ওহী সংরক্ষণে পোশাকে পবিত্রতার পরিছন্নতার গুরুত্ব
মহান আল্লাহ তাঁর রাসুলকে কোন কথা ঘোষণা করতে আদেশ করলেন, সে কথার যে কি তাৎপর্য এ কথা উপলব্ধি করার মত জ্ঞান রাসুলকে দেওয়া হয়েছিল, রাসুল মহান আল্লাহর আদেশের তাৎপর্য অনুধাবন করবেন, তিনি ভীতি গ্রন্থ হতে পারেন, চিন্তিত হতে পারেন, এ কারণে ঐ আয়াতের মধ্যে রাসুলকে এ কথাও বুঝিয়ে দেওয়া হলো, ভয় বা চিন্তার কোন কারণ নেই।
কেননা তোমার রবই শ্রেষ্ঠ, তোমার রবের শ্রেষ্ঠত্বের সামনে অন্য সমস্ত শক্তি ধূলিকণার মতই উড়ে যাবে। তোমার রব রয়েছেন তোমার সাথে, তোমাকে ইসলামী দাওয়াতের উত্তপ্ত ময়দানে এগিয়ে দিয়ে তোমার রব নীরব থাকবেন না।
তুমি তোমার দায়িত্ব পালন শুরু করে দাও, তোমাকে সহযোগিতা করার দায়িত্ব আমার। এই সূক্ষ্ম কথাগুলো রাসুল (সাঃ) উপলব্ধি করেছিলেন। মহান আল্লাহ তাঁকে যে উৎসাহ উদ্দীপনা দান করেছিলেন ঐ আয়াতে তা রাসুল অনুভব করেছিলেন বলেই তিনি তাঁর আন্দোলনের গতি পক্ষে কোন শক্তিকে সামান্যতম প্রশ্রয় দান করেননি।
ওহী সংরক্ষণে পোশাকে পরিছন্নতার তাগিদ এসেছে আসমান থেকেই
মহান আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব রাসুল উপলব্ধি করেছিলেন বলেই তিনি (সাঃ) একাকী গোটা পৃথিবীর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছিলেন। রাসুলের আদর্শ নিয়ে আজো যারা ময়দানে কাজ করতে অগ্রসর হবেন প্রথমে তাদেরকে মহান আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা অর্জন করতে হবে, তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের চিত্র নিজের মনে অঙ্কন করে নিতে হবে।
তাহলে পৃথিবীর কোন শক্তিকেই আর শক্তি বলে মনে হবে না। এর পরে আল্লাহ তাঁর রাসুলকে বললেন, ‘আপনি নিজের পোশাক পরিচ্ছদ পরিচ্ছন্ন রাখুন পরিচ্ছন্ন রাখুন।’
বিজ্ঞ তাফসির কারকগণ পবিত্র কোরআনের এই আয়াতের ব্যাপক তাফসীর করেছেন। প্রকৃত পক্ষে উক্ত আয়াতের মর্মও বড় ব্যাপক। ছোট একটি কথা দিয়ে আল্লাহ ব্যাপক অর্থ প্রকাশ করেছেন। এর মধ্যে একটা অর্থ হলো, পরিধেয় পোশাক পাক পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন রাখা।
বাহ্যিক পবিত্রতার প্রথম বস্তু হল পোশাক পরিচ্ছদ
পোশাক মানুষের মনের ওপরে গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করে এতে কোন সন্দেহ নেই। এ কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সামরিক বাহিনীর বিশেষ পোশাক নির্বাচিত করা হয়েছে। গবেষকগণ বলেছেন, পোশাক পরিচ্ছদের পবিত্রতা এবং আত্মার পবিত্রতা অবিচ্ছিন্ন।
একটার সাথে আরেকটা ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। পবিত্র রুচি সম্পন্ন কোন ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয় সে পুঁতিগন্ধময় কোন খাদ্য তাঁর মুখ গহ্বর দিয়ে দেহে প্রবেশ করবে। সুতরাং কোন পবিত্র আত্মার পক্ষেও সম্ভব নয় সে কোন অপবিত্র দেহের ভেতরে বাস করবে।
