মূর্তিপূজা কুসংস্কারের প্রচলিত প্রথা পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত ছিলেন মুহাম্মদ (সাঃ)
গোটা জগতের প্রচলিত পরিবেশ হতে, প্রচলিত প্রথা হতে মুহাম্মদ (সাঃ) ছিলেন সম্পূর্ণ মুক্ত। যাবতীয় পঙ্কিলতার মধ্যে বাস করেও তিনি ছিলেন সমস্ত পঙ্কিলতার ঊর্ধ্বে। গোটা পৃথিবীর এক ইঞ্চি ভূমি সে সময়ে মূর্তি পূজা থেকে মুক্ত ছিল না।
যে মক্কা নগরে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আন্তর্জাতিক নবী হিসাবে ঘোষণা দেয়া হবে আর কিছুক্ষণ পরেই, সে মক্কা নগরী ছিল যেন মূর্তির কেন্দ্রস্থল।
মানুষ মূর্তির প্রতি এত অনুরক্ত ছিল যে, কা’বা ঘরেই মূর্তি স্থাপন করেই তাঁরা সন্তুষ্ট ছিল না। তাদের বাস গৃহতেও মূর্তি স্থাপন করেছিল। তাঁরা প্রতি দিন উষা লগ্নে তথা দিনের শুরু করতো মূর্তির সামনে মাথা-নত করে, রাতে শয্যায় আশ্রয় নেওয়ার পূর্বে তথা দিনের কাজ শেষ করতো মূর্তির সামনে মাথা-নত করে।
কোথাও তাঁরা ভ্রমণে গেলে পকেটে করে মূর্তি নিয়ে যেত। যথা সময়ে পথিমধ্যে সে মূর্তির সামনে মাথা-নত করে মনের কামনা-বাসনা পেশ করা হতো। এমনি এক পরিবারে এবং পরিবেশে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে মহান আল্লাহ প্রেরণ করেছিলেন।
মুহাম্মদ (সাঃ) এর মূর্তিপূজার প্রতি ঘৃণা ছিল শিশুকাল থেকেই (সাঃ)
সেই শিশুকাল থেকেই মুহাম্মদ (সাঃ) মূর্তির প্রতি চরম ঘৃণা পোষণ করতেন। তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যগণ তাকে কোন দিন কোন মূর্তির সামনে অগ্রসর করাতে পারেনি।
কিশোর বয়স থেকেই তিনি সেই পরম সত্তার সন্ধানে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন এবং অনুধাবন করেছেন, দৃষ্টির সামনের মানুষগুলো যাদের সামনে মাথা-নত করছে, নিজের মনের আকাঙ্ক্ষা পেশ করছে, বিপদে যার কাছে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে, তার কোন ক্ষমতা নেই।
বরং সে মূর্তিতে আরেকজন মহা-ক্ষমতাশালীর অধীন। তাঁর গোত্র কুরাইশরা কা’বা এবং হজ্জের নেতৃত্ব হাতে পেয়ে যে চরম অনাচারের মধ্যে নিজেদেরকে নিমজ্জিত করেছে।
মক্কার বাইরে থেকে যারা হজ্জ করতে আসবে তাদেরকে কুরাইশদের পোশাক পরিধান করে কা’বাঘর প্রদক্ষিণ করতে হবে, নতুবা সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে প্রদক্ষিণ করতে হবে। হজ্জের অংশ হিসাবে সবাই আরাফাতের ময়দানে গেলেও কুরাইশরা যাবে না।
