জীবনে কোন গড়মিল হলে তখন এই কথাটি দেখিয়েই পিতা-মাতাকে আহত করবে।
 
তাই প্রতিনিয়ত সন্তানের চরিত্রকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন, শোকরিয়া প্রদান, দান করার অভ্যাস, হাসি দেওয়া, সালাম প্রদানের অভ্যাস দ্বারা আবৃত করতে হবে। এই অভ্যাসে অভ্যস্ত সন্তান পরিণত বয়সে কষ্টে থাকলেও পিতা-মাতাকে সাথে নিয়েই কষ্টের মোকাবেলা করে। কখনও একা শান্তিতে থাকার কথা চিন্তা করে না।