কোন পবিত্র দেহের পক্ষেও সম্ভব নয় সে নিজেকে অপবিত্র অপরিচ্ছন্ন পোষাকে আবৃত রাখবে। মহান আল্লাহ পবিত্র এবং পরিচ্ছন্ন। তিনি অপবিত্রতা প্রশ্রয় দেন না। এ কারণে তিনি তাঁর রাসুলকে আদেশ করলেন, তোমার পোশাক পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন রাখবে।
পবিত্রতার প্রয়োজনীতা ও সে সম্পর্কিত জ্ঞান আল্লাহর পক্ষ হতেই এসেছে
মহান আল্লাহর এ কথা থেকে এটা ধারণা করার কোন অবকাশ নেই যে, রাসুল (সাঃ) বোধহয় এর পূর্বে অপবিত্র অপরিচ্ছন্ন পোষাকে থাকতেন। পবিত্রতা সম্পর্কে তাঁর কোন জ্ঞান ছিল না। প্রকৃত ব্যাপার তা নয়।
বিশ্বনবী (সাঃ) ছিলেন জন্মগত-ভাবেই পবিত্র। মহান আল্লাহ তাঁকে পবিত্র রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন এবং তাঁর জ্ঞানের জগতে পবিত্রতা সম্পর্কে জ্ঞানদান করেছিলেন। আরবি ‘তাহুরের বা তাহারাত’ শব্দের অর্থ শুধু বাহ্যিক পবিত্রতা নয়। অন্তরের কলুষতা দূর করাকেও বোঝায়।
পবিত্রতা বা তাহারাতকে কোরআন যে অর্থে উপস্থাপন করেছে, পৃথিবীর এমন কোন ভাষা নেই, সে ভাষার একটি শব্দ ‘তাহারাতের সমার্থক হতে পারে বা পবিত্রতার ব্যাপক ধারণা পেশ করতে পারে। পাপ থেকে নিজেকে রক্ষা করাও পবিত্রতা এবং পাপের ভেতরে নিজেকে জড়িত করাকে অপবিত্রতা বলা
হয়েছে।
কোন অন্যায় কাজ বা মিথ্যা কথা থেকে নিজেকে বিরত রাখার অর্থও হলো পবিত্রতা। মিথ্যা কথা বলা অপবিত্রতা। এভাবে যাবতীয় অন্যায় অনাচার, পাপাচার, অত্যাচার, অপরিচ্ছন্নতা, মিথ্যা, চিন্তার জগতে অপরিচ্ছন্নতা ইত্যাদি থেকে মুক্ত থাকাকেই পবিত্রতা বলা হয়েছে।
পবিত্রতার জন্যে শুধু দেহ ও পোশাক পরিছন্নতা যথেষ্ঠ নয়
দেহ এবং দেহের পোশাক পবিত্র-এটা কোন পবিত্রতাই নয়। চিন্তার জগৎ হতে যাবতীয় অপরিচ্ছন্নতা এবং অপবিত্রতা দূর করতে হবে। অজ্ঞানতা তথা মূর্খতাও এক ধরণের অপবিত্রতা। এ সমস্ত পবিত্রতা থেকে মুক্ত থাকার নামই হলো পবিত্র কোরআনের ভাষায় তাহারাত।
ইসলাম আত্মা এবং দেহের পবিত্রতার দাবি করে। সে সময়ে মানুষ জ্ঞানের দিক থেকে, চিন্তার দিক থেকে, চরিত্রের দিক থেকে, স্বভাবের দিক থেকে, নেতৃত্বের দিক থেকে, কথার দিক থেকে তথা সর্ব স্তরে অপবিত্রতা ছেয়ে ফেলেছিল। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর রাসুলকে আদেশ করলেন, মানব সমাজ থেকে এ সমস্ত অপবিত্রতা দূর করার লক্ষে প্রচেষ্টা গ্রহণ করো।
তুমি এই মহান কাজ করছো, এ জন্য যেন তুমি ধারণা করো না, তুমি তাদের ওপরে দয়া করছো। বরং এটাই তোমার দায়িত্ব, এই দায়িত্ব দিয়েই তোমাকে প্রেরণ করা হয়েছে। আবার এ ধারণাও করো না, এ কাজ করে তুমি তোমার রবের কল্যাণ করছো। বরং তুমি তোমার ওপরে অর্পিত দায়িত্ব পালন করে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করেছো।
যে দায়িত্ব তুমি পালন করছো এ কাজ সহজ নয়। তুমি তোমার প্রতিটি পদক্ষেপে বাধাগ্রস্ত হবে। তোমার সাথে অহেতুক শত্রুতা করা হবে। তোমাকে বিভিন্নভাবে কষ্ট দেওয়া হবে। তোমাকে হত্যা করার প্রচেষ্টা করা হবে।
