দারস : সুরা আলাক্ব : ১-৫

 

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
﴿ اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ﴾﴿خَلَقَ الْإِنسَانَ مِنْ عَلَقٍ﴾﴿اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ﴾﴿الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ﴾﴿عَلَّمَ الْإِنسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ﴾
পড়ো (হে নবী), তোমার রবের নামে। যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জমাট বাঁধা রক্তের দলা থেকে। অতঃপর পড়ো, এবং তোমার রব বড়ই মেহেরবান। যিনি কলমের সাহায্যে জ্ঞান শিখিয়েছেন। যিনি মানুষকে এমন জ্ঞান দিয়েছেন, যা সে জানতো না। (সুরা আলাক্ব ১-৫)
 ইক্বরা-পড়ো, খালাক্ব-সৃষ্টি করেছেন, ইনছানা-মানুষকে, আলাক্ব-জমাট রক্তপিণ্ড, আকরাম-বড়ই অনুগ্রহশীল, আল্লামা-শিখিয়েছেন, বিলক্বলম-কলম দিয়ে, মা-যা, লাম’ইয়ালাম- যা সে জানতো না

নাম করন:

সূরাটির দ্বিতীয় আয়াতে উল্লেখিত আলাক্ব ‘عَلَقٍ’ শব্দ থেকে এর নামকরণ করা হয়েছে। আলাক্ব অর্থ ‘জমাটবাঁধা রক্তপিণ্ড’।

 

নাজিলের সময়কাল

মক্কার অদূরের একটি খাড়া পাহাড়ের চুড়ায় অবস্থিত হেরা-গুহায়। তখন রাসুল (সাঃ) বয়স ৪০ বছর। সে হিসেবে এটি মক্কী সুরা

 

পটভূমি

মক্কার মানুষদের দুঃখ দুর্দশা দেখে রাসুল (সাঃ) মন সদা ভারাক্রান্ত থাকত। তিনি ভাবতেন এর বিহীত কিভাবে সমাধা হবে। তার ১৭তম বছর বয়সে হিলফুল ফুজুল সৃষ্টি হলে, তিনি তাতে আন্তরিক ভাবে একাগ্রতার সাথে কাজে লেগে যান। মক্কার কোরাইশেরা তার সাহাযার্থে এগিয়ে আসেন। তিনি সবার সার্বিক সহযোগিতা পাওয়ার আশানুরূপ কোন অগ্রগতি দেখতে পেলেন না। এটি তার মনকে ব্যতীত ও ভারাক্রান্ত করত। তিনি প্রতিনিয়ত ভাবতের এ থেকে উত্তরনের উপায় কি? মানুষের মুক্তি মিলবে কিসে? কারো কাছে এর উত্তর ছিল না। ফলে তিনি ভাবনার মধ্যেই বিলীন হতে থাকলেন। এসব ভাবনার হেতু, একসময় তার কাছে একাকীত্ব প্রিয় হতে থাকে। তিনি মক্কার অদূরেই হেরা গুহায় সময় কাটাতেন। যেখানে কোলাহল নেই, হল্লা নেই, ঝগড়া নেই, মানুষের বাদানুবাদ নেই, মনোযোগ ছুটে যাবার পরিবেশ নেই, একান্ত একাকীত্বে তিনি হেরা গুহায় চিন্তা-ভাবনায় মেতে রইলেন।

 

এক পর্যায়ে রাসুল (সাঃ) দিবা স্বপ্ন দেখা শুরু করলেন। স্বপ্নে যা দেখতেন পরদিন তা হুবহু ঘটতে দেখতেন! কোনটি স্বপ্নে দেখছেন আর কোনটি বাস্তবে দেখছেন, দুটোর মধ্যে তফাতই রইল না। ফলে তার নির্জনতা আরো বেড়ে গেল। হেরা গুহায় দিন-রাত এবাদত বাড়িয়ে দিলেন। আয়শা (রাঃ) তার এই্ পর্যায়কে ‘তাহান্নুস’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। “তাহান্নুস” শব্দের মূল ধাতু হলো ‘হিন্স’ (حنث), যার অর্থ পাপ থেকে নিজেকে দূরে রাখা কিংবা পবিত্র থাকা। তিনি যখন জগত সংসারের যাবতীয় পাপ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে সক্ষম হলেন, তখন থেকেই তিনি দ্বিবাস্বপ্ন পূরণ হতে দেখা শুরু করলেন।

