মানুষ জন্মগত ভাবে আতর তথা সুগন্ধির প্রতি বেশী আগ্রহী। মানুষের কাছে পৃথিবীর মাটিতে ফোটা সকল ফুলের কদর সমান। ফুলের কদর দু’টি কারণে; একটি তার সৌন্দর্যের জন্য, অন্যটি তার ঘ্রাণের কারণে। সে জন্য ব্যবসায়ীরা সুবাসিত তৈল, আতর, সাবান, স্নো, পাউডার সবকিছুতেই পরিচিত ফুলের ঘ্রাণের সাথে মিলিয়ে পণ্যের ঘ্রাণ বিপণন করেন। পৃথিবীতে আজো এমন কোন সাহসী ব্যবসায়ীকে পাওয়া যায়নি, যিনি অপরিচিত কোন ঘ্রাণকে মানুষের কাছে পছন্দনীয় করে পণ্য বাজারে ছাড়তে পেরেছে। নিজেরাই দেখুন, যত পণ্য বাজারে আছে, সে গুলোর ঘ্রাণের সাথে, গোলাপ, চম্পা, জুঁই, জেসমিন, রজনীগন্ধার সুবাস কিংবা মিষ্টান্ন তৈরিতে কলা, কমলা, আম, স্ট্রবেরী, পেয়ারা, ডালিম সহ নানাবিধ ফলের ঘ্রাণ যোগ করে মানুষের চিত্তকে উত্তেজিত করে। যাতে মানুষ পণ্য কিনতে বাধ্য হয় কেননা এই সুবাস অতি পরিচিত এবং লোভকে করে শানিত। কিন্তু আমি সেদিন ঘ্রাণের জগতে যা আবিষ্কার করলাম, তা এখনও আমাকে হতবাক করে, মাথা এখনও ঠিক করতে পারিনি এই ভেবে যে, এটা বেটার কেমন রুচি! ঘটনাটা না হয় বলেই ফেলি, বিচার বিবেচনার ভাব পাঠকদের হাতে।
সন্ধ্যায় মাগরিবের নামাজ পড়ার জন্য হন্তদন্ত হয়ে কাতারের শেষ ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে কাতারের খালি স্থানে ঢুকিয়ে দিলুম। বাইরে ভয়ানক গরম, তার উপর জলীয় বাষ্পের আর্দ্রতা ক্ষণে ক্ষণে বাড়ছে। পাঁচ মিনিটের সামান্য হাঁটা-চলায় পুরো শরীর ভিজে একাকার হয়ে উঠে। মসজিদের এসি ব্যবস্থা নামাজীদের স্বাচ্ছন্দ্য এনে দেয়। ফলে সময়মত মসজিদে পৌছাতে না পারলে, কাতারের ভিতরে স্থান পাওয়াটা একটু দূরহ।
যাক, আমি তো পেয়ে গেছি! খানিক ভাবলাম পিছনের মানুষগুলো কেন মসজিদের বাহিরে মাঠে কাতার বানিয়ে দাঁড়ালো! তাদের কারো চোখে কি কাতারের এই খালি স্থান কি নজরে পড়েনি। ইমামের কেরাতের প্রতি মনোনিবেশ দিলাম। তখনই ব্যাপারটা আঁচ করতে পারলাম! কেউ একজন গায়ে আতর মেখে মসজিদে ঢুকেছে এবং তার আতর থেকে মুরগী ফ্রাইয়ের কড়া ঘ্রাণ বের হচ্ছে। আশ্চর্য লোভনীয় খাদ্য ঘ্রাণ মেখে কেউ একজন মসজিদে এসেছে! তাকে বেকুব বলব, নাকি পাগল বলব মাথায় আসছে না। আগে থেকেই পেটে খিদে ছিল, মুরগী ফ্রাইয়ের লোভনীয় ঘ্রাণে খিদের প্রকোপ গিয়েছে বেড়ে। শুরুতে ঘ্রাণটি একটু ভালই লাগছিল কিন্তু পরিবেশ পাল্টাতে দেরী হল না। প্রথম রাকায়াত কষ্ট করে শেষ করলাম। দ্বিতীয় রাকায়াতে পেট মোচড় মারা ও মাথা ঘুরানো শুরু হলো। ভাবলাম! ইমাম সাহেবের কাছে কি ঘ্রাণটুকু পৌঁছেনি! ছোট্ট মসজিদের ভিতরে এই তেজী ঘ্রাণ তার নাক অবধি না পৌছার কথা নয়! দোয়া করছিলাম নামাজটুকু যদি তিনি তাড়াতাড়ি শেষ করেন! তাহলে এই যাত্রায় বাঁচি। মাশায়াল্লাহ! ইমাম সাহেব খুবিই জলদি নামাজ শেষ করলেন।
ভাবলাম, আজকে মসজিদ থেকে আমাকেই আগে বের হতে হবে, না হলে মুরগী ফ্রাইয়ের কড়া ঘ্রাণে আমি বেহুশ হয়ে পড়ব। নামাজ শেষে যেই মাত্র দরজা বরাবর ছুটতে যাব, মুহূর্তেই জনা দশেকের মত মত মুসল্লি দরজা বরাবর ভৌ দৌড় দিলেন। দরজায় মুসল্লি জট সৃষ্টি হল! কারো কথা বলার সুযোগ নাই, সবাই ফ্রেশ বাতাসের সন্ধানে আগে বাহির হতে চায়। শুধু পিছন থেকে ঈমাম সাহেবের তিরিক্ষি গলার আওয়াজে এতটুকু শুন লাম ‘শু হাজা! ক্যাফ নফর ফি দাখেল মসজিদ! হারাম হারাম…..’ অর্থাৎ ‘এটা কেমন বেআকল মানুষ! এখন মসজিদে ঢুকেছে, হারাম, হারাম ইত্যাদি…. বুঝতেই পারলাম সমস্যা শুধু আমার হয় নাই, আরও অনেকের হয়েছে।
আল্লাহর সৃষ্টি করা প্রতিটি ঘ্রাণই পরিমিত স্বভাবের। মানুষ যে ঘ্রাণ সৃষ্টি করে তা পরিমিত স্বভাবের মধ্য থাকেনা। হয়ত কম নয়ত বেশী। দুটোই স্বাস্থ্যের জন্য সমস্যা। আমি ব্যক্তি জীবনে খুবই ঘ্রাণ প্রিয় মানুষ ছিলাম। ঘ্রাণ মাখা মাখি নিয়ে অতীতে কিম্ভুতকিমাকার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলাম। তবে চিকেন ফ্রাইয়ের গন্ধ মেখে কেউ চিত্ত বিনোদন করতে চায় এমন ডিজিটাল স্বভাবের মানুষের কথা জানা ছিলনা। মিলাতে চেষ্টা করলাম এটা কি পাগলামি স্বভাব নাকি নিজেকে আলাদা করার জন্য এই ধরনের রান্নার ঘ্রাণ গায়ে মেখে মসজিদে এসেছে!

Discussion about this post