মানুষের অবজ্ঞা আর নেতাদের কথা শুনে, করোনা নামক ক্ষুদ্র অণুজীবকে তেমন একটা পাত্তা দেয়নি দুলাল। গতকালও সারা শহরে সামাজিক কর্মকাণ্ড সেরেছে। বন্ধু-বান্ধবদের সাথে মস্তি করে মিছিল-মিটিং করে বেরিয়েছে সারা দিন। রাত্রে মা জোবায়দা খাতুন বহুবার অনুনয় করে বলেছে, বাবা! করোনা ভাইরাস কে ভয় কর, পৃথিবীর কোথাও এই জীব কাউকে করুণা করে না।
মায়ের ফালতু চিন্তাকে হাসি দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছে দুলাল। সাত সকালে কোট প্যান্ট পরে, সেন্ট মেরে ঘর থেকে বের হবার সময় নিজেকে এক মহান নেতা মনে হচ্ছিল। আজ নির্বাচনী প্রচারণার শেষ দিন। যথারীতি মায়ের করুণ আবদারকে উপেক্ষা করে রাস্তায় নেমে পড়ে দুলাল। লিডারের জয়ের সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ নিশ্চিত। তারপরও জয়ের পিছনে যার ভূমিকা বেশী সক্রিয়, সেই লিডারের পছন্দের তালিকায় সে আগে থাকবে। ব্যবসা, বাণিজ্য, সুযোগ, সুবিধার প্রথম সুযোগ গুলো তারাই হাতিয়ে নিবে। জীবনকে গড়ে তুলার জন্য এটা একটা বিরাট সুযোগ। শরীরে বল আছে, হৃদয়ে প্রাণশক্তি প্রবল। তাছাড়া পত্র-পত্রিকায় তো বলা হয়েছে, করোনায় শুধু বৃদ্ধরাই মরে।
নির্বাচনের আগের দিন সন্ধ্যায় প্রচণ্ড মাথা ব্যথা নিয়ে ঘরে ফিরে দুলাল। এক পাতা প্যারাসিটামল ইতিমধ্যে খেয়ে ফেলেছে। কোন একশন নেই! ডাক্তার কে গালি দিতে ইচ্ছে করে, সে বলেছিল দুটো ট্যাবলেট খেয়ে ঘুমিয়ে যান, সকালে ফরফরে তাজা হয়ে উঠতে পারবেন। পুরো রাতে এক পাতা! এক পাতায় কয়টা জানি? হ্যাঁ পুরো দশটা! সবগুলো ট্যাবলেট খাওয়ার পরও কোন সুবিধা হলনা।
এই মহল্লায় দুলালের প্রবল দাপট। এলাকার ছোট ভাই মাসুম মাস্টার্স পাস করার পর একটি ঔষধের দোকান দেবার আবদার জানিয়েছিল। দুলাল হাজার পঞ্চাশেক টাকা ধমক দিয়ে হাওলাত নিয়েছিল। কিসের হাওলাত! ইহ জনমে টাকা ফেরত চাইবার সাহসই হবেনা। অবশ্য এটা এখন ওপেন সিক্রেট, সবাই জানে, কাউকে দাঁড়াতে হলে, মহল্লার বড়ে মিয়াকে কিছু দিতে হয়। কিন্তু দুলালের সন্দেহে গিয়ে পড়ে ফার্মেসির মাসুমের উপর। তাকে নকল প্যারাসিটামল ট্যাবলেট ধরিয়ে দিয়েছে না তো! নাকি সেই দুই নম্বর নতুন ঔষধ কোম্পানির এম,আর, যাকে মাসিক দশ হাজার টাকার সম্মানী বাবদ এই এলাকায় ঔষধ বিক্রি করার সুযোগ করে দিয়েছে। দুলাল ভাবতে থাকে, রাতটা পার হউক, সকালেই এর একটা বিহিত ব্যবস্থা করতে হবে। শালা নকল ঔষধের ধান্ধা করে।
রাত পার হবার আগেই ভীতিকর হুইসিলে ঘুম ভেঙ্গে যায় দুলালের। দেশে জরুরী অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। পুলিশ আর্মি রাস্তায়, রাস্তা-ঘাট, পাড়া-মহল্লা সব কিছুর দায়িত্ব তারা নিয়ে ফেলেছে। কাউকে ঘর থেকে বের হতে নিষেধ করা হয়েছে। একাধারে মাইকিং চলছে করোনা সন্দেহ হলেই আর্মি-পুলিশকে যেন খবর দেয়। কেউ যেন রোগীর খবর লুকিয়ে না রাখে। এমন করা হলে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে।
দুই দিনের মধ্যেই এলাকার শিশু-কিশোরদের কাছে এই সংবাদ এক নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। তাদেরকেই বেশী বছর বাঁচতে হবে। বেঁচে থাকার অধিকার তাদের আগে। বুড়োরা তো এমনিতেই মরবে, তাই এই রোগ নিয়ে কোন অনুকম্পা নয়। অসুস্থদের তো আর মেরে ফেলা হবেনা, বড় জোড় মেডিক্যালে আটকিয়ে রাখবে। এটা তাদের মঙ্গলের জন্যই করা হয়। দৃশ্যত, মানব জাতির একে অপরকে শত্রু বানানোর জন্য করোনার কার্যক্রম শয়তানের চেয়েও প্রবল।
