হেরা গুহার নীরবতায় মুহাম্মদ (সাঃ) দিনের মত পরিষ্কার স্বপ্ন দেখার শুরু

হেরা গুহার নীরবতায় মুহাম্মদ (সাঃ) এর দিবাস্বপ্ন দেখার শুরু

হেরা গুহার নীরবতায় মুহাম্মদ (সাঃ) দিনের মত পরিষ্কার স্বপ্ন দেখা শুরু করলেন

মানুষ তাওহীদ পরিত্যাগ করে অংশীদারিত্বে নিমজ্জিত। অন্যায় অবিচার আর অত্যাচারে চারদিক প্লাবিত। ঘন-তমসাবৃত ধরণী, কোথাও দৃষ্টি গোচর হয় না সামান্যতম আলোক শিখা। কোন মানুষের প্রাণের কোন মূল্য নেই।

যে কোন মুহূর্তে সে কারো হাতে প্রাণ হারাতে পারে। মানুষের সম্পদের কোন নিরাপত্তা নেই, যে কোন সময়ে তা শক্তিশালী কেউ ছিনিয়ে নিতে পারে।

কোন নারীর সতীত্ব কোন মুহূর্তে লুণ্ঠিত হবে বা কেউ জানে না। অকারণে যুদ্ধের উন্মাদনা ছড়িয়ে রক্তস্নাত করে তুলছে মৃত্তিকা পৃষ্ঠ।

অকারণে আক্রোশ বশত: নিরপরাধ মানুষকে জ্যান্ত পুড়িয়ে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হচ্ছে। কন্যা সন্তানকে মৃত্তিকা গর্ভে জীবিত কবর দেয়া হচ্ছে। মানুষকে হত্যা করে তাঁর দেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বিচ্ছিন্ন করে তা পায়ের জুতায় ব্যবহার করা হচ্ছে।

শারীরিক বা মানসিক শ্রম ব্যয় করে জীবিকা নির্বাহ করাকে অপমানজনক মনে করে ছিনতাই এবং লুণ্ঠন করে জীবিকা নির্বাহ করাকে সম্মানজনক মনে করা হচ্ছে। মানুষকে নির্মম নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে তাঁর মাথার খুলিতে মদ পান করা হচ্ছে।

মুহাম্মদ (সাঃ) এর স্বপ্ন বাস্তবতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার আলামত

অশ্লীলতা আর নগ্নতার ধারণা মানুষের মন থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়েছে। নিপীড়িত নির্যাতিত নিষ্পেষিত অসহায় বঞ্চিত মানুষের করুণ আর্তনাদে আকাশ বাতাস বিদীর্ণ করে সমস্ত পরিবেশে এক মর্মন্তুদ করুণ হাহাকারে ভরে তুলেছে।

মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ সবই নিজের চোখে অবলোকন করেন। তাঁর কোমল মন করুণভাবে আর্তনাদ করে ওঠে। দিবা রাত্রি অহর্নিশি একটা বোবা কান্না তাঁর ভেতরে মাথা কুটতে থাকে।

কিভাবে কোন পথে অগ্রসর হলে এই নিষ্করুণ অবস্থা থেকে মানবতাকে মুক্ত করা যায়-এ চিন্তায় তাঁর হৃদয় মন উদ্বেলিত হতে থাকে।

অসহায় মানুষের আহাজারি তাঁর দুচোখ অশ্রু সজল করে তোলে প্রতিটি ক্ষণে। তিনি তাঁর এলাকার বাসিন্দাদের নিয়েই শুধু চিন্তা করেন না। গোটা পৃথিবীর নির্যাতিতা জনতা যেন তাঁর সামনে এসে তাঁর দিকে করুণ দৃষ্টিতে নির্নিমেষে চেয়ে থাকে। একটু শান্তি আর নিজের জন্মগত অধিকার কামনা করে তাঁরা।

চিন্তার সাগরে নিমজ্জিত হলেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। কিভাবে তিনি এসবের প্রতিকার করবেন। গোটা পৃথিবীর এই অবস্থা তাকে এমন চিন্তায় নিমজ্জিত করেছিল যে, চিন্তার ভারে তাঁর কোমর যেন ভেঙে আসছিল।

কিভাবে সমস্ত মানুষকে মুক্তি দেওয়া যায়, এ সমস্যার সহজ সরল সমাধান দান করে মহান আল্লাহ তাঁর নবীকে বলেছেন:-

﴿وَوَضَعْنَا عَنكَ وِزْرَكَ﴾ ﴿الَّذِي أَنقَضَ ظَهْرَكَ﴾
আমি তোমার ওপর থেকে ভারী বোঝা নামিয়ে দিয়েছি, যা তোমার কোমর ভেঙ্গে দিচ্ছিল৷ আলাম নাশরাহ ২, ৩

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর দৃষ্টির সামনে বিরাজিত সমস্যার সমাধানের চিন্তায় নিজেকে লোকালয় থেকে অনেক দূরে সরিয়ে নিলেন।