 

১-৫ নং আয়াতের শানে নুযুল:

এর মধ্যেই একরাতে আল্লাহর নির্দেশে স্বয়ং জিবরাইল (আঃ) ওহী নিয়ে হাজির হলেন এবং এই্ আয়াতগুলো পুরো পড়ার আহবান জানালেন।

 

রাসূল (সাঃ) এর নিকট জিবরাঈল (আঃ) যখন প্রথমবার উপস্থিত হন, তখন তিনি তাঁকে “ইকরা” বা পড়ুন বলেছিলেন। যেহেতু রাসূল (সাঃ) নিরক্ষর ছিলেন, তাই তিনি বললেন, “আমি পড়তে জানি না”! জিবরাঈল (আঃ) তাকে শক্তভাবে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। দ্বিতীয়, তৃতীয়বারেও একই ঘটনা ঘটল।

 

অতঃপর রাসুল (সাঃ) জবরাঈলের (আঃ) পড়া শুনলেন, মুখে মুখে পড়লেন এবং আত্বস্থ করলেন। সর্বমোট ৫ টি আয়াত এখানে পড়ানো হয়েছে।

 

এক একটি মক্কী সুরা এবং এই সুরায় সর্বমোট ১৯ আয়াত রয়েছে। ১ থেকে ৫ আয়াত আজকের আলোচ্য বিষয়। এই অংশটি রসূলুল্লাহ (সাঃ) ওপর অবতীর্ণ পবিত্র কোরআনের সর্বপ্রথম আয়াত ও মানবজাতির কাছে অহীর সূচনা হয় এই পাঁচটি আয়াতের মাধ্যেম।

একদা রাসুল (সাঃ) হারাম শরীফে এই পাঁচ আয়াত দিয়ে সালাত আদায় করছিলেন। তার আওয়াজ ও বিষয়বস্তু আবু জেহেলের কানে গেলে সে রাসুল (সাঃ) হুমকি দেয়। তারই আলোকে পরবর্তী ১৪ আয়াত নাজিল হয়।

 

ব্যাখা:

اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ – পড়ো (হে নবী), তোমার রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন।

 – পড়ো! এটি মানব জাতির জন্যে প্রথম আহবান।

– কেননা একমাত্র পড়ার মাধ্যমেই সৃষ্টির গুরুতত্ত্ব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে

 – আর সৃষ্টি সম্পর্কে ধারণা পেলেই স্রষ্টার প্রকৃত ক্ষমতার পরিচয় পাওয়া যাবে। কিন্তু

– রাসুল (সাঃ) জানালেন তিনি তো পড়তে পারেন না! অতঃপর

– জিবরাইল (আঃ) রাসুল (সাঃ) বুকে চেপে ধরলেন। তিনবার করলেন

– পড়ো কথার মাধ্যমে বুঝা যায়, কোরআনের আয়াত লিখিত আকারে এসেছিল

– যার কারণে রাসুল (সাঃ) কে পড়ার তাগিদ দেওয়া হচ্ছিল এবং সেটা ৩ বার

– অতঃপর তিনি মন দিয়ে শুনলেন এবং কথাগুলো আত্বস্থ করলেন

– এর মাধ্যমে বুঝানো হল পড়ার গুরুত্বের পরের অবস্থান হল শোনার গুরুত্ব

– মানুষের জন্যে এই দুটি গুন অর্জন অপরিহার্য এবং তা করতেই হবে

 

পড়ার তাগিদ কেন?

