দীর্ঘ বছরের সংগ্রাম শেষে আমরা ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পেয়েছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের জন্য বিরাট গৌরবের। বিশ্ববিদ্যালয় শুরুতে, বাংলা, ইংরেজি, আরবি, ফারসি, উর্দু, ইসলামিক স্টাডিজ, ইতিহাস, দর্শন, অর্থনীতি, রাজনীতি, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, গণিত ও আইন বিষয় নিয়ে তার যাত্রা শুরু করে। বিষয় সূচি হিসেবে বুঝা যায়, তদানীন্তন দুনিয়ার সেরা বিষয় গুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচিতে স্থান করে নিয়েছিল। বর্তমানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮৪ টির বেশী বিষয়ে পড়ানো হচ্ছে। বিশ্ব বরেণ্য বহু বিখ্যাত ব্যক্তি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষালাভ করেছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পটভূমিকে কেন্দ্র করে পাকিস্তান আন্দোলন গড়ে উঠেছে, মুসলিম লীগ সমৃদ্ধ হয়েছে। আওয়ামী মুসলিম লীগ ও আওয়ামীলীগের জন্ম এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কোলেই জন্ম হয়েছে। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ নামে একই ভূখণ্ড কাছাকাছি সময়ে দু’বার স্বাধীন হয়েছে; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছায়াতলেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বহু কিছুর সাক্ষী; এর ভবন, জরাজীর্ণ দেওয়াল, ধ্বংসপ্রাপ্ত ফটক, নুয়ে পড়া গাছ সবকিছুই ইতিহাসের কথা বলে। জাতিকে যোগ্য ও শিক্ষিত হিসেবে গড়ে তুলতে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের এত লম্বা ইতিহাস, এত ভূমিকা, এত নামের না পেরেছি সদ্ব্যবহার করতে, না পেরেছি মূল্যায়ন করতে।
আমাদের এই ভূখণ্ডে শিক্ষা ব্যবস্থা কেমন হবে, তার ধরন কি হবে, সেটা নিয়ে বহু পানি গড়িয়েছে। পাকিস্তান স্বাধীন হয়েছে ইসলাম ও ইসলামী শিক্ষাকে প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখিয়ে। ইসলামী শিক্ষা কি? আধুনিক দুনিয়ায় তার রূপ কেমন হবে, কেমন হওয়া উচিত সেটা নিয়ে জগতে আজো গবেষণা চলছে। কিন্তু যখন পাকিস্তান আন্দোলনের নেতারা এই বিষয়ে জনগণকে প্রলুব্ধ করছিল, তখন তারা ব্যক্তি জীবনেও ইসলাম মেনে চলত না। অনেক নেতা ইসলামী চিন্তার বিপরীত চিন্তায় বুঁদ থাকত। কারো কাছে কোন চরিত্রই ছিলনা। তারাই ইসলাম ও ইসলামী শিক্ষার জন্য জনগণকে উৎসাহিত করে দেশের স্বাধীনতা লাভের জন্য কাজ করেছে। নেতাদের লক্ষ্যহীন একটি স্ফুরণ, একটি আন্দোলন হাতি তামাশায় পর্যবসিত হয়েছে এবং কালের পরিক্রমায়, এখন অনেক ইসলামী ব্যক্তিরাও ইসলামী শিক্ষার কথা আর বলছেনা!
বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর থেকে আজ পর্যন্ত আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত, কি করা উচিত সেটা নিয়ে বহু গবেষণা, বিশেষজ্ঞ কমিটি হয়েছে। বহুবার শিক্ষার চেহারা পরিবর্তন করা হয়েছে। কিন্তু আজো কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছেনা, যে শিক্ষার আশা করেছিলাম, সে শিক্ষা আমরা দিতে পেরেছি এবং এটিই সেই প্রতীক্ষিত শিক্ষা ব্যবস্থা।
আমরা কেমন সন্তান চাই? আমাদের সন্তানের কেমন যোগ্যতা গড়ে উঠা উচিত? সন্তান দেশ ও সমাজের কোন ভূমিকাটা পালন করলে পিতা-মাতা বলবে সারা জীবনভর তো এটাই প্রত্যাশা করেছিলাম! সমাজ ও পরিবার যেটা চায়, আর রাষ্ট্র যেটা দেয় দুটো একই কিনা; এই প্রশ্নের উত্তর আজো মেলেনি।
১৯৭১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা দেশ ও জনগণের জন্য বুকের তাজা রক্ত দিয়েছে। ২০১৭ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্মানিত শিক্ষকেরা নীল, লাল, হলুদ, সাদা বর্ণে বিভক্ত হয়ে একে অপরকে লাথি, ঘুষি, কিলের মহৎ-কাজে লিপ্ত হয়েছে। ৪৬ বছরের ব্যবধানে এই যে বিরাট পরিবর্তন; দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা উপর ভর করেছে। উপরের প্রশ্ন গুলোর উত্তর না পাওয়ার জন্য এগুলো অন্যতম কারণের একটি। এভাবে চলতে থাকলে বাংলা ও বাঙ্গালীকে ঘৃণা করার জন্য বিদেশ থেকে কাউকে ভাড়া করে আনতে হয়না। নিজের সন্তান, নাতী পুতিদের অবজ্ঞা, অবহেলাই জাতিকে তাড়িয়ে বেড়াবে।
পরের পর্ব গুলোতে কিছু সত্য ঘটনা উল্লেখ করে দেখাতে থাকব, আমরা কেমন সন্তান চাই, আর কাড়ি কাড়ি অর্থ ও সময় ব্যয়ে কেমন সন্তান তৈরি করেছি।
চলবে……….