মসজিদ অর্থ সেজদার স্থান যদিও মানুষের ভাষায় তা আল্লাহর ঘর
বাংলাদেশের বেশীর ভাগ মানুষের ভাস্য মসজিদ আল্লাহর ঘর। এভাবে মানুষ মসজিদকে শ্রদ্ধা করে, কেননা মসজিদে গেলে মানুষ আল্লাহকে পায়। মূলত মসজিদ শব্দের প্রকৃত অর্থ হল “সেজদা করার স্থান”। আল্লাহর ঘর বলতে পবিত্র একটি স্থান আছে সেটার নাম “বাইতুল্লাহ”। আর সহজেই বাইতুল্লাহ বলতে কাবাকে বুঝায়। মসজিদ-আল্লাহ
ছবির এই মসজিদটি এক পিছিয়ে পড়া জনপদের হবে হয়ত (ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)। এক সময় আমাদের গ্রামের মসজিদ খানাও ঠিক এমন ছিল। সে মসজিদের মাধ্যমে আমরা নিয়মিত মুসল্লি হিসেবে গড়ে উঠতে পেরেছিলাম। ছাত্রাবস্থায় মসজিদের সেবা করাটাকে গৌরবের মত লাগত।
বর্তমান সময়ে মসজিদ নির্মানে নান্দনিকতা এসেছে
বর্তমানে আমাদের মসজিদেরও বিরাট পরিবর্তন হয়েছে। আসলে স্থানীয় মসজিদের চেহারা দেখলেই এলাকার মানুষের আন্তরিকতা ও সক্ষমতার ধারণা পাওয়া যায়। সব মুসলমানেরাই নিজেদের মসজিদকে সুন্দর সুবিধাসহ পরিপাটি রাখতে চায়। অনেক গাঁয়ে এমন দৃশ্যও দেখা যায়, তাদের নিজস্ব ঘরবাড়ির চেয়েও নিজেদের মসজিদ খানা অনেক নান্দনিক।
ছবির মসজিদের দৃশ্যে অসহায়ত্ব আছে কিন্তু অবহেলা আছে বলে মনে হলনা। ঝড়ো বৃষ্টির দিনে কৌণিক বৃষ্টির আঘাতে মানুষের বাড়ির দেওয়াল থেকে এভাবে চামড়া চলে যায়। মসজিদের চারিদিকে কারো বাড়িঘর না থাকায় মসজিদের এই করুণ দশা হয়েছে। কিন্তু চারিদিকের দৃশ্য নির্মল, নিবিড় পাখিডাকা একটি গাঁয়ের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।
মসজিদ কিসের তৈরি হতে হবে সেধা ধর্তব্য নয় বরং মসজিদে মুসল্লি আসে কিনা সেটাই মূল কথা
মসজিদ বাঁশের তৈরি নাকি মাটির; ইটের দালান কিনা বহুতল, সেটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। প্রকৃত কথা হল, এই মসজিদ থেকেই প্রতিদিন আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা দেওয়া হয় এবং দৈনিক দশবার ‘হাইয়া আলাল ফালাহ’ তথা ‘কল্যাণের দিকে ধাবিত হউন’ বলে মানুষকে আহবান করা হয়। এই ডাক শুনে লোকালয়ের কতজন মানুষ সাড়া দিয়েছে, সেটাই হল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
কোন ধনী ব্যক্তি কোথাও একটা মসজিদ বানিয়ে দিলেই মসজিদের কাজ হয়ে যায়না। মসজিদের প্রাণ হল মুসল্লি তথা নামাজি মানুষের সৃষ্টি। তাই সকলের কাজ হল, মুসল্লি বাড়ানোর চেষ্টা করা করা।
