সায়াদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) এর আত্মত্যাগ ও বীরত্ব
সায়াদ (রাঃ) ছিলেন প্রথম ইসলাম গ্রহনকারী ৮ জন সাহাবীদের একজন। এ সময়ে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তাদেরকে নামাজ আদায়ের জন্য চলে যেতে হতো নির্জন কোন পাহাড়ে বা জনহীন প্রান্তরে। সে সময়ে তাদেরকে কেউ নামাজ আদায় করতে দিলে দর্শক মনে একটা কৌতূহল জেগে উঠতো এবং সে তা সর্বত্র প্রচার করতো।
ফলে বিশ্বনবীর কার্যক্রমের পক্ষে অসময়ে বাধার সৃষ্টি হতো। এত গোপনীয়তার পরেও একবার মাত্র গুটি কয়েক মুসলমানের সাথে সংঘর্ষ ঘটতে যেয়েও ঘটেছিল। ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন, সে সময়ে মুসলমানগণ গোপনে নামাজ আদায় করতেন।
তাঁরা নামাজ আদায়ের জন্য কোন নির্জন স্থানে চলে যেতেন। এভাবে একদিন নামাজ আদায় করার সময় এক পাহাড়ে নির্জন স্থানে নামাজ আদায় করছিলেন এ সময়ে মূর্তি-ভক্তরা তাদেরকে দেখে ফেলল। তারা নামাজের দৃশ্য দেখে হৈ-ছৈ শুরু করে দেয়।
ইসলাম গ্রহণের সময় সায়াদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) ১৭ বছরের যুবক
মুসলমানদের সাথে তর্কবিতর্কের এক পর্যায়ে তারা আক্রমণও করে বসলো। হযরত সায়াদ (রাঃ) ইবনে আবি ওয়াক্কাস সে সময়ে ১৭ বা ১৮ বছরের পূর্ব যুবক। তিনি এ দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে পড়ে থাকা উটের একটা হাড্ডি উঠিয়ে তা দিয়ে এক কাফেরকে আঘাত করে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিলে।
আল্লামা ইবনে আহির বর্ণনা করেছেন, ইসলামের ইতিহাসে রক্তপাত ঘটিয়ে সায়াদ (রাঃ) ই প্রথম ব্যক্তি যিনি ইসলামের জন্য সর্ব প্রথম রক্তপাত ঘটিয়েছেন। হাকিম ওমারী ও ইবনে জারীর এবং ইবনে হিশামও এ ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন।
হাকিম ওমারী এ ঘটনা বর্ণনা করে বলেন, হযরত সায়াদ (রাঃ) যে কাফেরের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর নাম ছিল আব্দুল্লাহ ইবনে খাতাল। সে ছিল কুন্নী টাইমের গোত্রের লোক।
হযরত সায়াদ (রাঃ) গোত্রীয় সম্পর্কের কারণে বিশ্বনবী (সাঃ)-এর মামা হতেন। তিনি (সাঃ) সায়াদ (রাঃ) কে মামা বলে সম্বোধন করতেন করে বিশ্বনবীর মহান আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন।
হিজরতের ত্রিশ বছর পূর্বে সায়াদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন
বিশ্বনবী (সাঃ)-এর হিজরতের প্রায় ত্রিশ বছর পূর্বে হযরত সায়াদ (রাঃ) পবিত্র মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। শোষিত নিপীড়িত ও নির্যাতিত মানবতার মুক্তির দিশারী সায়াদায়ে (রাঃ) ছিলেন সুন্দর বলিষ্ঠ দেহের অধিকারী রগরগে ১৭ অথবা ১৮ বছরের তরুণ।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হযরত সায়াদ (রাঃ) কে অত্যন্ত সুন্দর স্বভাব ও প্রকৃতি দান করেছিলেন। তিনি যখনই শুনলেন মহাসত্যের আলো হেরা পর্বত থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে, দেরী করলেন না। উম্মার বেগে ছুটে গেলেন দরবারে নবীতে।
