১০ টাকার বিয়ের উদারতা ও মিলিয়ন টাকার বিয়ের দাম্ভিকতা

ফেসবুকে দেখলাম একজন ১০ টাকা মোহর দিয়ে বিয়ে করেছেন। অনেকে লাইক মেরেছেন, প্রচুর মারহাবা, মাশায়াল্লাহ যোগ হয়েছে! বিয়েতে ইসলাম এ ধরনের বখিলতা তথা কৃপণতাকে সমর্থন করেনা। বর ও কন্যার সক্ষমতা অনুসারে বিয়ে করাই ইসলামের মূল আবেদন। এ বিষয়ে সামনে যাবার আগে দুজন প্রখ্যাত সাহাবীর বিয়ের ঘটনা দেখে নেই।
 
ফাতিমা (রা) সাথে আলী (রা) বিয়ের কথা ঠিক হবার পরে রাসুল (সা) আলী (রা) কে প্রশ্ন করলেন, মোহরানা হিসেবে দেবার মত আলীর (রা) কাছে কি আছে? আলী (রা) বললেন, তার ঘরে একটি ঘোড়া একটি বর্ম ব্যতীত আর কিছুই নেই।
 
রাসুল (সা) বললেন, চলাফেরার জন্য ঘোড়া তোমার লাগবে। তবে বর্ম খানা মোহর হিসেবে ব্যবহার করতে পার। আলী (রা) স্বীয় বর্ম ৪৮০ দেরহামে বিক্রি করে সমুদয় অর্থ কন্যার পিতা রাসুল (সা) কে দিলেন। অতঃপর রাসুল (সাঃ) এই অর্থ বিয়ের জন্য খরচ করেন। এই বিয়ের ঘটনায়,
 
– আলী (রা) একেবারে অর্থহীন, কাঙ্গাল ছিলেন না।
– তাঁর কাছে নগদ বিক্রি যোগ্য দুটো জিনিষ ছিল।
– দুটো জিনিষেরই নগদ বাজারদর ভাল ছিল।
– ঘোড়া ও বর্মের মধ্যে বর্মটাই বেশী দামী বস্তু।
– জীবনাচরণ সচল রাখতে ঘোড়া সাথে রাখার পরামর্শ এসেছিল।
– সম্পদ যদি আরো বেশী থাকত, তাহলে আরো কিছু বিক্রি করারও পরামর্শ হয়ত আসত।
– আলী (রা) বিয়ে করতে গিয়ে, তাঁর অর্ধেক সম্পদ খোয়াতে হয়েছে।
 
– যারা কম অর্থে বিয়ে করতে চান, তাঁরা আলী (রা) এই উপমা টানেন।
– যিনি ১০ টাকায় বিয়ে করেছেন, তিনি কি আলি (রা) সমান অর্থ ব্যয় করেছেন?
– বরের আয় যদি বেশী হয়, সম্পদের পরিমাণ যদি ভারী হয়,
– অবশ্যই বরকে বেশী পরিমাণ মোহরানা দিতে হবে।
– আল্লাহ বলছেন, ইয়াতিম মেয়েকে দ্বিতীয় বউ হিসেবে বিয়ে করতে গেলেও যেন প্রথম বিয়েতে যে মোহরানা দেওয়া হয়েছিল তাকেও যেন তাই দেওয়া হয়।
– অথচ ১০ টাকার মোহর ধার্যের বিয়েতে কন্যাকে সরাসরি ঠকানো হল।
– ইসলামের সঠিক নির্দেশনা না বুঝার ফলে, কৃপণতা বোধ উৎসাহ পেল।
– ইসলাম বিয়ের শর্তকে সহজ করতে বলেছে, তাই বলে এতটুকু ঠুনকো নয়।
 
একদা রাসুল (সা) সাহাবীদের নিয়ে বসা ছিলেন, এমন সময় এক মহিলা এসে বললেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ (সা), আমি নিজেকে আপনার জন্য সঁপে দিলাম। একথা বলে মহিলাটি একটু দূরে বসে রইলেন। রাসুল (সা) কিছু বললেন না। নবীজির কোন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া দেখতে না পেয়ে একজন সাহাবী দাঁড়িয়ে বললেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ (সা) এই মহিলাকে যদি আপনার দরকার না হয়, তাহলে তার সাথে আমাকে বিয়ে দিয়ে দিন! একথা বলে তিনিও তার জায়গায় বসে গেলেন।
 
অনেকক্ষণ পরে রাসুল (সা) প্রশ্ন করলেন, মহিলাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলে সেই লোকটি কি আছে? লোকটি দাড়িয়ে তার উপস্থিতির সায় দিলেন। তাকে রাসুল প্রশ্ন করলেন, মোহরানা হিসেবে দেবার মত তোমার কি আছে? লোকটি বলল কিছুই তো নাই। রাসুল বললেন, তুমি বাড়ীতে যাও এবং দেখ কি কি আছে তোমার কাছে।
 
