লেখক হয়ে লাভ কি

লেখক হয়ে লাভ কি

পৃথিবীর বেশীর ভাগ ধনীদের মুখে এই কথাটি শোনা যাবে যে, লেখক হয়ে লাভ কি? লিখালিখি করে কেউ কি ধনী হতে পেরেছে?

অধিকন্তু অনেক লেখক তো শাসক ও ধনীদের হয়েই লিখে থাকেন। এগুলো সবই সত্য উপলব্ধি কিন্তু কোনটাই স্থায়ী দৃষ্টান্ত নয়। সৎচরিত্র বিদ্বানের লিখা হাজার বছরের ইতিহাসকে চকচকে করে।

ধনী ব্যক্তির মৃত্যুর আগেই ধন লয় হতে থাকে কিন্তু বিদ্বানের লিখা অতীতের হয়ে কথা বলতে থাকে। একজন শত শত বছর মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে।
তার লিখার বিষয়-বস্তু হয়ত গত হয় কিন্তু তার লিখা অমর হয়ে থাকে। আমরা যাদুঘর আর লাইব্রেরীতে লিখাকেই সংরক্ষণ করি। লিখা থাকলেই মানুষ পড়তে পারে, সে জন্য পড়ার আগেই লিখার গুরুত্ব অপরিসীম।
বিদ্যালয়ের শুরু কথাটাই হল লেখা-পড়া। নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, আলাওল, শেখ সাদি, ওমর খৈয়াম, সেক্সপিয়ার, এরিস্টটল, সক্রেটিস সবাই লেখার মাধ্যমে বেঁচে আছেন।
গাজ্জালী, জালালুদ্দীন, ইবনে সিরিন, ইবনে খুলদুন, তাইমিয়া বেঁচে নেই কিন্তু তাদের লেখার আলোতে জন্ম হচ্ছে আরো হাজারো লেখকের।
দারায়ূস, অ্যালেক্সান্ডার আর সাইরাসের বিশ্ব-কাঁপানো কীর্তি বেঁচে আছে অন্য কারো লিখনির কল্যাণে। পৃথিবী কোন দিন কোন নরপতি কিংবা ধনীর ইতিহাসকে ধারণ করেনা।
সে জন্যই তো গজনীর প্রতাপশালী সুলতান তার কীর্তি জীবিত রাখতে, মহাকবি ফেরদৌসিকে প্রতিটি চরণের মূল্য, একটি স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে পরিশোধ করতে চেয়েছিলেন। এটাই হল লেখক হবার গুরুত্ব।
চেষ্টা করলে যে কেউ একজন লেখক হতে পারে। কেননা লেখা-পড়া করাটাই মানব জীবনের প্রকৃত স্বভাব। এখানে ইচ্ছাটাই সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ডাবলিনের বিশ বছর বয়সী সেই আইরিশ ছেলেটির কথা কি মনে আছে? যে সাহিত্যিক হবার জন্য ব্যাংক ক্যাশিয়ারের চাকুরী ছেড়ে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমিয়েছিল?
অথচ তিনি ভাল ইংরেজিই জানেন না কিন্তু তাঁর অদম্য ইচ্ছা তিনি সেক্স পিয়ারের প্রতিদ্বন্দ্বী হবেন! তাই তিনি প্রতিদিন ফুলস্ক্যাপ কাগজে পাঁচ পৃষ্ঠা করে লিখতেন।
একদিন বাদ পড়লে দশ পৃষ্ঠায় সেটা পূরণ করতেন। এ কাজ করতে গিয়ে তিনি চরম আর্থিক অনটনে পড়ে যান। অভাব তাঁকে এতটুকু ঘিরে ফেলেছিল যে, ভাল কাপড়ের অভাবে তিনি প্রকাশ্যে ঘর থেকে বের হতেন না।
তারপরও তিনি লিখতেন একজন নেশায় মত্ত মাতালের মত। ফলে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ইংরেজিতে একজন জগত বিখ্যাত শ্রেষ্ঠ প্রাবন্ধিক, উপন্যাসিক এবং ছোট গল্পকার।