– দুনিয়ার জীবনে প্রথম তাগিদ এসেছে ইকরা তথা পড়া দিয়ে। এটা জ্ঞানার্জনের শুরুর নির্দেশ হিসেবে বুঝায়। যাতে মানুষ বরের নাম সৃষ্টিজগতকে পড়তে শেখে।

– হাশরের মাঠেও প্রথম তাগিদ দেওয়া হবে ইকরা বলে! বনী ইসরাইল-১৪ আয়াত 

﴿اقْرَأْ كِتَابَكَ كَفَىٰ بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ حَسِيبًا﴾ পড়ো, নিজের আমলনামা! আজ নিজের হিসেব করার জন্য তুমি নিজেই যথেষ্ট!

– অর্থাৎ দুনিয়ার জীবনে পড়ার মাধ্যমে অর্জিত ফলাফল এবার নিজেই পড়ো!

পড়ার গুরুত্ব কেন?

পড়ার মাধ্যমে চিন্তাশক্তির প্রসার ঘটায়: পড়া মানুষের মস্তিষ্কের দিগন্ত প্রসারিত করে। পড়া মানুষকে অন্ধ অনুকরণ থেকে বের করে আনতে সাহায্য করে। পড়া বিচার-বুদ্ধির বিকাশ ঘটায়। পড়ার মাধ্যমে সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের সক্ষমতা বাড়ায়।

পড়ার মাধ্যমে অজ্ঞতা দূর হয়: মানুষ জন্মগতই অজ্ঞ! বরং প্রাণীদের চেয়েও দুর্বল ও কম দক্ষ। মানুষকে নিজ চেষ্টায় বিজ্ঞ হতে হয়। পড়ার মাধ্যমে মানুষ সে সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠতে পারে। পড়ার মাধ্যমে সে সাহসী ও আস্তাশীল হয়। এবং পড়ার মাধ্যমেই মহাবিশ্বের নিয়মাবলী ও স্রষ্টার পরিচয় সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে। পড়ার

সভ্যতা বিনির্মাণ সাহায্য করে: মানুষের কাছে পড়ার জ্ঞান সৃষ্টি হলেই সে তা লিখে যেতে পারে। কলমের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান প্রজন্মের পর প্রজন্ম স্থায়ী হয়। এটি মানুষের ব্যক্তিগত উন্নতির পাশাপাশি সমাজ ও সভ্যতার ভিত্তি মজবুত করে।

 

আল্লাহর নামেই পড়ার গুরুত্ব কি?

– মক্কার সকল মানুষের সার্বিক সহযোগিতা ও ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমেও হিলফুল ফুজুল সফল হয়নি। রাসুলের (সাঃ) এর মত ত্যাগী, নির্লোভ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তির নিরলস চেষ্টাও বিফলে গেছে। এভাবে দুনিয়ার সকল মানুষের চেষ্টা-প্রচেষ্টা ব্যর্থ ও বিফলে যাবে, যদি না আল্লাহ সহযোগিতা না করেন। তিনি যখন সহযোগিতা করা শুরু করলেন এবং সেই আরববাসী সম্মীলিভ ভাবে বিরোধিতা শুরু করলেন, তবুও সেই কাজ সফল হয়েছে। তাই সকল কাজের শুরুতেই আল্লাহর নামে শুরু হতে হবে।

 

সৃষ্টার গুরুত্ব কি, কি তার পরিচয়?

