অনেক সুবিধাবাদী ব্যক্তি ধান্ধায় থাকে, একবার যদি রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য পেয়ে যায়; তাহলে সম্ভাব্য সবদিকের সুযোগ কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদ মেরে, লুটে পুটে খাবে। যারা এসব কাজ করে, তারা জানে যে, এটা চরম গর্হিত, নিন্দনীয় ও ঘৃণিত কাজ। তাই কোনদিন হাওয়া বিপরীতে বইতে থাকলে তাদের জন্য সমূহ বিপদ ও অপমানের শেষ থাকবে না। ফলে সম্পদকে লুকিয়ে রাখতে তারা ভিন দেশের গুপ্ত পকেটের সন্ধানে থাকে। যেখানে খুবই নিরাপদের সাথে এসব চুরির মাল সংরক্ষিত থাকবে। অসময়ে এসব তুলে পায়ের উপর ঠ্যাং তুলে আরাম করে খাবে।
আমাদের দেশেও রাষ্ট্রীয় সম্পদ মেরে খাওয়া দুর্নীতিবাজ দের নজীর প্রায়শই দেখতে পাই। প্রকৃত কথা হল এসব মানুষ দৃশ্যত বাহিরের মানুষের দৃষ্টিতে সুখী ও সমৃদ্ধশালী মনে হলেও এরা প্রতিনিয়ত দেশে-বিদেশে চরম শঙ্কা নিয়েই বেঁচে থাকে। কেননা প্রথমত তারা যে স্থান থেকে শোষণ করে, সেখানে জীবনাশঙ্কায় থাকে। দ্বিতীয়ত যেখানে অর্থ সম্পদ স্তূপ করে, সেখানে এসব ছিনতাই হবার ভয়ে থাকে। কেননা তার পিছনে যথার্থ কারণ ও থাকে।
বিশ্ববিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও দার্শনিক ইবনে খলদুন বলেছেন,
“কেউ একবার রাষ্ট্রের নাগপাশে জড়িয়ে পড়লে তা থেকে মুক্তি পাওয়া খুবই কঠিন ও দুঃসাধ্য। এমনকি এরূপ পরিবেশ থেকে পলায়নে ইচ্ছুক ব্যক্তিটি যদি স্বয়ং রাষ্ট্রপ্রধানও হন, তথাপি জনগণ এবং তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী সগোত্রীয়রা তাকে এক মুহূর্তের জন্যও অনুরূপ কিছু করার অবকাশ দিবে না। যদি এমন কিছু লক্ষণ তার আচরণে প্রকাশ পায়, তা হলে তা তার রাষ্ট্র ও নিজ জীবনের ধ্বংসই ডেকে আনবে।” আল মুকাদ্দিমা।
আমরা এই চিত্র আমাদের চারিদিকে সর্বদা দেখতে পাই। রাষ্ট্রীয় সুবিধাভোগী তো বটেই, ধর্মীয় পণ্ডিত ও বিরাট ইসলামী ব্যক্তিত্বের সিংহ সদৃশ মুখাবয়ব পর্যন্ত বিল্লীর চেহারায় ধারণ করে। তাদের কথা-বার্তা, চাল-চলন, উপদেশ-খয়রাত সবই রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যে নিবেদিত হয়। মূলত এরা এসব স্বেচ্ছায় করেনা, এদের বিবেক এটাতে তাড়িত হয়। ভেবে থাকে কোনমতে আপাতত চাতুরী করে সরকারের সুদৃষ্টিতে থাকি। সুযোগ পেলেই চরিত্র বদলিয়ে পূর্বের স্থানে ফিরে যাব। মূলত এটা কোনদিনই আর হয়ে উঠে না। যা আমরা ইবনে খলদুনের উক্তি থেকে জানতে পারি।
আরো পড়ুন…
- দ্বীনের দ্বায়িদের আর্থিক সচ্ছলতা অধিক জরুরী
- বস্তুবাদী সরকার, নৈতিকতার প্রতিবন্ধক
- বিনম্রতা একটি স্বর্গীয় গুনাবলী