সুন্দর সুঠাম দেহের অধিকারী তরুণ সায়াদ, আবেগ উচ্ছ্বাসে ভরা হৃদয়। তিনি কোন চিন্তা-ভাবনা না করেই আল্লাহর নবীর হাতে হাত রাখলেন। প্রথম দিকে যারা ইসলাম কবুল করেছিলেন ক্রমিক নং অনুসারে তিনি ছিলেন তৃতীয়।
আবার কেউ বলেছেন তাঁর পূর্বে আরো ইসলামী দাওয়াতের কাজ শুরু করার সাত দিনের ভেতরে হযরত সায়াদ (রাঃ) রাসুলের দলের কর্মী হয়েছিলেন।
সেই সময় ইসলাম ইসলাম কবুল করার অর্থই ছিল গোটা পৃথিবীকে নিজের শত্রুতে পরিণত করা। সমস্ত ধরণের বিপদ-মুসিবতকে নিজের ওপরে চাপিয়ে নেয়া।
উন্মুক্ত তীক্ষ্ণধার যুক্ত তরবারির নিচে মাথা পেতে দেওয়া। হযরত সায়াদ (রাঃ) ছিলেন সেই সাহসী যুবক-যিনি কোন ধরণের বিরোধিতার পরোয়া না করে নিজের প্রাণের মমতা ত্যাগ করে মহাসত্য অল ইসলামের দলের পতাকা উড়িয়ে দিয়েছিলেন।
ইসলামের বিরোধিতায় সায়াদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) ভাইয়েরা
হযরত সায়াদ (রাঃ) বড় ভাইয়ের নাম ছিল উতবা। সৌহিল কাফের, আর এই জাহাগ্রামের কিট্টি ওহুদের যুদ্ধে বিশ্বনবী (সাঃ)-এর পবিত্র চেহারা মোবারকে পাথর নিক্ষেপ করে নবীর চেহারার রক্তাক্ত করে দিয়েছিল।
এ কারণে হযরত সায়াদ (রাঃ) আজীবন তাঁর কাফের ভাইয়ের উপরে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ ছিলেন। তিনি বললেন, ‘আল্লাহর কসম! আমি উতবার রক্তের চেয়ে বেশী অন্য কারোর রক্ত পিপাসু ছিলাম না।’
সায়াদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) ছিলেন ইসলামের ইতিহাসে প্রথম তীর নিক্ষেপকারী
ওহুদের যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী যখন বিপর্যয়ের মুখে নিপীড়িত হয়েছিল তখন হযরত সায়াদ (রাঃ) নবী (সাঃ)-কে তাঁর পাশে থেকে হেফাজত করেছিলেন। বোখারী শরীফে এসেছে, যুদ্ধের ময়দানে চরম নাজুক অবস্থায় আল্লাহর নবী (সাঃ) নিজের তুনির থেকে তীর বের করে সায়াদ (রা)-এর হাতে দিতেন আর বলতেন,
রাসুল (সাঃ) স্বীয় তুনি থেকে তীর বের করে সায়াদ (রাঃ) দিয়ে বলেন, তীর চালাও
‘হে সায়াদ! আমার মাতা-পিতা তোমার ওপর কোরবান হোক, তুমি তীর চালাও!’ হযরত আলী (রাঃ) বলেন, ‘আমি সায়াদ (রাঃ) ছাড়া অন্য কারো পক্ষে এমন ধরনের বাকী রাসুলের (সাঃ) পবিত্র মুখ দিয়ে আর শুনিনি।’ হযরত সায়াদ (রাঃ) ই সেই সৌভাগ্যবান সাহাবা, যিনি ইসলামের জন্য শত্রুর দিকে প্রথম তীর নিক্ষেপ করেছিলেন।
হযরত সায়াদ (রা) বলেছেন, ‘আমি প্রথম আরব বাচ্চাদের যুদ্ধের আগে দেখলাম উমায়ের কে, সে এদিক ওদিকে লুকিয়ে বেড়াচ্ছে। আমি তাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কি হয়েছে উমায়ের, তুমি এমন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছো কেন?’