– মহান রব যিনি যাবতীয় সকল কিছু স্রষ্টা।

﴿هُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَىٰ عَلَى الْعَرْشِ ۚ﴾ তিনিই আসমান ও যমীনকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন এবং তারপর আরশে সমাসীন হয়েছেন। হাদিদ-৩

﴿ذَٰلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمْ ۖ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۖ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ فَاعْبُدُوهُ ۚ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ وَكِيلٌۚ﴾ এ তো আল্লাহ তোমাদের রব। তিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। সবকিছুর তিনিই স্রষ্টা। কাজেই তোমরা তাঁরই বন্দেগী করো। তিনি সবকিছুর তত্বাবধায়ক। আনয়াম-১০২

 

পবিত্র কোরআন মানুষের জন্যে এসেছে। সুতরাং এখানে এমন কোন বানী নেই, যা মানুষের পক্ষে তত্ত্ব-তালাশে নামলে অক্ষম হয়ে যাবে। উপরের আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, “তিনি আসমান ও যমীনকে ছয়দিনে সৃষ্টি করেছেন।” এটা একটি বড় জটিল ও কঠিন বিষয় কিন্তু গবেষক মানুষদের জন্যে এর ব্যাখা দেওয়াও একদিন সম্ভব হয়ে যাবে। এখন কেউ যদি এ বিষয়ে তত্ত্ব তালাশে আগ্রহী হয়ে উঠে। তাকে যে কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করতে হবে। তার বিবরণ এমন

 

১. প্রথমে জানার জন্যে আগ্রহ সৃষ্টি হওয়া (যা রাসুলের অন্তরে সৃষ্টি হয়েছিল)

২. ইকরা – পড়ুন! কেবল অক্ষর জ্ঞান নয়! পর্যবেক্ষন ও তথ্য সংগ্রহের প্রবল ইচ্ছা

৩. তাফাক্কুর – চিন্তন! পড়ে যা পেয়েছে সেটাকে চুলছেড়া বিশ্লেষন ও অনুধাবণ করা

৪. তাদাব্বুর – দূরদর্শী ভাবনা! সিষ্টেম থিংকিং! কিভাবে কাজ করে, কিভাবে ঘটে, ভৌত কাঠামো কেমন, কোথায় পরিবর্তন প্রতিক্রিয়া হয় প্রকৃতির নিয়ম অনুসারে (Laws of Nature) অনুধাবন করা

৫. ইজতিহাদ – উদ্ভাবন, আবিষ্কার! সর্বশেষ স্তর বিন্যাস। উপরের ৪টি স্তর যথাযত পদ্ধতিতে গবেষনার মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে শেষ হলে, ছয়দিনে কিভাবে আসমান-জমিন সৃষ্টি হল, তার বিষ্ময়কর গাণিতিক পদ্ধতি মানুষের জ্ঞানে প্রতিভাত হবে।

৬. আল্লাহু আকবর – আল্লাহ সর্বশক্তিমান! কোন জ্ঞানী ব্যক্তি এতগুলো ধাপ পেরিয়ে মহান আল্লাহর সৃষ্টি নৈপূন্যের গুঢ় তথ্য আবিস্কার করে যদি বলে ‘ছোবহানাল্লাহ’! এই এক ব্যক্তির ছোবহানাল্লাহ আর দুনিয়ার লাখো কোটি আবেদের হাতের তসবিহ দানার ছোবহানাল্লাহ কখনও কোনদিন ওজনে এক হবে না। আর এই পুরো প্রক্রিয়ার শুরুতে রয়েছে পড়ার গুরুত্ব।

 

خَلَقَ الْإِنسَانَ مِنْ عَلَقٍ – যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জমাট বাঁধা রক্তের দলা থেকে।

– খালাকাল ইনছান, তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। ইনছান শব্দটি নাসিয়া ধাতু থেকে সৃষ্ট

– যার অর্থ হল ভুলে যায় এমন সৃষ্ট জীব ‘বিস্মরণশীল প্রাণী’

– আল্লাহর এক স্পেশাল সৃষ্টি, যাকে সাধারণ প্রানীদের চেয়ে আলাদা করে বানানো

– নচেত মহান আল্লাহ ‘খালাকাল বাশার’ বলতে পারতেন। বাশার অর্থ মানুষ, প্রমাণ

– অন্য প্রাণীদেহের মত, মানুষের সুন্দর দেহ কাঠামোই হল প্রকৃত বাশার

﴿قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ يُوحَىٰ إِلَيَّۚ﴾  বলুন, আমি তো তোমাদের মতোই একজন মানুষ (বাশার), আমার প্রতি ওহী নাযিল হয়…। কাহাফ-১১০