মহান আল্লাহর অসীম অনুগ্রহে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন যাবতীয় পাপ ও পঙ্কিলতার বহু ঊর্ধ্বে। পবিত্র কোরআন থেকে যেমন সূরা শূরাঁর ৫২ নং আয়াত, সূরা কাসাসের ৮৩ নং আয়াত ও সূরা দোহার ৭ নং আয়াতসহ অনেক আয়াত থেকেই আমরা জানতে পারি, মহান আল্লাহ পক্ষ থেকে কোন ওহী অবতীর্ণের পূর্বে নবীগণ যে জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন, জ্ঞান সাধারণ কোন মানুষের থেকে বিশেষ কোন জ্ঞান ছিল না।
মুহাম্মদ (সাঃ) যাবতীয় কুসংস্কার থেকেও মুক্ত ছিলেন
যে বিষয়টা ছিল, তার ভেতরে আর সাধারণ মানুষের ভেতরে বিশাল পার্থক্য ছিল। নবুয়ত লাভের পূর্বে সাধারণের থেকে তাদের জীবনধারা ছিল সম্পূর্ণ পৃথক। দৈনন্দিন সাধারণ কাজ কর্মে অন্য মানুষের সাথে সামঞ্জস্য থাকলেও তাদের কাজের ধরন এবং মন-মানসিকতা, চিন্তা-চেতনা ছিল গোটা পৃথিবীর সমস্ত মানুষের থেকে পৃথক।
কিন্তু আল্লাহ সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান এবং ওহী সম্পর্কে জ্ঞান ছিল না বলেই ধারণা হয়। অন্যদিকে এ কথার সাক্ষ্য পবিত্র কোরআন দেয় অপর দিকে সাক্ষ্য দেয় স্বয়ং মুহাম্মদ (সাঃ) এর অবস্থা। কেননা, ওহী সম্পর্কে যদি তাদের পূর্ণ জ্ঞান পূর্ব হতেই থাকতো, তাহলে প্রথম ওহী অবতীর্ণের সময় তাঁরা অস্থির হয়ে পড়তেন না।
পক্ষান্তরে ওহী আসার পূর্বে তাদের মনে এবং চিন্তার জগতে যে সমস্ত চিন্তার উদয় হতো, সে চিন্তা কোন মিথ্যা ভিত্তির উপরে ছিল না। প্রকৃত সত্যের দিকেই তাদের চিন্তা ধাবিত হতো। তাদের চোখ যা দেখতো, তাদের ঘুমের অবচেতন জগতে যে দৃশ্য এসে চোখের সামনে ধরা দিত, তা ছিল বাস্তব।
মহান আল্লাহ ওহীর জ্ঞান দিয়ে তাদের সামনে মহা সত্যের এক আশ্চর্য পৃথিবীর দ্বার উন্মোচন করে দিতেন। তাদের বিশ্বাস দৃঢ় প্রত্যয়ে পরিণত হতো।
অর্থাৎ নবীগণ ওহী-জ্ঞানের পূর্বে পরিচালিত হতেন বুদ্ধিবৃত্তিক এবং প্রাকৃতিক হেদায়েতের দ্বারা। তাদের বুদ্ধির জগৎ মহান আল্লাহ এমনভাবে গঠন করেছিলেন যে, কোনটা সত্য এবং কোনটা মিথ্যা তার পার্থক্য তাঁরা অনায়াসে বুঝে নিয়ে সেভাবে জীবন পরিচালনা করতেন।
ইউরোপের অন্ধ বিদ্বেষী ঐতিহাসিকগণ ব্যতীত কেউ বলতে পারবে না যে, কোন একজন নবীও তাদের গোটা জীবনে মুহূর্তের জন্য কোন মূর্তির সামনে মাথানত করেছেন।
কেন করেননি? কারণ তাদের বুদ্ধিয়েই বলে দিত পৃথিবীর অন্যান্য জড়পদার্থের মতোই এই মূর্তিও জড়পদার্থ। এসবের নিজস্ব কোনই ক্ষমতা নেই। গোটা পৃথিবীর দিকে তাদের দৃষ্টি সহজাত প্রবৃত্তির কারণেই নিপতিত হতো এবং তাদের মন বলে উঠতো, এসবের পেছনে একজন মহা-ক্ষমতা বানের ক্ষমতা কার্যকর রয়েছে।