আমার ভাই আমাকে বললো, ‘ভাইয়া, আমার বয়স অল্প। আমার ভয় হচ্ছে রাসুল (সাঃ) আমাকে দেখে ফেললে তিনি হয়তো আমাকে যুদ্ধের ময়দান থেকে ফেরত পাঠিয়ে দেবেন। কিন্তু আমি ইসলাম প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যুদ্ধ করে শাহাদাত বরণ করতে চাই। আল্লাহ আমার নসিবে শাহাদাত লিখে রাখতে পারেন।’
আরো পড়তে পারেন “তীর তথা ক্ষেপণাস্ত্র শক্তিতে বলিয়ান হতে স্বয়ং রাসুল (সাঃ) নির্দেশ দিয়েছেন”
সায়াদ (রাঃ) এর ছোটভাই উমায়েরের আত্মত্যাগ ও সাহসীকতা
হযরত সায়াদ (রাঃ) তাই ওই ছোট ভাইকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। বয়স অল্প হবার কারণে তাকে যুদ্ধের ময়দান থেকে ফেরৎ পাঠালেন। উমায়ের (রাঃ) কাঁদতে লাগলেন।
তাঁর কান্না দেখে নবী (সাঃ) তাকে পুনরায় অনুমতি দিলেন। ‘তাঁর মনের কামনা অনুযায়ী মহান আল্লাহ তাকে শাহাদাত হিসেবে কবুল করলেন।
হযরত সায়াদ (রা)-এর জন্য ছোট ভাইয়ের শাহাদাত ছিল বড়ই কষ্টের। তখন তিনি তিনি ইন্নাল্লিলাহে ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন বলে নীরব হয়ে ছিলেন। প্রচণ্ড ধৈর্য ধারণ করলেন এবং তিনি। হযরত সায়াদের আব্বার নাম ছিল ওয়াক্বাস, আর মায়ের নাম ছিল হামনা। হামনা তার নিজের বাপ-দাদার আদর্শের একনিষ্ঠ অনুসারী ছিল।
তিনি যখন জানতে পারলেন যে, তার সন্তান সাইয়াদ আল্লাহর নবীর হাতে হাত রেখে ইসলামের কার্যক্রমে শামিল হয়ে পড়েছেন। তখন তিনি এমনভাবে ভেঙে পড়লেন যে, কোন খাদ্য বা পানীয় বা পানিও গ্রহণ করবেন না।
সায়াদ ইসলাম ত্যাগ না কারো সাথে কথা বলবেন না। কোন ধরণের খাদ্য বা পানীয় গ্রহণ করবেন না। সায়াদ ইসলাম ত্যাগ না করলে তিনি দিন এভাবে আত্মহত্যা করবেন।
হযরত সায়াদ (রা) তাঁর মা’কে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন। তিনি জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষায় নিপতিত হলেন। একদিকে মায়ের জীবন রক্ষা অন্যদিকে ইমান রক্ষা। কিন্তু বাতিলের সাথে তিনি আপোষ করলেন না।
তিনি তাঁর মা’কে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন : মা তুমি আমার কাছে সীমাহীন প্রিয়। কিন্তু তোমার শরীরের যদি এক হাজারটা প্রাণ থাকত আর আমার সামনে তোমার প্রতিটি প্রাণ এক এক করে বের হয়ে যেত তবুও আমি ইসলাম ত্যাগ করতাম না।
মা তাকে তাকে বার বার চাপ দিতে থাকে ইসলামের প্রদীপ সত্যের মানদন্ডের সামনে নির্ধারিত হতে বাধ্য হলেন।
