কোরবান আলী মিস্ত্রির এগার ছেলে, বারতম টি মেয়ে। শেষবারের প্রসবে স্ত্রীর জরায়ু সহ বের হয়ে আসে। তাই মেয়েটিকে সবাই থলে ঝরা মেয়ে হিসেবে চিনে। অর্থাৎ এই মেয়ের জন্মের সময় তার মায়ের ‘জন্ম থলে’ তথা জরায়ু বের হয়ে যায়। ফলে কোরবান আলী মানব উৎপাদনে থামে।
দৈনিক মজুরীতে খেটে খাওয়া মানুষ ছালামত উল্লাহ যখন ছয় সন্তানের পিতা হল, সবাই তাকে টিপ্পনী মেরে বলে, “কিরে মোমেনার বাপ! তুমিও কি শেষ-মেশ কোরবান আলি মিস্ত্রির রাস্তা ধরেছ?”
ছালামত উল্লাহ হাঁসে, এই হাসির কোন বিশেষত্ব নেই।
শুধু কোরবান আলী মিস্ত্রি কেন! হাছি মিয়া মাঝির দশ সন্তান। ভোলা মিয়া কারিগরের নয়। হাছি মিয়া নৌকার গুণন টানেন। গ্রামের মানুষের কাছে নৌকায় যিনি কাজ করে তিনিই মাঝি। ভোলা মিয়া বাঁশ-বেতের কাজ করে। উভয়ের বাড়ি নদীর পাশে। তাদের সামান্য আয়ে পরিবারের এতগুলো পেটে ভাত ঢুকানো কষ্টকর। তারপরও থেকে থাকেনা মানব সম্পদ উন্নয়নের ধারা।
সমাজে একজনের এতগুলো সন্তান হওয়া মোটেও আশ্চর্যজনক ঘটনা নয়। শিক্ষিত, সচ্ছল ঘরেও ছয়-সাত জন বাচ্চা না থাকলে বাবা-মা হতাশ হত। সন্তানাদি মারা যেত বেশী। রয়ে সয়ে যে ক’টা বেচে থাকে, সেটাই পূঁজি। এ নিয়ে পিতা-মাতার দুশ্চিন্তা লেগেই থাকত।
কোরবান আলী মিস্ত্রির সন্তানদের মধ্যে নিচের দিক থেকে পাঁচ জন সদা লেংটা থাকে। কাপড় যোগাবে কিভাবে! পেটে ভাতের যোগান দিতেই হিমসিম খেতে হয়। বাজারের পাশেই ঘর। সন্তানেরা রাস্তার ধারে পাশেই পায়খানা করে! এতে পথিকের চলাচলে কষ্ট হয়। পরিবেশ বরবাদ হয়। এই কারণে কোরবান আলী প্রসিদ্ধ। তার ঘরে একজন সন্তান বৃদ্ধি পাওয়া মানে, মানুষের চলার কষ্ট আরেকটু বেড়ে যাওয়া।
এই তিন পরিবারের সন্তানেরা বড় হয়েছে। কেউ শিক্ষিত নয় তবে সবাই কর্মঠ। মানুষের অবহেলা, অবজ্ঞার মাঝে বেড়ে উঠেছে। তাই অধ্যবসায়ী ও স্বাবলম্বী হয়েছে। এলাকার শিক্ষিত মানুষদের তারা দুষমন ভাবে। কেননা এরাই বেশী উপদেশ দেয়।
মধ্যপ্রাচ্যে কর্মঠ মানুষের কদর বেড়ে যায়। তাড়াতাড়ি ধনী হবার স্বপ্নে অনেকেই বিভোর। এখানে মানুষের জাত প্রথা নয়, বরং কর্মের মূল্য অনেক বেশী। তিন পরিবারের ছয় জন সদস্য যৌতুক হিসেবে ভিসা যোগাড় করে, বিদেশে পাড়ি জমায়।
এরাও আরো প্রতি পরিবারের তিনজনকে সহসা বিদেশে নিয়ে যায়। মরুভূমির গরম তাদের কাবু করতে পারেনা। কাঁচা অর্থের গন্ধ তাদের খুব ভাল লাগে। ফলে তিন পরিবারের চব্বিশ জনেরই ঠাঁই হয় প্রবাসে।
কোরবান আলী, হাছি মিয়া, ভোলা মিয়াদের বয়স হলেও মাসে মাসে রেমিটেন্সের টাকার অব্যাহত ধাক্কায় তাদের হিম্মত বাড়ে। এলাকার খাল, বিল, ডোবা, নালা যে যেটাই বিক্রি করুক। সেটাই তাদের দখলে চলে যায়। সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় এক টুকরা দাঁড়াবার জায়গা কিনার সুযোগ অতীত হয়েছে। এদের কারণে সব জিনিসের দামও বেড়েছে।
তাদের এক এক জনের ঘরে, পুত্রবধূ, মেহমান ও নাতি নাতনির সয়লাবের কারণে প্রতি ওয়াক্তে ঘরে ছোট খাট মেজবান বসে যায়। তাদের প্রয়োজনও বেশী। চারটে মুরগী একসাথে জবাই করলেও পরবর্তী বেলায় ডেকচি খালি হয়। আগে নিজেরা চাষাবাদ করলেও, সে সব ঘৃণিত কাজ ছেড়ে দিয়েছে বহু আগেই। এখন পায়ের উপর ঠ্যাঙ তুলে বসে খাবার সুখ রপ্ত করেছে।
