জীবন্ত কবর: অতি-প্রাকৃতিক গল্প

জীবন্ত কবর

তড়াৎ করে লাফিয়ে উঠতে গিয়ে তালুকদার সাহেবের মনে হল কাঁথা-কম্বলের বাধন যেন তাকে আঁকড়ে ধরেছে? এভাবে প্রায় সময়ই তালুকদার সাহেবকে রাতে ভুতে ধরে। কেউ বলে বোবা ধরেছে, কেউ বা বলে জিন। ভুত, বোবা, জিন যাই হউক, এই অবস্থায় শরীর বিলকুল ঘুরানো যায়না। অনেক চেষ্টা করেও হাত-পা নাড়াতে পারে না। এটাও সেই চিরাচরিত বোবায় ধরেছে ভেবে সম্বিত ফিরে পেতে একটু সময় নিলেন। জীবন্ত কবর: অতি-প্রাকৃতিক গল্প

আরো পড়তে পারেন…

  • অলিম্পিকের দেশে, ম্যারাথনের পদযাত্রা (ভ্রমণ কাহিনী)
  • কঠোর চিত্তের সন্তান! পিতা-মাতা সদা ভাগ্য বিড়ম্বিত হয়
  • হিন্দি চ্যানেলের উপকারিতা! (তিক্ত স্মৃতি)

চারিদিকে ঘন অন্ধকার! বুঝতে পারছেন না এখন রাত কয়টা বাজে। বরাবরের মত পিছনের দেওয়ালে টাঙ্গানো ঘড়ির কাঁটার রেডিয়ামের আলোর সাহায্য নিয়ে সময় দেখতে গিয়ে বুঝলেন, তার মাথার নিচে বালিশ নাই! মেজাজ টা বরাবরের মতই তিরিক্ষি হয়ে উঠল, ঘড়িটাও বরাবর জায়গায় নেই। গোস্বাটা গিয়ে মিসেস তালুকদারের উপর গিয়ে পড়ল। দিন দিন তারও অসুস্থতা ও দুঃচিন্তা বাড়ার কারণে সবকিছুতে জট-পাকিয়ে ফেলে, ফলে কোথাকার জিনিষ কোথায় রাখে, সেটাই মনে থাকেনা। শুয়ে শুয়ে এক মিনিটেরও কম সময়ের এত ভাবনা-রাশি তালুকদারের চিন্তার উপর ঝড় তুলে।

চারিদিকে উষ্ণ গরম, সবই ঘামে ভিজে একাকার। তালুকদারের মনে হল, কুসম গরম পানিতে তিনি শুয়ে আছে। আসলে এসব তার শরীরেরই ঘাম। হাতটাকে নাড়াতে চাইলেন, আগের মতই দেহের সাথে সেঁটে আছে! মনে হচ্ছে কোন একটা আবরণের কারণে হাত বের করা যাচ্ছেনা। তবে কি এখনো তিনি বোবার দখলে আছেন? ভাবছেন, পূর্বের অভিজ্ঞতায় দেখেছেন, ঘুমের ঘোরে বোবায় যখন ধরে, তখন পাশের কেউ ডাকলেও মুখ থেকে উত্তর বের হয়না। বাহিরের কোলাহল শোনা গেলেও সম্বিৎ ফিরে আসেনা। নিজের হাতগুলো উপরে তুলতে পারে না। তবুও কেন জানি মনে হল আজকের অনুভূতি একটু ভিন্ন প্রকৃতির!