সৃষ্টির কোন কিছুই বৃথা সৃষ্টি করা হয়নি। সাধারণ কোন মানুষের মনে এ ধরনের কোন চিন্তার উদয় না হলেও নবুয়ত পূর্ববর্তী জীবনে নবীদের মনে হতো। যারা উচ্চ পর্যায়ের সাধক ছিলেন বা সৃষ্টি জগৎ নিয়ে গবেষণা করতেন এবং সৃষ্টির সন্ধান করতে যেয়ে স্রষ্টার সন্ধান করতেন বা লাভ করতেন তাদের মনেও উল্লেখিত চিন্তার উদয় হতো।
এ কারণেই চিন্তাশীলগণ কোরআনের আলোকে বলেছেন, নবীদের নবুওয়ত পূর্ববর্তী জীবনের চিন্তাধারা উচ্চ পর্যায়ের মানুষের চিন্তাধারার মতই ছিল।
পবিত্র কোরআনে মানুষকে আল্লাহ আহ্বান করেছেন, তোমরা যে পৃথিবীতে বাস করছো, যে দেহ নিয়ে চলাফেরা করছো, দৈনন্দিন জীবনে তোমরা যে সামগ্রী ব্যবহার করছো, যে বীর্য তোমরা স্ত্রীর গর্ভে নিক্ষেপ করো এ সব নিয়ে তোমরা চিন্তা গবেষণা করো না?
এ সব নিয়ে চিন্তা গবেষণা করলেই তোমরা অনুধাবন করতে পারবে, তোমাদের প্রকৃত স্রষ্টা কে। তোমরা অনুভব করতে পারবে, তোমাদেরকে বৃথা সৃষ্টি করা হয়নি। মহান আল্লাহ যাকে নবী হিসেবে তাঁর বান্দাদের সামনে প্রেরণ করবেন, তাদের মনে এসমস্ত চিন্তার উদয় হতো এবং তারা মহা সত্য অনুধাবন করতেন।
প্রাকৃতিক নিদর্শনা-বলী পর্যবেক্ষণ চিন্তা গবেষণা এবং সহজাত জ্ঞানের প্রয়োগ করে নবীগণ চলতেন। বিভিন্ন নবীর নবুওয়ত পূর্ববর্তী জীবনের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেই আমাদের সামনে সে সত্য প্রতিভাত হয়ে ওঠে।
আমরা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওয়ত পূর্ববর্তী জীবনে দেখতে পাই, সে সমাজে প্রচলিত কোন একটি প্রথার সাথে নিজেকে বিলীন করে দেয়া দূরে থাক, ক্ষণিকের জন্য তা গ্রহণ করেননি।
তিনি আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের ক্ষেত্রে মুহূর্তের জন্যও অংশীদারিত্ব মেনে নেননি। মাতৃগর্ভ থেকে এই বিশাল পৃথিবীতে এসে চৈতন্য উদয়ের পরে তিনি ঐ সমস্ত বিশ্বাস নিজের অন্তরে এক মুহূর্তের জন্যও স্থান দেননি, যে বিশ্বাসের বেষ্টনে তিনি পরিবেষ্টিত ছিলেন।
যে পরিবারে এবং পরিবেশে তিনি শিশুকাল থেকে চল্লিশ বছর বয়সে পদার্পণ করলেন, অবাক করার বিষয় হলো, সে পরিবার এবং পরিবেশের সামান্য ছোঁয়া তাকে স্পর্শ করতে পারলো না। এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী মানুষের জীবনে, আর তাঁর জীবনে কোনই পার্থক্য ছিল না।
মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম যে আদর্শে মানব জাতির সামনে উপস্থাপন করেছিলেন, সে আদর্শে যে বিকৃতি করা হয়েছিল এবং ঘৃণিত নতুন প্রথার আমদানি করে তা অনুসরণ করা হতো, ক্ষণিকের জন্য তিনি তা মেনে নেননি।