নাম তার জর্জ বার্ণাড শ। একজন আনাড়ি মানুষ জ্বলে উঠেছিলেন কলম হাতে নিয়ে। আইরিশ ভাষার মানুষটি শুধু ইংরেজিতেই দখল নেন নি, তিনি সে ভাষায় রচনা করেছেন আলোচিত সব রম্য নাটক; ফলে ১৯২৫ সালে তিনি অর্জন করেছিলেন নোবেল পুরষ্কার।
রাউলিং নামটি অনেক পাঠকের কাছে পরিচিত মনে হবে। যার মা ছিলেন চাকুরীজীবী এবং ঘরে থাকা দুই কন্যা যাতে সময় কাটাতে পারে সে জন্য কিনে আনতেন দারুণ সব মজার বই।
ছোটবোনকে শোনাতে রাউলিং নিজেও বানিয়ে গল্প লেখতেন। এসব লিখিত গল্প শুনে ছোট বোনের উৎফুল্লতা দেখে রাউলিং এর মনে ইচ্ছা জাগে একদিন সে লেখিকা হবে।
রাউলিং পাতাল ট্রেনে চড়ে ম্যানচেস্টার থেকে লন্ডনে যাচ্ছিলেন। চার ঘণ্টার এই যাত্রায় যাত্রীদের প্রচণ্ড ভিড়। হাঁস-ফাঁস করা ভিড়ের দীর্ঘ যাত্রায় তার কল্পনায় ভেসে উঠে তার কৃপণ ফুফুর ঘরে অনাদরে, কষ্টে বেড়ে উঠা এতিম শিশুর মুখচ্ছবি।
যার অসহায় মুখেই ফুটে থাকে হাসির প্রতিচ্ছবি। তিনি সিদ্ধান্ত নেন তাকে সামনে রেখেই লিখা শুরু করবেন। J. K. Rowling  ছপ্দনামে তিনি লিখে ফেললেন  Harry Potter নামে বিশ্ব-কাঁপানো কল্প-উপন্যাস। 
যার প্রতিটা বইয়ে সিনেমা ও ভিডিও গেম সৃষ্টি হয়েছে; অনুবাদ হয়েছে বহু ভাষায়। সারা বিশ্বে বিক্রিত বইয়ের তালিকায় সারা বিশ্বের চতুর্থ নম্বর আসন  দখল করে।
সারা পৃথিবী থেকে নগদ অর্থের পাহাড়, সম্মান আর সম্মাননা তার পায়ে লুটাতে থাকে। সে যে কীর্তি সৃষ্টি করেছে, তা মিলিয়ন ডলার খরচ করেও অর্জন করা সম্ভব হতো না।
আর বিলিয়ন খরচ করলেও এত সুখ্যাতি কোনদিন আসত না। লেখা মানুষের মনস্তাত্ত্বিক চিন্তার উপর প্রবল প্রভাব ফেলতে পারে, তাই কলম আর লেখার এত জোড়, এত শক্তি।
নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল, এমনকি মানুষের প্রাণ সৃষ্টির বহু আগেই সৃষ্টি হয়েছে কলম। শুরু হয়েছে লেখা; সৃষ্টির বিন্যাস ও মানুষের তকদির। তারপর সৃষ্টি হয়েছে মানুষ।
ইসলামের ধর্মীয় বিশ্বাসে এই কথাটি খুবই গুরুত্বের দাবী রাখে। কেননা এই কথাটি বলেছেন, স্বয়ং আল্লাহ। লেখার গুরুত্ব কত তাৎপর্যময় তা এই উদাহরণ থেকেই বুঝে নিতে পারি।
যে জাতির মধ্যে পরিশীলিত লেখকের সংখ্যা বেশী সে জাতি তত উন্নত বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয়। যে জাতি পড়ে বেশী, সে জাতি লেখে বেশী। আবার যে জাতি লেখে বেশী, সে জাতির কাছে দ্বারস্থ হয় অন্য জাতি।
তাই লেখার মাধ্যমে ব্যক্তি হয়ত ধনী হয়না কিন্তু জাতি ও রাষ্ট্রকে শিক্ষিত ও সমৃদ্ধশালী বানাতে লেখা ও লেখক বিরাট গুরুত্ব বহন করে।