তালুকদারের এজমার সমস্যা আছে, মনে হচ্ছে বাতাসেই যেন অক্সিজেন কমে গেছে। সকল এজমার রোগীদের কাছে এমনিই মনে হয়। ইন-হেলার টা কোথায় জানি রাখা হয়েছিল? ঠিক করে চিন্তা করতে পারছিল না। মাথা ঠাণ্ডা করে শোয়ার মধ্যেই বুঝতে চেষ্টা করলেন, গতকাল কবে কখন কোথায় শুয়েছিলেন? কি খেয়েছিলেন? শেষ বার কার সাথে কথা হয়েছিল, ইত্যাদি।
কোন তথ্যই তিনি সঠিক ভাবে মনে করতে পারছেন না। অকাজের কিছু স্মৃতির সাথে বরাবরেই মতই সেই দুটো ভয়ঙ্কর মৃত্যুযাত্রার কথা আজো মনে পড়ে। তিন ভাবছেন, যা ভুলতে চেষ্টা করা হয় তাই মনে থাকে, যা মনে রাখার দরকার সেটই মনে থাকেনা। ঠিক এই মুহূর্তে কেন জানি অতীতের সেই ভয়ঙ্করতম ঘটনাগুলো তাকে চেপে ধরেছে।
তালুকদারের এক ভয়ানক রোগ আছে, যে রোগের হেতু কি এখনও ডাক্তারেরা বের করতে পারেনি। বিগত ২০৩০ সালেই সারা বিশ্বের সকলকে টিকা দিয়ে করোনা রোগ থেকে মুক্ত থাকার প্রতিষেধক দেওয়া হয়েছে। ২০৫০ সালেই শেষোক্ত ম্যালেরিয়া রোগীর দেহ থেকে সর্বশেষ বিষ নষ্ট করা হয়েছে! আজ ২০৮০ সাল, বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ যুগেও তালুকদার সাহেবের এমন বিদঘুটে রোগের চিকিৎসা দূরে থাক, চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা রোগের কারণই উদ্ধার করতে পারে নি! এই রোগীর সংখ্যা দিন দিন বেড়ে যাবার কারণে ডাক্তারেরা এটাকে “ডিপ হিস্টিরিয়া” বলে নথিভুক্ত করে থাকেন।
‘ডিপ হিষ্টিরিয়া’ মূলত দ্বাবিংশ শতাব্দীর এক কঠিন রোগ। এই রোগে আক্রান্ত হলে, মানুষ মারা যায়। রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায় এবং নাড়ীর কোন স্পন্দনই থাকেনা। তাই ডাক্তারেরা তাকে মৃত বলে ঘোষণা দেন। অর্থশালী মানুষেরা “ক্রিটিক্যাল ক্লিনিক্যাল ডেথ কন্ডিশনের” রোগী হিসেবে তাদের স্পেশাল আইসিউতে স্যালাইন দিয়ে নজর-দারীতে রাখে। দেখা গেছে সেখান থেকেও ১০ শতাংশ মৃত রোগী আবার প্রাণ ফিরে পায়, বাকিরা সন্তানদের ফতুর বানিয়ে গোরস্থানের অধিবাসী হয়।
তালুকদার সাহেবও ঠিক একবার এভাবে মারা গিয়েছিলেন! মসজিদের মাইকে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মৃত্যু সংবাদ প্রচারিত হয়েছিল। পরের দিন সকালে দাফন হবে, আত্মীয়রা তার লাশকে ঘিরে কোরআন পড়ছিল, শেষ রাত্রে হঠাৎ তার মৃত শরীর নড়ে চড়ে উঠে। ভুতের উপদ্রব ভেবে উপস্থিত সবাই মুহূর্তে যার যার মত করে পালিয়েছিল। পরে স্বজনেরা উঁকি দিয়ে দেখে, না তালুকদার মরে নি, তিনি জীবিত হয়ে উঠেছেন!
দ্বিতীয়বারের ঘটনাও ভয়ানক। তালুকদার মারা গিয়েছে, ডাক্তারেরা ঘোষণা দিয়েছে একেবারে শূন্য পালর্স, এটাকে জীবিত বলার কোন সুযোগই নাই। সন্তানেরা অনির্দিষ্টকাল ধরে আইসিউতে রাখতে ইচ্ছুক নয়। মৃতের গোসল শেষ হয়েছে, জানাজা সম্পন্ন হয়েছে, ঠিক কবরে নামানোর আগ মুহূর্তেই লাশ নড়ে চড়ে উঠে! এ ধরনের ঘটনা দেশের বিভিন্ন জায়গায় বেশ কয়েকটি ঘটেছে। এতে করে জানাজায় অংশগ্রহণ কারী মানুষের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। অনর্থক কথা রটে। কেউ মারা গেছে ঘোষণা দেবার পরেও সন্তানদের উপর চাপ আসে যে, সঠিকভাবে মরেছে কিনা সেটা নিশ্চিত হতে লাশকে কিছুদিন ঘরে রাখ। পচা দুর্গন্ধ বের হলেই সিদ্ধান্ত নাও ইত্যাদি।
এ ধরনের ঘটনা, বিত্তশালী তালুকদার সাহেবের জীবনে দুবার ঘটেছে। তিনি সন্তানদের এ ব্যাপারে বারে বারে তাগিদ দিয়ে রেখেছে যে, তার মৃত্যু হলে উপশহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থিত শপিং কমপ্লেক্স বিক্রি করে হলেও তাকে যেন আইসিউতে রাখে। এই শপিং কমপ্লেক্সের কারণেই তার পরিবার বিশাল অর্থ বিত্তের মালিক। মৃত্যুর পরে সন্তানেরা আদৌ সেটা বিক্রি করতে চাইবে কিনা সে সন্দেহ সবসময় তালুকদার কে ভাবিয়ে তুলত! এসব ভাবতে তালুকদার আরো কিছু সময় নষ্ট করলেন।
তার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল, কেমন জানি একপ্রকার গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে, ঠিক কর্পূরের গন্ধের কাছাকাছি। পুরো শরীর ঘেমে একাকার। মনে হচ্ছিল ক্ষীণস্বরে দূরের কোথাও থেকে যেন চিৎকার ও কোলাহলের ধ্বনি ভেসে আসছে এবং নিজের মাথার উপরের ছাদে ধুপধাপ শব্দ করে কেউ কাজ করছেন। হঠাৎ মনের ভিতরে বাজে প্রশ্নের উদয় হল, “আচ্ছা এটা আমার তৃতীয়বারের মৃত্যুর ঘটনা নয় তো”!