এর পর আসে রাষ্ট্রীয় সম্পদ পাচার-কৃত অর্থের কথা। বাহিরের মানুষের জানার সুযোগ থাকেনা যে, কে কত আত্মসাৎ করেছে। তবে আত্মসাৎকৃত অর্থের বৃহৎ একটি অংশই বাহিরের শক্তি ফাও মেরে দেয়। এটার জন্য না পারে উচ্চবাচ্য করতে আর না পারে মামলায় জড়াতে। যারা অন্যের অবৈধ সম্পদ কে নিরাপত্তা দেয়, তারা ভাল করেই জানে এসব চুরির মাল। তারাই এমন মেকানিজম করে এসব অর্থ-সম্পদ নিজেদের দায়িত্বে নিরাপদ রাখে, বিপদের দিনে যার সম্পদ সেও এটা উদ্ধার করতে পারে না।
পরিশেষে এসব সম্পদ না থাকে তার জন্য, না থাকে তার অধস্তন বংশের জন্য। আমাদের দেশের এক ধনকুবেরের ঘটনা আমরা জানি, যিনি উল্টো সরকারকে প্রলোভন দিয়েছিলেন যে, বিশাল অংকের টাকার কিছু উদ্ধার করে দিলে, সে তার কিছু অংশ দান করবে। আমরা দেখে থাকি, চোরাই সম্পদ দিয়ে অনেকে বহু-কিছু বানিয়েছে! মূলত যা দেখা যায়, এটা কিন্তু তার কিয়দংশ মাত্র। যেহেতু এই অর্থের স্বচ্ছতা থাকেনা, তাই এই সম্পদ রক্ষা করতে তাকেও অন্যায্য পথে বারে বারে অনেক অর্থ ঢেলে নিজেকে আবৃত রাখতে হয়। নতুবা পুরোটাই হারাবার ঝুঁকি থাকে। এই চরিত্র আমার দুর্নীতিবাজ শাহেদের জীবনে দেখেছি। সে অন্যায়কে অন্যায্য আচরণ দিয়ে বারে বারে ঢেকে দিতে চেয়েছে।
ত্রয়োদশ শতকের দার্শনিক ইবনে খলদুন মানুষের চরিত্রের এই দিকটি তখনও তিনি দেখেছেন। তিনি বলেছেন, “রাষ্ট্র যদি এরূপ পলায়নপর (সম্পদ চুরি করা) কোন সভাসদকে ছেড়েও দেন, তথাপি সম্পদ নিয়ে যাবার সুযোগ তাকে কোন মতেই দিবেন না। অন্যদিকে যদি ধরেও নেয়া যায় যে, কোন ব্যক্তি এরূপ সম্পদ নিয়ে অন্যত্র সরে পড়তে সক্ষম হল! সে দেশের দৃষ্টি তার উপরে পড়বে। তারা তাকে আকার ইঙ্গিতে ভয় দেখিয়ে বা প্রকাশ্যে জোর করে তার নিকট থেকে ছিনিয়ে নিবেই। কেননা তারা জানে যে, এ সম্পদ অন্য রাষ্ট্রের রাজকোষেরই অংশবিশেষ।” মোকাদ্দিমা।
এটা একেবারে সর্বজন বিদিত কথা যে, ভিন দেশে একবার বৈধ অর্থ গেলে, যেখান থেকে তা ফেরত আনা কঠিন। ইরাক, কুয়েত, লিবিয়া, ইরান তার জলজ্যান্ত উদাহরণ। ফলে সেখান থেকে অবৈধ অর্থকে যথাযথ কাজে লাগানো কিংবা নিজের ইচ্ছামত খরচ করার সুযোগও খুব কঠিন। শৃগাল যেমন অন্যের বাচ্চা ধরে নিজের সন্তানের উদর পূর্তি করে। আবার উড়ন্ত ঈগল শৃগালের বাচ্চা ছিনিয়ে স্বীয় বাচ্চার উদর ভর্তি করে। আত্মসাৎকৃত রাষ্ট্রীয় সম্পদের ব্যবহারও ঠিক এভাবেই হয়ে থাকে। কিন্তু সেই মানুষটি আজীবনের জন্য ঘৃণিত হিসেবে বিবেচিত হয়। এই কর্মকাণ্ডের কারণে এসব মানুষ ব্যক্তিজীবনে খুবই অসুখী হয় এবং শেষ বয়সে অবজ্ঞা ও তাচ্ছিল্যের মুখোমুখি হয়। তাছাড়া চরম পাপিষ্ঠ মানুষ হিসেবে দুনিয়া এবং পরকালে তার জন্য ক্ষুদ্রতম কোন কাজ অবশিষ্ট থাকেনা।