১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের পতন ছিল এক জটিল ও বহুমুখী ঘটনার ফল। এর পেছনে কেবল একটি নির্দিষ্ট কারণ ছিল না, বরং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক বিভিন্ন সমস্যার এক সম্মিলিত প্রভাব কাজ করেছিল। ১৫ আগস্টের সামরিক অভ্যুত্থান ও হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে এই পতন ঘটেছিল, যার পটভূমিতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ চিহ্নিত করা যায়:
বাকশাল প্রতিষ্ঠা ও একদলীয় শাসন:
১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমান বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্রের পরিবর্তে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা, “বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ” (বাকশাল) প্রতিষ্ঠা করেন। এর মাধ্যমে সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা হয় এবং চারটি সরকারি পত্রিকা ছাড়া বাকি সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর ফলে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয় এবং বিভিন্ন বিরোধী দল ও গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে তীব্র সমালোচনা আসে।
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতা:
স্বাধীনতার পর থেকেই দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছিল। তৎকালীন বিরোধী দল জাসদ (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল) সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে এবং ‘গণবাহিনী’ নামে একটি সশস্ত্র শাখা গঠন করে। এই সহিংসতা মোকাবিলায় সরকার ‘জাতীয় রক্ষীবাহিনী’ গঠন করে, যার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণসমূহ:
১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ: ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ সরকারের জনপ্রিয়তা মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেয়। ব্যাপক বন্যা, খাদ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যশস্যের উচ্চ মূল্য এই দুর্ভিক্ষকে আরও তীব্র করে তোলে। যদিও সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করেছিল, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে ত্রাণ কার্যক্রমে ব্যাপক বাধা আসে।
ব্যাপক দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা:
স্বাধীনতার পর থেকেই দেশে দুর্নীতি ও লুটপাট ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। অনেক ক্ষেত্রে সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরাও এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। শেখ মুজিবুর রহমান নিজেও তাঁর এক ভাষণে এই দুর্নীতির কথা স্বীকার করেন। এই অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দেয়।
আইন-শৃঙ্খলার অবনতি:
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতি হয়। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড এবং সাধারণ অপরাধের কারণে জনগণের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি পায়।
সেনাবাহিনীর অসন্তোষ:
সেনাবাহিনীর একটি অংশের মধ্যে নানা কারণে অসন্তোষ ছিল। বিশেষ করে, সেনাবাহিনীর নিয়মিত সদস্যদের পরিবর্তে জাতীয় রক্ষীবাহিনীর প্রতি সরকারের অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এবং সেনাবাহিনীর নিজস্ব অভ্যন্তরীণ কোন্দল এই অসন্তোষের কারণ ছিল।
১৫ আগস্টের ঘটনা:
বলা হয় সামরিক বাহিনীর কিছু উচ্চাভিলাষী ও বিপথগামী জুনিয়র অফিসাররা এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড ও সামরিক অভ্যুত্থান ঘটায়। এই ষড়যন্ত্রের পেছনে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গোষ্ঠীর ইন্ধন ছিল বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন।
এই সবগুলো কারণ একত্রিত হয়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পটভূমি তৈরি করেছিল, যার ফলে শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের পতন হয় এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।
সেই কারণে বিশ্ব মিডিয়া শেখ মুজিব সরকারের কার্যক্রমকে “তলা বিহীন ঝুড়ি” কিংবা “তলা ফাটা ব্যাগের” সাথে তুলনা করেন।


Discussion about this post