প্রথম দাওয়াত সালাতের ঘরের মানুষ প্রথম ইমান আনে
পবিত্র কোরআন থেকে জানা যায়, নবুওয়তের দায়িত্ব পালনের জন্য যে যোগ্যতা এবং জ্ঞান বিবেক বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার প্রয়োজন মহান আল্লাহ অনুগ্রহ করে তাঁর হাবিবের মধ্যে দান করেছিলেন। তাঁর অন্তরের চক্ষু উন্মোচিত করে দেয়া হলো। জ্ঞানের জগতের পরিধি এতটা বিস্তৃত করে দেয়া হলো যে, কোন উপমার মাধ্যমে তা প্রকাশ করা যাবে না।
টাকে শিক্ষা দিলেন স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। তাঁকে বলা হলো, যে দায়িত্ব তাঁকে দান করা হয়েছে, সে দায়িত্ব পালন শুরু করে দাও। পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে মহান আল্লাহ তাঁকে যে পদ্ধতিতে এবং কৌশলে দাওয়াতের কাজ করতে আদেশ করলেন তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেভাবেই ইসলামী দাওয়াতের কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকলেন।
আমাদেরকে একটা কথা স্মরণে রাখতে হবে, ইসলাম একটা আদর্শের নাম। এই আদর্শ বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যেই মহান আল্লাহ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বিশ্বনবী হিসাবে নির্বাচিত করেছেন।
সুতরাং বিশ্বনবীই হলেন ইসলামী জাগরণের বিশ্বনেতা। এই ইসলামী আদর্শে যারা বিশ্বাস স্থাপন করবেন বা ঈমান আনবেন তাদের সর্ব প্রথম দায়িত্ব কি তা মহান আল্লাহ তাঁর নবীকে হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম-এর মাধ্যমে শিক্ষা দিলেন।
দাওয়াত প্রদানে শক্তি প্রদান করা ইসলামে নিষেধ
এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারা-এর ২৫৬ নং আয়াত থেকে জানা যায়, ইসলাম গ্রহণ করার ব্যাপারে কারো ওপরে কোন শক্তি প্রয়োগ করা যাবে না। কেননা, কোনটা সত্য এবং কোনটা মিথ্যা তা স্পষ্টভাবে পার্থক্য করে দেয়া হয়েছে। এখন যার যেটা খুশি তা সে গ্রহণ করতে পারে।
তবে কেউ যদি ইসলামী আদর্শ গ্রহণ করতে চায় তাহলে তাকে সর্বপ্রথম পৃথিবীর সমস্ত শক্তিকে অস্বীকার করতে হবে, তারপরে তাকে এক আল্লাহর দাসত্ব করতে হবে। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে ‘তাগুত’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় তাগুত তাকেই বলে, যে শক্তি আল্লাহর আইন পালন করতে বাধার সৃষ্টি করে।
অতএব ঈমান আনতে হলে সর্বপ্রথম নিজেকে তাগুত মুক্ত করতে হবে। আর তাগুত মুক্ত জীবনের প্রতীক হলো সে মানুষ একমাত্র আল্লাহরই আইন পালন করে, অন্য কোন শক্তির আইন পালন করে না তথা অন্য কোন শক্তির দাসত্ব করে না।
মানুষের দাসত্বের প্রথম নিদর্শন হল সালাত
একজন মানুষ শুধুমাত্র আল্লাহর দাসত্ব করে তাঁর প্রমাণ হলো সে আল্লাহকে সেজদা দেয় বা সালাত আদায়। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবুওয়ত লাভের পরে তাঁর ওপরে প্রথম দায়িত্ব দেওয়া হলো সালাত আদায়।
আত-তাবারি বর্ণনা করেছেন, একমাত্র আল্লাহ তথা তাওহীদের ওপর বিশ্বাস স্থাপন এবং মূর্তি পূজা ত্যাগ করার পরে যে দায়িত্ব পালন করা মহান আল্লাহ অবশ্য করণীয় করেছেন, তাহলে সালাত আদায়।
প্রথমে সালাত চালু হয় ২ রাকায়াত হিসেবে
হাদিস শরীফে দেখা যায় হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা বলেছেন, ‘সর্বাগ্রে বিশ্বনবীর ওপর যে কাজ ফরজ করা হয় তাহলে সালাত আদায়। সে সালাত প্রথমে ছিল দুই রাকাত করে।’ (ইমাম আহমাদ ইবনে লাহিয়া)
