বিদ্যালয়-তঙ্ক নামের কোন শব্দ অভিধানে আছে কিনা জানিনা, এটা আমারই বানানো। বিদ্যালয় + আতঙ্ক! এই শব্দ দুটোর পরিচিতি সন্ধি কিংবা সমাসে পাইনি। অগত্যা এটাই লিখে দিলাম, কেননা আমার কাছে এটাই যুতসই বলে মনে হয়েছে। জ্ঞানী পাঠকদের নিকট থেকে সুন্দর পরামর্শ পেলে পরবর্তীতে সেটাই সেটিয়ে দিব। কথা বলছিলাম বিদ্যালয়-তঙ্ক নিয়ে। বিদ্যালয়ও কখনও অভিভাবকদের নিকট আতঙ্কের কারণ হয় আমার আজকের পোষ্টের সেটাই বিষয়।
পরিচিত সুহৃদ আমেরিকায় থাকেন। স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই উচ্চ শিক্ষিত। মেয়ে সবে মাত্র হাই স্কুলে উঠেছে। সেখানে কারো সাথে না মেশা কিংবা কাছাকাছি কিছু একটা নিষেধ মায়ের ছিল। মেয়ে ভুলে সে নিষেধ পালনে দুর্বলতা দেখিয়েছিল। এ জন্য মা গোস্বা করে মেয়েকে একটি চড় মেরেছিলেন।
চড় খেয়ে মেয়ে বিকাল বেলা থেকেই ফুলিয়ে আছে, নাস্তা-পানিও ধরে নাই। মায়ের ভাবনা ছিল রাত্রে খিধে লাগলে এমনিতেই গোস্বা পানি হয়ে যাবে, তখন আদর করে আবারো বোঝাবেন, সোনামণি একাজ করা অনুচিত, ওঠা ঠিক নয় ইত্যাদি।
মা দেখলেন, রাত্রেও মেয়ে ফুলে আছে এবং গোস্বা থামানোর কোন লক্ষণ নাই। অগত্যা মা নিজেই মেয়েকে খাওয়ার জন্য ডাকলেন। এতে মেয়ের গোস্বা আরো দ্বিগুণ বেড়ে গেল। সে প্রতিজ্ঞা করে বলল, সে তো খানা ধরবেই না অধিকন্তু ঘরে তার মায়ের কড়া শাসনের খবর তার শ্রেণী শিক্ষকের কাছে জানাবে।
এই কথা শুনে মায়ের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। উল্টো মা নিজেই তার রাত্রের খানা বন্ধ করে দেয়। ঘুমানোর নামে পুরো রাত শুধু এপাশ ওপাশ করে পিট পাল্টিয়েছেন আর ভেবেছেন, কিভাবে মেয়ের মন গলানো যায়। অবশেষে মায়ের মন পরাজিত হল, তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন মেয়ের কাছে হার মেনে সকল-উপায়ে তাকে বুঝাবে। মা হয়ে প্রয়োজনে মেয়েকে সর্বাঙ্গে আদর-সোহাগ দিবে। শেষ রাত থেকে মা মেয়েকে বুঝাতে লাগলেন, মায়ের ঘাম ঝরা সর্বাত্মক প্রচেষ্টার ফলে, সকালে স্কুলে যাবার আগের মুহূর্তে মেয়ের মন নরম হল। সে মাকে কথা দিল যে, আজকের মত একথা স্কুলে জানাবে না। মা হাফ ছেড়ে বাঁচলেন।
সুপ্রিয় পাঠক! আমি-আপনি যদি আমাদের দেশীয় সমাজের মানুষ হতাম, তাহলে কি সিদ্ধান্ত নিতাম? নিশ্চয় চড়ের স্থলে থাপ্পড়, তাতেও কাজ না হলে বেত, তাতেও না হলে স্কুল বন্ধ এবং সোজা শ্বশুর বাড়ি!
