Tipu vai
  • মুলপাতা
  • ধর্ম
    • ইসলাম
    • কোরআন
    • হাদিস
    • ডায়েরি
    • জীবনী
  • সাহিত্য
    • গল্প
    • রচনা
    • প্রবন্ধ
    • রম্য রচনা
    • সামাজিক
  • পরিবেশ
    • উদ্ভিদ জগত
    • প্রাণী জগত
    • ভেষজ হার্বাল
    • জলবায়ু
  • শিক্ষা
    • প্রাতিষ্ঠানিক
    • মৌলিক
    • ইতিহাস
    • বিজ্ঞান
    • ভ্রমণ
    • শিশু-কিশোর
  • বিবিধ
    • ঘরে-বাইরে
    • জীবন বৈচিত্র্য
    • প্রতিবেদন
    • রাজনীতি
    • তথ্যকণিকা
  • লেখক পরিচিতি
No Result
View All Result
নজরুল ইসলাম টিপু
  • মুলপাতা
  • ধর্ম
    • ইসলাম
    • কোরআন
    • হাদিস
    • ডায়েরি
    • জীবনী
  • সাহিত্য
    • গল্প
    • রচনা
    • প্রবন্ধ
    • রম্য রচনা
    • সামাজিক
  • পরিবেশ
    • উদ্ভিদ জগত
    • প্রাণী জগত
    • ভেষজ হার্বাল
    • জলবায়ু
  • শিক্ষা
    • প্রাতিষ্ঠানিক
    • মৌলিক
    • ইতিহাস
    • বিজ্ঞান
    • ভ্রমণ
    • শিশু-কিশোর
  • বিবিধ
    • ঘরে-বাইরে
    • জীবন বৈচিত্র্য
    • প্রতিবেদন
    • রাজনীতি
    • তথ্যকণিকা
  • লেখক পরিচিতি
No Result
View All Result
নজরুল ইসলাম টিপু
No Result
View All Result

ইমাম মুহাম্মদ বিন ইদ্রীস শাফেয়ী (রহঃ)

আগস্ট ৬, ২০২০
in জীবনী
10 min read
0
ইমাম শাফেয়ী
শেয়ার করুন
        

ইমাম মুহাম্মদ বিন ইদ্রীস শাফেয়ী (রহঃ) এর বংশধারা সম্পর্কে তাঁর ছাত্র রবী বিন সুলাইমান মুরারী এরূপ বর্ণনা করেন, ইমাম আবু আব্দিল্লাহ মুহাম্মদ বিন ইদ্রীস বিন আব্বাস বিন উছমান বিন শাফে বিন সায়েব বিন উবাইদিল্লাহ বিন আবদ ইয়াযীদ বিন হাশেম বিন মুত্তালেব বিন আবদে মানাফ আলকুরাশী, আলমুত্তালেবী আল হাশেমী (রহঃ)।

সায়েব বিন উবাইদিল্লাহ (রাঃ) বদরের যুদ্ধে মুসলমানদের হাতে বন্দী হবার পর ইসলাম গ্রহণ করেন। বনী হাশেমের ঝাণ্ডা তার হাতে ছিল। ফিদইয়া (রক্তপণ) আদায় করার পর মুসলমান হলে লোকেরা বিস্ময় প্রকাশ করে। তিনি বললেন, আমি মুসলমানদেরকে তাদের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করতে চাইনি। এক বর্ণনা মতে তাঁর বাহ্যিক আকার-আকৃতি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। একবার সায়েব বিন উবাইদিল্লাহ (রাঃ) অসুস্থ হলে হযরত উমর (রাঃ) তাকে দেখতে যান।

কৈশোরে একবার শাফে বিন সায়েব তার পিতার সাথে (রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর সাথে সাক্ষাতের সৌভাগ্য অর্জন করেন। তিনি তাকে দেখে বললেন,

অর্থাৎ পিতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়াটা সৌভাগ্য। ইমাম সাহেবের মাতার নাম ফাতেমা বিনতে আব্দিল্লাহ বিন হাসান বিন আলী বিন আবি তালিব। কিন্তু খতীবে বাগদাদী এবং কাযী আয়ায লিখেন যে, তার মাতা ছিলেন বনু ইদ গোত্রের, যাদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ইযদ হচ্ছে আরবের উপাদান।

জন্ম এবং বাল্যকাল

ইমাম মুহাম্মদ বিন ইদ্রীস শাফেয়ী সাহেব বর্ণনা করেন, আমি ১৫০ হিজরীতে সিরিয়ার গাযা শহরে জন্মগ্রহণ করেছি। দুই বছর বয়সে আমাকে মক্কায় নিয়ে আসা হয়। এ বর্ণনাটিই অধিক প্রসিদ্ধ। অন্য এক বর্ণনা মতে আমি আসকালানে জন্মগ্রহণ করি। আমার দু’বৎসর বয়সে মা আমাকে নিয়ে মক্কায় আসেন। অন্য এক বর্ণনা মতে তিনি বলেন, ইয়ামানে আমার জন্ম হয়। আমার মায়ের আশঙ্কা হল যে, ইয়ামানে আমার নসব (বংশ) নষ্ট হয়ে যাবে। এ কারণে তিনি দশ বছর বয়সে আমাকে নিয়ে মক্কায় চলে আসেন। তাঁর মাতা বর্ণনা করেন যে, যখন শাফেয়ী মাতৃগর্ভে ছিল তখন আমি স্বপ্নে দেখতে পেলাম যে, মুশতারী (মঙ্গল) তারকাটি আমার শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মিশরে পতিত হচ্ছে। তার আলো প্রতিটি শহরে গিয়ে পৌঁছল। স্বপ্ন ব্যাখ্যাকারীগণ বললেন যে, গর্ভ থেকে এমন একজন আলেম জন্ম নিবে, যার ইলম মিশর থেকে প্রতিটি শহরে ছড়িয়ে পড়বে।

ইমাম সাহেব পিতৃহীন ছিলেন। তাঁর জন্মের পূর্বেই অথবা তাঁর জন্মের পরপরই তাঁর পিতা মারা যান। তাঁর মাতা তাকে দু’বছর বয়সে মক্কায় নিয়ে আসেন।

ইমাম সাহেব বলেন, বাল্যকালে দুটি জিনিসের দিকে আমার সমস্ত মনোযোগ ছিল। তীর নিক্ষেপ এবং ইলম অর্জন। তীর নিক্ষেপে আমি এমন পারদর্শী হয়েছিলাম যে, দশটার মধ্যে দশটাই সঠিক লক্ষ্যে গিয়ে পৌঁছত! ঐ সময়ে ঘোড়ায় আরোহণের আগ্রহও ছিল। তীর নিক্ষেপ এবং ঘোড়সওয়ারী সম্বন্ধে ‘কিতাবুসসবক ওয়াররমী’ রচনা করি। এ বিষয়ে এটাই ছিল সর্বপ্রথম কিতাব। সাথে সাথে পড়ালেখায় পুরো মনোযোগ ছিল। পিতৃহীনতা এবং দরিদ্রতা সত্ত্বেও রাত দিন পড়াশুনায় রত থাকতেন।

শিক্ষা শুরু

মক্কা মুকাররমায় থাকাকালে ইমাম সাহেব মকতব হতে শিক্ষা শুরু করেন। এরপর মদিনায় গিয়ে ইলম হাছেল করেন। মক্কা থাকাকালেই তিনি তীর নিক্ষেপ, ঘোড়সওয়ারীর সাথে সাথে মকতবের পড়ার অবসরে বনী হুইল গোত্র থেকে আরবীয়্যাত (আরবী ভাষা) এবং আরবী কবিতায় পারদর্শীতা অর্জন করেন। এর সাথে সাথে তাঁর চাচা মুহাম্মদ বিন শাফে এবং মুসলিম বিন খালেদ যঞ্জী প্রমুখ থেকে হাদীছ শ্রবণ করেন।

ইমাম সাহেব তাঁর ছাত্রজীবনের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, আমি পিতৃহীন ছিলাম। আমার মা আমাকে লালন-পালন করতেন। মু’আল্লিমের খিদমত করার মত অর্থ আমার নিকট ছিল না। কিন্তু এমন সুযোগ সৃষ্টি হল যে, মু’আল্লিম আমাকে বিনা বেতনে পড়াতে রাযী হয়ে গেলেন। বাচ্চাদেরকে তিনি যে সবক দিতেন তা আমি মুখস্থ করে নিতাম এবং তার অনুপস্থিতিতে বাচ্চাদেরকে আমি পড়াতাম। এতে তিনি আমার উপর সন্তুষ্ট হয়ে বিনা বেতনে পড়াতে রাযী হয়ে গেলেন।

মকতবের শিক্ষা শেষ করার পর বনী হুযাইল গোত্রে চলে গেলাম। এরা ভাষা-অলঙ্কার শাস্ত্রে প্রসিদ্ধ ছিল। সতের বছর পর্যন্ত তাদের সাথে ছিলাম। মক্কা ফেরৎ এসে তাদেরকে কবিতা শুনাতে লাগলাম। ঐ সময় আরবী ভাষা, সাহিত্য এবং কবিতার প্রতি আমার যথেষ্ট আগ্রহ ছিল। ঐ সময়েই আমি আমার চাচা এবং মুসলিম বিন খালেদ যঞ্জী প্রমুখ থেকে হাদীছ রেওয়ায়েত করতাম। উলামাদের শিক্ষা মজলিসে বসে হাদীছ এবং মাসয়ালা শুনে শুনে মুখস্থ করে নিতাম। আমার মায়ের নিকট কাগজ কেনার পয়সা না থাকায় এদিক ওদিক থেকে হাড়, মাটির পাত্রের ভাঙ্গা টুকরা এবং খেজুরের পাতা কুড়িয়ে সেগুলোতেই লিখে নিতাম। সাত বৎসর বয়সে কোরআন মজীদ এমনভাবে হিফয করে নিয়েছি যে তার সব অর্থ এবং মর্ম আমার নিকৃট স্পষ্ট ছিল! দশ বৎসর বয়সে মুয়াত্বায়ে ইমাম মালেক মুখস্থ করে নিয়েছিলাম।

ইমাম মালেকের (রহঃ) দরসী মজলিসে

ইমাম সাহেবের বর্ণনায় আগেই বলা হয়েছে যে, তিনি মক্কা মুকাররমায় মকতবের শিক্ষা (প্রাথমিক শিক্ষা) গ্রহণের পর সেখানকার মুহাদ্দেছীন এবং ফকীহদের নিকট হাদীছ এবং ফিকাহ অর্জন করেন। এরপর কাব্য-সাহিত্য এবং আরবদের ইতিহাস (আইয়্যামে আরব) সম্বন্ধে পূর্ণ জ্ঞান অর্জন করেন। যে সময়ে তিনি হুযাইল গোত্রের কবিদের কবিতা শুনাতেন, তখন এক বুযুর্গের পরামর্শ এবং নছীহত অনুযায়ী মদীনা মুনাওয়ারায় ইমাম মালেকের খিদমতে উপস্থিত হন।

আরো পড়ুন…

  • ইমাম আহমদ বিন হাম্বল আশশায়বানী (রহঃ)
  • উম্মুল মোমেনীন সাফিয়া (রাঃ)
  • উম্মুল মোমেনীন মাইমুনা (রাঃ)

তিনি বলেন, ঐ সময়ে যুবাইর পরিবারের জনৈক ব্যক্তির সাথে আমার সাক্ষাৎ হলে তিনি বললেন, এটা আমার নিকট খুবই খারাপ লাগছে যে, তোমার এত মেধা এবং স্মরণশক্তি থাকা সত্ত্বেও তুমি দ্বীনের ফিকাহ থেকে বঞ্চিত থাকবে এবং ধর্মীয় বিষয়ে নেতৃস্থান তোমার অর্জিত হবে না।

আমি বললাম, ফিকাহ অর্জন করার জন্য কার নিকট যাব? তিনি বললেন, তুমি মালেকের নিকট যাও। তিনি বর্তমানে মুসলমানদের নেতা। এরপর আমি নয় রাত্রে ইমাম মালেকের (রহঃ) মুয়াত্তা মুখস্থ করে নিয়েছি।

এরপর মক্কার আমীর থেকে একটি চিঠি মদীনার আমীর এবং একটি চিঠি ইমাম মালেকের নামে নিয়ে মদীনায় পৌঁছলাম। মদীনার আমীরকে চিঠি হস্তান্তর করে বললাম, আপনি এ চিঠিটি কারও মারফতে ইমাম মালেকের নিকট পাঠিয়ে তাকে এখানে ডেকে আনুন এবং আমার ব্যাপারে সুপারিশ করুন।

তিনি বললেন, এটা কত ভাল হবে যে আমি নিজেই আপনার সাথে তার খিদমতে উপস্থিত হব এবং তার দরজায় এত দীর্ঘ সময় বসব যে আকীক উপত্যকার ধুলাবালি আমাদের উপর পড়বে এরপর ভিতরে যাবার অনুমতি মিলবে। আছরের পর মদীনার আমীর তার খাদেম এবং অনুচরদেরকে নিয়ে বের হলেন। আমিও সাথে ছিলাম। আমরা সবাই আকীক উপত্যকায় ইমাম সাহেবের বাড়ী গিয়ে পৌঁছলাম এবং অনুমতি চাইলাম। ভিতরে থেকে ইমাম সাহেবের বাঁদী বলল শায়খ বলেছেন যে, যদি আপনারা কোন মাসয়ালা জিজ্ঞেস করতে এসে থাকেন তবে একটি কাগজে লিখে পাঠিয়ে দিন, আমি উত্তর দিয়ে দিব।

মদীনার আমীর বললেন, একটি প্রয়োজনীয় ব্যাপারে মক্কার আমীর চিঠি লিখেছেন। এ কথা শুনে বাঁদী ভিতরে গেল। কিছুক্ষণ পর ইমাম সাহেব স্বয়ং বেরিয়ে এলেন। মদীনার আমীর তাঁর হাতে মক্কার আমীরের চিঠি হস্তান্তর করলেন। চিঠি নিয়ে ইমাম সাহেব পড়তে লাগলেন। যখন সুপারিশ লিখা স্থানের কথা পড়লেন, তখন বললেন, সুবহানাল্লাহ! রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইলম সুপারিশের মাধ্যমে অর্জন করা শুরু হয়ে গেছে! 

আমি দেখলাম, মদীনার আমীর ইমাম সাহেবের সাথে কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন। তাই নিজেই অগ্রসর হয়ে বললাম, আমি একজন মুত্তালেবী ব্যক্তি। আমার এ ঘটনায় ইমাম সাহেব আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন, এরপর নাম জিজ্ঞেস করলেন। আমি বললাম, আমার নাম মুহাম্মদ! ইমাম সাহেব বললেন, হে মুহাম্মদ! আল্লাহকে ভয় কর এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাক। কারণ ভবিষ্যতে তুমি মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তি হবে।

এরপর বললেন, ঠিক আছে আগামীকাল তুমি এসো এবং সাথে করে এমন কাউকে নিয়ে এসো যে তোমার জন্য মুয়াত্তা পাঠ করবে। আমি বললাম আমি নিজেই তা পাঠ করব। এরপর থেকে ইমাম সাহেবের দরসী হালকায় উপস্থিত হয়ে মুয়াত্তা পড়তাম এবং কিতাব আমার নিকটই থাকত। কখনও কখনও ইমাম সাহেবের ভয়ে পড়া বন্ধ করে দিলে, তিনি পড়ার নির্দেশ দিতেন। এভাবে অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই মুয়াত্তা পড়ে নিলাম এবং ইমাম সাহেবের ইন্তিকাল পর্যন্ত মদীনায় ছিলাম।

এ সম্পর্কে মুছইব বিন ছাবেত যুবাইরী থেকে অন্য একটি বর্ণনা রয়েছে। তিনি বলেন, ইমাম শাফেয়ী মদীনায় আসার পর মসজিদে বসে কবিতা শুনাতেন। একদিন আমার পিতা তাঁকে বললেন, তুমি একজন কুরাইশী হয়েও শুধু এতটুকুতেই কি সন্তুষ্ট যে, তুমি একজন কবি হবে? ইমাম সাহেব বললেন, তবে করব কি? আমার পিতা বললেন, তুমি ইলমে ফিকাহ অর্জন কর। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,”আল্লাহ যার মঙ্গল চান তাকে দ্বীনের ফিকাহ্ দান করেন”।

এরপর ইমাম সাহেব ইমাম মালেকের (রহঃ) খিদমতে যান এবং তার কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন।

কয়েকদিন পর ইমাম সাহেব আমার পিতা ছাবেত বিন আব্দিল্লাহ বিন যুবাইরের নিকট বললেন, ইমাম সাহেব বলেন,

“আমাদের মত সেটাই যার উপর আমাদের শহরবাসী রয়েছে এবং খোলাফায়ে রাশেদীন রয়েছেন।” এ কথার মর্ম কি?

আমার পিতা বললেন, ধর্মীয় বিষয়ে মাপকাঠি এবং প্রমাণ হচ্ছেন রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, এরপর হযরত আবু বকর (রাঃ), উমর (রাঃ) এবং উছমান (রাঃ) যাঁদের মৃত্যু এ শহরে হয়েছে। এরপর ইমাম মুহাম্মদ বিন ইদ্রীস শাফেয়ী (রহঃ) ইমাম মালেকের (রহঃ) দরসে শরীক হতে লাগলেন।

ইয়ামানে সফর এবং সেখানকার শাসনকর্তা নিয়োজিত হওয়া

মদীনায় ইমাম মালেক (রহঃ) এর দরসগাহ থেকে ইমাম মুহাম্মদ বিন ইদ্রীস শাফেয়ী সাহেব ধর্মীয় জ্ঞানে পারদর্শিতা অর্জন করেন। সেখান থেকে মক্কা ফিরে আসলে তাঁর ইলমী এবং দ্বীনি যোগ্যতার প্রসিদ্ধি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ঐ সময় ইয়ামানের আমীর মক্কায় আগমন করেন। ইমাম সাহেব বলেন, কোরাইশের নেতৃবর্গ ইয়ামানের আমীরের সাথে আলোচনা করলেন, যেন তিনি আমাকে তার সাথে ইয়ামান নিয়ে যান। কিন্তু আমার মায়ের নিকট এই পরিমাণ অর্থ ছিল না যে, কাপড়-চোপড় কিনে সেখানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিব। বাধ্য হয়ে মায়ের একটি চাদর ষোল দীনারের বিনিময়ে বন্ধক রেখে সকল সামানের ব্যবস্থা করলাম।

ইয়ামান পৌঁছার পর আমীর সাহেব আমাকে এক এলাকার শাসনকর্তা হিসাবে চাকুরি দেন। আমি খুবই যোগ্যতা এবং দায়িত্ববোধ সহকারে অর্পিত দায়িত্ব পালন করলাম। এতে তিনি সন্তুষ্ট হয়ে আমার পদোন্নতি করে দিলেন। কিছুদিন পর আবারও পদোন্নতি করে দিলেন। আমি আমার সুচারু কার্যকর্ম দ্বারা যথেষ্ট প্রসিদ্ধি লাভ করলাম। ঐ সময়েই ইয়ামান থেকে একটি দল উমরা করার জন্য মক্কায় আগমন করল। তারা এখানে এসে আমার ভাল আলোচনা করে গেল, যার ফলে মক্কা মুকাররমায় আমার প্রশংসা হতে লাগল।

ইয়ামান থেকে যখন মক্কায় এলাম এবং ইবনে আবি ইয়াহয়ার খিদমতে গিয়ে সালাম দিয়ে বসে পড়লাম, তিনি রুক্ষ ভাষায় আমাকে তিরস্কার করলেন। বললেন, তোমরা আমাদের সবক’এ বস। আর যখন কারো কোন কাজ মিলে যায় সে তাতে লেগে যায়। তিনি এ ধরনের আরও অনেক কথা বললেন। আমি তার নিকট থেকে চলে এলাম। এরপর সুফিয়ান বিন উয়াইনার নিকট গেলাম। আমি তাকে সালাম করলাম। তিনি হাসিমুখে আমাকে ধন্যবাদ ও সাদর সম্ভাষণ জানালেন। বললেন, আমরা তোমার আমীর হওয়ার সংবাদ পেয়েছি। তুমি সেখানে ইলমে দ্বীনের প্রচার করনি। আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমার উপর যে দায়িত্ব অর্পিত হয়েছিল, তা তুমি সম্পূর্ণরূপে সম্পন্ন করনি। এখন আর সেখানে যেয়ো না।

ইবনে আবি ইয়াহয়া হতে সুফিয়ান বিন উয়াইনার নসীহত আমার জন্য অধিক কার্যকরী প্রমাণিত হল।

বাগদাদে ইমাম মুহাম্মদের (রহঃ) দরসী মজলিসে

ইয়ামান থেকে প্রত্যাবর্তন করার পর সুফিয়ান বিন উয়াইনার নছীহত অনুসারে ইমাম মুহাম্মদ বিন ইদ্রীস শাফেয়ী (রহঃ) বাগদাদ গমন করেন। সেখানে ইমাম মুহাম্মদ বিন হাসান শাইবানীর নিকট থেকে ফিকাহ সম্পন্ন করেন। ইমাম মুহাম্মদ ছিলেন ইমাম আবু হানিফার বিশিষ্ট ছাত্র, তাঁর ইলম এবং ফিকাহর মুখপাত্র এবং প্রচারক। ইমাম শাফেঈ বলেন,

ইমাম মালেকের পর ইমাম মুহাম্মদের ওস্তাদ হওয়াটাকে আমি স্বীকার করি।

ইমাম সাহেব ইমাম মুহাম্মদ তাঁর ওস্তাদ হওয়ার এবং তিনি তাঁর শাগরেদ হওয়ার স্বীকারোক্তি করতে গিয়ে বলেন,”আমি মুহাম্মদ বিন হাসান থেকে এক উষ্ট্র সম পরিমাণ হাদীছ শ্রবণ করেছি।”

তিনি আরও বলেন, মানুষ যদি ইনছাফের দৃষ্টিতে লক্ষ্য করে তবে মুহাম্মদ বিন হাসানের মত ফকীহ দেখতে পাবে না।