বিশ্বনবী (সাঃ) কে সালাতের জন্যে ওজুর নিয়ম শিক্ষা দেন জিবরাইল (আঃ) নিজে
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক সময় যাকে নিজের সন্তান বলে পরিচয় দিতেন সেই হযরত যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন, ‘বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর প্রথম ওহী অবতীর্ণ হবার পরে আল্লাহর পক্ষ থেকে হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম তাঁকে অজু করা শিক্ষা দিলেন।
বিশ্বনবী (সাঃ) কে মানুষ ও জিনদের জন্যে রাসুল হবার ঘোষনা
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কার মালভূমি এলাকায় অবস্থান করছিলেন। এমন সময় হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম তাঁর কাছে সুন্দর মানুষের আকৃতিতে এলেন। তাঁর শরীর থেকে অদ্ভুত সুঘ্রাণ বের হচ্ছিল। তিনি বললেন, ‘হে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আল্লাহ আপনাকে সালাম জানিয়ে বলেছেন আপনি মানুষ এবং জিনদের জন্যে রাসুল নির্বাচিত হয়েছেন।
সালাতের জন্যে জিবরাইল (আঃ) মাটিতে লাথি মেরে পানি বের করে ওজুর ব্যবস্থা করলেন
এ কারণে আপনি তাদেরকে পবিত্র কালিমা লাইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ-এর দিকে আহ্বান করুন। ’ এরপর তিনি তাঁর পা দ্বারা মাটিতে আঘাত করলেন। সে স্থান থেকে একটা পানির ঝর্ণা প্রবাহিত হলো।
সে পানি দিয়ে হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম অজু করলেন যেন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অজুর পদ্ধতি শিখে নিতে পারেন।
তিনি অজু করে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বললেন, ‘এবার আপনি অজু করুন।’ সালাত আদায়ের জন্যে কিভাবে পবিত্র হতে হয় হযরত জিবরাইল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে তা শিক্ষা দিলেন।
বিশ্বনবী (সাঃ) প্রথম সালাত জিবরাইলের সাথে : ৪ সেজদায় ২ রাকায়াত
তিনি অজু করার পরে আল্লাহর ফেরেশতা জিবরাইল আলাইহিস সালাম নবীকে সাথে করে চার সেজদায় দুই রাকাত সালাত আদায় করলেন। এভাবে মহান আল্লাহ তাঁর নবীকে সালাত আদায় করা তথা আল্লাহকে সেজদা দেয়া, নিজেকে আল্লাহর গোলাম হিসাবে প্রমাণ করা শিক্ষা দিলেন।
এরপরে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর ওপরে ঈমান আনয়নকারী তথা ইসলামী আন্দোলনের প্রথম কর্মী হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা কে সেখানে এনে তাকে সাথে করে সালাত আদায় করলেন। (ইবনে কাসীর, ইবনে হিশাম, ইবনে জারীর)
বিশ্বনবী (সাঃ) বাড়ীতে এসে খাদিজা (রাঃ) ওজু করার নিয়ম শিক্ষা দিলেন
এই ঘটনা সম্পর্কে আরেকটি বর্ণনা এসেছে, অজুর নিয়ম শিক্ষা এবং সালাত আদায় করা শিক্ষা দিয়ে জিবরাইল আলাইহিস সালাম বিদায় গ্রহণের পরে বিশ্বনবী (সাঃ) বাড়িতে এসে তাঁর সহধর্মিনী হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহাকে সমস্ত ঘটনা বললেন।
তিনি ঘটনা শুনে আনন্দে অচির হয়ে গেলেন। নবী (সাঃ) তাকে অজুর নিয়ম শিক্ষা দিলেন এবং তাঁকে সাথে করে সেইভাবে সালাত আদায় করলেন, যেভাবে তাঁকে সাথে করে হযরত জিবরাইল আলাইহিস্ সালাম সালাত আদায় করেছিলেন।
এটাই ছিল নবুওয়ত লাভের পরে সর্ব প্রথম ফরজ কাজ। (ইবনে মাজাহ, ইবনে আহমাদ, তাবারানী, উসামা ইবনে যায়েদ ইবনে হারিসা)