কোন প্রতিমার উদ্দেশ্যে বলিদান-কৃত পশুর গোস্ত তিনি ভক্ষণ করেননি। বন্যার পানির ন্যায় যে সমাজে মদ প্রবাহিত হতো তাকে সে মদ স্পর্শ করতে পারেনি।
নারী ভোগের প্রতিটি দ্বার যেখানে ছিল উন্মুক্ত, তিনি সে দ্বারের দিকে নিজের অজান্তেও কখনো নিজের পদদ্বয় দূরে থাক-মুহূর্তের জন্য স্বীয় মনকে অগ্রসর করাননি।
মুহাম্মদ (সাঃ) নিজ গোত্র কুরাইশদের কুপ্রথাকেও উপেক্ষা করেছেন
তাঁর গোত্র কুরাইশ গোত্র সে সমাজে আভিজাত্যের অভিমানে একটা বৈষম্য সৃষ্টি করে রেখেছিল। তাঁরা দাবি করতো সমস্ত মানুষের মধ্যে তাঁরা শ্রেষ্ঠ। সুতরাং হজ্জের সময় অন্যদের মত তাদেরকে আরাফাতে যেতে আসতে হবে না।
তাদের দাবি ছিল, কুরাইশরা শ্রেষ্ঠত্বের কারণে কা’বার বাইরে গিয়ে সাধারণ হাজ্জীদের মত আরাফাতে অবস্থান করতে পারে না, এটা তাদের মর্যাদার পরিপন্থী। কিন্তু তাঁরা এটা অবগত ছিল যে, মক্কা থেকে হজ্জের সময় আরাফাতে গমন করা ইবাদাতের অংশ।
কিন্তু তাঁরা সম্পূর্ণ সচেতনভাবে এই ইবাদাতকে সংকীর্ণ করেছিল। মক্কার অধিবাসীদের মধ্যে যারা কুরাইশদের সাথে আত্মীয়তার বন্ধনে বা বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল, তাঁরাও আত্মীয়তার বা বন্ধুত্বের সূত্রে মর্যাদার দাবি উত্থাপন করে কুরাইশদের অনুকরণে হজ্জের ইবাদাতে সংকীর্ণতা এনেছিল।
তাঁরাও আরাফাতে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। আরেকটি প্রথা তাঁরা প্রবর্তন করেছিল, কা’বা এলাকার বাইরে থেকে যারা আসবে তাঁরা তাদের সাথে নিয়ে আসা খাদ্য আহার করতে পারবে না এবং পোশাক পরিধান করতে পারবে না।
কা’বার সেবক কুরাইশরা, তাঁরা যে খাদ্য সরবরাহ করবে তা আহার করতে হবে এবং যে পোশাক সরবরাহ করবে তা পরিধান করতে হবে, সরবরাহ করতে অক্ষম হলে উলঙ্গ হয়ে কা’বা তাওয়াফ করতে হবে।
সে সমাজের মানুষ এ সমস্ত বাতিল প্রথা সন্তুষ্ট চিত্তে গ্রহণ করে অনুসরণ করতো। কিন্তু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরাইশদের এ সব প্রথা কোন দিন গ্রহণ করেননি।
নবুওয়ত লাভের পূর্বে কুরাইশদের প্রবর্তিত প্রথা নিঠুর পায়ে দলিত মথিত করে তিনি আরাফাতে গমন করতেন।
হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম যে পদ্ধতিতে হজ্জ আদায় করেছেন, তিনি সে পদ্ধতি তথা আল্লাহর শিখানো নিয়মে তিনি হজ্জ সমাপন করেছেন। অর্থাৎ তদানীন্তন পৃথিবীতে প্রচলিত যাবতীয় অনাচার থেকে তিনি ছিলেন মুক্ত।
| 👈পূর্বের পোষ্ট | 𝕋 | পরের পোষ্ট 👉 |