আমি মুহাম্মদ বিন হাসান থেকে এক উষ্ট্র পরিমাণ হাদীছ লিখেছি। যদি তিনি না হতেন তবে ইলম সম্বন্ধে আমার এত জ্ঞান হত না। সমস্ত আহলে ইলম ফিকাহর বিষয়ে ইরাকবাসীদের মুখাপেক্ষী, ইরাকবাসীরা কুফাবাসীর প্রতি মুখাপেক্ষী আর কূফাবাসী আবু হানিফার মুখাপেক্ষী। আমি মুহাম্মদ বিন হাসান হতে অধিক বাগ্মী এবং অলঙ্কারশাস্ত্র বিশারদ কাউকে দেখিনি। তাঁকে কোরআন তেলাওয়াত করতে শুনলে মনে হত বুঝি কোরআন তাঁর ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে। যেসব আলেমকে আমি ইলমী এবং ফিকহী বিষয় সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করেছি মুহাম্মদ বিন হাসান ব্যতীত অন্য সবার চেহারায় বিতৃষ্ণার ভাব প্রকাশ পেয়েছে। কিতাবুল্লাহ (কোরআন) সম্পর্কে মুহাম্মদ বিন হাসান হতে অধিক জ্ঞানী আমি আর কাউকে দেখিনি। যেন কোরআন তার উপরই নাযিল হয়েছে।

ইমাম মুহাম্মদ বিন হাসান (রহঃ) তাঁর এ যোগ্য শাগরেদের প্রতি শুধু লক্ষ্যই রাখতেন না বরং তার সম্মানও করতেন। ইলমী বিষয়ে সহযোগিতার সাথে সাথে আর্থিক সহযোগিতাও করতেন। আবু উবাইদ বলেন, একবার আমি ইমাম মুহাম্মদ বিন হাসানের দরসী মজলিসে ইমাম শাফেয়ীকে দেখলাম যে তিনি ইমাম মুহাম্মদকে একটি মাসয়ালা জিজ্ঞেস করলেন। ইমাম মুহাম্মদ উত্তর দিলেন। উত্তরটি ইমাম শাফেয়ীর খুবই পছন্দ হল। তিনি তা লিখে নিলেন। ইমাম মুহাম্মদ ইলমের প্রতি তার এ আগ্রহ দেখে তাকে একশত দিরহাম দিয়ে বললেন, ইলমের প্রতি যদি আগ্রহ থেকে থাকে তবে এখানে থেকে যাও।

এ ঘটনার পর আমি ইমাম শাফেয়ীকে বলতে শুনেছি যদি ইমাম মুহাম্মদ না হতেন তবে ইলমী বিষয়ে আমার যবান (মুখ) খুলত না।

ইমাম সাহেব বলেন, আমি ষাট দিরহাম ব্যয় করে ইমাম মুহাম্মদের কিতাবগুলো সংগ্রহ করেছি এবং সেগুলোর প্রত্যেকটির পার্শ্বে দলীল হিসেবে হাদীছ লিখে নিয়েছি।

আবু হাসসান যিয়াদী বর্ণনা করেন, মুহাম্মদ বিন হাসানকে আমি আহলে ইলমের তত সম্মান করতে দেখিনি যতটুকু তিনি শাফেয়ীর সম্মান করতেন।

একদিন মুহাম্মদ বিন হাসান কোথাও যাওয়ার জন্য সওয়ার হয়েছিলেন। ইত্যবসরে ইমাম শাফেয়ী এসে উপস্থিত হলেন। ইমাম মুহাম্মদ তৎক্ষণাৎ তাঁর সফর মুলতবী করে বাড়ী ফিরে এলেন। সারা রাত তার সাথে ছিলেন। এর মধ্যে তৃতীয় কারো ভিতরে আসার অনুমতি ছিল না।

বাগদাদে ইমাম মুহাম্মদ বিন হাসানের দরসগাহই ছিল ইমাম শাফেয়ীর শেষ শিক্ষা সফর। এখানে অবস্থানকালেই তিনি তাঁর ফিকহী রায় এবং মত সংকলন করেন। এগুলোকেই কওলে কীম বা পূর্বমত বলা হয়।

কাযী আয়ায লিখেন, ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) ইমাম মালেক (রহঃ) থেকে মুয়াত্তা শ্রবণ করেছেন। এতে ইমাম মালেক অত্যন্ত খুশী হয়েছেন। এরপর ইমাম শাফেয়ী ইরাক গিয়ে মুহাম্মদ বিন হাসানের নিকট অবস্থান করেন। মদীনাবাসীর মাযহাব সম্বন্ধে তাঁর সাথে আলোচনা করেন। ইমাম মুহাম্মদের কিতাবগুলো তিনি লিখে নেন, সেখানেই তিনি তাঁর কওলে কীম’ সংকলন করেন যা যাফরানীর কিতাবে উল্লেখ রয়েছে।

বস্তুতঃ বাগদাদ আসার পরই ইমাম শাফেয়ীর ইলমের প্রসিদ্ধি ছড়িয়ে পরে। তাঁর মজলিসে বিপুল মানুষের সমাগম হতে থাকে।

বাগদাদে ইমাম সাহেব থেকে ইমাম আহমদ বিন হাম্বল এবং অন্যান্য আহলে ইলমের ইলম গ্রহণ

বাগদাদ অবস্থানকালে প্রত্যেক শ্রেণীর আহলে ইলম তাঁর নিকট থেকে ইলমে দ্বীন আহরণ করেন। ইমাম সাহেব দু’বার বাগদাদ আগমন করেন। প্রথম আগমন হয় ১৯৫ হিজরীতে।

হাসান বিন মুহাম্মদ যাফরানী বর্ণনা করেন, ইমাম সাহেব ১৯৫ হিজরীতে বাগদাদ আগমন করেন। সে সময় তাঁর চুলে খেযাব লাগান ছিল। সেবার দু’বছর আমাদের এখানে অবস্থান করেছিলেন। পরে মক্কায় চলে যান। দ্বিতীয়বার ১৯৮ হিজরীতে বাগদাদে আসেন এবং আমাদের নিকট মাত্র কয়েক মাস অবস্থান করে ফিরে যান। বাগদাদ অবস্থানকালে তাঁর দরসী মজলিসে সাহিত্যিক এবং লিখকগণ উপস্থিত হয়ে তাঁর নিকট হতে ফাছাহাত এবং বালাগাত অর্জন করতেন। সে সময়ে তাঁর মত আলেম কোথাও দৃষ্টিগোচর হয়নি।

আবুল ফযল যাজ্জাজ বলেন, ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) যখন বাগদাদ আগমন করেন, তখন জামে মসজিদে চল্লিশ পঞ্চাশটি ইলমী এবং দরসী হালকা বসত। ইমাম সাহেব প্রতিটি হালকাতে বসে বলতেন। ক্বালাল্লাহ এবং ক্বালা রাসুলিল্লাহে, আর তারা বলতেন ক্বালা আসহাবনা। ফল এই হল যে, কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর হালকা। ব্যতীত অন্য কোন হালকা বাকী রইল না। ইমাম সাহেব স্বয়ং বলেন, বাগদাদে আমি নাসের আল হাদিস (হাদীছের সহায়ক) উপাধিতে প্রসিদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।

ইমাম সাহেবের বাগদাদ অবস্থানকালে ইমাম আহমদ বিন হাম্বল বড় আদব সম্মান সহকারে তাঁর খেদমতে গিয়ে ইলম হাছেল করতেন। একবার ইয়াহয়া বিন ময়ীন ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের পুত্র ছালেহকে বললেন, আপনার পিতার কি লজ্জা করে না? আমি তাকে এ অবস্থায় দেখেছি যে, শাফেয়ী উপরে বসে চলেছেন আর আপনার পিতা তার ঘোড়ার রিকাব (পা রাখার স্থান) ধরে পায়ে হেঁটে চলছেন। ইয়াহয়া বিন ময়ীনের এ কথাটি ছালেহ তার পিতাকে বললে তিনি বললেন, তাকে বলে দাও যে, আপনি যদি ফকীহ হতে চান তবে শাফেয়ীর সওয়ারীর অন্য রিকাব ধরুন।

অন্য এক বর্ণনামতে ছালেহ বলেন, ইমাম শাফেয়ীর সাওয়ারীর সাথে। আমার পিতাকে যেতে দেখে ইয়াহয়া বিন ময়ীন এ বলে পাঠালেন যে, হে আবু আব্দিল্লাহ! আপনি শাফেয়ীর সাওয়ারীর সাথে চলতে পছন্দ করেন? আমার পিতা উত্তরে বললেন, আবু যাকারিয়া! আপনি যদি তার বাম পাশ দিয়ে চলতেন। তবে অধিক উপকৃত হতেন।

হাসান বিন মুহাম্মদ যাফরানী বলেন, ইমাম সাহেব বাগদাদ আগমন করলে আমরা ছয়জন শিক্ষার্থী তাঁর নিকট আসা-যাওয়া করতে লাগলাম। আহমদ বিন হাম্বল, আবু ছত্তর, হারেছ নাক্কাল, আবু আব্দির রহমান শাফেয়ী, আমি এবং অন্য একজন শিক্ষার্থী। আমরা যে কিতাবই ইমাম শাফেয়ীর নিকট পড়তাম আহমদ বিন হাম্বল উপস্থিত থাকতেন।

কয়েকজন বিশিষ্ট শিক্ষক

ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) মক্কা মুকাররমা, মদীনা মুনাওয়ারা এবং বাগদালে শিক্ষা সমাপ্ত করেন। তিনি তৎকালীন প্রসিদ্ধ উলামায়ে কিরাম থেকে দ্বীন এবং ইলম অর্জন করেন। তন্মধ্যে বিশিষ্ট কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হচ্ছে।

পিতৃব্য মুহাম্মদ বিন আলী বিন শাফে, মুসলিম বিন খালেদ যঞ্জী, মালেক বিন আনাস, সুফিয়ান বিন উয়াইনা, ইব্রাহীম বিন সাদ, সায়ীদ বিন সালেম আলকাররাহ, আব্দুল ওহহাব বিন আব্দিল মজীদ ছকফী, ইসমাঈল বিন উলাইয়্যা, আবু দমরা, হাতেম বিন ইসমাঈল, ইব্রাহীম বিন মুহাম্মদ বিন আবি ইয়াহয়া, ইসমাইল বিন জাফর, মুহাম্মদ বিন খালেদ জুন্দী, উমর বিন মুহাম্মদ বিন আলী বিন শাফে, আত্তাফ বিন খালেদ মাখযুমী, হিশাম বিন ইউসুফ ছনআনী, আব্দুল আযীয বিন আবি সালমা মাজেশনী, ইয়াহয়া বিন হাসান, মারওয়ান বিন মু’আবিয়া, মুহাম্মদ বিন ইসমাঈল, ইবনে আবি ফুদাইক, ইবনে আবি মাসলামা, কানাবী, ফুযাইল বিন আয়ায, মুহাম্মদ বিন হাসান শায়বানী, দাউদ বিন আব্দির রহমান, আব্দুল আযীয বিন মুহাম্মদ দারাওরদী, আব্দুর রহমান বিন আবি বকর মুলাইকা, আব্দুল্লাহ বিন মুআম্মল মাখযুমী, ইব্রাহীম বিন আব্দিল আযীয বিন আবি মাহযুরা, আব্দুল মজীদ বিন আব্দিল আযীয বিন আবি রাদ্দাদ, মুহাম্মদ বিন উছমান বিন ছফওয়ান জুমাহী, ইসমাঈল বিন জাফর, মুতাররাফ বিন মাযেন, হিশাম বিন ইউসুফ, ইয়াহয়া আবি হাস্সান তিন্নিসী প্রমুখ।

কয়েকজন শিক্ষকের সংক্ষিপ্ত জীবনী উল্লেখ করা হচ্ছে

ইসমাঈল বিন কুস্তুনতীন মক্কী (রহঃ)

মক্কা মুকাররমায় সাত বছর বয়সে ইমাম সাহেব কোরআন হিফজ করেন এবং তাজবীদ শিক্ষা গ্রহণ করেন। তাঁর শিক্ষক ছিলেন সেখানকার প্রসিদ্ধ কারী ইসমাঈল বিন আব্দিল্লাহ বিন কুসতুনতীন মক্কী। তিনি বনী মখযুমের গোলাম ছিলেন। তিনি কসত উপাধিতে প্রসিদ্ধ ছিলেন। নব্বই বছর বয়সে মারা যান। তিনি ইবনে কাছীরের সর্বশেষ শাগরেদ ছিলেন।

মুহাম্মদ বিন আলী বিন শাফে মক্কী (রহঃ)

মুহাম্মদ বিন আলী বিন শাফে বিন সায়েব বিন উবাইদ মুত্তালেবী মক্কী, ইমাম সাহেবের চাচা ছিলেন। তিনি আব্দুল্লাহ বিন আলী বিন সায়েব বিন উবাইদ এবং ইবনে শিহাব যুহরী থেকে হাদীছ বর্ণনা করেন। ইমাম সাহেব মক্কায় অবস্থানকালে তাঁর নিকট শিক্ষা গ্রহণ করেন। তার নিকট হতে ইব্রাহীম বিন মুহাম্মদ শাফেয়ী, হাসান বিন মুহাম্মদ বিন আয়ুন এবং ইউনুস বিন মুহাম্মদ মুআদ্দিব হাদীছ রেওয়ায়েত করেন। তিনি নির্ভরযোগ্য মুহাদ্দিছ ছিলেন।

মুসলিম বিন খালেদ যঞ্জী ফকীহ মক্কী (রহঃ)

ইমাম সাহেবের মক্কী উস্তাদ এবং শায়খদের মধ্যে আবু খালেদ মুসলিম বিন খালেদ বিন ফারওয়াহ যঞ্জী মাখযুমী (মৃত্যু ১৮১ হিঃ) মক্কার ফকীহ এবং শায়খ হরম (হরমের শায়খ) ছিলেন। তিনি যায়দ বিন আসলাম, আলাউদ্দিন বিন আব্দির রহমান, মুহাম্মদ বিন শিহাব যুহরী প্রমুখ থেকে হাদীছ রেওয়ায়েত করেন। তিনি ফকীহে মক্কা আব্দুল মালেক বিন আব্দিল আযীয বিন জুরাইজের খিদমতে দীর্ঘদিন থেকে তাঁর নিকট হতে ফিকাহ এবং ফতোয়া শিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি আবেদ এবং যাহেদ ছিলেন। তিনি ছায়েমুদ্দাহর অর্থাৎ সর্বদা রোযা পালনকারী ছিলেন। ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) তার নিকট থেকেই ফিকাহ অর্জন করেন এবং তাঁরই অনুমতিতে ইফতার আসনে আসীন হন। ইবনে হজর লিখেন, ইমাম মালেকের শিষ্যত্ব গ্রহণের পূর্বে ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) তাঁর নিকট থেকে ফিকাহ শিক্ষা লাভ করেন।

শামসুদ্দীন দাউদী (রহঃ) লিখেন, মুসলিম যঞ্জী প্রমুখ থেকে ইমাম শাফেয়ী ফিকাহর শিক্ষা লাভ করেন।

ইমাম যাহবী লিখেন,

“মুসলিম যঞ্জীই ইমাম শাফেয়ীকে ফতোয়া দেওয়ার অনুমতি দেন।”

সামআনী লিখেন, মুসলিম যঞ্জী থেকে ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) ইলমে হাদীছ এবং ফিকাহ শিক্ষা গ্রহণ করেন। ইমাম মালেকের সাথে সাক্ষাৎ হওয়ার পূর্বে তিনি তাঁর হালকাতেই অংশ গ্রহন করতেন।

ইব্রাহীম বিন আবু ইয়াহয়া আসলামী মাদানী আবু ইসহাক ইব্রাহীম বিন মুহাম্মদ বিন আবি ইয়াহয়া সামআনী আসলামী মাদানীও ইমাম সাহেবের একজন মাদানী শায়খ ছিলেন। তিনি ইমাম মালেক (রহঃ)-এর মুয়াত্তা হতে কয়েকগুণ বড় একটি কিতাব কিতাবুল মুয়াত্তা লিখেন। মুহাদ্দিছদের নিকট তিনি সন্দেহযুক্ত। ইবনে হাব্বান বলেন, শিক্ষা জীবনের প্রথম ভাগে ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) ইব্রাহীমের দরসে অংশগ্রহণ করতেন।

মুহাদ্দিছ সাজী (রহঃ) বলেন,

ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) তার নিকট হতে ফরযের সাথে সম্পৃক্ত কোন হাদীছ গ্রহণ করেননি। তবে ফাযায়েলের বিষয়ে গ্রহণ করেছেন।

সুফিয়ান বিন উয়াইনা মক্কী (রহঃ)

ইমাম সাহেবের মক্কী শায়খদের মধ্যে ‘মুহাদ্দিছুল হরম’ সুফিয়ান বিন উয়াইনা (মৃত্যু ১৯৮ হিঃ) একজন উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর সম্বন্ধে ইমাম সাহেব বলেন,

 

যদি মালেক এবং সুফিয়ান বিন উয়াইনা না হতেন তবে হিজায থেকে ইলম চলে যেত।

তিনি আরও বলেন, তিনি হিজাযের হাদীছ সম্বন্ধে সবচেয়ে বড় আলেম ছিলেন। তাঁর চেয়ে হাদীছের উত্তম ব্যাখ্যাকারী আমি কাউকে দেখিনি। আমি ত্রিশটি হাদীছ ব্যতীত আহকাম সম্পর্কিত সমস্ত হাদীছ ইমাম মালেকের নিকট পেয়েছি। সে ত্রিশটির ছয়টি হাদীছ ব্যতীত সবকয়টি হাদীছ সুফিয়ান বিন উয়াইনার নিকট পেয়েছি।

ইমাম মালেক বিন আনাস

ইমাম দারুল হিজরত মালেক বিন আনাস আছবাহী (মৃত্যু ১৭৯ হিঃ) ইমাম শাফেয়ীর সর্বপ্রধান মাদানী শিক্ষক ছিলেন। তিনি তাঁর নিকট হতে অনেক জ্ঞান লাভ করেছেন।

তিনি বলেন, উলামায়ে কিরামদের মধ্যে মালেক (রহঃ) উজ্বল তারকাসদৃশ। ইমাম মালেক (রহঃ)-এর মুয়াত্তা হতে অধিক নির্ভুল কিতাব আর দ্বিতীয়টি নেই। যদি ইমাম মালেক এবং সুফিয়ান বিন উয়াইনা না হতেন তবে হিজায থেকে ইলমে দ্বীন শেষ হয়ে যেত। যদি কোন হাদীছ সম্বন্ধে তার কোন সন্দেহ হত তবে পুরো হাদীছটাই বাদ দিয়ে দিতেন। মক্কায় অবস্থানকালে যুবা বয়সে অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি মুয়াত্তা সম্পূর্ণটা মুখস্থ করে নেন। পরে মদীনায় গিয়ে ইমাম মালেকের সামনে তা পড়ে শুনান।

মুহাম্মদ বিন হাসান শায়বানী

ইমাম মুহাম্মদ বিন হাসান শায়বানী কূফী (মৃত্যু ১৮৯ হিঃ) ইমাম শাফেয়ী (রহঃ)-এর বাগদাদের উস্তাদ ছিলেন। তিনি ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর অল্প বয়স্ক শিষ্য ছিলেন। তিনি ইমাম আবু ইউসুফ এবং ইমাম মালেক (রহঃ) থেকেও শিক্ষা লাভ করেন। তিনি ইমাম শাফেয়ী (রহঃ)-এর শিক্ষক ছিলেন। আবার ছাত্রভাইও ছিলেন। তিনি ফিকাহ এবং হাদীছ সম্বন্ধে অভিজ্ঞ ছিলেন। পূর্বের বর্ণনায় ছাত্র-উস্তাদের সম্পর্ক কিরূপ ছিল তা আলোচিত হয়েছে।

ইসমাঈল বিন উলাইয়্যা বছরী বাগদাদী

রায়হানাতুল কাযা ওয়াল মুহাদ্দেছীন আবু বিশর ইসমাঈল বিন ইব্রাহীম বিন মেকসাম আসাদী বছরী (মৃত্যু ১৯৪ হিঃ) ইমাম শাফেয়ীর বিশিষ্ট শিক্ষক ছিলেন। তাকে তার মায়ের সাথে সম্পর্কিত করে ইবনে উলাইয়্যা বলা হত। এ কুনিয়াতেই তিনি পরিচিত হন। তাঁর দাদা মেকসাম ছিলেন। সিন্দের কায়কান এলাকার অধিবাসী। তাকে যুদ্ধবন্দী করে আরব নিয়ে যাওয়া হয়। তবকাতে ইবনে সাদে এরূপই বর্ণিত রয়েছে।

 

যৌবনেই বহু গুণের সমাবেশ

ইমাম মুহাম্মদ বিন ইদ্রীস শাফেয়ী (রহঃ) অল্প বয়সেই ফিকাহ, ফতোয়া, হাদীছ, তাফসীর, স্বপ্নের ব্যাখ্যা, আরব ইতিহাস, আরবী কবিতা, আরবী ব্যাকরণ এবং ভাষা, তীর নিক্ষেপ, ঘোড়সওয়ার ইত্যাদি বিষয়ে বেশ প্রসিদ্ধি লাভ করেন। শিক্ষক-শায়খ এবং সমসাময়িকগণ তার ইলম এবং যোগ্যতার স্বীকৃতি দিয়েছেন। বিশ বছরেরও কম বয়সে মুসলিম বিন খালেদ যঞ্জী হতে ফতোয়া দানের অনুমতিপ্রাপ্ত হন। আব্দুর রহমান দৃঢ়তার সাথে বলেন, ইমাম শাফেয়ী জ্ঞানী এবং তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন যুবক। বশীর মুরাইসী (রহঃ) হজ্জ থেকে বাগদাদ গিয়ে বন্ধু বান্ধবদেরকে বলেন, আমি মক্কায় একজন কুরাইশী যুবক দেখেছি। তার যোগ্যতায় আমি বিস্মিত হয়েছি। কুরাইশী যুবক বলতে ইমাম শাফেয়ীকে বুঝিয়েছেন।

আরবী ভাষা এবং কবিতার প্রসিদ্ধ আলেম আছমায়ী (রহঃ) বর্ণনা করেন, আমি গ্রাম্য কবিদের কবিতার সংশোধন কুরাইশ যুবক থেকে করেছি। যাকে মুহাম্মদ বিন ইদ্রিস বলা হয়। সুফিয়ান বিন উয়াইনা বলতেন, শাফেয়ী সমকালীন যুবকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। যখন তাঁর নিকট তফসীর অথবা স্বপ্ন সম্পর্কিত কোন প্রশ্ন আসত তিনি বলতেন, ঐ যুবক অর্থাৎ শাফেয়ী থেকে জেনে নাও।

