স্কুল শিক্ষক ও এক রাজমিস্ত্রি

রাজমিস্ত্রি

রাজমিস্ত্রিদের কাজের হাঁক-ডাক ও টিন-মাস্তুলের আওয়াজে তন্দ্রা ছুটে গেল। বাহিরে বের হওয়া মাত্রই মুখে সফেদ দাড়িওয়ালা রাজমিস্ত্রির প্রতি নজর পড়ল। মুহূর্তেই ঘরে ঢুকে গেলাম। চেহারাটি খুব চেনা জানা মনে হল। ভাবছি কোথায় যেন দেখেছিলাম। চিন্তা করছি তার যেন কি নাম? স্কুল শিক্ষক ও এক রাজমিস্ত্রি

আরো পড়তে পারেন…

  • যোগ্য লোক অলস হলে কূটচালে অভ্যস্ত হয়
  • আজীবন অর্থকষ্ট, অভাব যাদের নিত্য-বন্ধু
  • মানুষের জন্য শিক্ষার প্রকৃত ধরণ কি?

সকল প্রবাসীরাই একটি চরম বিব্রতকর অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়। সেটা হল, পরিচিত ব্যক্তিদের দেখা মাত্রই চিনতে না পারা। তখনই টিপ্পনীর মুখোমুখি হতে হয়, “বড় লোক হয়ে গেছেন তো, তাই বন্ধু-বান্ধবদের ও চিনতে পারছে না!” প্রতি বছর যারা বাড়ী যায়, তারা এর মুখোমুখি তেমন একটা হয়না। কিন্তু যারা চার-ছয় বছরের বেশী সময় ধরে বাহিরে থাকে, তারা কিশোরদের চিনতে পারে না। তাদের মুখে দাড়ি-মোচ উঠে। প্রবীণদের কেউ দাড়ি রাখে, কারো দাড়ি-গোঁফ সাদা, কারো মুখ দন্তহীন।

নিকট অতীতেও আজকের রাজমিস্ত্রিকে দেখেছি বলে মনে হয় না। তবে নির্ঘাত এই মুখ আমার পরিচিত। আবার বের হলাম, এবার তিনিই আমাকে ডেকে থামালেন এবং বললেন,

হয়ত তুমি আমাকে চিনতে পার নি, তাই ঘরের ভিতরে ঢুকে গিয়েছ! আমি তোমাদের স্কুলের স্যার ‘আবুল হোসেন’! স্কুল শিক্ষক ও এক রাজমিস্ত্রি

মুহূর্তে সম্বিৎ ফিরে আসল। শতভাগ নিশ্চিত হলাম, তিনি আমাদের স্কুলের ইংরেজির শিক্ষক হোসেন স্যার! ষষ্ঠ শ্রেণীতে তিনি আমাদেরকে ইংরেজি গ্রামারের Tense পড়িয়েছিলেন। এমন আন্তরিকতা দিয়ে পড়িয়েছিলেন যে, বাকি জীবনে আর কখনও তা দ্বিতীয়বার ধরতে হয়নি! তিনি আমাদেরকে Voice Change ও Narration পড়িয়েছিলেন শিশুদের মত করে। অঙ্কের কারণেও তার সুনাম ছিল, তাই অঙ্ক প্রাইভেট হিসেবে।

সঙ্গত কারণেই সে ধরনের একজন গুণধর শিক্ষককে রাজমিস্ত্রির কাজে দেখব কল্পনাতেও ভাবিনি। ওনাকে দেখামাত্রই যদি ওনার নাম জানতে পারতাম, তাহলেও তো ভাবতে পারতাম না যে, স্কুল শিক্ষকের মহান পেশার ব্যক্তিকে, রাজমিস্ত্রির চেহারায় কল্পনা করব। কেননা এটা আমাদের সমাজের সাথে ব্যতিক্রম।

প্রশ্ন করলাম, স্যার আপনি একাজে কেন জড়ালেন?

সরাসরি জবাব দিলেন। দেখ বাবা! শিক্ষকতায় সম্মান-মর্যাদা দুটোই বেশী কিন্তু এই বেতন দিয়ে সংসার চালানোর মত অর্থ জোগাড় হয় না। অর্থকষ্ট লেগেই থাকে। স্কুল শিক্ষকের খিদে লাগেনা ব্যাপারটি তো এমন নয়। আমার সন্তানাদিও বেশী, তাদের মুখে অন্ন জোগাড়ের দায়িত্বও তো আমার। তাই ভেবে দেখলাম, এলাকায় রাজমিস্ত্রিদের কাজ ও প্রয়োজনীয়তা বেশী। উপার্জনের অর্থ নগদ পাওয়া যায় এবং ভাল আয় হয়।

তাই শিক্ষকতার চাকুরী ছেড়ে এই পেশাতেই জড়িয়ে গিয়েছি। এখন আমি সচ্ছলতার সাথে জীবন কাটাচ্ছি, ভালভাবেই দিন চলে যাচ্ছে। আগের চেয়ে অনেক বেশী ভাল আছি। শুরুতে রাজমিস্ত্রির সাহায্যকারী হিসেবে থাকলেও এখন আমি নিজেই কন্ট্রাক নিয়ে কাজ করি। তোমাদের বাড়ীর কাজটিও আমি কন্ট্রাকে নিয়েছি।

তার প্রতি শ্রদ্ধায় আমার মন আকুল হয়ে উঠল। ভাবলাম শুধুমাত্র সামান্য দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটালে পারলেই, যে কারো ভাগ্যের পরিবর্তনও ঘটিয়ে ফেলতে পারে। মুলত দু’হাত ও পায়ের তালুতেই ভাগ্য লুকিয়ে থাকে। তিনি শিক্ষিত মানুষ হওয়াতে এই কাজের খুঁটিনাটি, দুর্বলতা, হিসেব, নিকেশ সবই সহজই ধরতে পেরেছিলেন। এলাকার মানুষ তার কাছে টিউশনির জন্য শরণাপন্ন হয় না, বরং কনট্রাকটরের কাজের জন্যই হাজির হয়। তিনি এলাকার অনেক প্রবাসীর চেয়ে ভাল অবস্থানে আছেন এবং শেষ বয়সেও তার কাজের অভাব নেই!

পুনশ্চ: এই লেখা পড়ে আমাদের এলাকার মানুষ সহজেই তাকে চিনে ফেলতে পারবে। এটাতে অসম্মানের কিছু নেই কেননা তিনি আজ অবধি একই কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু অনেক মানুষ জানবে না যে, একদা তিনি একজন মহান শিক্ষক ছিলেন। বহু ছাত্র তৈরি করার কারিগর ছিলেন এবং ইংরেজি ও অঙ্কের মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অভিজ্ঞ পণ্ডিত ছিলেন!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *