যে মানুষের শুনার অভ্যাস আছে, সে বেশী প্রজ্ঞাবান হয়। পাঠশালায় যে শিক্ষার্থী বেশী শুনায় মনোনিবেশ করে, সে এক সময় সেরা মেধাবী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। আর যে মানুষ বেশী বলতে চায়, সে অন্যের মনের গুরুত্ব বুঝে না, নিজেও কোন কিছুর গভীরে যেতে পারে না অধিকন্তু সে নিজের অজান্তে নিজের ভুল প্রকাশ করে।
শিশুরা একটা বয়সে গল্প শুনতে চায়। প্রকৃতপক্ষেই শিশুরা গল্প শুনতে চায় না, অভিভাবকেরাই বিরক্ত হয়ে যা তাকে শোনায় সেটাকে গল্প হিসেবে চালিয়ে দেয়। সে সময় তাকে যদি ইতিহাসের কোন কাহিনী শুনানো হয়, কোন শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির বাল্যকালের জীবনী শুনানো হয়, সে তাও শুনবে। গভীর মনোনিবেশ সহকারেই শুনবে। মূলত শিশুরা এমন কথা শুনতে চায়, যা তাকে আনন্দ দিবে, উৎসাহিত ও উৎফুল্ল করে তুলবে। কেননা ঠিক এই বয়সটাতেই শিশুরা এমন তথ্য যোগাড় করতে চায়; যা দিয়ে আগামীকাল কিংবা তার পরের দিনে চিন্তা-ভাবনা করার জন্য মাল-মসল্লার হিসেবে কাজে আসবে।
শিশুরা বড়দের দেখে যে, যারা কথা বলে এবং উপস্থাপনা করে তাদের কদর বেশী। এসব মানুষ অন্যের দৃষ্টিকে নিজের দিকে ধরে রাখতে পারে। তাই শিশু এই যোগ্যতা অর্জন করার জন্য অভিভাবকদের নিকট থেকে কথা শুনতে চায়। ঠিক পরের দিন থেকেই তার মন-মগজ এই বিষয়টি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। গত রাতের শোনা কথাটি সে তার বোন, মা, দাদী কিংবা বন্ধুদের শুনিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বুঝতে চাইবে, সে এখন গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। কাউকে না পেলে প্রয়োজনে সে নিজেকে লক্ষ্য করেই কথা বলবে। উল্লেখ্য শিশুরা সেই শোনা কথা দিয়েই তার যোগ্যতাকে ঝালাই করতে চেষ্টা করে। ফলস্বরূপ, যে শিশু বেশী জানে সে তার সমবয়সীদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠে। সবাই তার কথা শুনতে চায়, মানতে চায় এমনকি পরামর্শও চাইবে। যে শিশু এ কাজে ভূমিকা রাখতে পারেনা, সে হিংসুক পরশ্রীকাতর হিসেবে বেড়ে উঠবে।
শোনার গুরুত্ব কতটুকু বেশী সেটার স্বপক্ষে পবিত্র কোরআনের বহু আয়াত রয়েছে। মহানবী (সা) এর কাছে যে পর্যায়ের মানুষই আসত না কেন, তিনি তাদের কথা মন দিয়ে শোনেই তারপর উত্তর দিতেন। সে কারণেই তিনি জগতের সবার প্রশংসনীয় মানুষ হিসেবে পরিগণিত হয়েছিলেন। যিনি মন দিয়ে শুনে, তার বন্ধু সংখ্যা বাড়ে। তাই একটি শিশুকের শ্রেষ্ঠ মানুষ সৃষ্টির প্রধান অন্যতম সুময় হল যখন সে শুনতে চায়। তখনই সুযোগ তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলিয়ে দেওয়া। মানুষের বৈশিষ্ট্য হল, তাদের বয়স বাড়ার সাথে সাথে তারা উপদেশ দিতে চায়, বলতে চায় বেশী কিন্তু শুনতে চায় কম! শিশু বয়সে এই পর্যায়ে যখন শিশুরা শুনতে চায়, তখন তাদেরকে আল্লাহ-পরকাল, ফেরেশতা, নবীদের জীবনী শুনানো উচিত। সাথে সাথে উত্তম ইতিহাস, চরিত্র-গঠন মূলক ঘটনা, কোন সেরা ব্যক্তির ছোটকালের জীবনী, গরীব ছেলেদের সংগ্রামী জীবন, কঠোর পরিশ্রমের উপকারিতা, অলস ব্যক্তির পরিণাম সহ বিভিন্ন কাহিনী আকর্ষণীয় পদ্ধতিতে একবার গিলিয়ে দিতে পারলে; সে ছেলে পরবর্তীতে মেধাবী, ধৈর্যশীল, সকল বিষয়ের প্রতি গভীর মনোনিবেশ কারী হবে। অনর্থক হাসির ঘটনা বলে, শিশুদের হয়ত ঘুম পাড়ানো যায় কিন্তু সে সব শিশু বাস্তবমুখী হয়না। শিশু গল্প শুনতে চায় বলে তাকে কার্টুন ছবি ধরিয়ে দেওয়া তার প্রতি চরম অবজ্ঞার শামিল। আর তা করে থাকেন স্বয়ং বাবা-মা। যার পরিণতি কখনও ভাল হয়না। মনে রাখা উচিত, মানুষের সকল কেন্দ্রীয় কার্যক্রম কিন্তু চিন্তা-ভাবনা দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত। তাই অভিভাবকেরা চিন্তার জগতে শিশুকে যদি একবার পথ চলার ব্যবস্থা করে দিতে পারে, সে শিশু বাস্তব জীবনে উপকার তো আসেই, এ ধরনের শিশু পিতা-মাতার উত্তম সঙ্গী হিসেবে কাজে আসে।