যিনি এই ঘটনার আগাগোড়া প্রত্যক্ষদর্শী তিনি কি বলেন তার মুখেই কিছুটা শুনি।
‘শুরুতেই আমার মাথার মেজাজ খারাপ হয়ে উঠেছিল। একটা ছোট চড় খাবার পরে যখন মেয়ের গোঁয়ার্তুমি শুরু করে তখন আরো দশটা প্রকট চড় মারার দরকার ছিল। পরে মেয়ের গোস্বা ঠাণ্ডা করার জন্য মায়ের নেওয়া ধাপগুলো দেখে আমার মাথার মেজাজ আরো চড়ে গেল। রাত্রে বাবা এসে যখন শুনল মেয়ে এ ধরনের হুমকি দিয়েছে! তিনি কপালে হাত দিলেন তারপর মাথায় এক মগ পানি ঢেলে, উদাস ভঙ্গিতে, হতাশ হৃদয়ে, সেই যে বিছানায় ঢলে পড়ল আর উঠার নাম নেই! এটা দেখে আমার মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে উঠল। বলে উঠলাম পিতা-মাতার এটা কোন ধরণের শাসন পদ্ধতি! অবশেষে সাহসী পিতার অসহায় আর্তি ও বিস্তারিত ঘটনা শুনে আমিই সিদ্ধান্ত নিলাম, সন্তান মানুষ করার যে প্রত্যয় নিয়ে এই দেশ দেখতে এসেছিলাম; সে আশায় গুড়ে-বালি। অতঃপর ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম’।
যে কারণে পিতা জ্ঞান-বুদ্ধি হারিয়ে বিছানায় পড়েছিলেন সেটা বলা হয়নি। তিনি জানালেন, ইতিপূর্বে তিনিও একটা মার দিয়েছিলেন, সেটার ইজা সামলাতে পুরো একটা বন্ধের দিন মেয়েকে ফুসলিয়ে রাজি করিয়েছেন এবং গোস্বা থামিয়েছিলেন। মেয়ের গোস্বা থামাতে সেদিন হুশ-বুদ্ধি সবই উজাড় করেছিলেন! নিজের বক্ষ পিঞ্জরে হাড্ডি আর গোশত ছাড়া আর কোন কৌশল বাকি নাই, সবই মেয়ের পিছনে কাজে লাগানো হয়েছে। সারাদিনের কঠোর পরিশ্রমের, পরিশ্রান্ত দেহে ঘরের ঢুকার পরে এ ধরনের সংবাদ পেলে কদাচিৎ আমেরিকার প্রেসিডেন্টও বিল্লি হয়ে যেতে বাধ্য হবে। এই ভয় ইজ্জত হারানোর ভয়ে নয়, সন্তানকে পিটানোর জন্য নয়, বরং আমেরিকায় স্থায়ী হতে আসা একজন অভিভাবকের সকল সুযোগ হারানোর ভয়েই। আমেরিকায় ছাত্র ও শিশুদের পক্ষে কড়া আইনের কারণেই।
বাংলাদেশী পাঠক হলে এতক্ষণে হয়ত ধৈর্যের বাধ ভেঙ্গে পড়ার দশা। পিতাদের হয়ত সোজা-সাপটা উত্তর থাকতে পারে; এই ধরনের মেয়ে আমার হলে সোজা মাথার উপর তুলে নিতাম এবং সজোরে জমিনে দিতাম একটা আছাড়! না! না! এই চিন্তাও করা যাবেনা! পাশ্চাত্যে স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে মজবুত আইন। যা পিতা-মাতার পক্ষেও উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।
পিতা-মাতা স্কুল পড়ুয়া সন্তানদের মারতে পারবেনা, এই অধিকার তাদের নেই। পিতা-মাতা কখনও কঠোরতা ও নির্দয়তার আশ্রয় নেয় না কিন্তু সন্তান যদি এই অপবাদ স্কুলে দিয়ে পিতা-মাতাকে ফাঁসিয়ে দেয় করার কিছুই নেই। অভিভাবকে ফাঁসতেই হবে, সেখানে কসম খাওয়ার কোন মূল্য নেই।