বড় রিস্কি ব্যাপার। করোনা রোগ, এক মহা ভয়ঙ্কর অনুভূতির নাম। যতক্ষণ রোগমুক্ত ততক্ষণ সবাই শুভাকাঙ্ক্ষী। যেই মাত্র রোগের দেখা মিলে, সেই মুহূর্তেই ব্যক্তিটি জাহান্নামের কিট তুল্য হয়ে যায়। মুহূর্তেই আত্মীয়তার সম্পর্ক বিলীন হয়ে যায়। ভাই পৃথক হয় বোন থেকে, স্বামী পৃথক হয় স্ত্রী থেকে। ইউটিউব আর ফেসবুক ঘেঁটে ঘেঁটে দুলাল বুঝতে পেরেছে, রোগের এই লক্ষণটা করোনার কথাই মনে করিয়ে দেয়। তাই সে নিজেকে স্বেচ্ছা কোয়ারেন্টাইনে আটকিয়ে রেখেছে। এদিকে দুলালের জ্বর পড়েনা। কাশিটা বেড়েই চলছে। এমন কাশি মনে হয় নাড়ি-ভূড়ি সবই বের হয়ে আসবে কিন্তু এক রত্তি কফও বের হয়না। কফ বের হলে ভাল লাগত, গলায় ভেজা ভাব অনুভূত হতো। এখন মনে হয় পুরো গলাটা পোড়া লাকড়ির মত হয়ে আছে। মায়ের মন বুঝ মানে না। বাজারের কথা বলে বাইরে গিয়ে, দূরের এক বোনপোকে ধরে ফার্মেসি থেকে ঔষধ কিনে আনে। তবুও কোন উপশম নাই।
দুলাল চিন্তা করে নেতাকেই ফোন দিয়ে খবরটা জানানো দরকার। তিনি এখনও নির্বাচনে জেতার আনন্দে বিভোর। এই মুহূর্তে তিনিই তার সর্বোচ্চ হিতাকাঙ্ক্ষী। কি না করেছে তার জন্য। দুলালের সমস্যার কথা শুনলে তিনি তড়িৎ ব্যবস্থা নিতে পারবেন। দলীয় প্রভাব, নেতার আশীর্বাদে হয়ত মেডিক্যালে স্পেশাল সুযোগ পেতেও পারে। বার বার ফোন দিয়েও নেতাকে পায়নি।
দুলালের বুকের ব্যথাটা বেড়েই চলছে। মনে হচ্ছে, ভিজা গামছা থেকে পানি মোচড়ানের মত করে তার বুকের পাঁজরের খাঁচা ভেঙ্গে একাকার হয়ে যাবে। গতকাল যা ছিল, আজ নিঃশ্বাস নিতে অনেক কষ্ট হচ্ছে। মা ফ্যান ছেড়ে দেয় যাতে করে কলিজার দুলালের নাকে বেশী করে বাতাস ঢুকতে পারে। কিন্তু ছেলে সুবিধা করতে পারছে না। একটি নিঃশ্বাস নিতে গিয়ে যেভাবে বুকের আয়তনকে বড় করে সেভাবে বাতাস ফুসফুসে ঢুকে না। মা ভাবতে থাকে কি করা যায়। অবশেষে তিনিই নেতাকে ফোন করেন। দুটো কথার পরেই নেতা ফোন কেটে দেন। শুধু তার কয়েকটি আতঙ্কিত কথাই মনে রাখতে পেরেছে। তিনি চিৎকার করে বলছিল হায়! হায়! এই দুলালেই আমারে শেষ করছে। আমার পুরো গোষ্ঠীকে নির্বংশ করে দিবে! হতভম্ব দুলালের মায়ের কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যায়। তিনি ভাবেন, ইনিই ছিলেন তাদের একমাত্র অবলম্বন শেষ আশ্রয় কিন্তু নেতার পক্ষ থেকে এটা সাহায্য পাবার মত কোন উত্তর ছিল না। বরং তার পরিণতিও সম্ভবত আমার দুলালের মতই।
বাইরে কারফিউ শিথিল ছিল। ছোট বোন শামীমা তার দুটো বাচ্চাকে একপ্রকার বাজারের থলের মত করে ধরে নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকে! সে অঝোরে কান্না করে বলছে দুলাল কই? আমার স্বামীকে বাঁচাও। তারা এখানে আসার পথে, তার স্বামীকে রাস্তা থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে। রিক্সায় চলার পথে অধিক কাশিই করোনা সন্দেহের অন্যতম কারণ।
ওদিকে দুলাল হতভম্বের মত দাড়িয়ে ফ্যানের দিকে নাক উঁচু করে একটি পরিপূর্ণ নিঃশ্বাস নেবার বারংবার চেষ্টায় মগ্ন আর অসহায় মা হাতের পাখা দিয়ে বাতাসের গতিকে আরেকটু বাড়িয়ে দিতে নিষ্ফল চেষ্টা করছে। শামীমা ভাইয়ের এই করুন দৃষ্ট দেখে চিল্লায়ে উঠে। সর্বনাশ এটা তো করোনার লক্ষণ! কি ভুলটাই না আমি করলাম রে। আমার সন্তানেরা তো শেষ হয়ে গেল! কে বাঁচাবে তাদের। দিশেহারা উত্তেজিত শামীমা কি বলছে মাথায় আসছে না, সে প্রলাপ বকছেই, মা তুমি একটা খুনি! কেন তুমি আগে জানাও নি!