লোকটি দৌড়ে বাড়ীতে গেল এবং ভগ্ন মনোরথে ফিরে এসে বলল, না আমার ঘরে কিছুই তো পেলাম না। রাসুল (সা) বললেন, আবারো ফিরে যাও এবং ঘরে তল্লাশি করে দেখ কোথাও অলংকারাদি কিংবা আংটি জাতীয় কিছু পাও কিনা, অন্যূন লোহার আংটি হলেও। লোকটি দৌঁড়াল যথারীতি ফিরে এসে একই কথা জানাল, কিছুই নাই তার ঘরে। নবীজি বললেন, তাহলে কি দিবে? লোকটি বলল, আমার পরিধেয় কাপড়ের অর্ধেক তাকে দিয়ে দিব। (তখন কাপড় অনেক দামী বস্তু ছিল)। রাসুল (সা) বললেন, এই অর্ধেকে না তোমার কিছু হবে, না মহিলার কোন কাজে আসবে!
 
তখন রাসূল (সা) তাকে বললেন, পবিত্র কোরআনের কোন কিছু তোমার মুখস্থ আছে কি? তিনি বললেন হ্যাঁ আছে, এই এই সূরা গুলো আমার মুখস্থ। রাসুল (সা) বললেন, মোহর হিসেবে পবিত্র কোরআনের মুখস্থ সুরাই তোমার জন্য যথেষ্ট। রাসুল (সা) উভয়ের বিয়ে পড়িয়ে দিলেন। এই বিয়ের উপমা দিয়ে কেউ যদি বলেন,
 
– হাদিসের আলোকে তিনিও এই ধরনের বিয়ে সারতে আগ্রহী।
– তা মোটেও হবেনা, কেননা তাকে সম্পদ ব্যয় করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে।
– রাসুল (সা) মানুষটিকে দুইবার তার বাড়ীতে ও আত্মীয়দের কাছে পাঠিয়েছেন।
– দুই বারই তিনি ন্যুনতম দামী বস্তু সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
– ওদিকে বিয়ে করা ও বিয়ে বসার জন্য পাত্র পাত্রী ঘটনাস্থলে উপস্থিত আছে।
– দু’জনেরই অর্থনৈতিক অবস্থা ও নিরাপত্তা খুবই সঙ্গিন।
– তাই রাসুল (সা) ন্যুনতম মাধ্যমকে বিয়ের শর্তের জন্য কাজে লাগিয়েছে।
– এটি একটি ব্যতিক্রমী পরিবেশের বিয়ে, মহিলার একজন অবলম্বন খুবই দরকার ছিল।
 
– দুর্যোগ, যুদ্ধাবস্থা, অরাজকতায় যুবতি কন্যার পিতারা বেশী দুঃচিন্তায় থাকে।
– এই পরিস্থিতিতে বিয়ের পাত্র পাওয়া গেলেও, তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা দুর্বল থাকে।
– আবার কন্যাকে কারো হাওয়ালা করতে পারলে সেও নিরাপদ থাকবে।
– এই ধরনের পরিস্থিতিতে উপরোক্ত বিয়ের অনুষ্ঠান হতে পারে।
– মুসলিম শরণার্থী শিবির গুলোতে এ ধরনের বিয়ে হরহামেশাই হয়।
– যার সক্ষমতা আছে, আর্থিক সচ্ছলতা আছে, তার জন্য তো এই বিয়ে উচিত নয়।
 
– বিয়ের শর্তগুলো সহজ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে
– জমকালো অনুষ্ঠান করে অপচয় করার নাম বিয়ে নয়; এটা টাকার গরম আর দাম্ভিকতা প্রদর্শনের নামান্তর।
– অধিক পরিমাণে দেন মোহর ধার্য করা, বিয়ের পবিত্রতা নষ্ট করে।
– বিপদের দিনে এই অর্থের পরিমাণ স্বামী-স্ত্রী দুজনের জন্যই কাল হয়ে দাঁড়ায়।
– যারা কাবিনে বেশী টাকার পরিমাণ বসাতে চায়, পুরুষের সেখানে বিয়ে করা অনুচিত।
– তারা ভবিষ্যতে বিপদজনক আত্মীয় হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে।
– কাবিনের টাকা কোনদিনই বিবাহিত জীবনে সুখ সমৃদ্ধি আনে না।
-তাই আসুন, বিয়েতে কৃপণতা, দাম্ভিকতা, আত্ম প্রদর্শনী ও প্রদর্শন্নেছা চরিত্র উপেক্ষা করি।
– ইসলাম যেভাবে বলেছে সেভাবে পালন করে, সুখী জীবন লাভ করি।