সালাতই হলো একমাত্র মাধ্যম যা একজন মানুষকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আল্লাহর দাস। সে একমাত্র মহান আল্লাহরই দাসত্ব করে, অন্য কোন শক্তির সামনে সে মাথানত করে না। সালাত মানুষের ভেতরে প্রবল আত্মশক্তি সৃষ্টি করে দেয়।
সালাত হল ইমান আনার পরে প্রথম ফরজ কাজ
মহান আল্লাহর সাহায্য লাভের যোগ্যতা মানুষের ভেতরে সৃষ্টি করে দেয়। এ কারণে ঈমান আনার পরে একজন মানুষের ওপরে সর্ব প্রথম ফরজ করে দেওয়া হয়েছে, সালাত আদায় করা। কেননা, যে মানুষ ঈমান এনেছে, তাকে এবার ইসলামী আদর্শ বাস্তবায়ন করার জন্য ময়দানে দৃঢ়পদ থাকতে হবে।
সে ময়দান কুসুমাস্তীর্ণ নয়-কণ্টকাকীর্ণ, উত্তপ্ত। এ ময়দানে টিকে থাকতে হলে, দৃঢ়পদ থাকতে হলে তাঁর আত্মশক্তি এবং মহান আল্লাহর সাহায্য একান্ত প্রয়োজন। আর এ দুটো জিনিষের যোগ্যতা সালাত সৃষ্টি করে দেয়।
বিশ্বনবী (সাঃ)-এর ওপরে যে দায়িত্ব অর্পণ করা হলো, সে দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা তাঁর ভেতরে সৃষ্টি করা হলো। হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহাকে সাথে নিয়ে তিনি (সাঃ) গোপনে সালাত আদায় করতে থাকেন। সেই সাথে ইসলামী আদর্শ বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে এ দলের কর্মী বৃদ্ধির প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন।
ঐতিহাসিকদের ভেতরে এ বিষয়ে কোন মতভেদ নেই যে, বিশ্বনবীর আহ্বানে সর্ব প্রথম সাড়া দেন তাঁর প্রাণপ্রিয় স্ত্রী হযরত খাদিজা (রাঃ)। যে মহিয়সী নারীর গুনাবলী বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না।
বিশ্বনবী (সাঃ) এর দাওয়াতে প্রথম যারা ইমান আনেন
হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা এর পরে আরও তিনজন বিশ্বনবীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে তাঁর দলের কাতারে শামিল হয়ে যান। সে তিন মহান ব্যক্তির নাম হলো সাইয়েদেনা হযরত আবু বকর (রাঃ), সাইয়েদেনা হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু ও সাইয়েদেনা হযরত আলী (রাঃ)।
হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহার পরে এই তিনজন আল্লাহর দীনের কর্মী হয়ে যান এ সম্পর্কে কোন মতভেদ না থাকলেও এ ব্যাপারে মতভেদ আছে যে, এই তিনজনের মধ্যে কোন মহাত্মা প্রথমে বিশ্বনবীর আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলেন। (তাবাকাত ৩/২১)
হযরত আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু ও হযরত সালমান ফারসী রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বর্ণনা করেছেন, উম্মুল মুমিনিন হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা এর পরে হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু সর্ব প্রথম ইসলামী দলে শামিল হন।
এ সম্পর্কে ঐতিহাসিক ও গবেষকগণ ঐকমত্য পোষণ করেন যে, নারীদের ভেতরে হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু ই সর্ব প্রথম বিশ্বনবীর আহ্বানে সাড়া দেন, বয়স্ক স্বাধীন মানুষদের মধ্যে প্রথম সাড়া দেন হযরত আবু বকর (রাঃ),
দাসদের মধ্যে হযরত যায়েদ ইবনে হারিসা রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু ও শিশু কিশোরদের মধ্যে হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বিশ্বনবী (সাঃ)-এর আহ্বানে সাড়া দেন।
| 👈পূর্বের পোষ্ট | 𝕋 | পরের পোষ্ট 👉 |