পুলিশ খবর পেয়ে ঘরে আসে এবং জলদি দুলালকে ঘরের বাইরে নিয়ে যায়। দুলাল যথাসম্ভব তার রাজনৈতিক পরিচিতি, সামাজিক সম্মান ও মর্যাদার কথা বুঝানোর চেষ্টা করছিল। যত টাকা লাগে, সবই দেওয়া হবে। যাতে করে তাকে একটু ভাল সুবিধা দেওয়া হয়। ইতিমধ্যে এ ধরণের পরিস্থিতি ট্যাকল দিতে দিতে পুলিশের অভিজ্ঞতা ভারী হয়েছিল। তারা সান্ত্বনার সাথে দুলালকে বলল, তাদের পক্ষে যতটুকু সম্ভব সর্বোচ্চটাই করা হবে।
তাকে ধরাধরি করে একটি ঠেলা গাড়িতে তোলা হল। দুলাল এই মুহূর্তে চরম অসহায়। তার মায়ের জ্বর শুরু হয়েছে। নেতাজি তো ভুলেছেই, বন্ধুরাও ভুলে গেল! এমন কি নিজের মায়ের একই পেটের সন্তান বোনটি তার বাচ্চা বাঁচানোর জন্য নিজের অসহায় ভাইকে পুলিশের হাতে তুলে দিল। কোরবানির গরুর চামড়া ঠেলা গাড়ীতে তোলার সময় মানুষ যেভাবে আচরণ করে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আধা মৃত এসব সদস্যারাও তাকে যেভাবে ঠেলা গাড়ীতে তোলে নেয়! দুলালের কাছে এটা চরম অবজ্ঞা ও অপমানের মনে হল। এই প্রথম সে মনে করল, ঈশ ঘরেই যদি মরে যেতাম কতই না ভাল হত।
দুলালের ঠেলা গাড়ি শহরের মেইন রাস্তা পাড়ি দিচ্ছে। ঠেলা গাড়িতে শুয়ে সে করুন চোখে তাকিয়ে দেখছিল আশে পাশের ভবন গুলোর দিকে। কয়েকদিন আগেও এই রাস্তা দিয়ে হেটে যাবার সময় রাস্তার মানুষ ইজ্জতের সাথে সালাম দিত, ব্যাল-কনি থেকে তরুণ-তরুণীরা সম্ভাষণ জানাত।
দমে দমে শ্বাস কষ্ট বেড়ে যাচ্ছিল। তারপরও শেষ বারের মত আকুতি করছে তাকে যেন মেডিক্যালের একটা ভাল সিট পাইয়ে দেয়। দুলাল আতঙ্কিত চোখে তাকিয়ে দেখে, তার মত অনেক মানুষকে এভাবে টেনে নেওয়া হচ্ছে। কাউকে হাঁটিয়ে, কাউকে রিক্সায়, অনেকেই তার মত ঠেলায় চলছে। সে চিৎকার করে বলে উঠে কোথায় নেওয়া হচ্ছে আমাদের। নীরব-নির্ভীক চিত্তের সাহায্যকারীরা ভাবলেশহীন চিত্তে বলে চলল, মেডিক্যালে! তাদের ওয়াকি টকি একাধারে বেজে চলছে। তাদের প্রতি নির্দেশ আসছিল, প্রচুর রোগী জট লেগেছে সারা শহরে। মেডিক্যালে যায়গা নাই। সিরিয়াস বৃদ্ধ রোগীদের আলাদা করে অগ্রাধিকার দেবার কথা বলা হচ্ছিল। দুলাল অসহায় দৃষ্টিতে ভাবে, ঈশ যদি আমি বৃদ্ধ হতাম, তাহলে আগে সুযোগ পেতাম।
উঠে বসার শক্তি হারিয়েছে অনেক আগেই। শুয়ে শুয়ে ডানে তাকায় দুলাল। এক বৃদ্ধ রিক্সায় অর্ধমৃত অবস্থায় বসা। হিংসে হল এই ভেবে যে, সে এই মুহূর্তে তার আগে অগ্রাধিকার পাবে। আরে এ তো তার মহল্লার সেই মুরুব্বী। যাকে দুলাল দু’চোখে দেখতে পারত না! কে একজন তাকে নেবুলাইজার দিচ্ছে। হ্যাঁ এটা তো বুড়োর সেই ছেলে, যে কিনা দুলালের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল। করুন অবস্থার মধ্যেও বরাবরের মত দুলাল ধমক দেয়, আমাকে নেবুলাইজারটা দিয়ে দাও। ছেলেটি নিরস বদনে বলে, এটা আমার বাবার জন্য। আমি দুঃখিত একটাই যোগাড় করেছি। দুলালকে অসহায়ত্ব ঘিরে ধরে।