– বাশাদের দেহে যে মানবিক সত্ত্বা লুকায়িত সেটাই ইনছান অন্যভাবে নফস।

– যে মানুষ ভুলে যায় তাকে তাগাদা দিতে হয়, অতীত মনে করাতে হয়,

– পুরানো কথা স্মরণ করাতে হয়, ওয়াদার কথা মনে করিয়ে দিতে হয়,

– তাকে শেখাতে হয়, তাকে পড়াতে হয়, তাকে গঠন করতে হয়,

– তার সক্ষমতা পাইয়ে দিতে হয়, তাকে যোগ্য করে গড়ে তুলতে হয়।

– এই কারণে মানুষের জন্যে দুনিয়াতে নবী আসে, কিতাব আসে, বিধান আসে

– বছরে ঈদ আসে, কোরবান আসে, রমজান আসে, প্রতি জুমায় খোতবা আসে

– সব কিছুরই একটা উদ্দেশ্য, ইনছান ভুলে যাবে, তাকে মনে করিয়ে দিতে হবে

﴿يَا أَيُّهَا الْإِنسَانُ مَا غَرَّكَ بِرَبِّكَ الْكَرِيمِ﴾  হে মানুষ! কোন জিনিষ তোমাকে তোমার মহান রবের ব্যাপারে ধোঁকায় ফেলে রেখেছে? ইনফিতর-৬

﴿كَلَّا إِنَّ الْإِنسَانَ لَيَطْغَىٰ﴾  কখনই নয়, মানুষ সীমালংঘন কারী। আলাক-৬

– একটি লম্বা হাদিসের অংশ বিশেষ থেকে পাওয়া যায়, আদম (আঃ) আলমে আরওয়াহ তে মানুষের রূহ দেখানো হয়েছিল। সেখানে তিনি সবার মধ্যে আলোকিত অবস্থায় দাউদ (আঃ) কে দেখতে পায়। জিবরাইল জানালেন তার বয়স হবে ৬০ বছর। আদম (আঃ) নিজের থেকে ৪০ বছর হায়াত দাউদ কে দিয়ে দিলেন। আদম (আঃ) জেনে নিয়েছিলেন তার বয়স হবে ১ হাজার বছর। কিন্তু ৪০ বছর আগেই মৃত্যুর ফেরেশতা হাজির হলে, আদম (আঃ) তাঁর কৃত ওয়াদার কথা এবং বয়স দিয়ে ফেলার বিষয়টি অস্বিকার করেন। ফলে মহান আল্লাহ মানুষের আমলনামা লিপিবদ্ধের জন্যে ফেরেশতা নিয়োজিত করেন। তিরমিজি-৩৩৬৬

 

– আলাক্ব! তথা জমাটবাধা রক্তপিণ্ড থেকে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন।