চরমভাবে হতচকিয়ে উঠলেন। এতক্ষণ বোবার ঘোরে ছিলেন। দুই হাতের কুনই দিয়ে সজোরে দেহের দুপাশে ধাক্কা দিলেন। মুহূর্তেই বুঝে ফেললেন, তার চরম সর্বনাশ ঘটে গেছে। দুইপাশেই ঘরের দেওয়াল সংক্ষিপ্ত, কনুই দিয়ে মাপা যায়। এ ধরনের সংক্ষিপ্ত যায়গা একমাত্র কবরের ভিতরেই বিদ্যমান। দু’হাত বের করে, দশ সেকেন্ডের ভিতরেই, বুকের উপর থেকে হাতড়ায়ে কাফনের বন্ধন খুলে নিয়ে, ধড়পড় করে বসে পড়ে তালুকদার এবং সজোরে চিৎকার করে বলে উঠলেন, বাবারে কবরের ভিতরে আমি জিন্দা আছি, কবর খুলে নাও।
দেহের সর্বশক্তি দিয়ে তালুকদার যেভাবে চিল্লায়ে উঠেছিল, ভূ-পৃষ্টের আলো-বাতাসে এই শব্দ অন্তত এক কিলোমিটার দূরের মানুষও শুনতে পেত। কিন্তু কবরের সোঁদা-ভিজে মাটির আস্তরণ যেন পুরো শব্দটিকেই গিলে ফেলেছে। আরো একবার চিল্লায়ে উঠে কিন্তু শব্দের কোন স্পন্দন সৃষ্টি হলনা। এবার দেহের, বুকের ও মুখের সমুদয় শক্তি একত্র করে বিশাল আকারের একটি চিল্লানি দিল! তালুকদার নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না, এত বড় চিল্লানির আওয়াজ এত ছোট হয়ে যায় কিভাবে! তালুকদার হৃদয়ের সকল উপলব্ধি দিয়ে বুঝতে পারছেন, মাথার এক হাত উপরেই তার সকল আত্মীয় স্বজন উপস্থিত।
কেউ কবরে মাটি ঢালছেন কেউ মাটির ঘনত্ব পুরো করছে। তালুকদার বাহিরের এসব ব্যস্ত মানুষের ক্ষীণ কণ্ঠের উচ্চারণ শুনতে পাচ্ছেন, তিনি তাদের কাউকে চিনতেও পারছেন কিন্তু তাদের কেউ জানতে পারছে না তালুকদার তৃতীয়বারের মত প্রাণ ফিরে পেয়েছেন এবং তিনি তাদের সামনের গর্তের ভিতরেই বসে আছে।
তালুকদার কবরের ভিতরে বসেই বাহিরের একটি নতুন কান্নার স্বরকে চিনতে পারলেন। এটা তার ছোট ছেলের কণ্ঠস্বর। প্রবাসে থাকে, বুক ফাটিয়ে বিলাপ করছিল কয়েকটি ঘণ্টা অপেক্ষা করলে সে পিতার মৃত লাশটাকে দেখতে পারত। এতে করে তালুকদারের দেহে আবার কিছুটা প্রাণ শক্তি ফিরে পেলেন! সজোরে চিল্লানী দিয়ে মাথার উপর বানানো ছাউনিতে কিল ঘুষি দিতে থাকলেন। যাতে করে উপরের জিন্দা মানুষেরা কবরস্ত মানুষের নড়াচড়ার অনুমান পায়।
অনিয়ন্ত্রিত কিল ঘুষিতে তালুকদার খুবই ব্যথা পায়। তিনি বুঝতে পারেন নি মাথার উপরে ছাউনির কর্তিত বাঁশের ফালা গুলো নিচের দিকেই রাখা হয়েছে। এগুলো খুবই ধারালো তাই হাত দুটো কেটে ছিঁড়ে একাকার। সম্ভবত বেজায় রক্তপাত হচ্ছে, ঘন অন্ধকারে জিহ্বায় লাগিয়ে দেখলেন অনুমান সত্য। মাটির আস্তরণ আরো পুরু হল, বাহিরের শব্দের গতি আরো ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হল এবং তালুকদারের বেঁচে থাকার সকল সম্ভাবনা তিরোহিত হল।
