সুরা আলাক অবতীর্ণের পেক্ষাপট, ইতিহাস ও বিশ্বনবীর (সাঃ) প্রস্তুতি

সুরা আলাক অবতীর্ণের পেক্ষাপট, ইতিহাস ও বিশ্বনবীর (সাঃ) প্রস্তুতি

বিশ্বনবী (সাঃ) এর প্রতি অবতীর্ণ প্রথম ওহির মুল তাৎপর্য

বিশ্বনবীর প্রতি মহান আল্লাহ প্রথম বাণী ছিল, ‘পড়ো তোমার রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। জমাট-বাঁধা এক রক্তপিণ্ড হতে মানুষ সৃষ্টি করে চলেছে এবং তোমার রব অত্যন্ত অনুগ্রহ-শীল। যিনি কলমের দ্বারা জ্ঞান শিক্ষাদান করেছেন।

মানুষকে এমন জ্ঞানদান করেছেন যা অবগত ছিল না।’ এ সুরার নাম হলো ‘আল আলাক’, পবিত্র কোরআনের ত্রিশ পারার ৯৬ নং সুরা। এই সুরার ১ থেকে ৫ নং আয়াত সর্ব প্রথম অবতীর্ণ হয়েছিল।

এই আয়াতগুলোতে স্পষ্ট করে ঘোষণা করা হয়েছে, মহান আল্লাহর সমস্ত সৃষ্টির ভেতরে মানুষ হলো সর্বোত্তম সৃষ্টি এবং পৃথিবীর সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে সর্বাপেক্ষা উন্নত সৃষ্টি এবং কারণে মানুষ এই পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি বা খলিফা। মানুষের সৃষ্টিগত দুর্বলতা এটাই যে, তাঁর আগমনের সূচনা হলো অপবিত্র পানি এবং জমাটবাঁধা রক্ত থেকে।

পক্ষান্তরে মহান আল্লাহ যখন তাকে উচ্চ সম্মান ও মর্যাদা প্রদান করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন এবং সর্ব ‘নিম্ন পর্যায়ের’ সৃষ্টিকে উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করতে ইচ্ছা প্রকাশ করলেন, তখন তাকে এমন গুণ দান করলেন যা মহান আল্লাহ পক্ষ থেকে দান করা শ্রেষ্ঠগুণ।

ওহীর মাধ্যমে বিশ্বনবী (সাঃ) কে পড়া, শোনা ও লেখা গুরুত্ব বুঝালেন

তাকে জ্ঞান নামক গুণের প্রকাশ ক্ষেত্র হিসেবে প্রস্তুত করলেন। তাকে কলমের মাধ্যমে লেখা শিক্ষা দান করলেন। সব ধরণের জ্ঞান ও আবিষ্কারের ক্ষমতা দান করলেন। আবার মানুষকে এটাও উপলব্ধি করালেন যে, উপায় ও উপকরণগত ধারায় জ্ঞান অর্জনের তিনটি মাত্র নিয়ম বিদ্যমান।

জ্ঞান অর্জনের প্রথম প্রকারের মাধ্যম হলো, অন্তর জগৎ ও মেধার জগতে মহান আল্লাহ পক্ষ থেকে জন্মগতভাবে যে জ্ঞান প্রদান করা হয়, তা শব্দ, অক্ষর এবং চিত্র বা লেখনীর মুখাপেক্ষী নয়। ইলহামের মাধ্যমেই এভাবে মানুষ জ্ঞান অর্জন করে।

জ্ঞান অর্জনের দ্বিতীয় মাধ্যম হলো কোন কিছু শুনে মুখে আবৃত্তি করে তা স্মরণে রাখা। জ্ঞান অর্জনের পথ হলো জিহ্বার মুখাপেক্ষী, অক্ষর ও লেখনীর মুখাপেক্ষী নয়। জ্ঞান অর্জনের তৃতীয় মাধ্যম হলো, অক্ষর ও লেখনীর দ্বারা।

আল্লাহ বিশ্বনবী (সাঃ) কে একমাত্র বুঝালেন পড়া ও লেখার মাধ্যমেই জ্ঞানের চর্চা হয়

কিন্তু এটা এমন একটি মাধ্যম, যে মাধ্যমে জ্ঞান অর্জনের উল্লেখিত দুটো মাধ্যম ছাড়া এই তৃতীয় মাধ্যমকে জ্ঞান অর্জনের একমাত্র মাধ্যম হিসাবে অবলম্বন করা করা যায় না। এ কারণে বলা হয়েছে, তিনি তোমাদেরকে কলমের মাধ্যমে জ্ঞান শিক্ষা দান করেছেন।

