বই প্রীতি ও মানবীর প্রেম

টিপুভাই ডট কম ব্লগের ছবি, নজরুল ইসলা টিপু - tipuvai.com
তিনি একটি রিক্সার উপরে বহু কষ্টে বসেছিলেন। রিক্সার পাটাতনের উপরে বিরাট এক বস্তা, পা দু’টো তার উপরে রাখা। এক হাতে রিক্সার হুড ধরা, অন্য হাতে শক্ত করে ধরা বইয়ের আরেকটি বান্ডিল। আমাকে আসতে দেখেই রিক্সাওয়ালাকে আগেই থামতে বলেছিলেন, আমিও যাতে থামি সে কারণে হাত দেখালেন।
 
এতগুলো বই দিয়ে ছোটখাটো একটা লাইব্রেরী বানানো যাবে। আবার মনে হল রাস্তার পার্শ্বে হকারেরা জায়গা দখলে নিয়ে বই বিক্রি করে। এধরনের কোন হকার থেকে পুরো বইয়ের বস্তাটাই কিনে নিয়েছে। দড়ির শক্ত বন্ধনী ছিঁড়েই কিছু বই নিজের অস্তিত্ব প্রকাশ করছে। তাদের কয়েকটিকে দেখে নিলাম, আমি রিক্সা ড্রাইভার, যে প্রেম নীরবে কাঁদে, টেক্সি ড্রাইভারের প্রেম, প্রেমের চিঠি লিখার কলা কৌশল! এসব বই দেখে আলবৎ বুঝে নিলাম ফজলু বেটা সেটাই করেছে! আমাকে প্রায় ধমকের সূরে জানালেন, আগামীকাল থেকে যেন তার ছাত্রীদের কাছে আর বই না পাঠাই। তারা চাইলেও যেন সোজা বলে দেই, কোন বই নাই! মনে মনে হাঁসলাম, কলেজের সার্টিফিকেট জোগাড় আর বই পড়লেই কাউকে শিক্ষিত বলেনা।
 
তিনি আমার সিনিয়র, কয়েকদিন ধরেই তার সাথে ভাব জমানোর চেষ্টা করছিলাম কিন্তু বেজায় মুড নিয়ে চলাফেরা করেন বলে ধরতে পারছিনা।  তিনি তেমন বড় কিছু না। এলাকার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তির ঘরের লজিং মাষ্টার ফজলুর রহমান। থার্ড ইয়ারের ছাত্র। আমি ফাস্ট ইয়ারের ছাত্র হিসেবে সে এলাকায় সবে মাত্র ঢুকেছি। তাই আমাকে সিনিয়র ভাব দেখায়।
 
কাকতালীয় ভাবে দেখা হয়েছিল মাদ্রাসা ছাত্র আবদুল মালেকের সাথে। তিনি আমাকে পেয়ে বেজায় খুশী। দুটো কারণে। প্রথমত, তিনি বইয়ের জোগান পাবেন দ্বিতীয়ত, এলাকার বই পাগল স্কুল-কলেজের ছাত্র ছাত্রীরা বই পড়তে পারবে। তারা সবাই সদা মিশুক, হাস্যময় আবদুল মালেকের সাহায্য চায়। অসচ্ছল আবদুল মালেকের পক্ষে তাদের চাহিদা-নুযায়ী বইয়ের জোগান দেওয়া অনেকটা কঠিন। ঠিক সেই মুহূর্তে আবদুল মালেক আমাকে সেখানে পেয়ে যারপরনাই খুশী ও আনন্দিত।
 
ছোটকাল থেকেই আমার বই পড়ার ঝোঁক ছিল বেশি। ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হবার জন্য কলেজে গিয়েছি, সাথে বাছাই করে নিয়ে গিয়েছি প্রায় আড়াই শতাধিক বই। আবদুল মালেক আমার সিনিয়র এখন কলেজে পড়ে। মাদ্রাসায় পড়ার সময়ে তার সাথে পরিচিতি হয়েছিল ফলে আমার সংগৃহীত বইয়ের অনেকগুলো পড়েছিলেন। সে জানার সূত্র ধরেই আবদুল মালেক আশান্বিত হয়েছিলেন যে, এবার এই এলাকার ছাত্র ছাত্রীদের বাহ্যিক বই পড়াবার একটা বিরাট সুযোগ সৃষ্টি হল।
 
এলাকায় আমি একেবারেই নতুন, কারো সাথে পরিচয় হবার সুযোগ পাইনি। আবদুল মালেক আমাকে এলাকার প্রায় সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। বিশেষ করে বই পড়ায় অভ্যস্ত বা পড়তে আগ্রহী এমন ছাত্র/ছাত্রীদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। পরিচয় পেয়ে এলাকার ধনীর দুলালী দুই সুন্দরী তরুণী বেজায় আপ্লুত হলেন।
 