আব্দুর রহমান বিন মাহদী ইমাম শাফেয়ীকে তার যুবাকালে লিখলেন যে, আপনি আমার জন্য এমন একটি কিতাব লিখুন যেখানে হাদীছের সমস্ত বিষয় ইজমা এবং কিতাব ও সুন্নাহর নাসেখ-মনসুখ বর্ণিত থাকবে, তখন ইমাম শাফেয়ী তাঁর প্রসিদ্ধ কিতাব ‘আর-রিসালা’ লিখেন।

মিশর সফর এবং ইবনে আব্দল হাকীমের সাথে বিশেষ সম্পর্ক

ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) ১৯৫ হিজরীতে প্রথমবার বাগদাদ ভ্রমণ করেন। সেখানে দু বছর অবস্থান করে মক্কায় ফিরে আসেন। এরপর দ্বিতীয়বার ১৯৮ হিজরীতে তথায় গমন করেন সেখানে কয়েকমাস অবস্থান করে ১৯৯ হিজরী অথবা ২০১ হিজরীতে মিশর গমন করেন। বাকী জীবন সেখানেই কাটান এবং সেখানেই ইন্তিকাল করেন। এর মাঝে গাযা গিয়েছিলেন বলেও প্রমাণ রয়েছে।

ইবনে নদীম লিখেন, ইমাম সাহেব ২০০ হিজরীতে মিশর গমন করেন। সেখানে যাওয়ার সময় তিনি এই কবিতাটি পড়েন।

ভাই আমার মন মিশর যেতে খুবই আগ্রহী। অথচ এ সফর বড়ই কষ্টসাধ্য। খোদার কসম! আমার জানা নেই যে শান্তি এবং ধনের আশায় সেখানে যাওয়া হচ্ছে, না কবরে যাওয়ার জন্য।

ইমাম সাহেবের উভয় কথাই সেখানে প্রকাশ পেয়েছিল। সেখানে যাওয়ার পর তিনি ধনবানও হন এবং সেখানে তিনি মৃত্যুবরণও করেন।

সায়ীদ বিন আব্দিল্লাহ বিন আব্দিল হাকাম বর্ণনা করেন, ইমাম শাফেয়ী আমাদের এখানে আসার পর বেশ আর্থিক সংকটে ছিলেন। আমার ভাই মুহাম্মদ বিভিন্ন ধনীদের নিকট থেকে পাঁচশ দীনার সগ্রহ করেন। আমার পিতাও পাঁচশ দীনার দান করেন। এভাবে এক হাযার দীনার ইমাম সাহেবের খিদমতে পেশ করা হয়। অন্য এক বর্ণনামতে, আব্দুল্লাহ বিন আব্দিল হাকাম নিজে এক হাযার দীনার দেন এবং বন্ধু-বান্ধবদের নিকট থেকে দু’হাযার দীনার সংগ্রহ করে মোট তিন হাজার দীনার তার খিদমতে পেশ করেন। 

মিশরে ইবনে আব্দিল হাকামের সাথে ইমাম সাহেবের বিশেষ সম্পর্ক ছিল। এমন কি ইমাম সাহেব তাদের ওখানেই ইন্তেকাল করেন।

প্রত্যহ সকালে তিনি তাঁর নিকট যেতেন। তিনি অন্য কোথাও থাকলে জিজ্ঞেস করে সেখানে যেতেন।

আব্দুল্লাহ বিন আব্দিল হাকাম মিশরের প্রসিদ্ধ আলেম ছিলেন। তিনি মালেকী মাযহাবের ইমাম ছিলেন। তাঁর পুত্র মুহাম্মদ বিন মালেকের কিতাব থেকে দু’খণ্ড নিয়ে যেতেন। পরদিন সেগুলো ফেরৎ দিয়ে অন্য দু’খণ্ড নিতেন। 

ইবনে আব্দিল বারর বর্ণনা করেন, আব্দুল্লাহ বিন আব্দিল হাকাম এবং তার উভয় পুত্র ইমাম শাফেয়ী হতে হাদীছ বর্ণনা করেছেন। তাঁর কিতাব লিখেছেন এবং আপন পুত্র মুহাম্মদকে তার সোর্পদ করে দিয়েছিলেন।

মুহাম্মদ বিন আব্দিল্লাহ বর্ণনা করেন, যখন আমি ইমাম সাহেবের নিকট অধিক আসা-যাওয়া করতে লাগলাম, মালেকী মাযহাবের উলামাগণ আমার পিতার নিকট সমবেত হয়ে বললেন, আবু মুহাম্মদ! আপনার ছেলে মুহাম্মদ ঐ ব্যক্তির (শাফেয়ীর) নিকট আসা-যাওয়া করে এবং তার সাথে বেশ সম্পর্ক করে নিয়েছে। লোকেরা ধারণা করছে, মালেকী মাযহাবের প্রতি অনীহা হওয়ার কারণে সে এরূপ করছে!

তাদের কথা শুনে আমার পিতা তাদেরকে নম্রভাবে বুঝালেন, বললেন, এ ছেলে এখনও যুবক। উলামাদের বিভিন্ন মত জানার এবং সেগুলো নিয়ে গবেষণা করার আগ্রহ রয়েছে। আর আমাকে একাকী বললেন, বেটা, তুমি তাঁর নিকট আসা-যাওয়া কর এবং তাঁর সঙ্গে থাক। যদি কখনও এ শহরের বাইরে যাও এবং আশহাবের রেওয়ায়েত ইমাম মালেকের কোন মত বর্ণনা কর তবে জিজ্ঞেস করা হবে আশাহাব কে?

এরপর আমি ইমাম শাফেয়ীর সঙ্গ আমার উপর বাধ্যতামূলক করে নিয়েছি। পিতার কথা স্মরণ রেখেছি। যখন মিশর থেকে ইরাকে গেলাম, সেখানকার কাযী কোন একটি মাসয়ালা নিয়ে আলোচনা করছিলেন। তখন কথা প্রসঙ্গে বললাম, আশাহাব মালেক হতে বর্ণনা করেছেন। জিজ্ঞেস করলেন, আশাহাব কে? এ কথা বলে উপস্থিত ব্যক্তিদের প্রতি লক্ষ্য করলেন। তাদের একজন বলল, এ ব্যক্তির আশহাব এবং আবলাক সম্বন্ধে কোন জ্ঞান নেই।

ইমাম সাহেবও তাঁর এ প্রিয় ছাত্রকে স্নেহ করতেন এবং ভালবাসতেন। মুযনী বর্ণনা করেন, আমরা ইমাম শাফেয়ী থেকে হাদীছ শ্রবণ করার জন্য গেলে প্রথমে তার দরজায় বসে থাকতাম পরে ভিতরে যাওয়ার অনুমতি মিলত। আর মুহাম্মদ বিন আব্দিল্লাহ বিন আব্দিল হাকাম আসলে উপরে উঠে যেতেন এবং দীর্ঘক্ষণ তার নিকট থাকতেন। কখনও কখনও তার সাথে খানা খেয়ে নিতেন। এরপর ইমাম সাহেব নীচে এসে আমাদেরকে পড়াতেন। পড়া শেষে মুহাম্মদ বিন আব্দিল্লাহ তার সওয়ারীর উপর বসে যেতে থাকলে ইমাম সাহেব দীর্ঘক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকতেন এবং আকাঙ্ক্ষা করতেন, আমারও যদি এমন একটা ছেলে হত! ইমাম সাহেব তার বাড়ীতেও যেতেন। তার ভাই সায়ীদ বিন আব্দিল্লাহ বর্ণনা করেন, অনেক সময় ইমাম সাহেব সওয়ার হয়ে আমাদের এখানে আসতেন এবং আমাকে বলতেন- মুহাম্মদকে ডাক। আমি তাকে নিয়ে এলে তিনি তার সাথে যেতেন এবং দীর্ঘক্ষণ থাকতেন এবং সেখানেই দুপুরের বিশ্রাম করতেন।

আকওয়ালে কাদীমা (পূর্বমত) এবং আকওয়ালে জাদীদা (পরবর্তী মত) এর রাবী

ইমাম সাহেবের ইলম তিনটি প্রধান শহরে প্রসার লাভ করে, মক্কা, বাগদাদ এবং মিশর। তিনটি শহরেই তাঁর দরসী মজলিস কায়েম হয়। বাগদাদে ইমাম সাহেবের দু’বছর কয়েক মাস অবস্থানকালে সেখানকার আহলে ইলমগণ তাঁর নিকট থেকে শিক্ষা লাভ করেন। তিনি মিশরে চার, পাঁচ, অথবা ছয় বৎসর অবস্থান করেন। এ সময়ের মধ্যে মিশরীয়রা ইমাম সাহেব থেকে এভাবে শিক্ষা লাভ করেন যে, তারা তাঁর ইলম এবং ফিকাহর প্রচারক এবং প্রসারক হয়ে উঠেন। বাগদাদে ইমাম সাহেব যে সমস্ত ফিকহী মত এবং রায় প্রদান করেছেন সেগুলোকে আকওয়ালে কাদীমা বলা হয়। তাঁর চারজন শাগরেদ থেকে সেগুলো বর্ণিত রয়েছে।

১। আবু আলী হাসান বিন মুহাম্মদ যাফরানী

২। আবু ছত্তর ইব্রাহীম বিন খালেদ

৩। আহমদ বিন হাম্বল

৪। হুসাইন বিন আলী কারাবেসী।

আর মিশরে তিনি যে সমস্ত রায় এবং মত প্রদান করেছেন সেগুলোকে আকওয়ালে জাদীদা বলা হয়। সেগুলো ছয়জন রাবী থেকে বর্ণিত রয়েছে।

১। আবু ইব্রাহীম ইসমাঈল বিন ইয়াহয়া মুযানী

২। আবু মুহাম্মদ বিন সুলাইমান মরাভী

৩। আবু মুহাম্মদ রবী বিন সুলাইমান বিন দাউদ জীযী

৪। আবু ইয়াকুব ইউসুফ বিন ইয়াহয়া বুওয়াইতি

৫। আবু হাফছ হারমালা বিন ইয়াহয়া

৬। আবু মুসা ইউনুস বিন আব্দিল আলা

ইমাম সাহেবের ফেকহী মাযহাব

ইমাম সাহেবের সময় হাদীছ, ফিকাহ এবং ফতোয়ার দু’টি প্রসিদ্ধ কেন্দ্র ছিল হিজায এবং ইরাক। এ উভয়টির মধ্যে কিছুটা পার্থক্য ছিল। ইমাম সাহেব এ উভয় কেন্দ্র থেকেই শিক্ষালাভ করেন এবং হিজায মক্কার উলামায়ে কিরাম থেকে তার দলীল প্রমাণ সম্পর্কে পূর্ণরূপে অবগতি লাভ করেন। তিনি মক্কা মুকাররমায় ইমাম মুসলিম বিন খালেদ যঞ্জী থেকে ফিকাহ শিক্ষা লাভ করেন। যিনি ছিলেন ইবনে জুরাইজের শাগরেদ আতা বিন আবি রাবাহ এর ফিকাহর প্রচারক এবং প্রসারক। মদীনায় তিনি ইমাম মালেক থেকে শিক্ষা লাভ করেন যিনি ছিলেন মদীনাবাসীর ইলম এবং জ্ঞানের তরজুমান ব্যাখ্যাকারী। এরপর

বাগদাদ গিয়ে ইমাম মুহাম্মদ বিন হাসান শায়বানীর শিষ্যত্বের সৌভাগ্য অর্জন করেন। যিনি ইমাম আবু হানিফার ফিকাহর তরজুমান হবার সাথে সাথে ইমাম মালেক থেকেও শিক্ষা লাভ করেছিলেন। ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) ইমাম মালেক এবং ইমাম মুহাম্মদকে স্বীয় উস্তাদ এবং মুআল্লিম স্বীকার করতেন। বিশেষ করে ইমাম মালেকের মতকে অগ্রাধিকার দিতেন এবং তাঁর মত এবং রায় অনুসারে আমল করতেন। অবশ্য সে সময়ে যেমনিভাবে অন্যান্য শায়খদের সাথে তাদের শিষ্যদের মতভেদ হত, ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম মালেকের সাথে মতভেদ ছিল। এতে লোকেরা তাকে প্রশ্ন করলে তিনি এ সম্পর্কে এক কিতাব রচনা করেন।

আবু ইসহাক সিরাযী বলেন, এ মতভেদ সত্ত্বেও আমরা ইমাম শাফেয়ীকে ইমাম মালেকের সঙ্গী মনে করতাম। ইমাম মালেকের সাথে ইমাম শাফেয়ীর যে পরিমাণ মতভেদ রয়েছে সেগুলো গণনা করলে দেখা যাবে, ইমাম মালেকের শিষ্য এবং সঙ্গী আব্দুল মালেক এবং অন্যান্যদের তার সাথে যে মতভেদ রয়েছে ইমাম শাফেয়ীর মতভেদ সংখ্যা এর চেয়ে কমই হবে।

অন্য একজন আলেম বলেন, ইমাম শাফেয়ী এবং ইমাম মালেকের মধ্যে যে মতভেদ রয়েছে তা ইমাম আবু ইউসুফ এবং ইমাম আবু হানিফার মধ্যেকার মতভেদের চেয়ে কম।

ইমাম মুহাম্মদ বিন ইদ্রীস শাফেয়ী (রহঃ) ফিকাহর বিষয়ে হিজায এবং ইরাকের ফিকাহবিদ গণের মৌলিক এবং শাখা নীতিগুলোকে সামনে রেখে মধ্যপন্থা অবলম্বন করেন। তিনি কোরআনের প্রকাশ্য অর্থকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করতেন; যদি না এমন কোন প্রমাণ পাওয়া যায় যে প্রকাশ্য অর্থ উদ্দেশ্য নয়। এরপর তিনি সুন্নাতে রাসূল থেকে দলীল গ্রহণ করতেন। এমন কি তিনি খবরে ওয়াহেদ দ্বারা প্রমাণিত নির্দেশকেও করণীয় বলতেন। যদিও তার বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য না হয়। তিনি ইমাম মালেকের মত মদীনাবাসীর আমূল বা কার্যধারাকে হাদীছে উল্লেখিত নির্দেশের সমর্থক হিসেবে গ্রহণ করতেন। এরপর তিনি ইজমাকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করতেন, যে পর্যন্ত না তার বিপরীত কিছু জানা যায়। তার ধারণায় পৃথিবীর সবাই কোন বিষয়ে একমত হওয়া অসম্ভব। এরপর কিয়াস অনুসারে আমল করতেন, যার সমর্থন কোরআন হাদীছে পাওয়া যেত।

ফকীহ, মুফতি এবং কাযীর জন্য ইমাম সাহেবের যে গুণাবলীর কথা উল্লেখ করেছেন এতে তার ফিকহী মতবাদ স্পষ্ট হয়ে উঠে। তিনি বলেন,

একজন কাযীর জন্য ফয়সালা করা বা একজন মুফতির জন্য ফতোয়া দেয়া তখনই জায়েয হবে, যখন সে কোরআন এবং এর ব্যাখ্যা সম্বন্ধে সম্যক অবগত থাকে। সুনান এবং আমার সম্বন্ধে তার জ্ঞান থাকে, উলামাদের মতভেদ সম্বন্ধে জ্ঞাত থাকে। সঠিক মেধা এবং দৃষ্টিভঙ্গী সম্পন্ন হয়, মুত্তাকী হয় এবং সন্দেহযুক্ত মাসয়ালার পরামর্শ করে।

ছাহাবাদের মতভেদ সম্বন্ধে ইমাম সাহেব বলেন, সেগুলোর যেটা কোরআন, সুন্নাহ, ইজমা বা কিয়াসের অনুরূপ হয় আমি সেটা গ্রহণ করি। তাদের কারো মত শুধুমাত্র তখনই গ্রহণ করি যখন সে সম্পর্কে কোরআন, হাদীছ অথবা ইজমা বা দলীলে কোন নির্দেশ না পাই।

ফতোয়া দেয়ার অনুমতি লাভ

ইমাম মালেক (রহঃ) ও মদীনার অন্যান্য আলেমবর্গ ইমাম শাফেয়ীকে চৌদ্দ পনের বৎসর বয়সেই ফতোয়া দানের অনুমতি দান করেন। ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) মক্কা হতে ফিরার পথে তাঁর মক্কা শরীফের উস্তাদ মুসলিম বিন খালিদ জাঞ্জীও তাকে ফতোয়া দেয়ার অনুমতি দান করেন।

ইমাম সুফিয়ান বিন উয়াইনা (রহঃ) ইমাম যুহরীর অতি প্রিয় ছাত্র ছিলেন। ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) তাঁর নিকট হতেও অনেক জ্ঞান অর্জন করেন।

ইমাম সুফিয়ান বিন উয়াইনা ইমাম শাফেয়ীকে কয়েক বৎসর যাবৎ ফিকাহ, হাদীছ এবং তফসীরের শিক্ষা দান করেন। একবার তিনি তাকে প্রশ্ন করলেন, হে শাফেয়ী! ইমাম যুহরী হতে বর্ণিত হাদীছ এরূপ রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মুল মুমেনীন হযরত ছফীয়াসহ মসজিদে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে দু’জন লোকের সাথে সাক্ষাৎ হলে তিনি তাদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, আমাদের সঙ্গে আমার বিবি উম্মুল মুমিনীন ছফীয়া। আবার তিনি একথাও বললেন যে, শয়তান রক্তের ন্যায় মানুষের রগ ও শিরায় চলাচল করে। এখন তোমার নিকট প্রশ্ন এই যে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এসব বলার উদ্দেশ্য কি ছিল?

ইমাম শাফেয়ী বললেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এরূপ বলার উদ্দেশ্য এই ছিল যে, তাদের মনে যেন এরূপ ধারণার সৃষ্টি না হতে পারে যে, একজন স্ত্রীলোক কিভাবে একজন নবীর সাথী হতে পারে?

অথবা এতে শয়তানের কুমন্ত্রণায় পড়ে তাদের মনে খারাপ ধারণার উদয় হতে পারে। সেসব চিন্তা করেই রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বপ্রথমেই পরিস্কার করে দিলেন যেন তাদের মনে কোনরূপ মন্দ ধারণাই জন্মিতে না পারে। আর অন্যদের জন্য এতে অনেক উপদেশ রয়েছে।

অথবা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ সমস্ত বলার উদ্দেশ্য এই ছিল যে, তিনি নবী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর প্রতি মন্দ ধারণা সৃষ্টি হতে পারত। কাজেই প্রত্যেক মানুষের সর্বদা এরূপ সাবধান থাকা উচিৎ যেন তাঁর প্রতি কারো পক্ষে কোনরূপ অপবাদ দেওয়ার সুযোগ না ঘটে। কারণ শয়তান রক্তের ন্যায় মানুষের শিরা উপশিরায় চলাচল করে।

সুফিয়ান বিন উয়াইনা (রহঃ) বললেন, আল্লাহ তাআলা তোমাকে পুরস্কৃত করুন। তোমার জবাবে আমি সন্তুষ্ট হয়েছি। এখন থেকে তুমি ফতোয়া দিতে পারবে।

জ্ঞান, বুদ্ধি ও বিচক্ষণতা

কাজী ইয়াহয়া বিন আকসাম বলেন, ইমাম শাফেয়ী (রহঃ)-এর চেয়ে অধিক বুদ্ধিমান আমি আর কাউকে দেখি নাই।

ইমাম মুয়ানী বলেন, অর্ধজগতের লোকের বুদ্ধি এক পাল্লায় রেখে অপর পাল্লায় ইমাম শাফেয়ী (রহঃ)-এর বুদ্ধি রাখা হলে তাঁর বুদ্ধির পাল্লাই ভারী হবে।

ইমাম মালেক (রহঃ) বলেছেন, আমার নিকট যত ছাত্র শিক্ষাপ্রাপ্ত হয়েছে তন্মধ্যে শাফেয়ীর চেয়ে অধিক মেধাবী এবং সমঝদার আমি আর কাউকে পাইনি।

স্বয়ং ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) বলেন, ইমাম মালেক বড় স্নেহ এবং আগ্রহ সহকারে আমাকে তাঁর সম্মুখে কিতাব পাঠ করতে দিতেন। তিনি আমাকে কিতাব পাঠ করে যেতে আদেশ করতেন। আমি পড়ে চুপ করলে তিনি বলতেন না তোমাকে আরো পড়তে হবে। আমার পাঠ-পদ্ধতি এবং বুঝবার ও বুঝাবার পন্থাকে তিনি অত্যন্ত পছন্দ করতেন।

আবু উবাইদ বলেন, ইমাম মালেক (রহঃ) ইমাম শাফেয়ীর তেজস্বিতা স্পষ্টবাদিতায় মুগ্ধ ছিলেন।

ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের সাথে জনৈক বুযুর্গ হজ্জে যান। তাঁরা উভয়ই একই স্থানে অবস্থান করছিলেন। ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ) প্রভাতে উঠে নীরবে হারাম শরীফে চলে যান। তাঁর সঙ্গী বুযুর্গ ব্যক্তি ধারণা করলেন যে, তিনি সম্ভবত সুফিয়ান বিন উয়াইনার শিক্ষা মজলিসে যোগদান করে থাকবেন। তিনি হারাম শরীফে গিয়ে তাঁকে সুফিয়ান বিন উয়াইনার শিক্ষা মজলিসে খোঁজ করলেন। কিন্তু তাঁকে সেখানে পেলেন না। অন্যান্য সম্ভাব্য শিক্ষা মজলিসেও অনুসন্ধান করলেন কিন্তু কোথাও তাঁকে পাওয়া গেল না। পরিশেষে এক কোরাঈশী যুবকের মজলিসে তাঁকে উপবিষ্ট দেখা গেল।

তাঁর সঙ্গী বুযুর্গ তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, সুফিয়ান বিন উয়াইনার মজলিস ত্যাগ করে এ যুবকের মজলিসে আগমনের কারণ কি? অথচ তিনি ইমাম যুহরী এবং আরো যুগশ্রেষ্ঠ ইমাম এবং তাবেয়ীগণের অতি প্রিয় ছাত্র।

ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ) উত্তরে বললেন, আমি যদি এমন বুদ্ধিমান লোকের মজলিসে না বসি তবে কিয়ামত পর্যন্ত এমন সুযোগ আর আসবে না। কোরাইশী এ যুবকের চেয়ে কিতাবুল্লাহ হৃদয়ঙ্গম করার ক্ষমতা আমি আর কারো মধ্যে দেখি নাই।