দুলাল ভাবে এটা কেমন চিকিৎসা! ঘর থেকে বের করে এনে রাস্তায় জমা করানো। অসহায় ভাবে চারিদিকে তাকায় সাহায্যকারীদের মধ্য পরিচিত কাউকে পাওয়া যায় কিনা। এই এলাকার সকল পুলিশের সাথে তার পরিচয় ছিল কিন্তু এ মুহূর্তে পরিচিত কেউ নেই। হঠাৎ নজরে পরে ঠেলায় রাখা আরেক ব্যক্তির দিকে। একি! ইনাকে দেখে তো প্রাক্তন কমিশনারের মত লাগে। হ্যাঁ কমিশনারই। দুলাল সর্বশক্তি দিয়ে চিল্লাতে চেষ্টা করে। কমিশনারের যখন এই দশা তাহলে তার কি হবে? ঘর থেকে দলে দলে রোগী বের করে আনা হচ্ছে। এ যেন এক মৃত্যুর মিছিল। গায়ে পড়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে! আর রাস্তায় তাদের জট লাগছে। আতঙ্কিত দুলাল বহু কিছু ভাবে। দুটি গোপন ব্যাংক একাউন্টে কয়েক কোটি রাখা আছে। বেশীর ভাগই চাঁদাবাজির টাকা! কেউ জানবে না এই টাকার কথাটা। কারো কোন কাজে আসবে না। ভাবে মায়ের কথা, যদি তার কথা শোনা হত, তাহলে হয়ত এই পরিণতি হতো না। শেষাবধী মাকেও করোনার রোগী বানিয়ে ছাড়ল। ছোট ভাই কিছু না বলে, শুরুতেই ঘর থেকে তার পরিবার নিয়ে পালিয়ে গাঁ বাচায়।
সারা জীবন ধমক দিয়ে চলা দুলাল কারো কাছে করুণা চায় নি। আজ সে হতাশায় তাকায় চারিদিকে। এখন তার ভাবনার সময়ও নেই। শারীরিক কষ্ট ক্ষণে ক্ষণে বেড়ে যাচ্ছে। চিন্তা করে কেউ যদি একটি পরিপূর্ণ নিঃশ্বাস তাকে এনে দিত, তাহলে ব্যাংকে জমানো সমুদয় টাকাটাই তাকে দিয়ে দিত। দুলাল চিল্লাতে থাকে, আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, আমাকে রক্ষা করো। হাজারো অসহায় রোগীর অপেক্ষার ভিড়ে তার চিল্লানী নিজের কাছে ফিরে আসে। ভাবতে থাকে কত মানুষকে কষ্ট দিয়েছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। তাদের কাছে মাফ চাওয়া যেত তাহলে কতই না ভাল লাগত। মনে পড়ল জন্মদাত্রী মায়ের কাছ থেকেও মাফ চাওয়ার সুযোগ পায়নি। মাগো বলে, চিল্লায়ে উঠে দুলাল।
মসজিদের মুয়াজ্জিন সাহেব তার বৃদ্ধা মাকে নিয়ে দৌড়ে যাচ্ছেন আর জোড়ে জোড়ে পড়ছেন, আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু…। মুয়াজ্জিনকে কেউ বাধা দিয়ে বলল কোথায় নিবেন? তিনি তো মারা গেছেন। এই লাশ এখন আমাদের দিয়ে দেন, আর আপনাকেও কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে। দুলালের মনে পড়ে ইমাম সাহেব একদা মসজিদে বলেছিলেন মরার আগে এই দোয়া পড়তে পারলে সে নাজাত পায়। মনে পড়ে গায়ে পচা-ফোসকা পড়া ভিখারি রাস্তার পাশে শুয়ে শুয়ে এই দোয়া পড়ে ভিক্ষা মাগত। এই দৃশ্যে দুলালের হাসি আসত। সেই দুলাল এখন রাস্তার পাশে শুয়ে, সামান্য দূরেই তার দামী ভবন। একটি শ্বাসের অভাবে তার জান বের হবার দশা। তখনই তার চোখ দুটো বিস্ফোরিত হয়ে আটকে যায় এমন এক ব্যক্তির দিকে! যাকে কাপড়ে লটকিয়ে পেঁচিয়ে টেনে রাখা হল তার পাশেই ঠেলা গাড়ির পাশের অংশে! ভাবতে থাকে, করোনা এমন এক গজব যার ছোবলে ধনী-দরিদ্র, ক্ষমতাধর আর কাঙ্গাল, সবাই একই কাতারে নেমে আসে।
দুলালের শ্বাস কষ্ট আরো বাড়ে। পানির পিপাসায় কলিজা ফেটে যাবার দশা, মাথা ব্যথা ভয়ানক আকারে উঠেছে। চোখ দুটো ঘোলা হয়ে আসছে। কাছের জিনিষও আর নজরে আসছে না। তার মায়ের কথা চিন্তা করে, নাহ! চেহারা মনে পড়ছে না। শব্দ শোনার ক্ষমতা ক্ষীণ হয়ে পড়ছে। মনে পড়ছে এটাই জীবনের শেষ সময়। রাস্তার পাশে অসহায় অবস্থায় করুন ভাবে মরতে যাচ্ছে। একটু পানির জন্য কাউকে ডাকে। কোন সাড়া নেই। একটু বাতাসের জন্য মুখ হা করে কিন্তু দুলালের জন্য বাতাস সীমিত। ঈমাম সাহেব কি একটা দোয়ার কথা বলেছিল? না! মোটেও মনে পড়ছে না। পাশের ভিখারি মৃত্যু যন্ত্রণায় কোঁকড়াচ্ছে আর সেই দোয়াটি পড়ে চলছে, দুলাল শুনতে চেষ্টা করে কিন্তু ততক্ষণে কানের শক্তি হারিয়ে গেছে। এখন সে আর পাশের ব্যক্তির কথাও শুনতে পাচ্ছে না। বুক ফুলানো একটি নিঃশ্বাস কত বড় নেয়ামত, কখনও ভেবে দেখেনি। এখন মনে হচ্ছে একটি ছোট্ট নিঃশ্বাসের সময় বহু বছরের মত লম্বা। দুলালের নিঃশ্বাসের গতি কমে আসে আর মনে হয় সময় যেন বেড়ে যেতে থাকে।