আমার সংগৃহীত বই আগে আমি পড়ি তারপর অন্যদের বিলি করি। তাই পাঠকের বয়স, রুচি, চিন্তা, পরিবেশ অনুযায়ী বই পাইয়ে দেবার দক্ষতা স্কুল জীবন থেকেই সৃষ্টি হয়েছিল। সে হিসেবে বই দিতাম। ফলে পাঠকেরা গোগ্রাসে বই পড়ত। মাসের শেষে দেখতাম কিছু পাঠক আমাকেও হার মানিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। 
 
এই এলাকায় বইয়ের জন্য সবাই আমার কাছে আসত না। কারো মাধ্যমে চেয়ে নিত, আমি শুধু বয়স জিজ্ঞাসা করতাম আর কতটুকু লেখাপড়া করেছে সেটা জানতে চাইতাম। সে হিসেবে বই দিতাম। কেননা তখনকার সময়ে অনেক গৃহবধূরাও বই পড়ত। ক্লাস সিক্স-সেভেন পর্যন্ত পড়েছে এমন গৃহবধূরা বেশী পড়ার প্রতি আগ্রহ দেখাত। আমার জানা না থাকলেও ফজলুর রহমানের ছাত্রীরাও আমার বই সংগ্রহ করে পড়ে যাচ্ছিলেন। ছাত্রী/শিক্ষকের মধ্যে কি হয়েছে জানিনা। তবে তাকে রাস্তা থেকে অনেকগুলো বই কিনে বাড়ি ফিরতে ও আমার প্রতি বিতৃষ্ণার প্রকাশ ঘটাতে দেখলাম। 
 
আবদুল মালেক জানিয়েছিলেন, ফজলুর রহমান ধনী লোকের সন্তান। তার ইচ্ছা এই বাড়ীটাকে শ্বশুর বাড়ী বানাবে। তলে তলে এগিয়েছেও অনেক। আমি এখানে আসার পরে তার গ্রহণযোগ্যতায় টান পড়েছে। সে তার ছাত্রীদের বই পড়তে নিরুৎসাহিত করছিল কিন্তু ছাত্রীরা বারে বারে নির্দেশ উপেক্ষা করে আরো বেশী বই পড়ে যাচ্ছিল। ওদিকে যখন ফজলু নিজেই বই কিনে এনে এসব ছাত্রীদের পড়তে দিল তখন তার অবস্থা আরো সঙ্গিন হল। ছাত্রীরা ক্ষিপ্ত হয়ে বলে বসল, আপনার এসব বই আমরা পড়ব না। এগুলো কি সব বইয়ের নাম ‘যৌবনের ঢেউ’ ‘প্রেমের নীরব কান্না’। না আছে রুচি, আর না আছে শিক্ষণীয় কাহিনী। যাই হোক বেচারা ফজলুর পক্ষে তাদের জামাই হওয়া সম্ভব হলনা, সে বাড়ী ত্যাগ করতে হয়েছিল। এ ঘটনা আমাকে যথেষ্ট পীড়া দিয়েছিল। যদিও আমি তাদের ঘরে বই বিতরণ বন্ধ করে দিয়েছিলাম।
 
বই প্রেমের কাছে মানবীর প্রেম যে পরাস্ত হবে সেটা ফজলু বুঝতে পারেনি। ফজলু নিজেও কোনদিন বই পড়েনি তাই তার ছাত্রীদের মনোভাবও বুঝতে পারেনি। সকল বই পড়া যায় না সব বই পড়তে নেই। শিক্ষার্থীদের জন্য এটা শতভাগ মানতে হয়। একজন বই পড়া মানুষ তলে তলে নিজের অজান্তে অনেক প্রাজ্ঞ ও বিচক্ষণ হয়ে উঠে। কিছুদিন পরেই তার সহযোগী বন্ধুরা বুঝতে পারে তার কথার ওজন বেড়ে যাচ্ছে। মুরুব্বীরা তাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। সে সময়ে ঘরে ঘরে যেভাবে বইয়ের কদর ছিল বর্তমানের তার কানাকড়িও নাই। মেট্রিক পাশ করেনি এমন গৃহবধূরা ডা. লুৎফর রহমান, সৈয়দ মুজতবা আলীর সকল বই পড়ে নিয়েছে, এমন দৃষ্টান্ত ভুরি ভুরি। তখনকার তাদের সাহিত্য মেধা বর্তমানের অনেকের কাছেই নাই। বর্তমানের অনেকে মুজতবা আলির বই বুঝতে গিয়ে ডিকশনারির সাহায্য নিতে হবে। বিয়ের উপহারের একটা বিরাট অংশ জুড়ে থাকত বই আর বই। বই হল একটা বিরাট সঙ্গী একাকীত্বের বন্ধু। ঘরে একটি সুন্দর বইয়ের উপস্থিতি নিজের অভিরুচি, পছন্দ আর রুচিশীলতার পরিচয় করিয়ে দেয়। তাই নারী-পুরুষ নির্বিশেষে আমাদের সবাইকে বেশী বেশী বই পড়া দরকার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *