ফড়িং এর লেজ ছিঁড়ে, তাতে সুতা বেঁধে আহত ফড়িংকে উড়ানো, কিছু গ্রামীণ শিশুদের একটি অন্যতম খেলা। অনেক সময় বড়রাও শিশুদের এ খেলায় সহযোগীতা করে। শিশুদের এই ধরনের উপভোগের চরিত্র, বাস্তব জীবনে তাকে কঠোর হৃদয়ের অধিকারী করতে পারে। শহুরে পিতা-মাতা ভাবতে পারে, যাকগে আমরা বেঁচে গেছি! শহরে যেহেতু ফড়িং নেই তাই তাদের সন্তানও কঠোরতা শিখতে পারবে না! অথচ শহুরের জীবনের সন্তানেরাও আমাদের অজান্তে কঠোরতার দীক্ষা নিচ্ছে প্রতিদিন। একটু সচেতনতার অভাবে সেটা আমরা বুঝতে পারিনা।
শহুরে জীবনের কম-বেশী প্রায় সবার ঘরেই ভিডিও গেইম এর ব্যবস্থা আছে। এসব খেলায় দুটো চরিত্র থাকে। একটি ডাকাত-সন্ত্রাসীদের চরিত্র অন্যটি পুলিশের। বেশীর ভাগ ভিডিও গেইমে পুলিশকে অপেক্ষাকৃত বোকা সাজানো হয়। পুলিশকে দিয়ে বিশ্রী গালিও দেওয়ানো হয়। আর বিপরীতে সন্ত্রাসী-ডাকাতকে হিরো বানানো হয়। তার হাতে থাকে প্রচুর ক্ষমতা। ধ্বংস আর বীরত্ব যেন তারই। ছোট্ট মনের শিশুরা এসব খেলায় নিজেকে সন্ত্রাসী বানিয়ে খেলতে আনন্দ বোধ করে। সেই খেলায়, অবিরত গুলি, বোমা, আগুন দিয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করছে। শিশুদের এই চরিত্রটিও গ্রামীণ শিশুদের ফড়িং চরিত্রের চেয়ে কম নয় বরং বেশী। শিশুদের সুকুমার বৃত্তি যখন দয়া, মায়া দিয়ে গড়ে উঠার কথা তখন তারা পিতার পকেটের টাকা খরচ করে কঠোরতা ও নিষ্ঠুরতার প্রশিক্ষণ নেয়। একটি শিশুকে অসমাজিক ও অবাস্তব ধারণায় বড় করার জন্য এই ধরনের খেলাগুলো কয়েক বছর খেললেই যথেষ্ট।
হৃদয়ের কঠোরতা এক সাথে পুর্নাঙ্গ রূপ পায়না। শিশু বয়সে ধীরে ধীরে অনুশীলনের মাধ্যমে পরিণত বয়সে এটা শক্ত আকার ধারণ করে। মানবীয় চরিত্রের মধ্যে কঠোরতা হল সবচেয়ে ক্ষতিকর বদগুন। আল্লাহ যখন কোন মানুষকে শাস্তিতে নিপতিত করতে চান, তখন তার অন্তর থেকে রহম ও দয়ার মনোভাব তুলে নেন এবং তদস্থলে চিত্তের পাষণ্ডতা ও কঠোরতা দিয়ে ভড়ে দেন। যেখানে কারো উপর আল্লাহ অসন্তুষ্ট হলে তার হৃদয়কে পাষণ্ড করে দেন, সেখানে পিতা-মাতাই অর্থ কড়ি খরচ করে সন্তানকে পাষাণ চিত্তের অধিকারী করতে কাজে লাগিয়ে দেয়! যদিও বেশীর ভাগ পিতা-মাতা এটাকে কল্যাণজনক মনে করেই, গাছাড়া ভাব দেখান।
কঠোর হৃদয়ের সন্তান পিতা-মাতার কোন উপকারে আসেনা। বরং এই সন্তান তাদের মানসিক সমস্যার অন্যতম কারণ হয়ে উঠতে পারে। হালকা কিংবা ভারী সকল প্রকার মাদকই মানুষকে কঠোর খাসিয়তের অধিকারী করে। মাদকাসক্ত মানুষ গুলো যেমন পাষাণ হৃদয়ের অধিকারী। তাদের সাথে বন্ধুত্ব করে এমন ব্যক্তিরাও তলে তলে পাষাণ পনাকে পছন্দ করে। এদের বন্ধুত্বের কারণে, ভদ্র মানুষের সুবোদ সন্তানটিও একদিন এমন এক পাষণ্ডপনা দেখিয়ে দেবে, যা মানুষের বিবেক-বুদ্ধিতেও কল্পনা করতে পারে না। বর্তমান সমাজে কঠোরতা, পাষণ্ডপনা দিনে দিনে বাড়ছে এবং প্রতিদিনই নিত্য নতুন চরিত্রের খবরের কাজগের শিরোনাম হচ্ছে। একবাক্যে, সমাজে এসব বিকাশের জন্য মানুষের মনুষ্যত্ব বোধের উপর কঠোরতা ভর করেছে। কেননা আমরা সজ্ঞানে অজ্ঞানে শিশুদের সুকুমার বৃত্তিকে শিশুকালেই বিষিয়ে তুলছি।