(একটি কাল্পনিক গল্প)
মায়ের ফালতু চিন্তাকে হাসি দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছে দুলাল। সাত সকালে কোট প্যান্ট পরে, সেন্ট মেরে ঘর থেকে বের হবার সময় নিজেকে এক মহান নেতা মনে হচ্ছিল। আজ নির্বাচনী প্রচারণার শেষ দিন। যথারীতি মায়ের করুণ আবদারকে উপেক্ষা করে রাস্তায় নেমে পড়ে দুলাল। লিডারের জয়ের সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ নিশ্চিত। তারপরও জয়ের পিছনে যার ভূমিকা বেশী সক্রিয়, সেই লিডারের পছন্দের তালিকায় সে আগে থাকবে। ব্যবসা, বাণিজ্য, সুযোগ, সুবিধার প্রথম সুযোগ গুলো তারাই হাতিয়ে নিবে। জীবনকে গড়ে তুলার জন্য এটা একটা বিরাট সুযোগ। শরীরে বল আছে, হৃদয়ে প্রাণশক্তি প্রবল। তাছাড়া পত্র-পত্রিকায় তো বলা হয়েছে, করোনায় শুধু বৃদ্ধরাই মরে।
নির্বাচনের আগের দিন সন্ধ্যায় প্রচণ্ড মাথা ব্যথা নিয়ে ঘরে ফিরে দুলাল। এক পাতা প্যারাসিটামল ইতিমধ্যে খেয়ে ফেলেছে। কোন একশন নেই! ডাক্তার কে গালি দিতে ইচ্ছে করে, সে বলেছিল দুটো ট্যাবলেট খেয়ে ঘুমিয়ে যান, সকালে ফরফরে তাজা হয়ে উঠতে পারবেন। পুরো রাতে এক পাতা! এক পাতায় কয়টা জানি? হ্যাঁ পুরো দশটা! সবগুলো ট্যাবলেট খাওয়ার পরও কোন সুবিধা হলনা।
এই মহল্লায় দুলালের প্রবল দাপট। এলাকার ছোট ভাই মাসুম মাস্টার্স পাস করার পর একটি ঔষধের দোকান দেবার আবদার জানিয়েছিল। দুলাল হাজার পঞ্চাশেক টাকা ধমক দিয়ে হাওলাত নিয়েছিল। কিসের হাওলাত! ইহ জনমে টাকা ফেরত চাইবার সাহসই হবেনা। অবশ্য এটা এখন ওপেন সিক্রেট, সবাই জানে, কাউকে দাঁড়াতে হলে, মহল্লার বড়ে মিয়াকে কিছু দিতে হয়। কিন্তু দুলালের সন্দেহে গিয়ে পড়ে ফার্মেসির মাসুমের উপর। তাকে নকল প্যারাসিটামল ট্যাবলেট ধরিয়ে দিয়েছে না তো! নাকি সেই দুই নম্বর নতুন ঔষধ কোম্পানির এম,আর, যাকে মাসিক দশ হাজার টাকার সম্মানী বাবদ এই এলাকায় ঔষধ বিক্রি করার সুযোগ করে দিয়েছে। দুলাল ভাবতে থাকে, রাতটা পার হউক, সকালেই এর একটা বিহিত ব্যবস্থা করতে হবে। শালা নকল ঔষধের ধান্ধা করে।
রাত পার হবার আগেই ভীতিকর হুইসিলে ঘুম ভেঙ্গে যায় দুলালের। দেশে জরুরী অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। পুলিশ আর্মি রাস্তায়, রাস্তা-ঘাট, পাড়া-মহল্লা সব কিছুর দায়িত্ব তারা নিয়ে ফেলেছে। কাউকে ঘর থেকে বের হতে নিষেধ করা হয়েছে। একাধারে মাইকিং চলছে করোনা সন্দেহ হলেই আর্মি-পুলিশকে যেন খবর দেয়। কেউ যেন রোগীর খবর লুকিয়ে না রাখে। এমন করা হলে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে।
দুই দিনের মধ্যেই এলাকার শিশু-কিশোরদের কাছে এই সংবাদ এক নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। তাদেরকেই বেশী বছর বাঁচতে হবে। বেঁচে থাকার অধিকার তাদের আগে। বুড়োরা তো এমনিতেই মরবে, তাই এই রোগ নিয়ে কোন অনুকম্পা নয়। অসুস্থদের তো আর মেরে ফেলা হবেনা, বড় জোড় মেডিক্যালে আটকিয়ে রাখবে। এটা তাদের মঙ্গলের জন্যই করা হয়। দৃশ্যত, মানব জাতির একে অপরকে শত্রু বানানোর জন্য করোনার কার্যক্রম শয়তানের চেয়েও প্রবল।