– কাউকে মানুষ হিসেবে দুনিয়াতে আসতে পারটাই বিরাট ভাগ্যের বিষয়

– কোটি কোটি নুতফা তথা শুক্রানোর সাথে প্রতিযোগিতায় জয়ী হয়েই দুনিয়াতে আসা

– আমরা যারা দুনিয়ায় এসেছি তারা প্রথম ধাক্কাতেই বিজয়ী ও বাছাই হয়েছি। কিভাবে

– নুতফা তথা পিতার ছুঁড়ে দেওয়া শুক্রানু থেকে ৪০ দিন জরায়ুতে ভাসমান অবস্থায়

– আলাক্কা তথা জোঁক আকৃতির রক্তপিন্ডের মত ৪০-৮০ দিন ঝুলন্ত টলায়মান অবস্থায়

– মুদগাহ তথা দাঁতে চিবানো মাংসপিন্ডের ন্যায় ৮০-১২০ দিনের অবস্থা

– অতঃপর জিবরাইল (আঃ) এসে রূহ ফুঁকবেন, তকদির ঘোষিত হবে, রেজিষ্টার হবে

– জোঁকের মত ঘৃণিত আকৃতির আলাক্বা, প্রতিটি মানুষের শুরু, যেন ভেসে বেড়ানো কিট

– সেখান থেকেই মানুষের মত অবহেলিত এক মহা বিস্ময়কর সৃষ্টির জন্ম দিয়েছেনূ

 

اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ – অতঃপর পড়ো, এবং তোমার রব বড়ই মেহেরবান।

– মহান আল্লাহ তাঁর ৯৯ নামের মধ্য থেকে এখানে আকরাম নামটি প্রয়োগ করেছেন

– আকরাম হল ‘কারিমের’ সুপারলেটিভ ডিগ্রী, সর্বোচ্চ রূপ দানকারী, করিম অর্থ দাতা

– আকরাম হল সবচেয়ে বড় দাতা ও দয়ালু, যার উপরে কোন অনুদান নেই।

– তুমি ছিলে তুচ্ছ ঘৃণিত আলাক্বা অবস্থায়, তিনি তোমাকে ইনছানের মর্যাদা দিয়েছে

– তিনি সেই ইনছানকে দুনিয়ার শ্রেষ্টতম পজিশনে বসিয়েছেন

– তিনি বাশার নামক দেহাভ্যন্তরে ইনছান নামক সপ্টওয়ার বসিয়ে মূল্য দিয়েছে

আবার,

– তুমি নিজেই স্বীকার করেছ তুমি অক্ষরজ্ঞানহীন, পড়তে জান না, উম্মী

– আর পড়া তো দীর্ঘ বছরের প্রচেষ্টায় অর্জন করতে হয়, সাধনা করতে হয়

– ওস্তাদের কাছে না গেলে কেউ পড়তে পারে না, যার জন্যে একজন শিক্ষক দরকার

– জগতের এসব বাস্তবতাকে উপেক্ষা করেই, তিনি তোমাকে তুলে এনেছেন

– মহা-জাগতিক বিষয়ের মত কঠিন বিষয়ের জ্ঞান তোমাকে দান করা হয়েছে।

– কোন ওস্তাদের কাছে না পড়েও, তোমাকে জগতের ওস্তাদ বানানো হয়েছে

– এটা কোন সাধারণ বিষয় নয়, মহান রব প্রভু আকরামের অনবদ্য দান,

– সুতরাং তাকে ডাক, তার নামই স্মরণ করুন

– দুনিয়ার সকল সমীকরণ পর্যন্ত এই নামের মালীক উল্টিয়ে দিতে পারেন

 

الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ – যিনি কলমের সাহায্যে জ্ঞান শিখিয়েছেন।