কলমের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করতে হলে যেমন অন্তর জগত ও মেধার জগত প্রসারিত হতে হয়, তেমনি প্রয়োজন হয় জিহ্বা দ্বারা আবৃত্তি করে তা স্মরণে রাখা। ফেরেশতা বিশ্বনবীর সামনে আবির্ভূত হয়ে বলেছিলেন, ‘আপনি পড়ুন।’

জবাবে নবী (সাঃ) বলেছিলেন, ‘আমি পড়তে জানিনা।’ ফেরেশতার কথা এটা ছিল না, আমি যা আবৃত্তি করছি, আমার সাথে অনুরূপ আপনিও করুন। এই বচন ভঙ্গী বা কথোপকথন থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় হযরত জিবরাঈল (আঃ) প্রথম ওহীর শব্দগুলো লিখিত আকারে তাঁর সামনে উপস্থাপন করেছিলেন।

বিশ্বনবী (সাঃ) এর প্রতি প্রথম ওহীতেই পড়ার গুরুত্ব ছিল অপরিহার্য

প্রথম ওহী যে তাঁর সামনে লিখিত আকারে ছিল তা বিশ্বনবীর কথার ভঙ্গীতেও প্রকাশ পায়। তিনি বলেছিলেন, আমি পড়তে জানি না। ওহী লিখিত না হলে তিনি এ কথা বলতেন না। ব্যাপারটা যদি শুধুমাত্র মুখের সাথে সম্পর্কিত হতো তাহলে তিনি (সাঃ) হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর সাথে সাথেই আবৃত্তি করে যেতেন, কোন আপত্তি উত্থাপন করতেন না।

মহান আল্লাহ প্রথম বাণী থেকে এ সত্য উপলব্ধি করা যায় যে, বিশ্বনবী (সাঃ)-কে নবুওয়ত দান করার পূর্বেই বিশেষ কোন প্রক্রিয়ায় তাঁর জ্ঞানের জগতে এ সত্য প্রবেশ করানো একেবারেই আল্লাহই হলেন রব বা প্রতিপালক। আল্লাহর এই রবুবিয়াত ছিল বিশ্বনবীর কাছে প্রকাশিত।

এ কারণেই দেখা যায় তিনি কোনদিন কোন মূর্তির কাছে সামান্য কোন প্রার্থনা করেননি। তিনি জানতেন যে, এই মূর্তিগলো মানুষের রব নয়, রব হলেন এক মাত্র আল্লাহ। এ সত্য তাকে অবগত করানো হয়েছিল বলেই তিনি নির্মাণ করা রব এ মূর্তিকে প্রচণ্ড ঘৃণা করতেন।

বিশ্বনবী (সাঃ) প্রথম ওহীর মাধ্যমে বরের পরচিতি তুলে ধরলেন

তিনি (সাঃ) ওহী আসার পূর্বেই একমাত্র আল্লাহকে রব বলে জানতেন এবং তাকেই একমাত্র রব হিসাবে মেনে চলতেন। এই রব কি, এটা তাঁর কাছে পরিচিত ছিল ফলে প্রথম ওহীর ভেতরে নবীকে রবের পরিচয় সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে হয়নি।

সরাসরি তাকে বলা হয়েছে, আপনি আপনার রবের নামে পড়ুন বা বিসমিল্লাহ বলে শুরু করুন। ঐ রবের নামেই পড়ুন, যিনি সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছেন। তিনি কাকে কিভাবে সৃষ্টি করেছেন এ কথা তাঁর নবীকে বলা প্রয়োজন হয়নি এ কারণে যে, নবের জ্ঞানের জগতে এ কথাগুলো পূর্বেই প্রতিষ্ঠিত করে দেওয়া হয়েছিল।

দৃষ্টির আড়ালে এবং দৃষ্টির সামনে পরিদৃশ্যমান আলোকিত সমস্ত পৃথিবী এবং এর ভেতরে যা কিছু আছে, এ সব কিছু সৃষ্টি করেছেন একমাত্র মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন।

জমাটবাঁধা রক্ত যা ইতিপূর্বে ছিল তোমাদের দেহ নির্গত এক ফোঁটা অপবিত্র পানি। যাকে বিশেষ এক সময়ে জমাটবাঁধা রক্তে পরিণত করা হয়েছে, মাংস পিণ্ডে

পরিণত করে তার ভেতর অস্থি সহযোজন করে মানুষের আকৃতিদান করা হয়েছে। মানুষের প্রথম অবস্থা ছিল এক ফোঁটা অপবিত্র পানি, সেখান থেকে সুন্দর মানুষ সৃষ্টি করে তাকে জ্ঞানের সঞ্জীবনী সুধা ঢেলে জ্ঞানের অলংকারে সজ্জিত করণ সেই মহান আল্লাহর অসীম অনুগ্রহের প্রকাশ।