মুসল্লিরাই মসজিদ বানাবে, মসজিদে প্রাণের সৃষ্টি হবে, কল্যাণের রাস্তা প্রসস্থ হবে। বাংলাদেশের পরিমণ্ডলে মসজিদ নিয়েও বহু ঝামেলা হয় ব্যতিক্রমী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে। কয়েকটি তুলে ধরা হল।র
এই ধনী ব্যক্তির মসজিদ নির্মানের ঘটনা
এক ধনী ব্যক্তি দোয়া চেয়েছিলেন, তিনি এক জায়গায় একটি মসজিদ বানিয়ে দিবেন বলে কথা দিয়েছিলেন। আকর্ষণীয় একটি মসজিদ বানিয়েও ফেলেছেন। এলাকার মানুষ মসজিদের টাইলস এর জন্য আবারো তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। সর্বমোট পনের লাখ টাকা লাগবে। তাঁর ব্যবসা মন্দা যাচ্ছে, তাই দোয়ার আবেদন।
তাঁকে জানালাম যথেষ্ট হয়েছে, মসজিদে শান-শওকত করানো নাজায়েজ। আপনার দায়িত্ব ছিল অবকাটামো তৈরী করা এবং তাই হয়েছেও। টাইলস লাগানো যদি দরকার পড়ে, সে দায়িত্বটা এলাকার মুসল্লিদের দিয়ে দিন, তারাও সওয়াবের কাজে অংশ নিক, তাদেরও দায়িত্ব আছে।
আপনি বরং এই পনের লাখ টাকা দিয়ে অবহেলিত এলাকায় পনেরটি নতুন মসজিদের যাত্রা করিয়ে দিন। মনে হল কথাটি তাঁকে স্ট্রাইক করেছে, জানিনা পরে কি হয়েছিল।
আরেক ধনী ব্যক্তির মসজিদ নির্মানের ঘটনা
শহরের উপকণ্ঠে এক দরবেশের নামে মসজিদ। এই মসজিদের নামে শহরে জায়গা-জমি আছে, দোকান পাটও আছে। সুদি ব্যাংকে কোটি টাকার উপরে অলস পড়ে আছে! প্রতি শুক্রবারে নামাজের পরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের টাকা পয়সার সংক্রান্ত বৈঠক হয়।
মুতওয়াল্লী নির্বাচনে এলাকায় ভোট হয়। সেই ভোটের জমজমাট প্রচারণা চলে। মসজিদের টাকা যথাযথ কাজে লাগিয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি হচ্ছেনা বলে ঠেলা-ঠেলি, লাঠা-লাঠি হয়। তাদেরই হর্তা-কর্তা একজন কথা প্রসঙ্গে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলে জানালাম; এটা তো মোটেও সওয়াবের কাজ নয় বরং এই ধরনের ফেতনা-বাজি ও গোলমাল করার জন্য পুরো মহল্লার মানুষকে আল্লাহ শাস্তি দিতে পারেন।
এই মহল্লার আশে পাশে আরো অবহেলিত মসজিদ আছে কিন্তু দরবেশের নামে প্রতিষ্ঠিত মসজিদেই মানুষ অর্থকড়ি দেয়। অন্যগুলোর করুণ চিত্র। ব্যাংকে কোটি টাকা অলস রাখার কোন অধিকার আপনাদের নেই।
সবই আশ-পাশ ও অন্যান্য এলাকার দুর্বল অবকাঠামোর মসজিদ গুলোতে ব্যবহার করুন। কেননা মানুষ এই টাকা দেয় মসজিদের উন্নয়নের জন্য। আপনাদের এই অধিকার নাই যে, আপনাদের মসজিদ কখন নষ্ট হবে সে জন্য অপেক্ষায় থাকবেন, তখন টাকাটা এই কাজে লাগাবেন। আমার এই কথায় ভদ্রলোককে চিন্তিত মনে হল।
মসজিদ নির্মানের তৃতীয় আরেকট ঘটনা