অবশেষে হযরত সায়াদ (রাঃ) সত্যের মশালের সামনে নির্বাচিত হলেন যে, স্বয়ং আরশের অধিপতি হযরত সায়াদ (রাঃ) এমনভাবে উত্তীর্ণ হলেন যে, মুসলমানদেরকে জানিয়ে দিলেন, ‘কিন্তু তাঁরা যদি আমার সাথে এমন কোন (মাবুদকে) শরীক বানানোর জন্য-যাকে তুমি (আমার শরীক বলে) বলো না-তোমার ওপর চাপ দেয়, তাহলে তুমি তাদের আনুগত্য করবে না।’ (সুরায়ে লোকমান-আয়াত নং-১৫)
সায়াদ (রাঃ) ছিলেন ইসলামের প্রথম ৮ জন ইসলাম গ্রহণকারীর একজন
হযরত আবু বকর (রাঃ) এর আহবানে হযরত ওসমান (রাঃ), হযরত যুবাইর (রাঃ), হযরত আব্দুর রহমান (রাঃ), হযরত সায়াদ (রাঃ) ও হযরত তালহা (রাঃ) এবং হযরত সায়াদ (রাঃ)সহ মোট আটজন ছিলেন প্রথম মুসলমান। (ইবনে হিশাম)।
এরপর ক্রমশ: মুসলমানের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে পেতে থাকে। প্রথমে নামাজ আদায়ের জন্য কোন নির্জন স্থানে যেতেন এবং সেখানে মুশরিকেরা তাদেরকে দেখে ফেলে।
এবং এক যুবক সাহাবী হযরত সায়াদ (রাঃ) কালক্রমে কর্তৃত্ব বাণী করে প্রথম মুসলমান আব্দুল্লাহ ইবনে খাতালে হযরত সাহাবী হযরত সায়াদ (রাঃ) কালক্রমে ঘটনার পরে আরকামের বাড়িতে পৌঁছে সমস্ত মুসলমানদের মিলিত হবার ব্যবস্থা করলেন।
ইবনে হিশাম বর্ণনা করেন, এই বাড়িটা ছিল সাফা পাহাড়ের উপরে। কোন বর্ণনা করা হয়েছে, সে ছিল কুন্নী টাইমের গোত্রের লোক।
এই বাড়িতে মুসলমানরা একত্র হয়ে নামাজ আদায় করতেন এবং বিশ্বনবী (সাঃ) তাঁর সাহাবাদেরকে এখানেই আল্লাহর বিধান সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দান করতেন। ক্রমশ: এ বাড়িটাই ইসলামের প্রচার ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। ইসলামের ইতিহাসে এই বাড়িটা চির বিখ্যাত হয়ে আছে।
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিকাংশ সময় এই বাড়িতেই অবস্থান করতেন। তিনি নব্য মুসলমানদের অন্তরে এই বাড়ি থেকে ইমানের যে আগুন জ্বালিয়ে দিতেন, তাঁরা স্বস্থানে ফিরে গিয়ে আরো অনেকের অন্তরে ইমানের সে আগুন প্রজ্বলিত করতেন।
সে সময়ে গোপন ইসলামী দাওয়াতের কার্যক্রমের কেন্দ্রীয় কার্যালয় হিসেবে ঐ বাড়িটা ব্যবহৃত হতো। মুসলমানগণ ইসলামী দাওয়াতের আল্লাহ কর্তৃক নির্বাচিত নেতার সাথে এই বাড়িতে মিলিত হয়ে নব পর্যায়ে কর্মসূচি গ্রহণ করতেন।
উল্লেখ্য এখানে যে সায়াদ (রাঃ) বলা হয়েছে, তাকে বাংলাদেশে সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) হিসেবে চিনে। বিশ্বনবী (সাঃ) বইয়ের অনুবাদক যেভাবে নাম লিখেছিলেন, হুবহু সেভাবে রেখে দেওয়া হয়েছে
| 👈পূর্বের পোষ্ট: নবী ও রাসুলদের প্রধান দায়িত্ব এবং ইসলাম প্রচারের প্রাথমিক কৌশল |
| পরের পোষ্ট 👉 |