পবিত্রতা মানুষের অন্তরকে কলুষমুক্ত ও সাহসী করে
পৃথিবীর সমস্ত মানুষ তোমার বিরুদ্ধে চলে যাবে। তুমি নানা ধরণের মিথ্যে অপবাদের, ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি হবে। তোমার বাড়ি-ঘর, সহায় সম্পদ বিনষ্ট হবে। আহার নিদ্রায় কষ্ট পাবে। তোমার উপার্জনের পথরুদ্ধ হয়ে যাবে। তোমার নামে কুৎসা ছড়িয়ে দেওয়া হবে। বিরোধী শক্তি তোমাকে অবরোধ করবে।
তোমার দেহের রক্ত ঝড়বে। তোমার সামনে নানা ধরণের লোভ লালসা দেখানো হবে। বিভিন্নভাবে তোমার দায়িত্ব পালন করা থেকে তোমাকে বিরত রাখার চেষ্টা করা হবে। কিন্তু তোমার কাজে তুমি থাকবে অটল অবিচল।
তোমাকে এমন ধৈর্য ধারণ করতে হবে যে, ধৈর্যের শেষ পর্যায় বলতে তোমার কাছে কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। ধৈর্যের শেষ সীমা বলতে তোমার কাছে কিছুই থাকবে না।
ওহীর শুরুতেই মহান আল্লাহ তাঁর নবীকে এ কথা স্পষ্ট করে দিলেন, কি কাজের জন্য তোমাকে বিশ্বনবী হিসাবে মনোনীত করা হয়েছে এবং কেন করা হয়েছে। এই কাজের সূচনা কিভাবে করা হবে, এই কাজ করতে যেয়ে কোন মানুষের কাছে এ কথা বলা যাবে না যে, আমি তোমাদের হেদায়েতের জন্য এসেছি, তোমাদের কল্যাণ করছি, তোমরা আমার হাতে হাত দিয়ে ঈমান যখন আনলে তাহলে এবার আমাকে আমার বিনিময় প্রদান কর।
এ ধরণের কোন আশা মনে পোষণ করা করা যাবে না, এ কথা সত্যের প্রচারক-দেরকে বলে দেওয়া হলো। এ কাজ করতে গেলে কোন ধরণের বাধা আসবে তাও স্পষ্ট করে বলে দিয়ে ধৈর্য ধারণ করতে বলা হয়েছে।
এভাবে আল্লাহ তাঁর নবীকে দায়িত্ব দান করলেন এবং কিভাবে তিনি কাজ করবেন, কার্যক্ষেত্রে যে সকল অসুবিধা দেখা দিত তা দূর করার পথের সন্ধান দিতে থাকলেন। অর্থাৎ ক্রমাগতভাবে ওহী অবতীর্ণ হতে থাকলো।
ওহী আনয়নে পবিত্র আত্মা জিবরাইল (আঃ) আসা যাওয়া শুরু করলেন
বিশ্বনবী (সাঃ) ওহী ধারণ করার ক্ষমতা ক্রমশ: অর্জন করলেন। হযরত জিবরাঈল (আঃ) যে সময়ে ওহী তাঁর কাছে আবৃত্তি করতেন নবী (সাঃ)-ও তাঁর সাথে দ্রুত আবৃত্তি করতে থাকেন। প্রিয় বন্ধুর এই অস্থিরতা ব্যস্ততা মহান আল্লাহর কাছে সহ্য হলো না।
তিনি তাঁর রাসুলকে বললেন, ‘আপনার এত কষ্ট করার কোন প্রয়োজন নেই। আমার ফেরেশতা ওহী আবৃত্তি করে আপনি শুধু তা মনোযোগ দিয়ে শুনবেন। আপনার মনের মধ্যে এবং স্মৃতিতে তা সংরক্ষণ করে দেবার দায়িত্ব আমার।’
তোমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দেওয়ার জন্য তুমি আমার কাছে দোয়া করবে। আমার ওহীর কোন কথার কোন অর্থ তা আমিই তোমাকে বুঝিয়ে দেব। আমার ফেরেশতার সাথে অত ব্যস্তভাবে তুমি তোমার জিহ্বা চালনা করো না। আমি যা তোমাকে শোনাচ্ছি তা তুমি শুধু শোন। (সুরায়ে ত্বা-হা ও সুরায়ে কিয়ামাহ)
| 👈পূর্বের পোষ্ট: ওঠো ও সতর্ক করো’ সুরা মুদ্দাস্সিরে রবের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার আহবান |
| পরের পোষ্ট 👉 |