রাসুল (সা) বলেছেন, “শুধুমাত্র হতভাগাদের নিকট থেকেই রহমত উঠিয়ে নেওয়া হয়”
সে একই হাদিসে বলা হয়েছে, “যে দয়া করে না, তাকেও দয়া করা হবেনা। তোমরা পৃথিবী বাসীদের উপর দয়া কর, আকাশের অধিপতি তোমাদের উপরও দয়া করবেন”। মানব হৃদয়ে দুটোর মধ্যে শুধুমাত্র একটি উপাদানের স্থান হয়। হয়ত দয়া, নয়ত কঠোরতা। দুটোর স্থান একত্রে এক জায়গায় হয়না। আমরা খবরের কাগজে প্রতিনিয়তই দেখতে পাই, যে ব্যক্তি অন্যকে নিষ্ঠুর কায়দায় উৎখাত করে, সেও ততোধিক নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে দুনিয়া ত্যাগ করে। পৃথিবীর ইতিহাস এ ধরনের খবরে ঠাসা। ব্যক্তিগত শত্রুতা না থাকা স্বত্ত্বেও নিষ্ঠুর মানুষের মৃত্যু সাধারনের মনে শান্তি আনে, তারা সামান্য সময়ের জন্য হলেও উল্লাস প্রকাশ করে, প্রশান্তি পায়। ফেসবুকে হাসাহাসি করে, কেউ পকেটের টাকায় মিষ্টি বিতরণ করে।
আল্লাহ নিজেও দয়ালু এবং চিরঞ্জীব। মানুষ আপাদ মস্তক, আজীবন অকৃতজ্ঞ হওয়া স্বত্ত্বেও তিনি মানুষের উপর গোস্বা করে শোধ নেন না। তিনি ক্ষমাশীল বলে মানুষকে ক্ষমা করে ফিরিয়ে আনতে চায়। সেই আল্লাহও চায় না যে, তার বান্দারা কঠোর চিত্তের অধিকারী হউক। তিনি চান, তারাও যাতে রহম দিলের অধিকারী হয়। ফলে তিনি তাঁর সকল পরম বন্ধুদের চরিত্রকে নম্রতা ও দয়া দিয়ে আচ্ছাদিত করেছেন। তাই সকল পিতা-মাতার উচিত, তাদের সন্তানের হৃদয়কে দয়া দিয়ে যদি ভড়িয়ে তুলতে না পারে, তাহলে অন্তত কঠোরতা অনুশীলনের পথ থেকে যেন দূরে রাখে। তাহলে সেই খালি স্থানে দয়া, মানবিকতার গুন ভর করবে। হাদিস শরীফে আছে, জান্নাতবাসী সকল মানুষেরা তিন শ্রেণীতে বিভক্ত হবে। তারা যথাক্রমে,
- ১. সদকা দানকারী ন্যায় পরায়ণ শাসক।
- ২. প্রত্যেক নিকটাত্মীয় ও মুসলমানদের উপর দয়ালু ও দয়াদ্রচিত্তের অধিকারী।
- ৩. পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করেও, পুতঃপবিত্র থাকার জন্য যারা কারো কাছে নিজের হাত প্রসারিত করে না।
ভাল করে লক্ষ্য করে দেখুন। উপরের এই গুনগুলো জান্নাতে বসবাস কারী মানুষদের সার্বিক পরিচয় বহন করে। এই তিন প্রকারের মানুষের বাহিরে যাদের অবস্থান তারা কমবেশী সবাই হৃদয়ের কঠোরতায় আচ্ছন্ন। তাই উন্নত চরিত্রের মানবিক গুনাবলী সম্পন্ন মানুষ হবার জন্য দরকার হৃদয়ের কঠোরতা পরিহার করার চেষ্টা করা সাথে সাথে নম্রতা, দয়া পরবশের চরিত্র অর্জনের জন্য সদা চেষ্টা করা।