বড় রিস্কি ব্যাপার। করোনা রোগ, এক মহা ভয়ঙ্কর অনুভূতির নাম। যতক্ষণ রোগমুক্ত ততক্ষণ সবাই শুভাকাঙ্ক্ষী। যেই মাত্র রোগের দেখা মিলে, সেই মুহূর্তেই ব্যক্তিটি জাহান্নামের কিট তুল্য হয়ে যায়। মুহূর্তেই আত্মীয়তার সম্পর্ক বিলীন হয়ে যায়। ভাই পৃথক হয় বোন থেকে, স্বামী পৃথক হয় স্ত্রী থেকে। ইউটিউব আর ফেসবুক ঘেঁটে ঘেঁটে দুলাল বুঝতে পেরেছে, রোগের এই লক্ষণটা করোনার কথাই মনে করিয়ে দেয়। তাই সে নিজেকে স্বেচ্ছা কোয়ারেন্টাইনে আটকিয়ে রেখেছে। এদিকে দুলালের জ্বর পড়েনা। কাশিটা বেড়েই চলছে। এমন কাশি মনে হয় নাড়ি-ভূড়ি সবই বের হয়ে আসবে কিন্তু এক রত্তি কফও বের হয়না। কফ বের হলে ভাল লাগত, গলায় ভেজা ভাব অনুভূত হতো। এখন মনে হয় পুরো গলাটা পোড়া লাকড়ির মত হয়ে আছে। মায়ের মন বুঝ মানে না। বাজারের কথা বলে বাইরে গিয়ে, দূরের এক বোনপোকে ধরে ফার্মেসি থেকে ঔষধ কিনে আনে। তবুও কোন উপশম নাই।
দুলাল চিন্তা করে নেতাকেই ফোন দিয়ে খবরটা জানানো দরকার। তিনি এখনও নির্বাচনে জেতার আনন্দে বিভোর। এই মুহূর্তে তিনিই তার সর্বোচ্চ হিতাকাঙ্ক্ষী। কি না করেছে তার জন্য। দুলালের সমস্যার কথা শুনলে তিনি তড়িৎ ব্যবস্থা নিতে পারবেন। দলীয় প্রভাব, নেতার আশীর্বাদে হয়ত মেডিক্যালে স্পেশাল সুযোগ পেতেও পারে। বার বার ফোন দিয়েও নেতাকে পায়নি।
দুলালের বুকের ব্যথাটা বেড়েই চলছে। মনে হচ্ছে, ভিজা গামছা থেকে পানি মোচড়ানের মত করে তার বুকের পাঁজরের খাঁচা ভেঙ্গে একাকার হয়ে যাবে। গতকাল যা ছিল, আজ নিঃশ্বাস নিতে অনেক কষ্ট হচ্ছে। মা ফ্যান ছেড়ে দেয় যাতে করে কলিজার দুলালের নাকে বেশী করে বাতাস ঢুকতে পারে। কিন্তু ছেলে সুবিধা করতে পারছে না। একটি নিঃশ্বাস নিতে গিয়ে যেভাবে বুকের আয়তনকে বড় করে সেভাবে বাতাস ফুসফুসে ঢুকে না। মা ভাবতে থাকে কি করা যায়। অবশেষে তিনিই নেতাকে ফোন করেন। দুটো কথার পরেই নেতা ফোন কেটে দেন। শুধু তার কয়েকটি আতঙ্কিত কথাই মনে রাখতে পেরেছে। তিনি চিৎকার করে বলছিল হায়! হায়! এই দুলালেই আমারে শেষ করছে। আমার পুরো গোষ্ঠীকে নির্বংশ করে দিবে! হতভম্ব দুলালের মায়ের কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যায়। তিনি ভাবেন, ইনিই ছিলেন তাদের একমাত্র অবলম্বন শেষ আশ্রয় কিন্তু নেতার পক্ষ থেকে এটা সাহায্য পাবার মত কোন উত্তর ছিল না। বরং তার পরিণতিও সম্ভবত আমার দুলালের মতই।
বাইরে কারফিউ শিথিল ছিল। ছোট বোন শামীমা তার দুটো বাচ্চাকে একপ্রকার বাজারের থলের মত করে ধরে নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকে! সে অঝোরে কান্না করে বলছে দুলাল কই? আমার স্বামীকে বাঁচাও। তারা এখানে আসার পথে, তার স্বামীকে রাস্তা থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে। রিক্সায় চলার পথে অধিক কাশিই করোনা সন্দেহের অন্যতম কারণ।
ওদিকে দুলাল হতভম্বের মত দাড়িয়ে ফ্যানের দিকে নাক উঁচু করে একটি পরিপূর্ণ নিঃশ্বাস নেবার বারংবার চেষ্টায় মগ্ন আর অসহায় মা হাতের পাখা দিয়ে বাতাসের গতিকে আরেকটু বাড়িয়ে দিতে নিষ্ফল চেষ্টা করছে। শামীমা ভাইয়ের এই করুন দৃষ্ট দেখে চিল্লায়ে উঠে। সর্বনাশ এটা তো করোনার লক্ষণ! কি ভুলটাই না আমি করলাম রে। আমার সন্তানেরা তো শেষ হয়ে গেল! কে বাঁচাবে তাদের। দিশেহারা উত্তেজিত শামীমা কি বলছে মাথায় আসছে না, সে প্রলাপ বকছেই, মা তুমি একটা খুনি! কেন তুমি আগে জানাও নি!