ইংল্যান্ডের আফসানা আজাদের নাম হয়ত অনেকে শুনেছেন, দুনিয়া বিখ্যাত ছবি Herry Potter এর নায়িকা। পিতা-মাতা বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত আর আফসানা ছিলো হাই স্কুলের ছাত্রী। তার পিতা ও বড় ভাই চাচ্ছিলেন না, সে আর অভিনয় করুক। বদনাম ছিল পিতা তাকে চড় মেরেছেন আর বড়ভাই ঘর থেকে বের হতে দেন নাই। পরে মেয়ে গিয়ে থানায় মামলা দিলেন। অচিরেই পিতা-ভ্রাতা বন্দি হলেন এবং ট্রাইব্যুনালের চেয়েও দ্রুতগতির বিচারে তাদের দু’জনের দীর্ঘদিনের কারাদণ্ডও হয়ে গেল। এটা আজকের লেখার সাথে সম্পর্কিত নয়, পাশ্চাত্যে একজন ছাত্রী ইচ্ছে করলে পিতা-মাতাকে কত স্টাইলে জেলের ভাত খাওয়াতে পারে সে উদাহরণ দেখানোর জন্যই দেওয়া হল।
আমেরিকার এই পিতার হয়ত আফসানার মত খ্যাতিমান মেয়ে নেই। কিন্তু আইন আদালত তো আছে। ছেলে-মেয়ে যদি স্কুলে নালিশ করে এবং তা যদি নির্দয়তার কাছাকাছি হয় তাহলে হাজত-ভোগ তো আছেই। মাতা-পিতা অনেক সরকারী সুবিধা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হবে। চাকুরী সুবিধা, ব্যাংক লোণ থেকে শুরু করে সবকিছু বাধাগ্রস্ত হবে। সর্বোপরি সন্তানকে পিতা-মাতার কাছ থেকে নিয়ে যাওয়া হবে এবং তাদের রাখা হবে শিশু সংশোধন কেন্দ্রে। এর আগে তাদেরই প্রতিবেশীর এক ছেলেকে সংশোধন কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। দীর্ঘদিন সংশোধন কেন্দ্রে থেকে, সেখানে সংশোধনের জন্য অপেক্ষমাণ অন্য তরুণদের যৌন উৎপীড়নে নিজের ছেলের অভ্যাসই খারাপ হয়ে যায়। এ জাতীয় খবরে যে কোন পিতা-মাতা আতঙ্কিত হবেই এবং অবুঝ সন্তানের পায়ে পড়তে বাধ্য হবে।
শিক্ষার উদ্দেশ্য যদি হয়, সন্তান অনেক অর্থকড়ি কামিয়ে এলাকার মানুষকে তাক লাগিয়ে দিবে। সুরম্য বাড়ী বানিয়ে, গাড়ী হাঁকিয়ে চলবে এটা দেখে পিতা মাতার চোখ শান্তি পাবে। তার জন্য উপরের শিক্ষা অনেক উত্তম হতে পারে। আর কোন পিতা যদি ভাবে আমার সন্তান মানুষ হয়ে আমার কোলে ফিরে আসবে, দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে, জাতি গঠনে ভূমিকা রাখবে। টাকা-কড়ি যাই কামাতে পারুক আমাদের বুকে ধারণ করবে, সে পিতার জন্য ওই শিক্ষা মোটেও কার্যকরী হবেনা। সে জন্য পিতা-মাতাকে আগেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, সন্তানকে দিয়ে তা কি আশা করেন এবং আশানুসারে তার জন্য পরিবেশ কেমন দিতে পারলেন সে ব্যাপারে সযত্ন ও সতর্ক থাকা শুরুতেই প্রয়োজন।