শিক্ষা মজলিস

ইমাম সাহেবের শিক্ষা মজলিস শুরু হত সুবহে সাদেকের পর ও ফজরের নামাযের পর থেকে। সূর্যোদয় পর্যন্ত চলত ফিকাহর আলোচনা। এরপর হাদীছের আলোচনা চলত। হাদীছের শিক্ষার শেষে অনুষ্ঠিত হত ওয়াজ মজলিস। এরপর শুরু হত ইলমী তর্ক-বিতর্ক। যোহরের নামাযের পর সাহিত্য, কবিতা, ব্যাকরণ এবং ভাষাগত আলোচনা হতো। এরপর তিনি বিশ্রাম নিতে ঘরে যেতেন। আছর থেকে মাগরিব পর্যন্ত তিনি আল্লাহ তাআলার যিকর আযকারে নিমগ্ন থাকতেন।

রাত্রিকে তিনভাগ করে প্রথমভাগে ঘুমাতেন। দ্বিতীয়ভাগে হাদীছ ও ফিকহ সম্বন্ধে কিতাব লিখতেন। তৃতীয় ভাগ কোরআন তেলাওয়াত এবং নফল নামাযে কাটিয়ে দিতেন। এইরূপে সুবহে সাদেক পর্যন্ত কেটে যেত। কোরআন তিলাওয়াতের প্রতি তাঁর খুবই আগ্রহ ছিল।

ইমাম সাহেবের শিক্ষা মজলিস সে সময়ের মুহাদ্দেছীন এবং ফিকাহবিদগণের শিক্ষা মজলিসের অনুরূপ কায়েম হত। তিনি সে স্নেহ-ভালবাসা এবং ইখলাছ নিয়ে ছাত্রদেরকে পড়াতেন যা পূর্বের উলামাদের নিয়ম-রীতি ছিল। এ সম্পর্কে ইমাম সাহেব তাঁর শাগরেদ রবী বিন সুলাইমান মারাভীকে উদ্দেশ্য করে যে কথা বলেছেন তা বর্তমান শিক্ষকদের জন্য শিক্ষাপ্রদ।

হে রবী! যদি তোমাকে ইলম খাইয়ে দেয়ার শক্তি থাকত তবে আমি তাই করতাম।

ইমাম সাহেব তার হলকায় অংশগ্রহণ কারীদের প্রকৃতি সম্বন্ধে জ্ঞাত ছিলেন। তাদের আগ্রহ সম্পর্কেও অবগত ছিলেন। কখনও কখনও তিনি তাদের নিকট তা প্রকাশও করতেন। বাগদাদের ছাত্রদের মধ্যে আহমদ বিন হাম্বল সম্পর্কে বলতেন, বাগদাদ থেকে আসার সময় আহমদ বিন হাম্বল হতে অধিক সরল মুত্তাকী ফকীহ এবং আলেম কাউকে রেখে আসিনি। একবার তিনি বলেন, তিনজন উলামা এ যমানার আশ্চর্যজনক। প্রথম আরবী এক ব্যক্তি যে একটি শব্দও সঠিকভাবে আদায় উচ্চারণ করতে পারে না; এ হচ্ছে আবু ছত্তর। দ্বিতীয়, এক অনারব ব্যক্তি, যে একটি শব্দও ভুল করে না; এ হচ্ছে হাসান যাফরানী। তৃতীয় এক ছোট ব্যক্তি সে যখন কোন কথা বলে তখন বড় বড় উলামায়ে কিরামও তার সত্যতা স্বীকার করে, এ হচ্ছে আহমদ বিন হাম্বল। তিনি একবার বলেন, আমি দু’ ব্যক্তি হতে অধিক বুদ্ধিমান কাউকে দেখিনি- আহমদ বিন হাম্বল, সুলাইমান বিন দাউদ হাশেমী। এদের সবাই ইমাম সাহেবের ছাত্র।

তিনি তাঁর এক প্রিয় ছাত্র মুযনী সম্পর্কে বলেন, মুযনী আমার মাযহাবের সাহায্যকারী। অপর আরেক ছাত্র রবী মুরাদী সম্বন্ধে বলেন, রবী আমার কিতাবের রাবী। 

বাগদাদের দরসী হলকায় হাসান যাফরানী ইমাম সাহেবের কিতাব পড়ে, শুনাতেন এবং অন্যান্য ছাত্ররা লিখে নিতেন। ফিকাহ এবং হাদীছ সম্বন্ধে ইমাম সাহেবের গভীর জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও তিনি আহমদ বিন হাম্বল এবং আব্দুর রহমান বিন মাহদীকে বলতেন, হাদীছ সম্বন্ধে তোমরা আমার চেয়ে অধিক জ্ঞান রাখ। ছহীহ হাদীছ জানা থাকলে আমাকে বলো। আমি তা অবলম্বন করব।

রবী মুরাদী বর্ণনা করেন, ইমাম সাহেবের ইন্তিকালের সময় আনি তাঁর নিকট উপস্থিত ছিলাম। সেখানে বুওয়াইতী, মুযনী এবং ইবনে আব্দিল হাকামও উপস্থিত ছিলেন। ইমাম সাহেব আমাদের প্রতি লক্ষ্য করে বললেন, আর ইয়াকুব! (বুওয়াইতী) তুমি লোহার শৃঙ্খলে বেড়ি পরিহিত অবস্থায় মারা যাবে। আর হে মুযনী! মিশরে তোমাকে নিয়ে সমালোচনা করা হবে। কিন্তু পরে গিয়ে তুমি তোমার যমানার শ্রেষ্ঠ ফেকহী কিয়াসকারী হবে। আর মুহাম্মদ (ইবনে আব্দিল হাকাম)! তুমি ইমাম মালেকের মাযহাব অবলম্বন করবে। আর আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, হে রবী! তুমি আমার কিতাবগুলোর প্রচার এবং প্রসারে সহায়ক হবে।

হে আবু ইয়াকুব! তুমি আমার দরসী হলকা পরিচালনা কর। রবী মুরাদী বলেন, ইমাম সাহেবের মৃত্যুর পর আমাদের প্রত্যেকের তাই হয়েছে যা তিনি বলে গিয়েছেন, যেন তিনি সূক্ষ্ণ পর্দার আড়ালে সব দেখছিলেন।

বাগদাদের চার শাগরেদ

ইমাম সাহেব মিশর গমনের পূর্বে বাগদাদে দু’বৎসরেরও অধিক সময় দরসী হলকা কায়েম রাখেন। এ সময়ে সেখানকার উলামা, মুহাদ্দেছীন, ফিকাহবিদ, সাহিত্যিক, কবি সকলেই তাঁর দরসী হলকায় অংশ নিয়ে শিষ্যত্ব লাভ করেন। এদের মধ্যে চারজন শাগদের তার ইলম, ফিকাহ এবং ফতোয়ার তরজুমান ছিলেন। এদের মাধ্যমেই ইমাম সাহেবের আকওয়ালে কাদীমা সংরক্ষিত হয়। যাফরানী, আবু ছত্তর, আহমদ বিন হাম্বল এবং কারাবেশী। নিম্নে এ চারজনের সংক্ষিপ্ত জীবনী বর্ণনা করা হচ্ছে।

হাসান বিন মুহাম্মদ যাফরানী বাগদাদী (রহঃ)

আবু আলী হাসান বিন মুহাম্মদ বিন ছাব্বাহ যাফরানী বাগদাদীর মূল বাসস্থান ছিল বাগদাদের নিকটবর্তী যাফরানীয়া গ্রামে। তিনি ফিকাহ এবং হাদীছের ইমাম ছিলেন। এ বিষয়ে তিনি কিতাবও রচনা করেছেন। ইমাম শাফেয়ীর খিদমতে থেকে জ্ঞানে গভীরতা অর্জন করেন।

তিনি বলতেন, মুহাদ্দিছগণ ঘুমিয়ে ছিলেন। ইমাম শাফেয়ী তাদেরকে জাগ্রত করেছেন। আর যে ব্যক্তিই হাদীছ লিখতে বসেছে তার উপর ইমাম শাফেয়ীর ইহসান রয়েছে। ইমাম শাফেয়ীর শিক্ষা মজলিসে তিনিই তাঁর কিতাব পাঠ করতেন এবং অন্যান্যরা শ্রবণ করতেন। তিনি বর্ণনা করেন, আমি ইমাম সাহেবের সম্মুখে তাঁর কিতাব ‘আররিসালা’ পাঠ করলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি আরবের কোন গোত্রের। আমি উত্তর দিলাম, আমি আরবী নই। বরং যাফরানিয়া নামক গ্রামের বাসিন্দা। একথা শুনে তিনি বললেন, ‘তুমি তোমার গ্রামের সর্দার।’

আহমদ বিন হাম্বল এবং আবু ছত্তরের উপস্থিতিতে যাফরানী ইমাম সাহেবের সম্মুখে তাঁর কিতাব পাঠ করতেন। তিনি ইমাম সাহেবের আকওয়ালে কাদীমা বা পূর্বমতের রাবী ছিলেন। প্রথমে তিনি আহলে ইরাকের ফিকহী মতবাদের উপর ছিলেন। পরে তিনি ফিকহে শাফেয়ী তথা শাফেয়ী মতবাদের একজন বিশিষ্ট আলেম এবং প্রচারক হন।

ইমাম আহমদ বিন হাম্বল শায়বানী বাগদাদী (রহঃ)

আবু আব্দিল্লাহ আহমদ বিন মুহাম্মদ বিন হাম্বল শায়বানী বাগদাদী (মৃত্যু ২৬৬ হিজরী) ইমাম শাফেয়ীর বাগদাদের ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম। ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) বলেন, বাগদাদ হতে বের হবার সময় ফিকাহ, তাকওয়া এবং ইলমে আহমদ বিন হাম্বল হতে বড় কাউকে রেখে আসিনি। ইমাম আহমদ বলেন, ইমাম শাফেয়ীর শিক্ষা মজলিসে বসার পূর্বে আমি হাদীছের নাসেখ-মনসুখ সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলাম। তিনি তাঁর উস্তাদ ইমাম শাফেয়ীর জন্য অনেক দোয়া করতেন। একবার তার পুত্র আব্দুল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন শাফেয়ী কে যার জন্য আপনি এত বেশী দোআ করেন? তিনি বললেন, বেটা! শাফেয়ী দুনিয়ার জন্য সূর্য স্বরূপ এবং দেহের জন্য সুস্থতা স্বরূপ। এ দুটোর কি কোন পরিপূরক থাকতে পারে? আমি তিরিশ বৎসর থেকে ঘুমানোর পূর্বে ইমাম শাফেয়ীর জন্য দোআ এবং ক্ষমা প্রার্থনা (ইস্তিগফার) করে আসছি।

ইবনে জওযী লিখেন,

ইমাম আহমদ বিন হাম্বল ইমাম শাফেয়ীর অন্যতম শাগরেদ ছিলেন। মিশর যাওয়া পর্যন্ত তিনি সব সময় তাঁর সান্নিধ্যে থাকতেন।

আবু ছত্তর ইব্রাহীম বিন খালেদ বাগদাদী

আবু ছত্তর ইব্রাহীম বিন খালেদ বিন আবিল ইয়ামান কালবী বাগদাদী (রহঃ) (মৃত্যু ২৪০ হিজরী) প্রথমে ইরাকীদের মতবাদের উপর ছিলেন। ইমাম শাফেয়ীর শিক্ষা মজলিসে অংশগ্রহণের পর সে মত ত্যাগ করেন। তিনি তার সময় বাগদাদের মুহাদ্দিছ এবং ফিকাহ শাস্ত্রবিদদের মধ্যে গণ্য। কয়েকটি মাসয়ালায় তিনি অন্য ইমামদের থেকে ভিন্ন মত পোষণ করেছেন।

আবু ছত্তর ইমাম সাহেবের পূর্বতম বর্ণনাকারীদের একজন। এতদভিন্ন কয়েকটি মাসয়ালায় তিনি ইমাম সাহেবের সাথে মতভেদ করে নিজের ভিন্ন। মাযহাব প্রতিষ্ঠা করেন এবং ইমাম শাফেয়ী (রহঃ)-এর কিতাবের অনুরূপ অনেক বড় কিতাব রচনা করেন। আযারবাইজান এবং আর্মেনিয়ার অধিকাংশ লোকই তার ফেকহী মতবাদের অনুসারী ছিলেন।

হুসাইন বিন আলী কারাবেসী বাগদাদী (রহঃ)

আবু আলী হুসাইন বিন আলী বিন ইয়াযীদ কারাবেসী আল বাগদাদী (মৃত্যু ২৪৫ হিজরী) ইমাম শাফেয়ীর বাগদাদের ছাত্রদের মধ্যে অনেক প্রসিদ্ধ ছিলেন। তিনি তাঁর প্রধান শাগরেদদের মধ্যে গণ্য ছিলেন। ইনিও প্রথমে ইরাক উলামাদের ফিকহী মতের অনুসারী ছিলেন। ইমাম শাফেয়ীর শিষ্যত্ব গ্রহণের পর তার মত অবলম্বণ করেন। তিনি অনেক কিতাব রচনা করেন। তিনি একজন প্রসিদ্ধ আলেম, ফকীহ, মুহাদ্দিছ ও মুতাকাল্লিম (ইলমে কালাম বিশারদ) ছিলেন। বাগদাদে তাঁর যথেষ্ট মর্যাদা ছিল। ইমাম আহমদের সাথে তাঁর কে বন্ধুত্ব ছিল কিন্তু খলকে কোরআনের ফিতনার সময় উভয়ের বন্ধুত্ব শত্রুতা রূপ নেয়।

মিশরের ছয় শাগরেদ

ইমাম মুহাম্মদ বিন ইদ্রীস শাফেয়ী (রহঃ) শেষ বয়সে মিশর গমন করেন। সেখানে তাঁ ইলমের যথেষ্ট প্রসার ঘটে। তথাকার ছাত্ররা তাঁর ফিকহী মত এবং রায়গুলে সংগ্রহ করেন। এদের মধ্যে ছয়জন উল্লেখযোগ্য- মুযনী, রবী, জীমী, রবী মুরাদী, বুওয়াইতী হারমালা এবং ইউনুস বিন আব্দিল আলা। তাদের মাধ্যমে তাঁদের শাগরেদদের মাধ্যমে এবং তাদের রচিত কিতাব দ্বারা ইমাম সাহেবে মাযহাব ছড়িয়ে পড়ে। তাদের সংক্ষিপ্ত জীবনী উল্লেখ করা হচ্ছে।

ইসমাঈল বিন ইয়াহয়া মুনী আলমিছরী (রহঃ)

আবু ইব্রাহীম ইসমাঈল বিন ইয়াহয়া বিন ইসমাঈল আল মুনী আলমিছরী (রহঃ) (মৃত্যু ২৬৪ হিজরী) সম্পর্কে ইবনে খিল্লিকান লিখেন

তিনি শাফেয়ী মাযহাব অবলম্বনকারীদের ইমাম। তিনি ইমাম শাফেয়ীদের ফিকহী পদ্ধতি, তাঁর ফতোয়া এবং তাঁর মত সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞাত ছিলেন তার সম্পর্কে ইমাম সাহেব বলেছিলেন, মুযনী আমার মাযহাবের সাহায্যকারী তিনি খুবই নেককার, আবেদ-যাহেদ, আলেম ছিলেন। সূক্ষ্ম মাসয়ালা সম্পর্কে গভীর দৃষ্টি ছিল। উন্নত মর্যাদার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও ইমাম সাহেবের যে সব মাসয়ালা তাঁর নিকট ছিল না সেগুলো রবী মুরাদীর কিতাব থেকে সংগ্রহ করেন। ইমাম সাহেবের ইন্তিকালের পর তাকে গোসল দেয়া এবং দাফন কাফনের কাজ তিনি সমাধা করেন। তিনি ২৬৪ হিজরীর রমযান মাসে ইন্তেকাল করেন। মুকাত্তম পাহাড়ের নিকট ইমাম সাহেবের কবরের পাশে তাকে সমাধিস্থ করা হয়।

রবী বিন সুলাইমান জীষী আলমিছরী

আবু মুহাম্মদ রবী বিন সুলাইমান বিন দাউদ ইযদী আল জীযী আল মিছরী (রহঃ) (মৃত্যু ২৫৬ হিজরী) কায়রোর পশ্চিমে নীলনদীর তীরে জীয়া নামক স্থানের অধিবাসী ছিলেন। মৃত্যুর পর তাকে সেখানেই দাফন করা হয়। তিনি ইমাম শাফেয়ীর শাগরেদ ছিলেন কিন্তু তাঁর নিকট থেকে খুব কমই বর্ণনা করেছেন। তবে ইমাম সাহেবের ছাত্র আব্দুল্লাহ বিন আব্দিল হাকামের মাধ্যমে তাঁর ইলম অর্জন করেছেন। আবু দাউদ, নাসাঈ, তাহাবী প্রমুখ তাঁর নিকট থেকে হাদীছ রেওয়ায়েত করেন। তিনি নির্ভরযোগ্য, নেককার আলেম ছিলেন। তিনি কাছীরুল হাদীছ’ অর্থাৎ অনেক হাদীছ সম্পর্কে জ্ঞাত ছিলেন।

রবী বিন সুলাইমান মুরাদী আল মিছরী (রহঃ)

আবু মুহাম্মদ রবী বিন সুলাইমান বিন আব্দিল জাব্বার আল মুরাদী আল মিছরী (রহঃ) (মৃত্যু ২৭০ হিজরী) ইমাম শাফেয়ীর অধিকাংশ কিতাব রেওয়ায়েত করেন। ইমাম সাহেব বলতেন, রবী আমার মাযহাবের রাবী। রবী আমার নিকট থেকে যে পরিমাণ ইলম অর্জন করেছে তা অন্য কেউ করেনি। ইলমের প্রতি তার আগ্রহ দেখে ইমাম সাহেব বলতেন, রবী! যদি সম্ভব হত তবে তোমাকেই ইলম খাইয়ে দিতাম। তিনি ইমাম সাহেবের মিশরের সর্বশেষ ছাত্র ছিলেন। আলমুয়াযযিন’ উপাধিতে তিনি পরিচিত ছিলেন।

হারমালা বিন ইয়াহয়া আল মিছরী (রহঃ) আবু আব্দিল্লাহ হারমালা বিন ইয়াহয়া বিন আব্দিল্লাহ তুজীবি আল মিছরী (রহঃ) (মৃত্যু ২৪৪ হিজরী) ইমাম শাফেয়ীর দরসে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। তিনি হাফেযে হাদীছ ছিলেন। তাঁর নিকট থেকে ইমাম মুসলিম অনেক হাদীছ রেওয়ায়েত করেছেন। 

আব্দুল আযীয বিন উমর আল মিছরী বর্ণনা করেন, ইমাম শাফেয়ীর ইন্তিকালের পর আমি হারমালাকে জিজ্ঞেস করলাম, ইমাম শাফেয়ী থেকে যে সমস্ত কিতাব শ্রবণ করেছেন, সেগুলোর একটা তালিকা দেখান। তিনি সর্বমোট আটটি কিতাবের নাম উল্লেখ করলেন এবং বললেন, ইমাম শাফেয়ীর এর সকল কিতাবই আমার নিকট আছে। যেগুলো আমরা আরয (উস্তাদের সম্মুখে ছাত্রদের পাঠদান) এবং সামা (স্বয়ং উস্তাদের পাঠ) করেছি। আবু আব্দিল্লাহ বুশবখী বলে। তিনি ইমাম সাহেব থেকে সত্তরটি কিতাব রেওয়ায়েত করেছেন।

ইউনুস বিন আব্দিল আলা আল মিছরী (রহঃ)

আবু মুসা ইউনুস বিন আব্দিল আলা মিছরী (মৃত্যু ২৬৪ হিজরী) তাঁর শায়খ সম্পর্কে বলেন, যদি সমস্ত মানুষকে ইমাম শাফেয়ীর জ্ঞান বন্টন করে দেয়া হয় তবে সবার জন্য যথেষ্ট হবে। তিনি ‘ওয়ারশ’ এর কিরাআতের ইমাম ছিলেন। দারিদ্রতার সহিত জীবন-যাপন করতেন। তিনি খুবই মুত্তাকী এ খোদাভীরু আলেম ছিলেন। তাঁর দুআয় বৃষ্টি চাওয়া হত। ইয়াহয়া বিন হাসসান তার সম্পর্কে বলেন, তোমাদের এ ইউনুস ইসলামের রুকন (স্তম্ভ)। তিনি ইমাম শাফেয়ী ব্যতীতও সুফিয়ান বিন উয়াইনা, ওলীদ বিন মুসলিম, আশহাব প্রমুখ থেকে হাদীছ রেওয়ায়েত করেন। আর তার নিকট থেকে ইমাম মুসলিম, নাসাঈ, ইবনে মাজা প্রমুখ হাদীছ রেওয়ায়েত করেন।

ইউসুফ বিন ইয়াহয়া বুওয়াইতী (রহঃ)

আবু ইয়াকুব ইউসুফ বিন ইয়াহয়া বুওয়াইতী আল মিছরী (রহঃ) (মৃত ২৩১ হিজরী) ইমাম শাফেয়ীর ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। তিনি একজন আবেদ, যাহেদ, মুত্তাকী এবং নেককার আলেম ছিলেন। খলকে কোরআনের ফিৎনার সময় তাঁকে মিশর থেকে বন্দী করে বাগদাদ নিয়ে যাওয়া হয়। এ বিষয়ে তিনি তাঁর মত পরিবর্তনের অস্বীকৃতি জানালে খলীফা ওয়াছেক তাকে জেলে প্রেরণ করেন এবং তিনি সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। সেখানে তিনি জুমআর আযান শুনে গোসল করে ধৌত কাপড় পরিধান করে জেলখানার দরজা পর্যন্ত আসতেন এবং বলতেন,

হে আল্লাহ! আমি নামাযের প্রতি তোমার আহবানকারীর সাড়া দিয়েছি কিন্তু তারা আমাকে বাধা দিয়েছে।

অন্যান্য শাগরেদ

বাগদাদ এবং মিশরের এ দশজন ছাত্র ইমাম সাহেবের বিখ্যাত ছাত্র যাদের মাধ্যমে তাঁর মাযহাব সারা বিশ্বে প্রসারিত হয় এবং যাদের ইলম এবং জ্ঞানে আলো দূর দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে। এদের ছাড়া তাঁর আরো অনেক শাগরেদ রয়েছেন যারা তার ইলমী এবং দ্বীনি আমানত অন্যের নিকট পৌঁছিয়েছেন। তন্মধ্যে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হচ্ছে।