পুলিশ খবর পেয়ে ঘরে আসে এবং জলদি দুলালকে ঘরের বাইরে নিয়ে যায়। দুলাল যথাসম্ভব তার রাজনৈতিক পরিচিতি, সামাজিক সম্মান ও মর্যাদার কথা বুঝানোর চেষ্টা করছিল। যত টাকা লাগে, সবই দেওয়া হবে। যাতে করে তাকে একটু ভাল সুবিধা দেওয়া হয়। ইতিমধ্যে এ ধরণের পরিস্থিতি ট্যাকল দিতে দিতে পুলিশের অভিজ্ঞতা ভারী হয়েছিল। তারা সান্ত্বনার সাথে দুলালকে বলল, তাদের পক্ষে যতটুকু সম্ভব সর্বোচ্চটাই করা হবে।
তাকে ধরাধরি করে একটি ঠেলা গাড়িতে তোলা হল। দুলাল এই মুহূর্তে চরম অসহায়। তার মায়ের জ্বর শুরু হয়েছে। নেতাজি তো ভুলেছেই, বন্ধুরাও ভুলে গেল! এমন কি নিজের মায়ের একই পেটের সন্তান বোনটি তার বাচ্চা বাঁচানোর জন্য নিজের অসহায় ভাইকে পুলিশের হাতে তুলে দিল। কোরবানির গরুর চামড়া ঠেলা গাড়ীতে তোলার সময় মানুষ যেভাবে আচরণ করে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আধা মৃত এসব সদস্যারাও তাকে যেভাবে ঠেলা গাড়ীতে তোলে নেয়! দুলালের কাছে এটা চরম অবজ্ঞা ও অপমানের মনে হল। এই প্রথম সে মনে করল, ঈশ ঘরেই যদি মরে যেতাম কতই না ভাল হত।
দুলালের ঠেলা গাড়ি শহরের মেইন রাস্তা পাড়ি দিচ্ছে। ঠেলা গাড়িতে শুয়ে সে করুন চোখে তাকিয়ে দেখছিল আশে পাশের ভবন গুলোর দিকে। কয়েকদিন আগেও এই রাস্তা দিয়ে হেটে যাবার সময় রাস্তার মানুষ ইজ্জতের সাথে সালাম দিত, ব্যাল-কনি থেকে তরুণ-তরুণীরা সম্ভাষণ জানাত।
দমে দমে শ্বাস কষ্ট বেড়ে যাচ্ছিল। তারপরও শেষ বারের মত আকুতি করছে তাকে যেন মেডিক্যালের একটা ভাল সিট পাইয়ে দেয়। দুলাল আতঙ্কিত চোখে তাকিয়ে দেখে, তার মত অনেক মানুষকে এভাবে টেনে নেওয়া হচ্ছে। কাউকে হাঁটিয়ে, কাউকে রিক্সায়, অনেকেই তার মত ঠেলায় চলছে। সে চিৎকার করে বলে উঠে কোথায় নেওয়া হচ্ছে আমাদের। নীরব-নির্ভীক চিত্তের সাহায্যকারীরা ভাবলেশহীন চিত্তে বলে চলল, মেডিক্যালে! তাদের ওয়াকি টকি একাধারে বেজে চলছে। তাদের প্রতি নির্দেশ আসছিল, প্রচুর রোগী জট লেগেছে সারা শহরে। মেডিক্যালে যায়গা নাই। সিরিয়াস বৃদ্ধ রোগীদের আলাদা করে অগ্রাধিকার দেবার কথা বলা হচ্ছিল। দুলাল অসহায় দৃষ্টিতে ভাবে, ঈশ যদি আমি বৃদ্ধ হতাম, তাহলে আগে সুযোগ পেতাম।
উঠে বসার শক্তি হারিয়েছে অনেক আগেই। শুয়ে শুয়ে ডানে তাকায় দুলাল। এক বৃদ্ধ রিক্সায় অর্ধমৃত অবস্থায় বসা। হিংসে হল এই ভেবে যে, সে এই মুহূর্তে তার আগে অগ্রাধিকার পাবে। আরে এ তো তার মহল্লার সেই মুরুব্বী। যাকে দুলাল দু’চোখে দেখতে পারত না! কে একজন তাকে নেবুলাইজার দিচ্ছে। হ্যাঁ এটা তো বুড়োর সেই ছেলে, যে কিনা দুলালের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল। করুন অবস্থার মধ্যেও বরাবরের মত দুলাল ধমক দেয়, আমাকে নেবুলাইজারটা দিয়ে দাও। ছেলেটি নিরস বদনে বলে, এটা আমার বাবার জন্য। আমি দুঃখিত একটাই যোগাড় করেছি। দুলালকে অসহায়ত্ব ঘিরে ধরে।
দুলাল ভাবে এটা কেমন চিকিৎসা! ঘর থেকে বের করে এনে রাস্তায় জমা করানো। অসহায় ভাবে চারিদিকে তাকায় সাহায্যকারীদের মধ্য পরিচিত কাউকে পাওয়া যায় কিনা। এই এলাকার সকল পুলিশের সাথে তার পরিচয় ছিল কিন্তু এ মুহূর্তে পরিচিত কেউ নেই। হঠাৎ নজরে পরে ঠেলায় রাখা আরেক ব্যক্তির দিকে। একি! ইনাকে দেখে তো প্রাক্তন কমিশনারের মত লাগে। হ্যাঁ কমিশনারই। দুলাল সর্বশক্তি দিয়ে চিল্লাতে চেষ্টা করে। কমিশনারের যখন এই দশা তাহলে তার কি হবে? ঘর থেকে দলে দলে রোগী বের করে আনা হচ্ছে। এ যেন এক মৃত্যুর মিছিল। গায়ে