প্রফেসর সাহেব অমায়িক মানুষ। টানাটানির সংসার। ভদ্র লোকদের দুঃখ মাপার যন্ত্র আবিষ্কার হয়নি বলে, তারা হাসি দিলেও মানুষ ভাবে অনেক সুখি মানুষ কিন্তু কৃপণ! মফস্বলের কলেজেই লেকচারার হিসেবে আছেন। গ্রামের মানুষের কাছে, কলেজে যারা পড়ায় তারা সবাই প্রফেসর। শব্দটি উচ্চারণে সহজ, বহুল ব্যবহৃত। তার শাশুড়ি এসেছেন বেড়াতে। মেয়ের শখ মফস্বলের তাজা মাছ খাওয়াবেন।
মেয়ে স্বামীকে জানালেন, বাজার করতে গিয়ে সর্বদা কিপটেমি করোনা। তুমি সোজা মানুষ, তাই সবাই তোমাকে ঠকায়। এ ধরনের বেকুবি আর করোনা। যেভাবে পার বাজার থেকে কিছু তাজা মাছ কিনে আনো। মায়ের বয়স হয়েছে, কখন দুনিয়া ছেড়ে চলে যায় ঠিক নাই।
প্রফেসার সাহেব হাসেন। ভাবেন, দুনিয়ার সকল স্ত্রীদের কাছে তার স্বামী বান্ধবীর স্বামীর চেয়ে বোকা। দোয়া করতে থাকেন, যাতে করে সকল সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কিছু তাজা মাছ সংগ্রহ করতে পারে।
কোরবান আলীদের কেউ বাজারে গেলে বাজার গরম হয়ে যায়। দালাল ফড়িয়ারা সামান্য জিনিষের দামও বাড়িয়ে দেয়। প্রফেসর সাহেব দেখলেন, পরিচিত মাছ ওয়ালা কাঁধে বহন করে মাছ নিয়ে বাজারে ঢুকছেন! এই সময়টির জন্যই তিনি তক্কে তক্কে আছেন। তাই নিজেই একটু এগিয়ে গিয়ে সদয় ভঙ্গিতে ভদ্রতার সাথে প্রশ্ন করেন।
আসসালামু আলাইকুম, কি মাছ আনছেন, মতির বাপ?
ওয়ালাইকুম সালাম। মতির বাপ পথে কোন কথা বলতে ইচ্ছুক নয়। হউক না সে প্রফেসর! মাষ্টার-প্রফেসর, ঈমাম-হুজুর সমাজের গরীব লোক তো এরাই। লক্ষ্য তার আগে বাজারে ঢুকে, কোরবান আলী গোষ্ঠীর কেউ আছে কিনা সন্ধান করা।
মতির বাপ কাঁধে মাছের ভার আটকে রেখেই জায়গার দিকে তাকাচ্ছেন কোথায় নামাবেন। প্রফেসর সাহেব আবারো প্রশ্ন করলেন, কোন মাছের দাম কত? যদিও এখন মাছের চেহারা দেখা হয়নি। চায়ের দোকানের কোণে বসে ছিলেন এক বুড়ো। পান খেয়ে খিলাল করছিলেন। তিনি সেখান থেকেই গলা হাঁকিয়ে বললেন, তোমার কাঁধে রক্ষিত মাছের পুরো ভার সহ কত সেটাই বল।
মতির বাপ এই ধরনের একটি উক্তির জন্যই অপেক্ষা করছিল। প্রফেসর সাহেবের মাথা ভৌঁ করে ১৮০ ডিগ্রী বরাবর ঘুরে গেল। তাকিয়ে দেখেন তিনি আর কেউ নয়, হাছি মিয়া মাঝি! নতুন আরের ধনীর উপদ্রব! এক সময় তিনি নৌকা টানতেন আবার মাছও ধরতেন। এটাই ছিল তার পেশা। ছেলেদের নগদ টাকার প্রভাবে ওসব গরিবি কাজ ছেড়ে দিয়েছে। এখন পেশা ছেড়ে দিয়ে, চায়ের দোকানে বসে রাজনীতি করে, মন্ত্রী এমপিদের ভুল ধরে সময় কাটান।
প্রফেসর সাহেব কি করবেন! ভেবে কুল কিনারা পাচ্ছেন না! বেলা বাড়তে রইল, আর কোন মাছ ওয়ালা আসার লক্ষণ দেখা যাচ্ছেনা। বেলা এগারটা বাজে, বন্ধের দিনের অর্ধেক টা এভাবেই মাটি হল। তখনই ফোন আসে মেডামের, হ্যালো! “এক কেজি মাছের জন্য গেলা, মনে হয় পুরো বাজার কিনে নিয়ে আসতেছ!” আমি সেই কবে থেকে হলুদ-মরিচে লবণ মাগিয়ে বসে আছি….