সুলাইমান বিন দাউদ হাশেমী, আবু বকর আব্দুল্লাহ বিন যুবাইরী হুমাইদী মক্কী, ইব্রাহীম বিন মুনযির হিযামী, ইব্রাহীম বিন খালেদ, আবু তাহের বিন সিরাজ, আমর বিন সাওয়াদ আমেরী, আবুল ওলীদ মুসা বিন আবিল জারুদ মক্কী, আবু ইয়াহয়া মুহাম্মদ বিন সায়ীদ বিন গালেব আত্তার, আবু উবাইদ, আহমদ বিন সিনান ওয়াসেতী, মুহাম্মদ বিন আব্দিল্লাহ বিন আব্দিল হাকাম, হারুন আইলী প্রমুখ ছাড়াও আরও বহু মুহাদ্দিছ এবং ফকীহ তাঁর নিকট থেকে শিক্ষা লাভ করেছেন।

আত্মবিশ্বাস

একবার ইমাম আহমদ বিন হাম্বল, ইসহাক বিন রাহওয়ে ও ইমাম ইয়াহয়া বিন ময়ীন পবিত্র মক্কায় সফর করেন। প্রত্যেকেই মুহাদ্দিছ আব্দুর রাযযাক (রহঃ)-এর শিক্ষা মজলিসে যোগদান করার আকাঙ্ক্ষী ছিলেন। তথায় গিয়ে তারা দেখতে পেলেন অত্যন্ত জাঁকজমকের সাথে এক যুবক আসনে বসে আছেন। তাঁর চারপাশে লোকদের ভিড়। 

সে যুবকটি স্বগৌরবে শিক্ষা দান করছেন। আর বলছেন, ওহে সিরিয়াবাসী! হে ইরানবাসী! আপনারা আমাকে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীছ সম্বন্ধে যে কোন প্রশ্ন করতে পারেন। তার সঠিক উত্তর দিতে আমি প্রস্তুত।

ইমাম ইসহাক বলেন, আমি বললাম, এ দাম্ভিক গর্বিত যুবকটি কে? মানুষ বলে দিল ইনি মুহাম্মদ বিন ইদ্রীস শাফেয়ী মুত্তালেবী। 

ইমাম ইসহাক ইমাম আহমদ বিন হাম্বলকে বললেন, চলুন ইমাম শাফেয়ীকে পাখী উড়ানো সম্পর্কিত হাদীছটির তত্ত্ব জিজ্ঞাসা করে আসি। ইমাম আহমদ বললেন, এর অর্থ তো পরিস্কার। অর্থাৎ রাত্রিকালে পাখীগুলোকে তাদের বাসায় ঘুমাতে দাও কিন্তু আপনি যখন সেখানে যেতে চাচ্ছেন তখন আমিও আপনার সাথে যাব।

ইমাম আহমদ (রহঃ) ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) কে সেই হাদীছের মর্ম সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলেন।

ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) তৎক্ষণাৎ উত্তর দিয়ে দিলেন। বললেন, মূখযুগের নিয়ম ছিল যে, রাতের বেলায় যদি কাউকে সফরে যেতে হত তখন পাথর নিক্ষেপ করে পাখীগুলোকে বাসার বাইরে বের করা হত। সেগুলো যদি উড়ে ডান দিকে যেতো তবে মঙ্গল ও শুভ মনে করা হত। আর যদি বাম যেতো, তবে অশুভ ও অমঙ্গলজনক মনে করা হত। হুজুর ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে যখন মূর্খ যুগের এ রীতির কথা উল্লেখ করা হল, তখন তিনি বললেন, পাখীগুলোকে তাদের বাসায় বিশ্রাম করতে দাও। আর তোমরা আল্লাহর উপর ভরসা কর।

তখন ইমাম ইসহাক (রহঃ) ইমাম আহমদ (রহঃ) কে বললেন, আমি যদি ইরাক হতে হেজাজ পর্যন্ত শুধু এ হাদীছের মর্ম উদ্ধার করার জন্য সফর করতাম তবে তা সার্থক হত।

ইমাম আহমদ, ইসহাক এবং ইয়াহয়া বিন ময়ীন ইমাম শাফেয়ীর দক্ষতা এবং ইলমে হাদীছে তাঁর অগাধ জ্ঞানের স্বীকৃতি দিলেন।

তর্ক শাস্ত্রে বুৎপত্তি ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) বিভিন্ন দেশে ভ্রমন করে বিভিন্ন শায়খ থেকে জ্ঞান অর্জন করেন। অপর কোন ইমাম তাঁর মত দেশ-ভ্রমন করেন নাই। তিনি বিভিন্ন দেশের আলেম-উলামা এবং জ্ঞানী-মনীষীদের নিকট হতে বহু শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা লাভ করেন। বিভিন্ন শাস্ত্রে তিনি যেরূপ প্রসিদ্ধি লাভ করেন তর্ক। শাস্ত্রেও তিনি দ্রুপ খ্যাতি অর্জন করেন। এখানে তার কিছুটা আলোচনা করা হচ্ছে।

ফিকাহ্ না তামাশা একদা ইমাম শাফেয়ীকে ফকীহ রবী বললেন, কোন ব্যক্তি যদি রমজানের একটি রোজা কাযা করে তবে আমার মতে তার কাযা স্বরূপ বারটি রোযা রাখতে হবে। কেননা এ মাসের একদিন অন্য মাসের বারদিনের সমান।

ইমাম সাহেব বললেন, ইহা কি ফিকাহ নাকি তামাশা। আপনি যদি এরূপ মন্তব্য করতে চান তবে আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করছি, যদি কোন ব্যক্তি লাইলাতুল কদরের নামায কাযা করে তবে আপনার রায় মতে সে হাজার মাস পর্যন্ত কিরূপে কাযা করবে? কেননা, কোরআনে বলা হয়েছে, লাইলাতুল কদর হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।

এ জবাব শুনে রবী নিশ্চুপ হয়ে চলে গেলেন।

আহমদ বিন হাম্বলের বিরোধিতা

ইমাম সাহেব একবার ইমাম আহমদ বিন হাম্বলকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমি শুনেছি আপনি বলে থাকেন যে, কোন ব্যক্তি যদি এক ওয়াক্ত নামায কাযা করে তবে সে ব্যক্তি কাফের হয়ে যাবে। ইমাম আহমদ বিন হাম্বল তা স্বীকার করলেন। তিনি বললেন, সে ব্যক্তি যদি পুনরায় মুসলমান হতে চায় তবে তাকে কি করতে হবে?

ইমাম আহমদ বললেন, তাকে আবার নামায পড়া আরম্ভ করতে হবে।

তখন ইমাম শাফেয়ী বললেন, দেখা যায় আপনার মতে কাফেরের পক্ষেও নামায পড়া শুদ্ধ হবে। অথচ নামায পড়ার জন্য প্রথম শর্ত হলো যে, নামাযী ব্যক্তির ঈমান থাকা চাই। অথচ কাফের ব্যক্তির ঈমান থাকে না।

তিনি তার্কিক নন

একবার ফুল বিন রবী ইমাম সাহেবের নিকট আরয করলেন, হাসান বিন যিয়াদ লুলুর সঙ্গে একদিন আপনার তর্ক শুনতে চাই। ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) বললেন, তিনি তো তর্ক করার মত উপযুক্ত লোক নন। আপনি একান্তই যদি তার তর্ক পরীক্ষা করতে চান তবে আমার যে কোন একজন ছাত্রের সঙ্গে তাকে তর্কে লাগিয়ে দিন। তবে আপনি আমার কথার সার্থকতা বুঝতে পারবেন।

হাসান বিন যিয়াদকে আমন্ত্রণ জানানো হল। ইমাম শাফেয়ীর একজন ছাত্র তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমাদের সঙ্গে কয়েকটি বিষয়ে মদীনাবাসীরা বিরোধিতা করে থাকেন। আশা করি আপনার নিকট হতে আমরা সেগুলোর মীমাংসা শুনতে পাব।

হাসান বিন যিয়াদ তা জানতে চাইলে ছাত্রটি বললেন, নামাযে থাকা অবস্থায় কোন ব্যক্তি যদি কোন সতী সাধ্বী স্ত্রীলোককে অপবাদ দেয় তবে তার হুকুম কি?

হাসান বললেন, তার নামায নষ্ট হয়ে যাবে। অযু সম্পর্কে হুকুম জানতে চাইলে হাসান বললেন, অযু বাকী থাকবে।

ছাত্রটি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, আচ্ছা! কোন ব্যক্তি যদি নামাযে অট্টহাসি হাসে তবে সে সম্পর্কে কি নির্দেশ রয়েছে। হাসান বললেন, নামায এবং অযু উভয়টিই নষ্ট হয়ে যাবে।

তখন ছাত্রটি বললেন, সতী সাধ্বী স্ত্রীলোকের প্রতি অপবাদ দেওয়া অট্টহাসির চেয়ে কম নিন্দনীয় হতে পারে কিরূপে?

ফযল বিন রবী তা শুনে হেসে উঠলেন। ইমাম শাফেয়ীকে সব কথা খুলে বললে তিনি বললেন, আমি তো আগেই বলেছিলাম যে, হাসান বিন যিয়াদ তর্ক করার মত উপযুক্ত লোক নয়।

ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের অভিমত

ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ) বলেন, আমি ইমাম শাফেয়ীর চেয়ে জ্ঞানী, প্রত্যুৎপন্নমতি, মাসয়ালার সহীহ এবং প্রামাণ্য জবাবদাতা আর কাউকে দেখি নাই।

১৯৫ হিজরী পর্যন্ত ইমাম সাহেব মক্কা শরীফের মুফতীরূপে নিযুক্ত ছিলেন। অতঃপর তিনি বাগদাদ গমন করেন।

খলীফা হারুনুর রশীদ তার শাহী দরবারে ওয়ায করার জন্য একদিন ইমাম সাহেবকে অনুরোধ করলেন, তিনি সেখানে গিয়ে ওয়ায করেন। তাঁর ওয়াজ সবার মর্মস্পর্শ করল। সভাময় কান্নার রোল পড়ে গেল। স্বয়ং খলীফা হারুনুর রশীদও অধীরভাবে কাঁদতে লাগলেন।

 

সভাশেষে খলীফা তাকে পঞ্চাশ হাজার দেরহাম পুরস্কার প্রদান করলেন। ইমাম মুয়ানী এবং রবী বলেন, ইমাম সাহেব পঞ্চাশ হাজার দিরহাম হতে চল্লিশ হাজার দিরহাম ফকীর, মিসকীন, গরীব-দুঃখী এবং আলেম-ওলামাদের মধ্যে বিলিয়ে দেন।

মানুষে বলল, আপনি তো প্রায় সব অর্থই অপরকে বিলিয়ে দিচ্ছেন। তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন যে, তাদের মালের উপর ভিক্ষুক এবং বঞ্চিতের অধিকার রয়েছে। তাদের ভাগ্যের কারণেই এসব আমদানী হয়ে থাকে। তাই তাদের সম্পদ আমি তাদের মধ্যে বিলিয়ে দিয়ে থাকি। আল্লাহ তাআলা আমাকে মধ্যস্থ লোক হিসাবে নিযুক্ত করেছেন। আমার মধ্যস্থতায় তাদের মাল তাদের নিকট পৌঁছে। আমি আশংকা করছি যে, যদি তাদের মাল যথাযথভাবে তাদের নিকট পৌঁছিয়ে না দেই তবে হাশরের দিন আল্লাহর সামনে আমাকে জবাবদিহি করতে হবে।

ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) বাগদাদ হতে আবার মক্কা শরীফে চলে আসেন। ১৯৮ হিজরীতে হজ্ব সম্পাদনের পর বাগদাদ গমন করেন। সেখানে কয়েকমাস অবস্থানের পর তিনি আবার মিসর চলে যান। শেষ জীবন পর্যন্ত তিনি সেখানেই অবস্থান করেন এবং সেখানেই ইন্তিকাল করেন।

 জ্ঞান-বুদ্ধি এবং বিচক্ষণতা

ইমাম সাহেব খুবই বুদ্ধিমান, বিচক্ষণ এবং তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। অলঙ্কার শাস্ত্রেও তিনি প্রসিদ্ধ ছিলেন। আবু উবাইদ বলেন, আমি ইমাম সাহেব হতে অধিক বুদ্ধিমান কাউকে দেখিনি। হারুন বিন সায়ীদ আইলী বলেন, ইমাম শাফেয়ী যদি চান যে, পাথরের এ স্তম্ভগুলো কাঠ প্রমাণ করবেন তবে তিনি তা করতে পারবেন। মুহাম্মদ বিন আব্দিল হাকাম বলেন, যদি ইমাম শাফেয়ী না হতো। তবে আমি কিছুই জানতাম না। তিনি আমাকে কিয়াস শিখিয়েছেন।

ইউনুস বিন আব্দিল আলা বলেন, যদি সমস্ত মানুষের আকল-বুদ্ধি ইমাম শাফেয়ীর বুদ্ধির সাথে মিলানো হয় তবে তাদের আকল-বুদ্ধি খুঁজে পাওয়া যাবে না। যে ব্যক্তি তার কথা বুঝতে পারে সে নিশ্চয় খুবই জ্ঞানী। তিনি মানুষের সাথে তাদের জ্ঞানানুসারে কথা-বার্তা বলতেন। মুযনী বলেন, ইমাম শাফেয়ী যা কিছু বলতেন, পূর্ণরূপে যদি তা বুঝতাম তবে বিভিন্ন প্রকার ইলম এবং বিষয় সম্পর্কে অবগত হতাম। এত জ্ঞান-বুদ্ধি থাকা সত্ত্বেও দ্বীনি বিষয়ের মোকাবেলায় একে কোন মূল্য দিতেন না। তিনি বলতেন,

যদি আমার নিকট কোন ছহীহ হাদীছ বর্ণনা করা হয় এবং আমি তা গ্রহণ করি, তবে তোমরা সাক্ষী দিও যে, আমার আকল জ্ঞান চলে গেছে?

তীক্ষ্ণ বুদ্ধির একটি প্রমাণ

খলীফা হারুনুর রশীদের স্ত্রীর নাম ছিল যুবাইদা। একদা তাদের উভয়ের মধ্যে কোন বিষয় নিয়ে প্রচণ্ড বাক-বিতণ্ডা শুরু হয়। এ সময়ে হারুনুর রশীদের স্ত্রী ক্রোধভরে তাকে জাহান্নামী বলে সম্বাোধন করলেন। তিনি গোস্বাভরে জবাব দিলেন যে, যদি আমি জাহান্নামী হই তবে তোমাকে তালাক।

এ কথার পর উভয়ের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে। অথচ তাদের উভয়ের মধ্যে প্রগাঢ় ভালবাসা ছিল। খলীফা নিজের এ কথার কারণে খুবই দুঃখিত হলেন। এ মাসয়ালার সমাধানে তিনি সমস্ত আলেমদের সমবেত করলেন। কিন্তু কেউ তাঁর কোন সদুত্তর দিতে পারলেন না। কারণ তালাক হওয়া না হওয়া নির্ভর করছে। খলীফার জান্নাতী জাহান্নামী হওয়ার উপর। আর তা এমন বিষয় যে সম্বন্ধে মানুষ অবগত নয়। তাই তাদের পক্ষে জবাব দেওয়া সম্ভবপর হয়ে উঠেনি।

এ সময়ে ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) দণ্ডায়মান হয়ে বললেন, আমি এ মাসয়ালার জবাব দিতে পারব।’ তখন ইমাম সাহেবের বয়স মাত্র তের বৎসর।

যেখানে সমস্ত আলেম উত্তর দিতে অপারগ সেখানে এই বালক উত্তর দিবে! এতে সকলেই আশ্চার্যান্বিত হল। অনেকে হয়ত তাকে অপ্রকৃতিস্থ ভাবল। কিন্তু খলীফা তাকে জবাব দেয়ার অনুমতি দান করলেন।

ইমাম সাহেব বললেন, মাসয়ালার জবাব দেবার পূর্বে আমি জানতে চাই যে এখন কি আমি আপনার মুখাপেক্ষী নাকি আপনি আমার মুখাপেক্ষী? খলীফা উত্তরে বললেন, আমিই এখন আপনার মুখাপেক্ষী। ইমাম সাহেব বললেন, তবে এটা কেমন করে হতে পারে যে, আপনি উচ্চাসনে বসে থাকবেন আর আমি নিম্মাসনে বসে থাকব? কারণ আলেমের স্থান অনেক উচ্চে। একজন আলেমের অপমান আমি বরদাস্ত করতে রাজী নই; যদিও আমি আমার অপমান সইতে পারি।

তখন খলীফা নিম্নে নেমে এসে ইমাম সাহেবকে খলীফার আসনে বসালেন।

তারপর ইমাম সাহেব খলীফাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আচ্ছা বলুন তো! আপনার জীবনে কি এমন কোন ঘটনা ঘটেছে যে, আপনার পাপ করার ইচ্ছাও হয়েছিল; সে পাপ করার শক্তিও ছিল কিন্তু এতদসত্ত্বেও আল্লাহর ভয়ে আপনি সে পাপ পরিত্যাগ করেছেন?

খলীফা বললেন, “এরূপ ঘটনা আমার জীবনে বহুবার ঘটেছে”।

তখন ইমাম সাহেব বললেন, ‘আমি ফতোয়া দিচ্ছি যে, আপনি বেহেশতী, কাজেই আপনার বিবি তালাক হন নাই’। উলামায়ে কিরাম ইমাম শাফেয়ীর নিকট তার ফতোয়ার পক্ষে দলীল চাইলে তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন,

‘আর যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের সম্মুখে দণ্ডায়মান হওয়ার ভয়ে নিজেকে পাপকার্য হতে বিরত রেখেছে, নিশ্চয়ই জান্নাত হচ্ছে তার বাসস্থান’।

ইমাম সাহেবের এ জবাব শুনে সবাই সন্তুষ্ট হলেন। তারা পরস্পরে বলাবলি করতে লাগলেন, ভবিষ্যতে এ বালকটি অদ্বিতীয় হবে এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।

ইমাম শাফেয়ীর ধী শক্তি ও তীক্ষ্ণবুদ্ধি

ইমাম মুহাম্মদ বিন জরীর তবরী বর্ণনা করেন, পবিত্র মদীনায় শিক্ষা গ্রহণ কালে ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) একবার ইমাম মালেক (রহঃ)-এর শিক্ষা মজলিসে উপস্থিত ছিলেন। এ সময় এক ব্যক্তি এসে ইমাম মালেক (রহঃ)কে জিজ্ঞাসা করল জনাব,

‘আমি তোতা পাখীর ব্যবসা করে থাকি। এক ব্যক্তির নিকট এই বলে আমি একটি তোতাপাখী বিক্রয় করলাম যে, পাখিটি খুব কথা বলতে পারে। কিছুক্ষণ পর ক্রেতা এসে বলল যে, তোতা পাখিটি কথা বলে না। এ নিয়ে আমাদের উভয়ের মধ্যে কথা কাটাকাটি আরম্ভ হল। সে সময়। আমি হঠাৎ করে বলে ফেললাম যে, আমার তোতা পাখি কখনো চুপ থাকে না। যদি চুপ থাকে তা হলে আমার স্ত্রী তালাক। এখন আপনি আমাকে বলে দিন যে, এ কথার কারণে আমার স্ত্রী তালাক হয়ে গিয়েছে কিনা’? ইমাম মালেক (রহঃ) জবাবে বললেন যে তোমার স্ত্রী তালাক হয়ে গিয়েছে। সে ব্যক্তি অত্যন্ত বিষন্ন মনে বাড়ী ফিরল। ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) সে ব্যক্তির পিছনে পিছনে গেলেন। কিছুদূর গিয়ে তাঁকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার পাখিটি অধিকাংশ সময় কথা বলে না কি অধিকাংশ সময় চুপ থাকে? সে ব্যক্তি বলল, পাখিটি অধিকাংশ সময় কথা বলে। তবে মাঝে মধ্যে চুপও থাকে। তখন ইমাম শাফেয়ী বললেন, তুমি নিশ্চিন্ত থাক। তোমার স্ত্রী তালাক হয় নাই। তাকে এ জবাব দিয়ে, ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) আবার শিক্ষা মজলিসে ফিরে আসলেন।

প্রশ্নকারী ব্যক্তি ফিরে এসে ইমাম মালেক (রহঃ) কে বলল, হযরত! আমার: মাসয়ালাটি আরেকটু গভীরভাবে চিন্তা করে দেখুন। ইমাম মালেক (রহঃ) এবারও সে একই উত্তর দিলেন। তখন প্রশ্নকারী বলল, আপনার শিক্ষা মজলিসের এ নবাগত যুবকটি আমাকে নিশ্চিন্ত করে বলেছে যে, আমার স্ত্রী তালাক হয় নাই। ইমাম মালেক (রহঃ) এতে রাগান্বিত হলেন। তার স্ত্রীর তালাক না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) বললেন, হযরত! আপনি নিজেই আব্দুল্লাহ বিন যিয়াদের রেওয়ায়াত বর্ণনা করেছেন যে, কায়েস কন্যা ফাতেমা হুযুর ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! মু’আবীয়া এবং আবু জাহম উভয়েই আমাকে বিবাহ করতে চায়। তখন হুযুর ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আবু জাহম তো কখনো কাঁধ হতে লাঠি নামায় না। অথচ তিনি অবশ্যই জানতেন যে আবু জাহম শয়ন করে থাকে। অন্যান্য কাজকর্মও করে থাকে। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ কথা হতে আমি বুঝে নিয়েছি যে, তিনি এ কথা বুঝাতে চেয়েছেন যে, আবু জাহম প্রায়ই স্কন্ধে লাঠি রাখে। এর উপর ভিত্তি করেই আমি ফতোয়া দিয়েছি যে, যেহেতু তোতা পাখি প্রায় সময়ই কথা বলত কাজেই তার স্ত্রী তালাক হয় নাই।

তখন ইমাম মালেক (রহঃ) বললেন, হ্যা ভাই! প্রকৃতপক্ষেই তোমার স্ত্রী তালাক হয় নাই। শাফেয়ীর দলীল গ্রহণযোগ্য।

ইমাম শাফেয়ীর সূক্ষ্ম বুদ্ধি দেখে ইমাম মালেক (রহঃ) তাকে বললেন, এখন তোমারও ফতোয়া দেওয়ার মত যোগ্যতা অর্জিত হয়েছে। ইমাম মালেক (রহঃ) ও মদীনার অপরাপর ফিকাহবিদগণ এবং মুহাদ্দেছীনগণ সর্বসম্মতিক্রমে ইমাম শাফেয়ীকে ফতোয়া দেওয়ার অনুমতি দান করলেন।