এই প্রথম তালুকদার চিন্তা করছেন, কবরের এই ছোট্ট কুঠুরিতে বেচে থাকার মত আর কতক্ষণ সময় পাবে! কি পরিমাণ অক্সিজেন এখানে বাকি আছে। ইতিমধ্যেই তিনি শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট পাচ্ছেন ফলে প্রতিটি নিঃশ্বাসই খুবই দামী। কি করা উচিত, কি করলে আরেকবার বেচে গিয়ে দুনিয়ার মাটিতে পা রাখতে পারবে, তা ঠিক করতে পারছে না। দুনিয়ার বুকে সদম্ভ পদচারণার সময় এধরনের কথা ভেবে দেখেনি অক্সিজেন কত দামী। জান বের হওয়াটা কত কষ্টের এবং বেঁচে থাকার সংগ্রাম যে কত কঠিন! অনেক বিক্ষিপ্ত স্মৃতি উল্টোপাল্টা ভাবে মনে গুঁতো দিচ্ছে। ছেলেরা কি শপিং কমপ্লেক্স বিক্রি করেছে। মৃত্যু মনে করেই কি তাকে জলটি কবরে ঢুকিয়ে দিয়েছে? নাকি দীর্ঘদিন আইসিউতে রাখার পরেই কবর দিয়েছে।
কাটা হাতের রক্তের স্বাদ নিতে গিয়ে, তালুকদারের পানির পিয়াসা উঠেছে চরমে। প্রতি মুহূর্তে ভীতি ও সংশয় বাড়ছে। তিনি নিশ্চিত, এখানেই তাকে মরতে হবে কিন্তু কতক্ষণ পরে এবং কিভাবে? অক্সিজেন যখন একেবারেই শেষ হয়ে যাবে, তখনকার শেষ নিঃশ্বাস টানার জন্য তিনি কেমন আচরণ করবেন, ইত্যাদি। ঠিক সেই মুহূর্তে তার চোখের সামনে ভেসে উঠল, সামনের বাড়ীর সেই ইয়াতীম ছেলের করুন মুখচ্ছবি।
যার পিতা কিছু দামী ভু-সম্পত্তি রেখে মারা যায়। এই সম্পত্তির লোভে, তার অভিভাবকত্ব পেতে অনেকেই আগ্রহী ছিল। ফলে এই অনাথ শিশুর শুভাকাঙ্ক্ষী ও শত্রু  দুটোই সৃষ্টি হয়েছিল। একদা চুরির অভিযোগে, কিছু মানুষ গণপিটুনির নামে দূরের এক বিলে ছেলেটিকে একবার পানিতে চোবাচ্ছিল, আরেক বার তুলে আনছিল। সে চুরি করেনি বললেই, আবারো পানিতে চোবাচ্ছিল। নাকে মুখে পানি ঢুকে তার মুখ ফুলে উঠেছিল, চেহারা বীভৎস আকার ধারণ করল। কেউ তার প্রতি ন্যুনতম মায়া-দয়া দেখাচ্ছিল না। তালুকদার নিরাপদ দূরত্ব থেকেই সে করুন দৃশ্য দেখছিল, তিনি ইচ্ছে করলে একাই ছেলেটিকে উদ্ধার করতে পারতেন কিন্তু করেন নি!  তিনি ছেলেটিকে বাঁচাতে কোন ভূমিকা রাখেন নি, কারণ ছেলেটির পিতার সাথে সংঘাত পূর্ণ একটি অমীমাংসিত জায়গাতেই তার শপিং কমপ্লেক্স করার চিন্তা মাথায় ঘুরপাক করছিল।
ছেলেটির মৃত্যুর পর প্রমাণিত হয় সে চোর নয়, দুনিয়ার বুকে হেটে চলা সবল মানুষের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে গণপিটুনির মামলাও একদিন খারিজ হয়। এই নিকষ অন্ধকার কবরে বসে সেদিনের ঘটনা যেন তিনি দিনের আলোর মত পরিষ্কার দেখছিলেন। প্রতিটি নিঃশ্বাসে বারে বারে এই ভয়ঙ্কর চিত্রটিই তালুকদারের চোখে ভাসছিল। ভাবতে দিয়ে একপর্যায়ে তালুকদার কান্না শুরু করে। ছেলেটি পানির ভিতরে অক্সিজেনের অভাবে মরেছে আর আজ তালুকদার মরবে বাতাসে অক্সিজেনের অভাবে। তার চেয়েও কঠিন করুণ ভাবে। অথচ মাথার উপরে দাড়িয়ে এখনও আত্মীয় স্বজনেরা, আল্লাহর কাছে তার আত্মার মাগফেরাতের জন্য কান্না করছে।