গ্রামীণ জীবনে দেখা। অনেক মানুষ মসজিদে জায়গা-সম্পত্তি দেয়। কিন্তু মসজিদের নগদ আয় না থাকাতে সে সব জমি সরকারী সাব রেজিস্ট্রি অফিসে সরকারী ট্যাক্স আদায় করে রেজিস্ট্রি করে নেওয়াটা অনেক মানুষের পক্ষে সম্ভব হয়না।
তাই পিতা-দাদা কর্তৃক দেওয়া এসব জমি পরবর্তীতে সন্তান-নাতীরা আর দিতে চায়না। ছুটিতে গিয়ে দেখেছি পিতার দেওয়া সে ধরণের সম্পত্তি বিক্রি করে একজন হজ্জ করে এসেছেন। তিনি জানেন এটা অন্যায্য কিন্তু হজ্জ করার মাধ্যমে ন্যায্যতা পাওয়া যাবে।
আরেকজন মারা যাবার পরদিনই পুত্রবধু মানুষ লাগিয়ে দিয়েছে মসিজদের নামে শ্বশুরের দেওয়া যায়গাটি বিক্রি করে দেবার জন্য। আরেক পিতা ঈদগাহের ময়দান দিয়েছিলেন। ত্রিশ বছর ধরে ব্যবহার হচ্ছিল; রেজিস্ট্রি হয়নি।
পরবর্তীতে সন্তানেরা ঈদের দিনে কোন ছুতো-নাথা কথা তুলে আমাদের ঈদগাহ বলে চিল্লাত। মুসল্লিরা প্রতিবাদ করত, ফলে গোলমাল লাগত, এটাই চাইত ছেলেরা। অবশেষে মানুষ এই ঈদগাহ পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয়।
মসজিদ নির্মানের চুতর্থ আরেকট ঘটনা
স্কুল জীবনে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠতম এক দরগাহের মসজিদে করুন সুরে অনুনয় করে মসজিদের জন চাঁদা তুলছিল। কিছু টাকার অভাবে মসজিদের উন্নয়ন কাজটুকু আটকে আছে।
আমার ছোট্ট মনে আঘাত করে। বাড়ীতে ফিরে যাবার জন্য গাড়ী ভাড়ার রক্ষিত টাকার বিরাট একটা অংশ দিয়ে পাঁচ মাইল হেটে বাড়িতে পৌঁছেছিলাম। বিশ বছর পরে গিয়ে দেখি একি!! আজো সেই মসজিদ আগের অবস্থানেই!
চল্লিশ বছর পরে গুগল জিপিএস ব্যবহার করে মসজিদ খানা দেখার ইচ্ছে হল! না দেখাই ভাল ছিল! এক বছরে মিলিয়ন মানুষের আসা যাওয়া হয় এই দরগাহে। মূলত মসজিদে মুসল্লি বাড়ানোর ইচ্ছে এদের নেই, মসজিদের ভাঙ্গা অংশ দেখিয়ে টাকা তোলাই এদের মূল লক্ষ্য।
মসজিদ নির্মানে ফিতরা জাকাতের টাকা দেওয়া যায় না
পরিশেষে, মসজিদে জাকাত-ফিতরার টাকা দেওয়া না জায়েজ। রাস্তায় মাইক লাগিয়ে দান তোলা ও চাঁদার রসিদ বই হাতে নিয়ে মানুষের পিছনে ঘুরাঘুরি করাটা, আল্লাহর মহত্ব কে খাটো করিয়ে নেওয়ার সমতুল্য।
নিজের জন্য সুন্দর একটি ঘর বানানোর ইচ্ছে সবার থাকে। তখন নিজেদেরকেও এভাবে ভাবতে হবে যে, আমি দামী ভিলায় রাত্র যাপন করলাম আর আমার লোকালয়ের আল্লাহর ঘরকে অবহেলিত রাখলাম।
এটা নিজের জন্য অপমান কর এবং আল্লাহর দয়ার প্রতি অবহেলা। তাই আল্লাহর ঘরের সেবা করাটাকেও নিজের দায়িত্ব বানিয়ে নেওয়া উচিত। সর্বোপরি সেই কথা, মুসল্লির সংখ্যা বাড়লে মসজিদের আবাদ হবে।
মসজিদকে জীবিত রাখার জন্য অনেক মুসল্লির দরকার। এই কাজ সকল মুমিন-মুসলমানের।