এরূপও কোন কোন বর্ণনা পাওয়া যায় যে, ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) যখন ইমাম মালেক (রহঃ)-এর নিকট পড়াশুনা করতেন তখন কেউ ফতোয়া চাইলে ইমাম মালেক (রহঃ) যখন ফতোয়া দিতেন; ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) তখন দরজায় বসে থাকতেন। ফতোয়ার কোন ভুল ধরা পড়লে ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) তা পুনরায় বিবেচনা করতে ইমাম মালেক (রহঃ) কে অনুরোধ জানাতেন। ইমাম মালেক (রহঃ) ও তখন গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা করে দেখতেন। নিজের ত্রুটি ধরা পড়লে ইমাম মালেক (রহঃ) তখন তা সংশোধন করে ফতোয়া দিতেন। 

সকল মানুষের বুদ্ধিমত্তা সমান থাকে না। বহু অভিজ্ঞতা, সৎকর্ম সম্পাদন ও পূর্ণতা লাভের পরই মানুষের বুদ্ধি পরিপক্ক হয়।

হাদীছ শরীফে বর্ণিত রয়েছে, মুমিন ব্যক্তির বুদ্ধির প্রখরতা এবং তীক্ষ্মতাকে ভয় কর। কেননা, সে আল্লাহর নূর দ্বারা দৃষ্টিপাত করে থাকে। 

ইমাম শাফেয়ী (রহঃ)-এর বুদ্ধিমত্তার পরিপক্কতা সর্বজনবিদিত। হাফেজ ইবনে হজর আসকালানী এ সম্পর্কিত অনেক ঘটনা তাঁর রচিত কিতাব মানাকেবে ইমাম শাফেয়ী-এর মধ্যে উল্লেখ করেছেন। 

ইমাম বোখারী (রহঃ)-এর শিক্ষক ছিলেন ইমাম হুমায়দী (রহঃ)। তিনি বলেন, আমি এবং ইমাম শাফেয়ী একদা মক্কার বাইরে গেলাম। পথে এক ব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ হল। আমি ইমাম শাফেয়ীকে বললাম, আপনার ফেরাসত বা বুদ্ধিপ্রখরতা দ্বারা বলুনতো দেখি এ লোকটির জীবিকা নির্বাহের উপায় কি? তিনি বললেন, সে মশল্লা পেষার কাজ করে অথবা দর্জির কাজ করে। ইমাম হুমায়দী বলেন, আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, তুমি কি কাজ কর? সে বলল, আমি আগে মশল্লা পেষার কাজ করতাম। এখন দর্জির কাজ করি।

ইমাম শাফেয়ী স্বয়ং বর্ণনা করেন, আমি ইয়ামান দেশ হতে ফেরাসত সম্পর্কিত জ্ঞান পরিপূর্ণভাবে লাভ করার পর দেশে ফিরবার পথে একটি ছোট শহরে পৌঁছার পর রাত্রি হল। রাত্রি যাপন করব কোথায়- এ নিয়ে চিন্তিত হলাম। প্রশস্ত ললাট এবং নীল চক্ষ বিশিষ্ট এক ব্যক্তিকে তার বাড়ীর আঙ্গিনায় পায়চারী করতে দেখলাম। আমার ফেরাসতের শক্তি মোতাবেক সে ব্যক্তি কৃপণ। আতিথেয়তা করবে না তবুও প্রয়োজনের তাগিদে তার নিকট প্রয়োজন পেশ করলাম। লোকটি আমার ফেরাসতকে আশ্চার্যান্বিত করে দিয়ে আমার সাথে নম্র ব্যবহার করলেন। একটি উত্তম ঘরে থাকার ব্যবস্থা করলেন। আহারেরও ব্যবস্থা করলেন। উত্তম বিছনাপত্র আয়োজনে কোনরূপ কার্পণ্য করলেন না। আমার ঘোড়ার ঘাস পানির ব্যবস্থায়ও কোনরূপ কসূর দেখা গেল তার সদ্ব্যবহারে এবং আতিথেয়তায় খুবই সন্তুষ্টি বোধ করলাম। 

আমার ফেরাসত দ্বারা সে ব্যক্তি সম্পর্কে যা ধারণা করেছিলাম তা ভুল প্রমাণিত হল দেখে ভাবলাম আমার শিক্ষা ভুল হবে অথবা এ লোকটির স্বভাব অবশ্যই অন্যরূপ হবে।

পরদিন সকালবেলায় আমি আমার খাদেমকে প্রস্তুত হতে বলে বাড়ীর মালিকের নিকট বিদায় চাইলাম। তাঁর প্রতি অনেক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার পর বললাম, আপনি যদি কোন সময় মক্কা শরীফে যান তবে ‘যি-তাওয়া’ নামক স্থানে গিয়ে মুহাম্মদ বিন ইদ্রীসের বাড়ী অনুসন্ধান করবেন। আমি আপনাকে আমাদের মধ্যে দেখতে পেলে খুবই আনন্দবোধ করব।

তখন লোকটি বললেন, আপনার ভদ্র ব্যবহারে আমি সন্তুষ্ট। তবে আমি মনে করি আপনি আমার নিকট পূর্বে কোন বস্তু আমানত রাখেননি। কোনদিন আমার কোন উপকার করেছেন বলেও স্মরণ করতে পারছি না। কাজেই আমার পরিশ্রমের বিনিময়ে আপনার নিকট পারিতোষিক দাবী করছি।

ইমাম শাফেয়ী বললেন, আপনার নিকট আমি কোন আমানত রাখি নাই বা আপনার কোন উপকারও আমার দ্বারা সাধিত হয় নাই। এখন আপনার পারিতোষিক কিভাবে আমি আদায় করতে পারি তা বুঝিয়ে দিন?

তখন সে প্রত্যেক কাজের বিনিময়ে বিভিন্ন পারিতোষিক দাবী করল। ইমাম শাফেয়ী বলেন, খাদেমের মারফতে আমি তা মিটিয়ে দিয়ে বললাম, আপনার কোন পারিতোষিক বাকী নেই তো। সে বলল, এখন শুধু ঘর ভাড়া বাকী রয়েছে। ইমাম শাফেয়ী বললেন, আমি তাও আদায় করে দিলাম। তখন আমি নিশ্চিন্ত হলাম যে, ইলমে- ফেরাসাত প্রকৃত পক্ষেই একটি ইলম।

মুহাম্মদ বিন সায়ীদ হতে ইমাম হাকেম রেওয়ায়াত করেন, আমি রবীর নিকট শুনেছি যে, ইমাম শাফেয়ী একদিন তার নিকট এসে বললেন, এক ব্যক্তি আমার নিকট আগমন করল। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম আপনি বোধ হয় ‘ছনআন’ দেশের অধিবাসী। সে ব্যক্তি তা স্বীকার করল। আমি তাকে পুনরায় জিজ্ঞাসা করলাম যে, যথাসম্ভব আপনি লোহা-লক্করের কাজ করেন, সে ব্যক্তি তাও স্বীকার করল।

রবী বলেন, একবার ইমাম শাফেয়ীর সম্মুখ দিয়ে আমার ভাই অতিক্রম করলেন, তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, এ ব্যক্তি কি আপনার ভাই? আমি তা স্বীকার করলাম। বললাম, হ্যাঁ, এ ব্যক্তি আমার ভাই। অথচ ইমাম শাফেয়ী এর পূর্বে কোন দিন আমার ভাইকে দেখেননি। 

ইমাম বায়হাকী বলেন, একবার আমি ইমাম শাফেয়ীর সাথে জামে মসজিদে উপস্থিত ছিলাম। তখন এক ব্যক্তি শায়িত ব্যক্তিদের মধ্যে কারো অনুসন্ধান করছিল। ইমাম শাফেয়ী রবীকে বললেন, আপনি গিয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করুন যে, সে নীল চক্ষু বিশিষ্ট তার কোন হাবশী গোলামকে হারিয়েছে কিনা। রবী গিয়ে লোকটির সাথে কথা বলল। লোকটি রবীর সাথে ইমাম সাহেবের খিদমতে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, আমার গোলাম কোথায় রয়েছে? ইমাম সাহেব বললেন, আপনি এখন তাকে জেলখানায় পাবেন। লোকটি জেলখানায় গিয়ে তাঁর গোলামটিকে দেখতে পেলেন। 

রবী এর তাৎপর্য জানতে চাইলে ইমাম শাফেয়ী বললেন, অনুসন্ধানকারী ব্যক্তি এসে যখন মসজিদে প্রবেশ করল, তখন হাবভাব দেখে আমি বুঝতে পারলাম যে, লোকটি কোন পলাতক ব্যক্তিকে খোঁজ করছে। অতঃপর যখন দেখলাম যে, লোকটি শায়িত হাবশী গোলামদের মধ্যে তালাশ করছে। তখন বুঝতে পারলাম যে, সে কোন গোলামকে খোঁজ করছে। এরপর লক্ষ্য করলাম যে, লোকটি তাদের চক্ষুর প্রতি বিশেষ লক্ষ্য করছে। তখন বুঝলাম যে, যার অনুসন্ধান করা হচ্ছে তার চোখে কোন বিশেষত্ব আছে। 

ইমাম বায়হাকী বলেন, আমি এ সমস্ত কথা শুনে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কিভাবে জানতে পারলেন যে, গোলামটি জেলখানায় রয়েছে। ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) বললেন, অভিজ্ঞতা হতে বুঝতে পেরেছি যে, গোলামের যদি পেট ভরা থাকে তা হলে ব্যভিচার করে। আর যদি ক্ষুধার্ত হয় তবে চুরি করে। ধারণা করলাম এ দুটির একটা তো সে অবশ্যই করবে।

 বদান্যতা 

যুহদ, পরমুখাপেক্ষী না হওয়া, লোকদের থেকে পৃথক থাকা, বদান্যতা, অল্পে তুষ্টি, উদারতা, প্রভৃতি গুণ সর্বকালে উলামায়ে ইসলামের বৈশিষ্ট্য ও প্রতীক হিসাবে চলে আসছে। এ বিষয়ে ইমাম সাহেব পূর্বসূরীদের প্রতিচ্ছবি ছিলেন।

ইমাম সাহেব বলেন, বদান্যতার অর্থ এই যে, নিজের কোন দাবী বা কোন বস্তু কাউকে বিনা স্বার্থে দিয়ে দেওয়া। তা কয়েক প্রকারেই হতে পারে। করো ঋণ থাকলে তা ক্ষমা করে দেওয়া, নিজের প্রয়োজনের উপর অপরের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়ে মিটিয়ে দেওয়া, অপরের উপকারার্থে নিজের জ্ঞান বুদ্ধি ব্যয় করা, অপরের সাহায্যার্থে নিজকে বিপদে পতিত করা, অপরের জীবন রক্ষার্থে নিজের জীবন বিপন্ন করা।

তিনি বলেন, কাউকে কোন কিছু প্রদান করে তাঁর নিকট হতে প্রতিদান আশা করতে নাই। তাকে কোনরূপ হেয় প্রতিপন্ন করতেও নাই। দান করার সওয়াব বিনষ্ট হয়ে ক্ষতি হবার বহু আশংকা রয়েছে।

একবার খলীফা হারুনুর রশীদ ইমাম সাহেবের খিদমতে পঞ্চাশ হাজার দেরহাম হাদিয়াস্বরূপ পেশ করলেন। সেগুলো হতে তিনি চল্লিশ হাজার দেরহামগরীব, ইয়াতীম, বিধবা এবং অভাবগ্রস্থ আলেমদের মধ্যে বন্টন করে দিলেন।

ইমাম সাহেবের নিকট যে সমস্ত হাদিয়া উপঢৌকন পেশ করা হত প্রায় সময়ই সেগুলোর তিন চতুর্থাংশ গরীব-দুঃখী, বিধবা, ইয়াতীম, অভাবগ্রস্থ আলেমদের মধ্যে বন্টন করে দিতেন। এরপরও তিনি আল্লাহর নিকট সর্বদাই দো’আ করতেন, হে আল্লাহ! তুমি আমাকে দুনিয়ার লোভ-লালসা হতে মুক্ত রেখো।

ইমাম সাহেবের অন্যতম বিশিষ্ট ছাত্র ইমাম মুয়ানী (রহঃ) বলেন, আমি ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) হতে অধিক দানশীল এবং বদাণ্য ব্যক্তি আর কাউকে দেখিনি। একদা ঈদের রাত্রে আমি তাঁর সাথে মসজিদ হতে বাড়ী ফিরছিলাম। পথে পথে একটি মাসয়ালা নিয়ে আলোচনা হলো। তার বাড়ীর দরজায় একটি গোলামকে দণ্ডায়মান অবস্থায় দেখতে পাওয়া গেল। সে সালাম জানিয়ে আরজ করল, আমার মনিব হাদিয়া স্বরূপ এ অর্থপূর্ণ থলিটি আপনার খিদমতে পাঠিয়েছেন। ইমাম সাহেব সালামের জবাব প্রদান করে সেটি গ্রহণ করলেন। এ সময় এক ব্যক্তি এসে বলল, হযরত! আজ আমার একটি সন্তান জন্মগ্রহণ করেছে। কিন্তু আমার হাতে একটি পয়সাও নাই। ইমাম সাহেব তৎক্ষণাৎ সে থলিটি তাকে দিয়ে দিলেন।

আরেক ঈদ রজনীর ঘটনা। ঘরে প্রয়োজনীয় জিনিস পত্রের অভাব। ইমাম সাহেবের স্ত্রী বললেন, আপনি তো সবার মঙ্গল কামনায় আপনার সময় ব্যয় করেন। আজ ঈদের রাত্রি। ঘরে প্রয়োজনীয় জিনিস পত্রের অভাব। কাজেই আপনি যদি কারো নিকট হতে কিছু অর্থ না আনেন তবে অন্য কোন উপায় দেখছি না।

ইমাম সাহেব এক ব্যক্তি হতে সত্তরটি দীনার ধার করে বাড়ী ফিরছিলেন। পথিমধ্যে কয়েকজন ফকীর-মিসকীন তাকে ছেঁকে ধরল। পঞ্চাশটি দীনার তিনি তাদের মধ্যে বিলিয়ে দিলেন। অবশিষ্ট বিশ দীনার নিয়ে বাড়ী ফিরলেন। স্ত্রীর নিকট হস্তান্তর করার পূর্বেই এক কোরাইশী বিপদগ্রস্থ ব্যক্তি এসে তার অভাবের কথা বলল। তিনি সেই বিশ দীনার সে ব্যক্তির সম্মুখে রেখে বললেন, ভাই! তোমার যতটুকু প্রয়োজন সে পরিমাণ এগুলো হতে নিয়ে যাও। সে ব্যক্তি সব কয়টি মুদ্রা উঠিয়ে বলল, এতেও আমার প্রয়োজন মিটবে না!

ইমাম সাহেব তখন স্ত্রীর নিকট এসে সম্পূর্ণ ঘটনা বর্ণনা করলেন। তিনি উত্তরে বললেন, এটা তো আপনার জন্য সাধারণ ব্যাপার।

পরদিন ভোর বেলায় খলীফা হারুনুর রশীদের মন্ত্রী জাফর বিন ইয়াহয়ার একজন দূত এসে ইমাম সাহেবকে সাথে নিয়ে গেল। জাফর তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করলেন। অতঃপর বললেন, আজ রাত্রে স্বপ্নযোগে আল্লাহ তা’আলার পক্ষ হতে আমাকে আপনার দানের কথা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। অতঃপর তিনি এক হাজার দীনার হাদিয়া স্বরূপ ইমাম সাহেবের নিকট পেশ করে তা গ্রহণ করার জন্য বহু অনুনয় বিনয় করেন। ইমাম সাহেব তা গ্রহণ করেন।

বাগদাদে অবস্থানকালে খলীফা হারুনুর রশীদ তার দারোয়ান ফযল বিন রবীকে নির্দেশ দিলেন- এক্ষুনি মুহাম্মদ বিন ইদ্রীস হিজাযীকে আমার নিকট নিয়ে এস। এ সময় তিনি তার বিশেষ সহচরদের সাথে মজলিসে উপবিষ্ট ছিলেন। তাঁর সম্মুখে তলোয়ার রাখা ছিল। ফযল বর্ণনা করেন, আমি ভয়ে ভয়ে ইমাম সাহেবের মজলিসে উপস্থিত হলাম। তখন তিনি নামায পড়ছিলেন। নামায শেষ হলে আমি বললাম, আমীরুল মুমেনীন আপনাকে স্মরণ করছেন। তৎক্ষণাৎ তিনি বললেন, বিসমিল্লাহ এবং দো’আ পড়তে পড়তে আমার সাথে চললেন। আমি সামনে চলছিলাম এবং তিনি আমার পিছে পিছে আসছিলেন।

প্রাসাদের দরজায় পৌঁছে আমি ভিতরে প্রবেশ করলাম। আমার ধারণা ছিল তাঁকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য হারুনুর রশীদ দরজাতেই থাকবেন। আমি ইমাম সাহেবের আগমনের সংবাদ দিলাম। তিনি বললেন, সম্ভবতঃ তুমি তাঁকে আতঙ্কিত করে দিয়েছ। ইমাম সাহেব ভিতরে প্রবেশ করলেন। তাঁকে দেখে খলীফা হারুনুর রশীদের চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। আগে বেড়ে মুছাফাহা, মুআনাকা (আলিঙ্গন) করলেন এবং বললেন, হে আবু আব্দিল্লাহ! আমাদের এ অধিকার নেই যে, দূত মারফত সংবাদ দিয়ে আপনাকে ডেকে আনার। আমাদেরই আপনার নিকট যাওয়া উচিত ছিল। আমরা ক্ষমাপ্রার্থী। আমরা আপনার জন্য চার হাজার দীনার (অন্য এক বর্ণনামতে দশ হাজার দীনার) হাদিয়া দেয়ার নির্দেশ দিয়েছি। ইমাম সাহেব তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। হারুনুর রশীদ বললেন, এগুলো গ্রহণ করার জন্য আমি আপনাকে জোর অনুরোধ জানাচ্ছি। আপনি গ্রহণ করে নিন। ফযল এ অর্থ তাঁর সাথে পাঠিয়ে দাও।

ইমাম সাহেবের দারিদ্রতা এবং অমুখাপেক্ষীতা এমন ছিল যে, বাগদাদে বিরাট অংকের অর্থ গ্রহণ করেননি। আর যখন তিনি মিশর গমন করেন সেখানে তাঁর শুভাকাঙক্ষী এবং ভক্তরা তাৎক্ষণিকভাবে তিন হাযার দীনার সংগ্রহ করে দেন, তিনি তা সানন্দে কবুল করেন। কারণ এটা হচ্ছে আহলে ইলম মুত্তাকীদের পক্ষ থেকে ইলমী এবং দ্বীনি সহায়তা ও সহযোগীতা আর তা ছিল রাজকীয় ইহসান বা অনুগ্রহ।

ইমাম সাহেব ইয়ামানের সরকারী চাকুরী ছেড়ে যখন মক্কায় আসেন তখন তাঁর নিকট দশ হাজার দীনার ছিল। শহরের বাইরে তাঁবু খাঁটিয়ে অবস্থানকালে অনেক লোক তার সাথে সাক্ষাৎ করতে যায়। এদের মধ্যে গরীব লোকও ছিল। তিনি তাদের মধ্যে সম্পূর্ণ অর্থ বন্টন করে দেন। এরপর মক্কায় এসে ঋণ গ্রহণ করেন।

রবী বর্ণনা করেন, ইমাম সাহেব প্রত্যেক দিনই দান করতেন। রমযানে ফকীর মিসকীনদেরকে প্রচুর অর্থ ও কাপড়-চোপড় দান করতেন।

একব্যক্তি ইমাম সাহেবের জামার বুতাম ঠিক করে দিলে তিনি তাঁকে এক দীনার দিয়ে দেন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে বললেন যে, আমার নিকট এ ছাড়া আর নেই। একব্যক্তি তাঁর বেত উঠিয়ে দিল। তিনি তাকে দীনারের এক থলি দিয়ে দিলেন। আমরা মিশর শহরে অনেক দানশীল দেখেছি কিন্তু ইমাম সাহেবের মত কাউকে দেখেনি। কেউ তাঁর নিকট কিছু প্রার্থনা করলে যদি দেওয়ার মত তাঁর নিকট কিছু না থাকত তবে লজ্জায় তার চেহারা পরিবর্তন হয়ে যেত। একবার তিনি হাম্মামে গোসল করতে গেলেন। গোসল করে হাম্মামের মালিককে বেশ অর্থ দিয়ে দেন।

অল্পেতুষ্টি

ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) বলেন, বিশ বৎসর যাবৎ আমি কোনদিন পেট পুরে আহার করিনি। লোভ-লালসাকে কখনো আমি প্রশ্রয় দেইনি। এতে আমি সর্বদা প্রশান্তি অনুভব করতাম। এর ফলে কোনদিন কারো নিকট আমাকে হেয় হতে হয়নি।

ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) সব সময়ই লোভ-লালসাকে ঘৃণার চোখে দেখতেন। লোভের বশবর্তী হয়ে মানুষ অনেক ঘৃণিত কাজও করে বসে। এর অপকার সম্বন্ধে কোরআন পাকের অনেক জায়গায় বর্ণনা রয়েছে। ‘

খলীফা হারুনুর রশীদ একবার ইমাম সাহেবকে সবিনয়ে বললেন, আপনি যে শহর পছন্দ করেন আপনাকে সে শহরের কাজী পদে নিয়োগ করব। ইমাম সাহেব সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে দেন।

সচ্চরিত্রতা এবং সরলতা

ইমাম সাহেব প্রাণবন্ত বুযুর্গ এবং প্রফুল্ল আলেম ছিলেন। তিনি আপন শাগরেদ এবং ভক্তদের প্রতি সহৃদয় ছিলেন। তাদের সাথে অত্যন্ত স্নেহ এবং ভালবাসার আচরণ করতেন।

তিনি বলতেন,

আমি তাদের (ছাত্রদের) সামনে তাদের সম্মানার্থে নিজেকে হীন করে দেই, আর যে ব্যক্তি তার নফসকে নীচু না করবে, তাকে সম্মান করা হবে না।

একবার ছাত্ররা কোন বিষয়ে পীড়াপীড়ি করলে তিনি বললেন, তোমরা যদি এরূপ না কর তবে আমি সে কথাই বলব যা ইবনে সীরীন জনৈক একগুঁয়ে ব্যক্তিকে বলেছিলেন,

যদি তুমি আমাকে এমন বিষয়ে বাধ্য কর যা করার ক্ষমতা আমার নেই তাহলে আমার চরিত্রের যা তোমাকে আনন্দিত করে তাই তোমাকে অসন্তুষ্ট করে দেবে।