প্রায়ই তিনি নির্জনতা অবলম্বন করতেন। যে সমস্ত সমস্যা নিয়ে তিনি চিন্তায় অস্থির থাকতেন, এসব সমস্যার সমাধান আল্লাহ তাকে ওহীর মাধ্যমে দান করবেন।
সুতরাং ওহী নাজিলের সময় যত এগিয়ে আসতে থাকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নির্জনতা অবলম্বন ততই বৃদ্ধি পেতে থাকলো। তিনি মক্কা থেকে তিন মাইল দূরে একটা পাহাড়ে চলে যেতেন।

হেরা গুহার নীরবতায় মুহাম্মদ (সাঃ)

সে পর্বতের হেরা নামক গুহায় বিশেষ ইবাদাতে নিমগ্ন হয়ে পড়তেন। এ সময়ে তিনি সত্য এবং সুন্দর স্বপ্ন দেখতেন। তিনি এমন স্বপ্ন দেখতেন তা যেন মনে হতো তিনি তা বাস্তবে দেখছেন।

পর্বতের গুহায় তিনি ইবাদাতের কোন পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন তা হাদিস শরীফে হযরত আয়েশা (রাঃ) এর বর্ণনায় এসেছে। বুখারী শরীফে বর্ণনা করা হয়েছে, হেরা গুহায় তিনি যে ইবাদাত করতেন তা ছিল চিন্তা গবেষণা ও উপদেশ গ্রহণ করা।

তিনি বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে যেতেন অথবা খাদিজা (রাঃ) স্বয়ং গিয়ে দিয়ে আসতেন বা লোক মারফত প্রেরণ করতেন। কোন সময় কয়েকদিনের খাবার তিনি একত্রে নিয়ে যেতেন।

হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেছেন, মহান আল্লাহ যে সময়ে তাকে অনুগ্রহ করে মানব জাতির জন্য নবী নির্বাচিত করলেন তখন তিনি নবুয়তের একটা অংশ হিসাবে নির্ভুল স্বপ্ন দেখতেন। এ সময়ে মহান আল্লাহ তাকে নির্জন বাসের প্রতি গভীর আগ্রহী করে তোলেন।

তখন তিনি যে স্বপ্নই দেখতেন তা দিনের আলোর মতোই বাস্তবে পরিণত হতো। একাকী কোন নির্জন স্থান সে সময়ে তার কাছে অধিক প্রিয় ছিল। আরেকটি বর্ণনায় দেখা যায়, নবুওয়তের সূচনা লগ্নে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাইরে বের হলেই কোন নির্জন উপত্যকায় বা কোন নির্জন সমভূমিতে চলে যেতেন।

সে সময়ে তিনি কোন জড়পদার্থের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় শুনতে পেতেন, আসসালামু আলাইকা ইয়া রাসুলুল্লাহ! এ কথা শোনার সাথে সাথে তিনি চমকে উঠে চারদিকে তাকিয়ে সালাম দাতার সন্ধান করতেন। কিন্তু তিনি তার আশেপাশে গাছ পাথর ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেতেন না।

এভাবেই সময় তখন অতিবাহিত হচ্ছিল। আমাদের ধারণা, ওহী এবং হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম -কে ধারণ যেন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করতে পারেন, এ কারণেই নবুওয়তের পূর্বে কিছুদিন মহান আল্লাহ এ অবস্থা সৃষ্টি করে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অভ্যন্তরীণ শক্তি বৃদ্ধি করছিলেন।

হাদিস শরীফে দেখা যায়, যে সময়ে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্জনতা অবলম্বন করতেন তখন তিনি প্রচুর দান করতেন। অভাবীদের মধ্যে খাদ্য বিতরণ করতেন।

হেরা গুহা থেকে বাড়ীতে ফিরার পথে মুহাম্মদ (সাঃ) কাবা তাওয়াফ করতেন

বাড়িতে ফিরে আসার সময়ে কা’বাঘরে এসে তিনি সাত বার বা ততোধিক বার তাওয়াফ করতেন তারপর বাড়িতে যেতেন। এ সময়ে বিশ্বনবী যে সমস্ত স্বপ্ন দেখতেন তা শুধু মাত্র সে সময়ের জন্যই সীমাবদ্ধ ছিল না। এ ধরণের স্বপ্ন নবুওয়ত লাভের পরেও তিনি তাঁর জীবনে বহুবার দেখেছেন।

হাদিসে কুদসী নামে যে হাদিসগুলো রয়েছে, তা অনেকেই এ পর্যায়ে ভুক্ত। এ ছাড়াও বিশ্বনবীর মনে বিভিন্ন সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে নানা কথার সৃষ্টি করে দেয়া হতো।

এরপর সেই রমজান মাসে তিনি হেরা গুহায় চলে গেলেন। এরপর সেই মহান রাত বিশ্ব-মানবতার সামনে এসে উপস্থিত হলো, যে রাতে নির্ভুল জীবন বিধান বিশ্বনবীর মাধ্যমে অবতীর্ণ হতে থাকলো।

👈পূর্বের পোষ্ট 𝕋 পরের পোষ্ট 👉