– মহান আল্লাহ নিজেও কোরআনকে লওহে মাহফুজে লিখে সংরক্ষন করেছেন

– জিবরাইল পড়ার উপযোগী করে কোরআন এনেছেন এবং রাসুল কে পড়তে বলেছেন

– পবিত্র কোরআনে ক্বলম নামে একটি সুরা আছে

– বলা হয়েছে, বছরে মাস হল ১২ টি তিনি সেটা কিতাবে লিখে রেখেছেন, তাওবাহ-৩৬

– দুই কাঁধের ফেরেশতারা প্রতি সেকেন্টে মানুষের আমলনামা লিখে চলেছেন

– আরশে আজমের মালিক নিজেও কলম দ্বারা দলীল সংরক্ষণ করেছেন এবং

– মানুষের জন্যে কলমের সাহায্যে শিখন পদ্ধতিকে সঠিক পন্থা হিসেবে বলে দিয়েছেন

– মানুষকে ইনছান তথা বিস্মৃতিপ্রবণ বলা হয়েছে, তার জ্ঞান টিকে থাকবে কলমের দ্বারা

– কলম হল জ্ঞানের স্থায়িত্ব ধরে রাখা ও ক্রমবিকাশের প্রতিক,

– ইনছানের পরবর্তী প্রজন্ম, অতি দূরবর্তী প্রজন্ম কলমের লিখনি থেকেই জানবে

– কলমের লিখনি জ্ঞান, প্রজ্ঞা, মেধা ও ইতিহাসকে রেখে যাবে

– কলমের লিখনি যখন প্রতিষ্ঠিত হবে, নবী-রাসুল আসার সিলসিলা ফুরিয়ে যাবে

– আগের আসমানি কিতাব যথাযথ লিখনীর অভাবে, হারিয়ে গেছে

– কোরআন কলমের মাধ্যমেই কেয়ামত পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকবে

– আল্লাহর কালাম লিখার মাধ্যমেই প্রচার, প্রসার ও বিস্তার লাভ করবে

– আসমাউল রিজাল গ্রন্থে ৫ লাখের বেশী মানুষের তথ্য ইতিহাসের ফ্রেমে আবদ্ধ হয়েছে

– মুসলমানদের কলমে লিখিত হয়েছে দুনিয়ার বহু গ্রন্থ ইতিহাস, গণিত-বীজগণিত

– চিকিৎসা বিজ্ঞান, আলোক বিজ্ঞান, পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন, ধাতুবিদ্যা, জ্যোতিবিদ্যা

– মুসলমান কিংবা মানুষের হাতে সংরক্ষিত হয়েছে হাজারো বছরের ইতিহাস ও ঘটনা

– এটা মহান আল্লাহর দেখিয়ে দেওয়া পথ ও কলমের কারণ

– সে কারনে দুনিয়াতে পড়ার আগে লেখার গুরুত্ব আগে আলোচিত হয়।

 

عَلَّمَ الْإِنسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ – যিনি মানুষকে এমন জ্ঞান দিয়েছেন, যা সে জানতো না।

 

– মূলত মানুষের কোন জন্মগত জ্ঞান নেই, তাকে বানানো হয়েছে জ্ঞান শুন্যভাবে

– একটি শিশু মুরগী, খেতে পারে, আত্মরক্ষা করতে পারে, অলসতা ঝাড়তে পারে

– একটি শিশু হরিণ মায়ের স্তন সন্ধান করে খেয়ে, সহসা দাঁড়াতে, দৌঁড়াতে পারে

– একটি শিশু হাঁস সহসা পানিতে ভাসতে পারে, ঢুব দিতে পারে… কিন্তু

– একটি মানুষের বাচ্চা ওভাবে পারে, কারণ প্রাণীদের জন্মগত জ্ঞান থাকে মানুষের নয়

– মানুষকে জীবনের একটি বিরাট অংশ ব্যয় করতে হয় জ্ঞান অন্বেষণ এবং জানার জন্য

– এত চেষ্টার পরও মানুষের জানার চাহিদা শেষ হয়না এবং জানারও ইতি ঘটে না

– এত কিছুর পরও মানুষের কাছে সকল জ্ঞান ধরা দেয় না, যদিও তাদের আগ্রহ থাকে

– সে জ্ঞান রাসুল (সাঃ) হিলফুল ফুজুলে পায় নাই, যদিও সকল জ্ঞানী তাঁর সাথী ছিল

– সে জ্ঞান পেয়েছেন মহান আল্লাহর মাধ্যমে, বিশেষ দয়া এবং বিবেচনায়

– এটা এমন জ্ঞান আল্লাহ যদি না দেয়, দুনিয়ার সকল মানুষ একত্রিত হয়েও পাবে না

– যে জ্ঞান মানুষের ভবিষ্যতকে পথ দেখাবে, অতীতের অন্ধকারের স্বরূপ উৎঘাটন করবে