পড়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে! আর রাস্তায় তাদের জট লাগছে। আতঙ্কিত দুলাল বহু কিছু ভাবে। দুটি গোপন ব্যাংক একাউন্টে কয়েক কোটি রাখা আছে। বেশীর ভাগই চাঁদাবাজির টাকা! কেউ জানবে না এই টাকার কথাটা। কারো কোন কাজে আসবে না। ভাবে মায়ের কথা, যদি তার কথা শোনা হত, তাহলে হয়ত এই পরিণতি হতো না। শেষাবধী মাকেও করোনার রোগী বানিয়ে ছাড়ল। ছোট ভাই কিছু না বলে, শুরুতেই ঘর থেকে তার পরিবার নিয়ে পালিয়ে গাঁ বাচায়।
সারা জীবন ধমক দিয়ে চলা দুলাল কারো কাছে করুণা চায় নি। আজ সে হতাশায় তাকায় চারিদিকে। এখন তার ভাবনার সময়ও নেই। শারীরিক কষ্ট ক্ষণে ক্ষণে বেড়ে যাচ্ছে। চিন্তা করে কেউ যদি একটি পরিপূর্ণ নিঃশ্বাস তাকে এনে দিত, তাহলে ব্যাংকে জমানো সমুদয় টাকাটাই তাকে দিয়ে দিত। দুলাল চিল্লাতে থাকে, আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, আমাকে রক্ষা করো। হাজারো অসহায় রোগীর অপেক্ষার ভিড়ে তার চিল্লানী নিজের কাছে ফিরে আসে। ভাবতে থাকে কত মানুষকে কষ্ট দিয়েছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। তাদের কাছে মাফ চাওয়া যেত তাহলে কতই না ভাল লাগত। মনে পড়ল জন্মদাত্রী মায়ের কাছ থেকেও মাফ চাওয়ার সুযোগ পায়নি। মাগো বলে, চিল্লায়ে উঠে দুলাল।
মসজিদের মুয়াজ্জিন সাহেব তার বৃদ্ধা মাকে নিয়ে দৌড়ে যাচ্ছেন আর জোড়ে জোড়ে পড়ছেন, আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু…। মুয়াজ্জিনকে কেউ বাধা দিয়ে বলল কোথায় নিবেন? তিনি তো মারা গেছেন। এই লাশ এখন আমাদের দিয়ে দেন, আর আপনাকেও কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে। দুলালের মনে পড়ে ইমাম সাহেব একদা মসজিদে বলেছিলেন মরার আগে এই দোয়া পড়তে পারলে সে নাজাত পায়। মনে পড়ে গায়ে পচা-ফোসকা পড়া ভিখারি রাস্তার পাশে শুয়ে শুয়ে এই দোয়া পড়ে ভিক্ষা মাগত। এই দৃশ্যে দুলালের হাসি আসত। সেই দুলাল এখন রাস্তার পাশে শুয়ে, সামান্য দূরেই তার দামী ভবন। একটি শ্বাসের অভাবে তার জান বের হবার দশা। তখনই তার চোখ দুটো বিস্ফোরিত হয়ে আটকে যায় এমন এক ব্যক্তির দিকে! যাকে কাপড়ে লটকিয়ে পেঁচিয়ে টেনে রাখা হল তার পাশেই ঠেলা গাড়ির পাশের অংশে! ভাবতে থাকে, করোনা এমন এক গজব যার ছোবলে ধনী-দরিদ্র, ক্ষমতাধর আর কাঙ্গাল, সবাই একই কাতারে নেমে আসে।
দুলালের শ্বাস কষ্ট আরো বাড়ে। পানির পিপাসায় কলিজা ফেটে যাবার দশা, মাথা ব্যথা ভয়ানক আকারে উঠেছে। চোখ দুটো ঘোলা হয়ে আসছে। কাছের জিনিষও আর নজরে আসছে না। তার মায়ের কথা চিন্তা করে, নাহ! চেহারা মনে পড়ছে না। শব্দ শোনার ক্ষমতা ক্ষীণ হয়ে পড়ছে। মনে পড়ছে এটাই জীবনের শেষ সময়। রাস্তার পাশে অসহায় অবস্থায় করুন ভাবে মরতে যাচ্ছে। একটু পানির জন্য কাউকে ডাকে। কোন সাড়া নেই। একটু বাতাসের জন্য মুখ হা করে কিন্তু দুলালের জন্য বাতাস সীমিত। ঈমাম সাহেব কি একটা দোয়ার কথা বলেছিল? না! মোটেও মনে পড়ছে না। পাশের ভিখারি মৃত্যু যন্ত্রণায় কোঁকড়াচ্ছে আর সেই দোয়াটি পড়ে চলছে, দুলাল শুনতে চেষ্টা করে কিন্তু ততক্ষণে কানের শক্তি হারিয়ে গেছে। এখন সে আর পাশের ব্যক্তির কথাও শুনতে পাচ্ছে না। বুক ফুলানো একটি নিঃশ্বাস কত বড় নেয়ামত, কখনও ভেবে দেখেনি। এখন মনে হচ্ছে একটি ছোট্ট নিঃশ্বাসের সময় বহু বছরের মত লম্বা। দুলালের নিঃশ্বাসের গতি কমে আসে আর মনে হয় সময় যেন বেড়ে যেতে থাকে।
(একটি কাল্পনিক গল্প)