বিশ্বনবী (সাঃ) কে শুধুমাত্র পড়া নয় কলমের শক্তি সম্পর্কেও জানালেন

তাকে শুধু জ্ঞানই দান করা হয়নি, কলমের মাধ্যমে তাকে এমন এক জ্ঞান দান করা হয়েছে যে, অর্জিত জ্ঞানের বিস্তৃতি এবং ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য সংরক্ষণের কৌশল ঐ মহান আল্লাহই তোমাদেরকে শিক্ষা দান করেছেন।

তিনি যদি তোমাদেরকে অলক্ষ্য থেকে কলমের ব্যবহার শিক্ষাদান না করতেন, তাহলে তোমাদের জ্ঞানের জগতে বন্ধ্যাত্ব নেমে আসতো। তোমরা সামনের দিকে অগ্রসর হতে পারতে না।

তোমরা ছিলে জ্ঞানহীন অচেতন, কিছুই তোমরা অবগত ছিলে না। তোমাদের মায়ের গর্ভ থেকে যখন তোমাদের নিয়ে আসা হয় সে সময়ে তোমাদের কোন চেতনাই ছিল না। তারপরেও তোমাদেরকে তিনটি জিনিস দান করা হয়েছে।

চোখ কান এবং মস্তিষ্ক। একটা দিয়ে দেখবে আরেকটা দিয়ে শুনবে এবং মাথা দিয়ে চিন্তা করবে। তোমার চিন্তার জগতে আমিই আবিষ্কারের সূত্র দান করি। যা তোমার অজানা অজ্ঞাত ছিল, তা তোমাকে জানানোর ব্যবস্থা আমি করেছি।

বিশ্বনবী (সাঃ) কে আল্লাহ জানালেন প্রকৃত জ্ঞান তাঁর হাতেই নিবদ্ধ

তোমরা একটা নতুন কিছু উদ্ভাবন করে এ ধারণা করো না, এটা তোমারই কৃতিত্ব। প্রকৃত ব্যাপার তা নয়, আমিই তোমার চিন্তার জগতে আবিষ্কারের অনুপ্রেরণা এবং সূত্র দান করি। তুমি তোমার জ্ঞান দ্বারা কোন কিছুই করতে পারো না।

যতক্ষণ আমি তোমাকে সহযোগিতা না করি। তোমার এ জ্ঞান নেই, তুমি অনুভব করতে পারো না কিভাবে আমি তোমাকে জ্ঞানদান করি।

মহান আল্লাহ তাঁর প্রথম বাণীতেই তাঁর রাসুলের ওপর কোন বিরাট দায়িত্ব চাপিয়ে দেননি। তাঁর সামনে কাজের বিশাল তালিকাও পেশ করেননি।

ওহী সম্পর্কে বিশ্বনবী ছিলেন অনভিজ্ঞ, প্রথম বার এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ করে মহান আল্লাহ তাঁর নবীকে ওহী সম্পর্কে অভিজ্ঞ করলেন যেন আগামী বার তিনি ওহী ধারণ করতে পারেন। মানসিক ও শারীরিক প্রস্তুতির জন্যেও কিছুদিন তাঁকে সময় প্রদান করা হয়েছিল।

প্রথমবার তাঁর পবিত্র স্বভাব প্রকৃতির ওপর যে প্রভাব নিপতিত হয়েছিল, তা যেন সহজ হয়ে যায়, এ কারণেও ওহীর বিরতি দেওয়া হয়েছিল।

প্রথম অবতীর্ণ-কৃত বাণীর তাৎপর্য হলো, বিশ্বনবী (সাঃ) তাঁর নবুওয়ত সম্পর্কে অর্থাৎ তিনি যে নবী হবেন এ সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন না। তাঁকে আল্লাহর পক্ষ থেকে অবগত করা হলো, আপনাকে নবী হিসাবে নির্বাচিত করা হয়েছে, সুতরাং আপনি সাধারণের থেকে ভিন্ন।

আপনার জীবন এবং সাধারণ মানুষের জীবনে আকাশ পাতাল ব্যবধান বিদ্যমান। একজন রাসুলের যে দায়িত্ব ও কর্তব্য আপনাকে তা পালন করতে হবে। অর্থাৎ নবুওয়ত সম্পর্কে বিশ্বনবীকে সজাগ করে তোলা হয়েছিল প্রথম ওহী অবতীর্ণ করে।

👈পূর্বের পোষ্ট: মহান আল্লাহর বিশেষ তত্ত্বাবধানে নবী (সাঃ) এর শিক্ষার ব্যবস্থা
 পরের পোষ্ট 👉