তাঁর প্রিয় ছাত্র যা’ফরানী প্রথম প্রথম তার খানা নিজ বাড়ীতে তৈরী করাতেন। ইমাম সাহেবের পছন্দনীয় খাদ্যের তালিকা লিখে খাদেমাকে দিতেন। একদিন ইমাম সাহেব খাদেমাকে ডেকে খাদ্যের তালিকা দেখলেন। সেখানে আরও একটি পছন্দনীয় খাদ্যের নাম বৃদ্ধি করে দিলেন। দস্তরখানের উপর যখন খানা আনা হয় তখন নতুন একটি খানা দেখে যাফরানী বিস্মিত হয়ে বললেন, আমার ইচ্ছা ব্যতীত এ খানা কিভাবে এল। খাদেমাকে ডেকে যখন খাদ্যের তালিকা দেখলেন, তখন দেখতে পেলেন সেখানে ইমাম সাহেবের কলমে লিখা নতুন একটি খাদ্যের নাম। ইমাম সাহেবের এ লৌকিকতামুক্ত, কাজে যাফরানী এত খুশী হলেন যে তৎক্ষণাৎ একটি বাঁদীকে আযাদ করে দিলেন।

বুওয়াইতী বলেন,

ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্মল চরিত্রের অধিকারী ছিলেন।

ইমাম সাহেব বলেন, আমি মক্কায় এক কুরাইশী রমনীকে বিয়ে করেছিলাম। তাকে কৌতুক করে বলেছিলাম,

এটা তো বড়ই বিপদের কারণ যে, তুমি কাউকে ভালবাসবে আর তুমি যাকে ভালবাসবে সে তোমাকে ভালবাসবে না।

এর উত্তরে সে মহিলা বলেছিল,

আর সে তোমাকে দেখে মুখ ফিরিয়ে নেবে আর তুমি পীড়াপীড়ি করবে তার সামনে থাকতে।

একবার ইমাম মুহাম্মদ বিন ইদ্রীস শাফেয়ী, ইয়াহইয়া বিন ময়ীন এবং আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ) মক্কায় গমন করেন। একই জায়গায় তারা অবস্থান করেন। রাত্রে ইমাম শাফেয়ী এবং ইয়াহইয়া বিন ময়ীন শুয়ে পড়লেন। ইমাম আহমদ বিন হাম্বল নামাযে রত হয়ে গেলেন। সকাল বেলায় ইমাম শাফেয়ী বললেন, আজ রাত্রে আমি মুসলমানদের জন্য দু’শত মাসয়ালা সমাধা করেছি। ইয়াহইয়া বিন ময়ীনকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি করেছেন? তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীছ দু’শত মিথ্যাবাদী রাবী থেকে রক্ষা করেছি। আহমদ বিন হাম্বলকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, নফল নামাযে আমি এক খতম কোরআন পড়েছি।

ইবাদত, রিয়াযত, যুহৃদ এবং তাকওয়া

রবী বর্ণনা করেন, ইমাম সাহেব প্রতিরাতে এক খতম কোরআন পড়তেন। রমযানে রাতে দিনে দু’খতম পড়তেন। এক বর্ণনায় রয়েছে, রমযানে তিনি নামাযে ষাট খতম পড়তেন।

বাহর বিন নছর বলেন, আমরা যখন কাঁদতে চাইতাম পরস্পরকে বলতাম, এ মুত্তালেবী যুবকের নিকট চল, সে কোরআন পড়বে। আমরা তাঁর নিকট এলে তিনি কোরআন তেলাওয়াত শুরু করতেন। তখন আমরা তাঁর কোরআন তেলাওয়াত শুনে উচ্চস্বরে কাঁদতে শুরু করতাম। এ অবস্থা দেখে ইমাম সাহেব তেলাওয়াত বন্ধ করে দিতেন। কোরআন তেলাওয়াতের মধুর আওয়াযের দরুন এরূপ হত।

হুসাইন বিন আলী কারাবেসী বলেন, ইমাম সাহেবের সাথে আমি কয়েক রাত কাটিয়েছি। তিনি রাত্রের তৃতীয়াংশ পর্যন্ত নফল নামাযে পঞ্চাশ হতে একশ আয়াত তেলাওয়াত করতেন। প্রত্যেক আয়াতে মুসলমানদের জন্য দোআ করতেন, শাস্তির আয়াত এলে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাইতেন।

ইমাম সাহেব বর্ণনা করেন, আমি স্বপ্নে দেখতে পেলাম যে, হযরত আলী (রাঃ) আমাকে সালাম করে মুছাফাহা করলেন এবং তাঁর আংটি বের করে আমাকে পরিয়ে দিলেন। এ স্বপ্নের বৃত্তান্ত আমার চাচার নিকট উল্লেখ করলাম। তিনি বললেন, হযরত আলীর (রাঃ) সাথে মুছাফাহা করার অর্থ (আযাব) শাস্তি থেকে নিরাপত্তা। আর আংটির ব্যাখ্যা এই যে, পৃথিবীর যে স্থান পর্যন্ত হযরত আলীর নাম পৌছেছে সে পর্যন্ত তোমার নাম পৌঁছবে।

মুহাম্মদ বিন আব্দিল্লাহ বিন আব্দিল হাকীম বলেন, আমরা পরস্পরে বসে মুত্তাকী এবং সংসার বিরাগীদের সম্বন্ধে আলোচনা করছিলাম। হযরত যুনুন মিসরী (রহঃ) সম্বন্ধে বিশেষভাবে আলোচনা হচ্ছিল। এমন সময় জনৈক প্রখ্যাত আলেম ও বুযুর্গ এসে বললেন, ভাইয়েরা! আমার মতে ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) সবচেয়ে বড় মুত্তাকী, ইবাদতকারী এবং সংসার বিরাগী। তিনি আত্মহারা অবস্থায় কোরআন তিলাওয়াত করে থাকেন। সাংসারিক ঝামেলা হতে তিনি সম্পূর্ণ দূরে অবস্থান করেন। আমীর-ওমরাহর তিনি পরোয়া করেন না। একবার আমি এবং ইমাম মুয়ানীর গোলাম ইমাম শাফেয়ীর সাথে ছাফা পাহাড়ে যাচ্ছিলাম। ঘটনাক্রমে গোলামটি ‘হাজা ইয়ামিল ফাছল’ এ আয়াত পাঠ করলেন। ইমাম শাফেয়ী এ আয়াতটি শুনে কেঁপে উঠলেন এবং অস্থির হয়ে রোদন করতে লাগলেন। তাঁর মধ্যে খোদাভীতি অত্যন্ত প্রবল ছিল।

রবী বিন সুলাইমান বলেন, ইমাম সাহেবের সংগে আমি হজে গেলাম। হজ্বের প্রতিটি কার্য পালনের সময় অধীর হয়ে ক্রন্দন করছিলেন। আর অত্যন্ত তন্ময় হয়ে এ কবিতাটি পাঠ করছিলেন

“রাসূলের বংশধর আমার অবলম্বন। আল্লাহর দরবারে তারা আমার নাজাতের কারণ। এ কারণেই আমি আশা করছি যে, আমার আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে”।

ইমাম শাফেয়ী (রহঃ)-এর কোরআন তিলাওয়াত এতই মর্মস্পর্শী ছিল যে, নামাযে কিংবা কোন মজলিসে তিলাওয়াত করলে মুসল্লী এবং শ্রোতাদের মধ্যে কান্নার রোল পড়ে যেতো।

সুন্নতের পাবন্দী

ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ) বলেন, ইমাম শাফেয়ী (রহঃ)-এর নিয়ম ছিল তাঁর প্রদত্ত ফতোয়ার খেলাফ যদি কোন হাদীছ পাওয়া যেতো তবে তৎক্ষণাৎ প্রকাশ্যে ঘোষণা করে দিতেন যে, আমি আমার পূর্বের ফতোয়া হতে প্রত্যাবর্তন করছি।

ইমাম মুয়ানী, রবী বিন সুলাইমান এবং অপরাপর ছাত্রদের সাথে ইমাম সাহেব প্রায়শঃ বলতেন, আমি যে কয়টি কিতাব লিখেছি, সেগুলো যথাসাধ্য সতর্কতা এবং দলীল সহকারে লিখতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমি মানুষ। আমার ভুল হওয়াটাই স্বাভাবিক। কাজেই আমার প্রণীত কিতাবে যদি কোন মাসয়ালা কোরআন এবং সুন্নাহর খেলাফ হয়ে থাকে এবং তোমরা তা অনুধাবন করতে পার তবে ধরে নিবে আমি তা হতে প্রত্যাবর্তন করছি। আর একথাও স্মরণ রেখো যে, আমি যদি কোন সহীহ হাদীছ জানতে পারি এবং তদানুসারে আমল না করি তবে বুঝতে হবে আমার বুদ্ধির ত্রুটি ঘটেছে।

স্বীয় অভিমতের ব্যাপারে তিনি কখনো জেদের বশবর্তী হতেন না। তাঁর কোন মাসয়ালা ভুল প্রমাণিত হলে তিনি তা সংশোধন করে নিতে বিলম্ব করতেন না। ইমাম আহমদ (রহঃ)কে বলতেন, হাদীছের ব্যাপারে আপনার দৃষ্টি আমার দৃষ্টিতে অধিক তীক্ষ। কাজেই, আমার ফতোয়ার খেলাফ কোন হাদীছ যদি আপনার পরিদৃষ্ট হয় তবে অবিলম্বে আপনি তা আমাকে জানিয়ে দিবেন। এতে আমার পক্ষে নিজেকে সংশোধন করে নেয়া সম্ভব হবে।

তাঁকে অনেক বিতর্ক সভায় যোগদান করতে হত। তিনি অত্যন্ত বিনীত ও নম্রভাবে অপর পক্ষের প্রশ্নের জবাব দিতেন। তিনি বলতেন, আমার বড়ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার জন্য কারো সাথে কোনদিন তর্ক-বিতর্ক করি নাই। সত। প্রচার এবং সত্যকে প্রতিষ্ঠা করাই আমার উদ্দেশ্য ছিল।

তিনি ছিলেন অত্যন্ত সত্যপ্রিয়। মিথ্যাকে তিনি প্রচণ্ডভাবে ঘৃণা করতেন। তিনি বলতেন, সারা জীবনে আমি একদিনও মিথ্যা বলি নাই। মিথ্যা শপথ তো দূরের কথা, সত্য শপথও আমি কোন দিন করি নাই।

তার কিতাবাদি সম্বন্ধে তিনি বলতেন, আমি খোদার নিকট প্রার্থনা করছি যে, আমার জাতি আমার লেখা বুঝুক এবং তদানুসারে আমল করুক।

বুযুর্গদের প্রতি আদব শ্রদ্ধা

ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) সম্বন্ধে কোন এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করলে ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) বললেন, জেনে রাখুন! ফিকহবিদগণ ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর আওলাদ ও পোষ্যবর্গ।

অন্য এক ব্যক্তি সুফিয়ান বিন উয়াইনা এবং ইমাম মালেক (রহঃ) সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, এ দুই ব্যক্তি না থাকলে হেজাজ হতে ইলমে হাদীছ বিলীন হয়ে যেত।

যখনই তিনি ইমাম মালেক (রহঃ)-এর কোন কথার উদ্ধৃতি দিতেন, তখনই বলতেন, ‘এটা আমাদের উস্তাদ ইমাম মালেকের অভিমত। তিনি প্রায়ই বলতেন, ইমাম মালেকের সাথে আমাদের কোন তুলনা হতে পারে না।

ছাহাবাদের প্রসংগে তিনি বলতেন, ইজতিহাদ, পরহেযগারী এবং জ্ঞানে তাঁরা আমাদের চেয়ে শত সহস্রগুণ শ্রেষ্ঠ ছিলেন।

একবার এক ব্যক্তি মাসয়ালা জিজ্ঞাসা করলেন যে, কোন ব্যক্তি পদব্রজে কা’বায় পৌঁছার শপথ করল। কিন্তু সে তা কার্যে পরিণত করতে পারল না। এখন তার ব্যাপারে শরীয়তের কি নির্দেশ? তিনি বললেন, তাকে কাফফারা আদায় করতে হবে। আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি আত্তার বিন রাবাহ এইরূপ মত পোষণ করেন।

বিনয়

ইমাম সাহেব বলেন, বিনয় প্রদর্শনের নির্দেশ এজন্য দেওয়া হয়েছে যেন কোন ব্যক্তি নিজ শক্তি এবং অর্থের অপব্যবহার না করে। আচার-আচরণে যেন কোন দুঃখীর মনে কোন প্রকার আঘাত কিংবা ব্যাথা না আনতে পারে। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন খোদা আমার প্রতি ওহী নাযিল করেছেন যেন তোমরা বিনয় অবলম্বন কর। কেউ কারো প্রতি যেন অবিচার না কর। কারো প্রতি যেন অহংকার প্রদর্শনের কোনরূপ প্রবৃত্তি না জন্মে।

উপযুক্ত লোককে তিনি শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখতেন। কারো কোন কৃতিত্ব দেখলে তিনি তাকে পুরস্কার দ্বারা ভূষিত করতেন। একবার তিনি কোথাও যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে দেখতে পেলেন যে, এক ব্যক্তি তীরন্দাজি শিক্ষা করছে। লোকটির তীর লক্ষ্যস্থল ভেদ করতে দেখে ইমাম সাহেব তাকে স্বীয় পকেট হতে তিনটি দিনার বের করে পুরস্কার স্বরূপ দিলেন। অতঃপর অনুশোচনা করে বললেন, আমার নিকট আরো দীনার থাকলে এত অল্প দীনার দ্বারা আপনাকে পুরস্কৃত করতাম না।

বন্ধু-বান্ধব এবং শাগরেদদের আপ্যায়ন করার জন্য তিনি একটি দাসীকে নিয়োজিত করে রেখেছিলেন। হালুয়া প্রস্তুত করার ব্যাপারে সে পারদর্শী ছিল। তার দ্বারা হালুয়া তৈরী করিয়ে তিনি বন্ধু-বান্ধবদের প্রায়ই আপ্যায়ন করতেন। বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে তিনি সদয় এবং নম্র ব্যবহার করতেন। তাদেরকে আহার করাতে পেরে তিনি পরম সন্তুষ্টি লাভ করতেন।

কেউ যদি ইমাম সাহেবের সামান্য পরিমাণও উপকার করত তবে তিনি তার শতগুণ অধিক উপকার করতেন। তার প্রতি কৃতজ্ঞও থাকতেন।

হুব্বে আলী এবং শিয়া মতবাদ গ্রহণের অপবাদ

হযরত আলী এবং হযরত উছমান (রাঃ) সম্বন্ধে দুটি ভিন্ন দল ছিল। একদল ‘উলুবী’ এবং অপর দল ‘উছমানী’। ইমাম শাফেয়ীর যামানায়ও ছাহাবায়ে কিরামের মতভেদের কারণে সৃষ্ট দুটি দল উলুবী এবং উছমানী বাকী ছিল। প্রত্যেক মহৎ ব্যক্তিত্বের সম্পর্কে তারা এ দৃষ্টিভঙ্গিতে বিবেচনা করে। সামান্য ব্যাপারে নিজের সিদ্ধান্ত প্রকাশ করত। তদ্রুপ ইমাম সাহেবের মধ্যে কতক লোকে শিয়াবাদের গন্ধ পেয়েছে। কারণ, তিনি হযরত আলী, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বংশধরদেরকে ভালবাসতেন। ইমাম সাহেব হাশেমী মুত্তালেবী সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচাত ভাই। স্বপ্নযোগে তিনি হযরত আলীর সাথে মুছাফাহা এবং মুআনাকা (আলিঙ্গন) এর সৌভাগ্য অর্জন করেন এবং তাঁর আংটি পরেন। এসব কারণে তিনি হযরত আলী, আবু তালেব এবং রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বংশধরের সম্মান দেখাতেন। এ বিষয়টি কারও নিকট সন্দেহ লাগল এবং সে সময়ের সাধারণ নিয়মানুসারে ইমাম সাহেবের ব্যাপারে শিয়াবাদের ধারণা করল।

একবার ইমাম সাহেব কোন একটি মজলিসে উপস্থিত হলেন। সেখানে আবু তালেবের বংশের কয়েকজন আলেম উপস্থিত হলেন। ইমাম সাহেব বললেন, এঁদের সামনে আমি কোন কথা বলব না। এঁরা সম্মানিত ব্যক্তি। একদিন একব্যক্তি তাঁকে একটি মাসয়ালা জিজ্ঞেস করল। ইমাম সাহেব উত্তর দিলেন। প্রশ্নকারী বলল, আপনি হযরত আলীর (রাঃ) মতের বিপরীত ফতোয়া প্রদান করেছেন। ইমাম সাহেব বললেন, তুমি এ মাসয়ালাটি হযরত আলীর (রাঃ) মতানুসারে প্রমাণ কর; আমি আমার মুখমণ্ডল মাটিতে রেখে দিব এবং আমার মত থেকে প্রত্যাবর্তন করব।

কাযী আয়ায লিখেন, একবার কিছু লোক এসে ইমাম সাহেবকে বলল আপনার মধ্যে শিয়ার নিদর্শন পাওয়া যাচ্ছে। আপনি নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বংশধরকে মুহব্বত করেন। ইমাম সাহেব বললেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি বলেন নি যে,

তোমাদের কেউই পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না- যদি না সে আমাকে তার পিতা-পুত্র এবং সমস্ত মানুষ থেকে অধিক ভালবাসে?

রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এও বলেছেন যে, মুত্তাকী লোক আমার বন্ধু এবং আত্মীয়। আর মুত্তাকী এবং নেককার আত্মীয়দের ভালবাসার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ অবস্থায় আমি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নেককার আত্মীয় স্বজনকে ভালবাসব না কেন? এরপর এ কবিতা পড়লেন

হে সওয়ার! প্রাতে যখন হাজীগণ উপত্যকার ঢলের ন্যায় মুযদালিফা হতে মিনার দিকে গমন করে তখন তুমি মুহাছোব উপত্যকায় দাঁড়িয়ে প্রত্যেক গমনকারী এবং অবস্থানকারীকে আহ্বান করে বল যদি মুহাম্মদের (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বংশধরকে ভালবাসা রফয (শিয়া মতবাদ) হয়ে থাকে তবে মানব এবং জিন প্রত্যেকেই সাক্ষী থাকুক যে, আমি একজন রাফেযী।

ইমামগণ এবং সমসাময়িকদের রায়

রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এ দোয়াটি বর্ণিত রয়েছে

“হে আল্লাহ! কুরাইশদেরকে হেদায়াত দাও। কারণ তাদের আলেম ইলম দিয়ে দুনিয়া পরিপূর্ণ করবে। হে আল্লাহ! যেমনি তুমি তাদেরকে শাস্তি দিয়েছ তেমনি তাদের নেয়ামতও দান কর।”

আবু নয়ীম আব্দুল মালেক বিন মুহাম্মদ বলেন, এ হাদীছে কুরাইশ আলেম দ্বারা ইমাম শাফেয়ীকে বুঝানো হয়েছে। ইমাম আহমদ বিন হাম্বল বলেন, প্রত্যেক শতাব্দীর শুরুতে আল্লাহ তাআলা এমন একজন আলেমে দ্বীন সৃষ্টি করেন- যিনি লোকদেরকে সুন্নাত শিক্ষা দেন এবং রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে প্রতিরক্ষার কাজ করেন। আমরা দেখেছি যে, প্রথম শতাব্দীর শুরুতে উমর বিন আব্দিল আজীজ এবং দ্বিতীয় শতাব্দীর শুরুতে ইমাম শাফেয়ী একাজ সমাধা করেছেন। 

ইসহাক বিন রাহওয়ে বলেন, ইমাম শাফেয়ীর মক্কায় অবস্থানকালে আমি তাঁর নিকট গিয়েছিলাম। আহমদ বিন হাম্বল পূর্ব থেকেই সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি আমাকে বললেন, আবু ইয়াকুব! এ ব্যক্তির (শাফেয়ীর) দরসে বস। আমি বললাম, আমি তার নিকট বসে কি করব। আমার বয়স তাঁর বয়সের কাছাকাছি। তার কারণে কি আমি ইবনে উয়াইনা এবং মুকরীর দরস ছেড়ে দিব? আহমদ বিন হাম্বল বলেন, ইবনে উয়াইনার দরসী মজলিস পরেও পাওয়া যাবে। কিন্তু শাফেয়ীর মজলিস পাওয়া যাবে না।

আব্দুল্লাহ বিন যুবাইর হুমাইদী বর্ণনা করেন, আহমদ বিন হাম্বল আমাদের এখানে মক্কায় সুফিয়ান বিন উয়াইনার নিকট অবস্থান করছিলেন। একদিন তিনি আমাকে বললেন, এখানে একজন কুরাইশী আলেম আছেন। আমি নাম জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, তিনি হচ্ছেন মুহাম্মদ বিন ইদ্রীস শাফেয়ী। বাগদাদে তিনি তাঁর দরসে অংশ নিয়েছিলেন। তাঁর পীড়াপীড়িতে আমরা তাঁর দরসে গেলাম। কয়েকটি মাসয়ালা নিয়ে আলোচনা হল। সেখান থেকে উঠে আসার পর আহমদ বিন হাম্বল বললেন, তাকে কেমন মনে হল? কুরাইশী আলেমের

ইলমে এবং তার বলার পদ্ধতিতে কি খুশী হওনি? তাঁর এ কথা আমার অন্তরে বদ্ধমূল হয়ে গেল। আমি ইমাম শাফেয়ীর মজলিসে বসতে শুরু করলাম। তাঁর মজলিসের সামনে সুফিয়ান বিন উয়াইনার মজলিস নিস্তেজ হতে লাগল। এরপর আমিও ইমাম সাহেবের সাথে মিশর চলে গেলাম।

মুহাম্মদ বিন ফল বাযযায তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, একবার আমি আহমদ বিন হাম্বলের সাথে হজে গেলাম। সেখানে আমরা এক স্থানেই অবস্থান করছিলাম। আমি ফজরের নামায পড়ে আহমদ বিন হাম্বলের খোঁজে মসজিদে হারামের প্রত্যেকটি দরসে গেলাম। দেখলাম তিনি এক গ্রাম্য যুবকের নিকট বসে আছেন। তার নিকট গিয়ে বললাম, আবু আব্দিল্লাহ! আপনি সুফিয়ান বিন উয়াইনার মজলিস বাদ দিয়ে এখানে বসে আছেন অথচ সেখানে ইবনে শিহাব যুহরী, আমর বিন দীনার, যিয়াদ বিন আলাকা এবং অনেক তাবেঈন উপস্থিত রয়েছেন।