একেবারে শেই সময়ে তালুকদারের মনে পড়ল আল্লাহর কথা। সুখে-সমৃদ্ধিতে দিন কাটানোর ফলে আল্লাহকে ডাকার কথা তেমন একটা ভাবেনি। মনেও উদয় হয়নি প্রয়োজনও হয়নি। আজ তার মনে পড়েছে কিন্তু শেষ কয়েকটি নিঃশ্বাস বাকি থাকতে। তারপরও আল্লাহর মাধ্যমে বিপুল সম্ভাবনা এখনও রয়েছে। পৃথিবীর কেউ জানেনা নিঃস্ব তালুকদারের প্রকৃত খবর কিন্তু একজন জানেন তিনি আল্লাহ। এত কাছাকাছি থাকলেও কেউ তালুকদারের উপকারে আসবে না কিন্তু একজন মাত্র উপকারে আসবে, তিনি আল্লাহ!
তিনি একজন মানুষের মানুষের মনেও যদি কবরস্ত তালুকদারের জীবিত থাকার কথাটি মনে করিয়ে দেন। তাহলে তিনি আবারো বেঁচে উঠতে পারেন! সেই আল্লাহ ইচ্ছে করলে এখনও সেটা সম্ভব। কেন জানি তালুকদারের মাথায় আসল, আল্লাহকে ডাকতে হলে তো, পশ্চিম দিকে ফিরতে হয়। তাহলে পশ্চিম কোন দিকে? কবরের অন্ধকার কুঠুরিতে বসে সিদ্ধান্ত নিতেই আরো কয়েটি শ্বাস শেষ করা হয়। যখন বুঝতে পারল, পশ্চিম ডান পাশে এবং উত্তর-দক্ষিণ করে বানানো কবরের ভিতরে পশ্চিমে ফিরে সেজদা দেবার মত দুনিয়ার সে সুযোগ, এখানে নেই। ভোঁ ভোঁ করে মাথা ঘুরছিল, বারংবারে বাতাসের অভাবে বুক ফুলে উঠেছে, বক্ষপিঞ্জরের হাড় গুলো ভেঙ্গে খান খান হয়ে যাবার দশা। চোখ দুটো যেন কোটর থেকে বাহিরে বের হয়ে যাবে।
আবার মনে হচ্ছিল একটু দাড়াতে পারলে যেন, ফুসফুসের প্রতিটি কোষ আবারো তাজা হয়ে উঠবে। দেহের সমুদয় দিয়ে ঝটকা মেরে দাড়াতে চাইলেন! প্রচণ্ড আঘাত পেয়ে সেই এতিম শিশুটির মত অসহায়ের মতই ততোধিক গতিতে মাটিতে আছড়ে পড়লেন! তালুকদার কিছুক্ষণের জন্য ভুলে গিয়েছিলেন যে, কবরের ভিতরেই তিনি আটকা পড়েছেন। কবরের ভিতরের উচ্চতা খুবই সীমিত। মৃত্যুর আগের মুহূর্তের কিছুক্ষণ সময়টিও বহু লম্বা সময়ের মত হয়ে যায় এবং এ পরিস্থিতিতে প্রতিটি ক্ষণই গুরুত্বপূর্ণ। ভাবলেন এভাবেই যেহেতু মরতে হবে, তখন উত্তর-দক্ষিণ হয়ে অন্তত মরি। এত কিছু ঘটনা ঘটতে দুনিয়ার পাঁচ মিনিট সময় লেগেছে কিন্তু ভুক্তভোগী তালুকদারের জন্য এটা মহাকালের এক সংঘটিত ব্যাপারের মত।
ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, অন্ধকার কবরের ছোট্ট কুঠুরির উত্তর দিক কোনটা, সেটা নির্ণয় করতেই ব্যর্থ হয়ে তালুকদার অনন্তকালের পথে যাত্রা শুরু করেছে। তারা জানেনা সেখানকার পদে পদে বিপদের উদ্ধারকারী কে আর সেখানের অজানা বিপদের প্রকৃত সাহায্যকারীই বা কে?