আহমদ বিন হাম্বল বললেন, চুপ থাক! কোন হাদীছের যদি সনদে আলী (স্বল্প মাধ্যমের সনদ) পাওয়া না যায় তবে তার সনদে সাফেল (অধিক মাধ্যমের সনদ) পাওয়া যাবে। এতে দ্বীন অথবা আকলের (জ্ঞানের) কোন ক্ষতি হবে না। আর যদি তুমি এ যুবকের জ্ঞান (আকল) না পাও তবে আমার ধারণায় কিয়ামত পর্যন্ত তা পাবে না। আমি কিতাবুল্লাহ সম্পর্কে এর চেয়ে অধিক জ্ঞানী কাউকে দেখেনি। আমি জিজ্ঞেস করলাম ইনি কে? তিনি বললেন, ইনি মুহাম্মদ বিন ইদ্রীস শাফেয়ী।

আবু ছত্তর বলেন, আমার মতে ছত্তরী এবং নখয়ী হতে ফিকাহ সম্পর্কে শাফেয়ী অধিক অভিজ্ঞ।

জনৈক রাবী বর্ণনা করেন, মুহাম্মদ বিন হাসান ইমাম শাফেয়ীর যে পরিমাণ সম্মান করতেন অন্য কোন আহলে ইলম তা করতেন না।

হেলাল বিন আলা বলেন, ইমাম শাফেয়ী ইলমের তালা খুলে দিয়েছেন। ইবনে হিশাম বলেন, অভিধানের বিষয়ে ইমাম শাফেয়ী হুজ্জাত (প্রমাণ) স্বরূপ।

মিশরে একবার ইমাম শাফেয়ী এবং ইবনে হিশামের মধ্যে পুরুষদের নসব (বংশধারা) নিয়ে আলোচনা হল। কিছুক্ষণ পর ইমাম শাফেয়ী বললেন, এ বিষয় বাদ দিন। এটা আমাদের সবার জানা আছে। মেয়েদের নসব সম্পর্কে আলোচনা করুন। এ বিষয় নিয়ে যখন আলোচনা হল ইবনে হিশাম চুপ হয়ে গেলেন এবং বললেন, আমি জানতাম না যে আল্লাহ তাআলা এমন আলেম সৃষ্টি করেছেন।

কারামত

রোমসম্রাট প্রতি বৎসর বাগদাদে খলীফা হারুনুর রশীদের নিকট কর প্রেরণ করতেন। একবার রোমের শাসনকর্তা খলীফার দরবারে এই বলে কয়েকজন পাদ্রী পাঠালেন যে, আমার রাজ্যের একজন তত্ত্ববিদ পণ্ডিতের সঙ্গে তর্ক করে যদি আপনার রাজ্যের মুসলমান পণ্ডিতগণ জয়ী হতে পারেন তবেই আমি রীতিমত কর আদায় করব। অন্যথায় আপনি আর আমার নিকট হতে কর চাইবেন না।

রোম হতে আগত পাদ্রীদের সংখ্যা ছিল চারশত। তাদের সাথে তর্ক করার জন্য খলীফা হারুনুর রশীদ দজলা নদীর তীরে আলেমদেরকে সমবেত করলেন। অতঃপর ইমাম সাহেবকে বললেন, এ ক্ষেত্রে আপনাকে সর্বপ্রথম এগিয়ে যেতে হবে।

উভয় পক্ষ নদীর তীরে উপস্থিত হলে ইমাম সাহেব একখানা মুসল্লা কাঁধে করে নিয়ে পাঁয়ে হেঁটে নদীর উপর চলে গেলেন। পানির উপর মুসল্লা বিছিয়ে দিয়ে বললেন, আমার সাথে যারা বহছ করার ইচ্ছে হয় সে এখানে চলে আসুক।

এটা দেখে খৃষ্টানরা অবাক হয়ে রইল। এমনকি তাদের অনেকেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে ফেলে। রোম সম্রাটের দরবারে এ সংবাদ পৌঁছলে তিনি বললেন, খোদার শোকর যে, তিনি এ দেশে আসেননি। তিনি যদি এ দেশে আসতেন তবে সারা রোম সাম্রাজ্যের খৃষ্টানরা মুসলমান হয়ে যেতো।।

অবয়ব ও গঠন প্রকৃতি

ইমাম মুযানী বর্ণনা করেন, আমি ইমাম শাফেয়ী হতে অধিক সুন্দর মানুষ দেখিনি। তাঁর গণ্ড দুটি ছিল হালকা পাতলা। তাঁর শত্রু ছিল এক মুষ্ঠি পরিমাণ লম্বা। তিনি মেহেদীর কেযাব ব্যবহার করতেন। তিনি আতর এবং সুগন্ধি খুবই পছন্দ করতেন। যে স্তম্ভের উপর হেলান দিয়ে তিনি দরসে বসতেন তাতে সুগন্ধি মাখন হত। তাঁর স্বভাব ছিল কোমল এবং পবিত্র। পোষাক-পরিচ্ছদ এবং খাদ্যের প্রতি বিশেষভাবে যত্নবান ছিলেন। স্মরণ শক্তি বৃদ্ধির জন্য তিনি অধিকাংশ সময় লুবান বা গুলগুল ব্যবহার করতেন। এর ফলে একবার তিনি এক বৎসর পর্যন্ত নাকসীর (নাক দিয়ে রক্ত বের হওয়া) রোগে আক্রান্ত ছিলেন।

জ্ঞানসূলভ বাণী

জ্ঞান-বুদ্ধি, হাদীছ, ফিকাহ, সাহিত্য, কাব্য, বংশ, পরম্পরা ইতিহাস এসব বিষয়ে ইমাম সাহেবের বিশেষ দক্ষতা ছিল। কাব্য সাহিত্য, অভিধান এবং আরবীয়্যাতের প্রতি বিশেষ আগ্রহ ছিল। তিনি কবিতা রচনা করতেন, কিন্তু উলামাদের জন্য কবিতা বলা অনুচিত মনে করতেন। তাই তিনি সেদিকে মনোযোগ দেননি। তিনি স্বয়ং বলেন,

কাব্য রচনা যদি উলামাদের জন্য দোষণীয় না হত তবে আমি এ যমানায় লবীদ বিন রবীয়া হতেও শ্রেষ্ঠ কবি হতাম।

তিনি বলতেন, আমি কাব্যরচনা, সাহিত্য এবং ভাষা দ্বীনের সহায়ক হিসেবে অর্জন করেছি। ইমাম সাহেবের জ্ঞানের বাণীতে আরবী সাহিত্য এবং রচনার স্বাদ পাওয়া যায়। সেগুলোতে জ্ঞান এবং বুদ্ধির সাথে সাথে ভাষা-অলঙ্কারের চাশনিও রয়েছে। একদিন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল- বলুন, কি অবস্থা? তিনি উত্তর দিলেন,

তার অবস্থা কেমন হবে যার কাছে আল্লাহ তাআলা কোরআনের, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নতের, শয়তান, গোনাহর, যমানার বিপদ-আপদের, নফস, আপন খাহেশের, পরিবার-পরিজন, অন্ন এবং মালাকুল মউত রূহ কবজ করার দাবী জানাচ্ছে।

জনৈক ব্যক্তি তার সৌন্দর্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন,

খোদার কসম! সে ব্যক্তি সৌন্দর্য দিয়ে চক্ষু পূর্ণ করে দেয় আর কথা দ্বারা কান পূর্ণ করে দেয়।

তার এ সাহিত্যপূর্ণ কথা শুনে এক ব্যক্তি, এ কথাটি আবার বলার অনুরোধ করলে তিনি বললেন,

আমি তোমার সামনে আবার তা বললে, খোদার কসম সেখানে আমি ভুল করব না, কাউকে চুপ করিয়েও দিব না এবং কারো সাফাই বর্ণনা করব না।

ইলম শিক্ষার সম্পর্কে তিনি বলেন

এ ইলমে দ্বীন কেউই ধন এবং নফসের মর্যাদা দিয়ে অর্জন করতে পারবে। নফসের অসম্মান, দারিদ্রতা এবং ইলমের মর্যাদা করেই কৃতকার্য হতে পারবে।

মুফতি এবং মুজতাহিদ যদি ভুলও করে তবুও নেক নিয়তের কারণে আল্লাহর নিকট পূরস্কৃত হবে। ইমাম সাহেব বলেন

যে আলেম ফতোয়া দিবে সে ছাওয়াব পাবে। কিন্তু দ্বীনের ব্যাপারে ভুল। করার কারণে সে ছাওয়াব পাবে না। সে এ কারণে ছাওয়াব পাবে যে, যেখানে সে ভুল করেছে সেখানে তার নিয়ত সঠিক ছিল।।

কোন এক প্রসঙ্গে তিনি বলেন

মানুষের স্বভাব যমীন স্বরূপ এবং ইলম বীজ স্বরূপ। তলব (অন্বেষণ) দ্বারাই ইলম অর্জিত হয়। স্বভাব উপযুক্ত হলে ইলমের শস্য প্রস্ফুটিত হবে এবং তার অর্থ এবং মর্ম শাখা ছড়াবে।

একবার তিনি মাসয়ালার দলীল সম্পর্কে বলেন,

উত্তম দলীল সেটাই যার অর্থ স্পষ্ট হয়, যার মূল দৃঢ় এবং মজবুত হয় এবং যা শুনে শ্রোতার অন্তর আনন্দিত হয়।

আল্লামা মারজানী হানাফী (রহঃ) বলেন, ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) বলেছেন, এ ব্যাপারে সমস্ত মুসলমানগণ একমত যে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীছ কারো মন্তব্যের খাতিরে কখনো পরিত্যাগ করা যাবে না। 

ইমাম শাফেয়ী বলেছেন, আমার পিতা-মাতা হুজুর ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর কোরবান হোক। তাঁর কোন হাদীছ যদি প্রমাণিত হয়ে যায় তবে তা পরিত্যাগ করা বৈধ হবে না।

তিনি আরও বলেছেন, কেউ যদি আমার কিতাবে সুন্নতের পরিপন্থী কোন কথা পায় তবে সনতের উপরই আমল করা তার জন্য আবশ্যক। আমার কথাকে বর্জন করতে হবে।

হযরত শাহ ওলীউল্লাহ্ হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগা নামক কিতাবে লিখেছেন, ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ) কে বলেছেন যে, সহীহ হাদীছ সম্বন্ধে আপনি আমার চেয়ে অধিক জ্ঞাত। কাজেই যদি কোন সহীহ রেওয়ায়েত আপনার দৃষ্টিগোচর হয় তবে আপনি তা আমাকে অবগত করবেন যেন আমি তদানুসারে আমল করতে পারি।

ইমাম শাফেয়ী (রহঃ)-এর জীবনে এসব কথা নিছক মুখনিঃসৃত বাণী রূপেই ছিল না; বরং তা বাস্তবে রূপায়িত করে জগদ্বাসীকে দেখিয়ে দিয়েছেন। তিনি কোন বিষয়ে কোন সিন্ধান্তে উপনীত হওয়ার পরও তার বিপরীত যদি কোন সহীহ রেওয়ায়েত পাওয়া যেতো তবে তিনি তাঁর পূর্ব সিদ্ধান্ত পরিত্যাগ করতেন।

সমস্ত হাদীছ বিশারদ এবং ফিকবিদ তাঁকে পরম শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখতেন। তাঁর নীতিমালা এবং সিন্ধান্তকে মেনে নিয়েছেন। অসংখ্য মুহাদ্দিছ, ফকীহ, তফসীর-বিশারদ এবং বুযুর্গ তাঁকে অনুসরণও করেছেন।

ইমাম গাযযালী এবং ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী পরবর্তীদের মধ্যে ভাস্কর স্বরূপ। তাঁরাও ইমাম শাফেয়ী (রহঃ)-এর কিতাবের প্রতি অপরিসীম আস্থাবান ছিলেন। তারাও সেগুলোকে আদর্শের চোখে দেখতেন। তিনি বলেন, চতুষ্পদ জন্তুকে আদব শিক্ষা দেওয়া যতটুকু কঠিন মানুষকে রাজনীতি শিক্ষা দেওয়া তার চেয়েও অধিক কঠিন। কারণ, অজ্ঞরাও নিজদেরকে জ্ঞানী ভাবতে দ্বিধাবোধ করে না। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস তারাও জ্ঞানী। কাজেই কোন উপদেষ্টার উপদেশই তারা গ্রহণ করতে চায় না।

দৃষ্টিশক্তি যেমন এক জায়গায় গিয়ে ক্ষান্ত হয়ে যায় আর সামনের দিকে অগ্রসর হয় না দ্রুপ বিবেক-বুদ্ধিরও একটি সীমা রয়েছে। উক্ত সীমা পর্যন্ত গিয়ে সে থেমে যায়।

সৎস্বভাব, দানশীলতা, বিনয় ও কৃতজ্ঞতা মানুষের মধ্যে এ চারটি গুনের সমাবেশ থাকা আবশ্যক। এগুলোর সমাবেশ থাকলে মানুষ পরিপূর্ণ মনুষ্যত্ব লাভ করতে পারে।

যতটুকু সম্মানপ্রাপ্য আমি যদি তাকে এর চেয়ে অধিক সম্মান প্রদর্শন করি তবে তার দৃষ্টিতে আমি ততটুকু হেয় প্রতিপন্ন হব।

গম ব্যতীত যাঁতাকলের নিকট যাওয়া যেমন নিরর্থক, কাগজ-কলম ও দোয়াত ব্যতীত শিক্ষা মজলিসে যাওয়াও তদ্রুপ অর্থহীন। নির্লজ্জ ও মন্দকাজ কেয়ামতের দিন অনুতাপ ও অনুশোচনার কারণ হবে।

কেউ এমন ব্যক্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে, যে ব্যক্তি তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে না, সে নিজেকেই সবচেয়ে বেশী অবমাননা করল।

যে ব্যক্তি আমাকে চিনে না, তার প্রশংসা করা আমার জন্য অনর্থক কাজ বৈ আর কিছুই নয়।

হালাল জীবিকা অর্জন, পরহেজগারী বা খোদাভীরুতা এবং সর্বাবস্থায় খোদার উপর ভরসা রাখা এ সবের মধ্যে দুনিয়া ও আখেরাতের মঙ্গল নিহিত রয়েছে।

যে ব্যক্তি না বুঝে জ্ঞান অর্জন করে নেয়, সে ব্যক্তি যেন অন্ধকার রাত্রিতে লাকড়ির বোঝা বেঁধে নিল এবং সে বোঝা হতে কোন সর্প তাকে দংশন করল।

আলেমদের জন্য তাকওয়া বা খোদাভীরুতা অলংকার স্বরূপ। সৎস্বভাব তাদের পরিচ্ছদ স্বরূপ। যে ব্যক্তির মধ্যে ইলমের প্রতি ভালবাসা নেই তার মধ্যে কোন মঙ্গল নেই। তাদের সাথে সম্পর্ক রাখা তো দূরের কথা; তাদের সাথে পরিচয়ও না থাকা চাই।

সবাইকে সন্তুষ্ট রাখা খুব কঠিন ব্যাপার। কাজেই, মানুষের কর্তব্য আল্লাহর সাথে সুগভীর সম্বন্ধ রাখা এবং অপর কারো প্রতি বিন্দুমাত্রও ভরসা না করা।

যাকে রাগান্বিত করা হয় অথচ সে রাগান্বিত হয় না সে ব্যক্তি গাধার মত আর যাকে সন্তুষ্ট করলেও সন্তুষ্ট হয় না সে শয়তান।

আল্লাহ তাআলার ইবাদত না করা একে তো চরম গোনাহ আবার বেদআতও বটে। কোরআন শিক্ষা করলে মানুষের মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং ফিক দ্বারা তার সম্মান বৃদ্ধি পায়। আর হাদীছ দ্বারা দলীল প্রমাণ শক্তিশালী হয়।

ইলম লাভ করার পরও যে ব্যক্তি পাপ হতে বিরত থাকে নাই ইলম তার কোন মঙ্গল সাধন করতে পারে নাই।

যে ব্যক্তি তোমার নিকট অপরের কুৎসা ও বদনাম রটনা করে সে ব্যক্তি অপরের নিকট তোমার বদনাম গেয়ে বেড়াবে।

যে ব্যক্তি বন্ধুত্বের সময় তোমার এমন গুণের প্রশংসা করবে যা তোমার মধ্যে নেই; সে ব্যক্তি শত্রুতার সময় তোমার এমন দোষের কথা বলে বেড়াবে যা তোমার মধ্যে নেই।

ভাল এবং মন্দের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ার পর যে ব্যক্তি সুপথ বেছে নিতে পারে সে ব্যক্তি বুদ্ধিমান। 

আমি যদি কোন সত্য কথা ও দলীল কারো সম্মুখে পেশ করি তিনি যদি তা কবুল করে নেন, তবে এতেও আমার অন্তরে একটি প্রভাব পড়বে এবং তার প্রতি আমার ভালবাসা জন্মাবে।

আর কেউ যদি সত্য বিষয়েও অহেতুক আমার সাথে তর্কে লিপ্ত হয় তাহলে আমার কাছে তার মর্যাদা ও ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়।

অভাবের সময় দান করা, নির্জনে খোদাকে ভয় করা বা যার নিকট হতে কোন কিছু আশা করা হয় কিংবা যাকে ভয় করা হয় তার সাথে অধিক সত্য কথা বলা- এ তিনটি কাজ খুবই কঠিন ব্যাপার।

ইলম মুক্ত মনিব। তালেবে-ইলম তার দাস। দাস যদি খিদমত করে তবে মনিবের মন পেতে পারে। আর দাস যদি মনিবের সাথে অভিমান করে তবে, মনিবকে সে অধিক অভিমানী পাবে।

বুদ্ধিমানের পরিচয় হল তার বুদ্ধি তাকে মন্দকাজ হতে বিরত রাখে। কোন কাজ অতি দ্রুত সম্পন্ন করতে চাইলে তার সুফল হতে বৃঞ্চিত থাকতে হয়। সুফল আনয়নে ধীর-স্থিরতা অতি সহায়ক। 

সৎ লোকের সাহচর্য সৎ কাজের প্রতি এবং মন্দ সাহচর্য মন্দ কাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে থাকে।

যিনি প্রকৃতপক্ষে মানবতার দাবী আদায় করেন তিনি মন্দকাজ হতে বিমুক্ত হয়েছেন। তাঁর পাপ ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়।

বুদ্ধিহীনরা স্বজাতীর চেয়ে বিজাতীদের অধিক সম্মান দেখিয়ে থাকে। কপটতা দ্বারা সে বিজাতীয় লোকদের অন্তর জয় করতে চায়। অথচ তা সম্পূর্ণ অসম্ভব।

আল্লাহ তাআলা তোমাকে স্বাধীন করে সৃষ্টি করেছেন। কাজেই, স্বাধীন থাকাই তোমার কর্তব্য। স্বীয় বন্ধুকে নির্জনে উপদেশ দান করা এবং বুঝিয়ে দেয়া ভদ্রতার মধ্যে শামিল। এটাই দোষ সংশোধনের গুপ্ত রহস্য। সকলের সম্মুখে তাকে উপদেশ দান করা তার সম্মানহানী এবং দূর্ণাম করারই নামান্তর।

বিনয় সৌজন্যের পরিচায়ক। অভিশপ্ত লোকেরাই অহঙ্কার ও গর্ব করে থাকে। কেউ যদি আকাঙ্খা করে যে, মানুষ তার নিকট আমানত রাখুক তবে বুঝতে হবে হয়ত সে চোর না হয় বোকা।

তোমার উপর যদি অনেক কাজের দায়িত্ব অর্পিত হয় তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি আগে শুরু করবে।

যারা দুনিয়া লোভী তাদের দুনিয়াদারদের দাস বলতে হয়। অল্পে তুষ্ট লোকের কারো নিকট কিছু প্রার্থনা করতে হয় না। এজন্য তারা মানুষের কাছে বেপরোয়া ও অপ্রত্যাশী থাকে।

খোদার হিকমতের আলো যে দেখতে চায় সে যেন বোকাদের সংশ্রব ত্যাগ করে। নির্জনতা অবলম্বন করে। ঐ সমস্ত আলেম থেকেও দূরে থাকবে যারা আদব, তমীজ এবং ধর্মহীন। 

সাবধান! তোমার জিহবা হতে যেন একটিও অনাবশ্যক কথা বের না হয়। কোন একটি কথা তোমার মুখ দিয়ে বের হয়ে গেলেই তুমি তার নিকট পরাস্ত হয়ে গেলে। সে আর তোমার অধীনে থাকবে না। 

জ্ঞানীদের নিকট মূর্খরা মূখের চেয়ে অধিক কিছু নয়। পক্ষান্তরে মূখদের নিকট জ্ঞানীরা মূর্খরূপে পরিগণিত হয়।

এটা কি জ্ঞানের কম বৈশিষ্ট্য যে, মূর্খরাও জ্ঞানের দাবী করে থাকে। আর মূখতার চেয়ে অধিক গর্হিত বিষয় আর কি হতে পারে যে মূখেরাও মূর্খতাকে অস্বীকার করে থাকে। এজন্যই তাদেরকে মূর্খ বললে রেগে জ্বলে উঠে।

দানশীলতা তোমাকে দুনিয়া ও আখেরাতে স্বীয় বেষ্টনীতে হেফাজত করবে।

অন্তর জিহ্বার জন্য ক্ষেত স্বরূপ। এতে উত্তম কথা বপন কর। সবগুলো চারা যদি নাও জন্মায়, তবে কিছু কিছু চারারূপে অবশ্যই গজিয়ে উঠবে।

জিহবা হতে যে কথা বের হয়, তা হতে পারে পাথরের চেয়ে শক্ত সূঁচ এর চেয়ে অধিক বেদনাদায়ক, অম্লের চেয়ে অধিক তিক্ত এবং তলোয়ারের চেয়ে অধিক তীক্ষ্ম। কাজেই অতি সতর্কতার সাথে জিহবা পরিচালনা করবে।

যদি অপরিপক্ক লোক রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চায় তবে তাকে পদে পদে লাঞ্চিত হতে হবে। যে ব্যক্তি এর আকাঙ্খা করে তার নিকট হতে এটা পলায়ন করে।

দীর্ঘ জীবন, স্বচ্ছলতা ও তীক্ষ্ম মেধা এগুলো তালেবে ইলমের জন্য অপরিহার্য গুণ।

ইলম প্রকৃতপক্ষে দু’প্রকার। আত্মার ইলম এবং দেহের ইলম। ইলমে দ্বীন আত্মার ইলম এবং চিকিৎসা শাস্ত্র দেহের ইলম। ইলম অর্জন করা নফল নামায পড়ার চেয়ে উত্তম।

কাব্যনিপুনতা

কবি হিসাবেও ইমাম মুহাম্মদ বিন ইদ্রীস শাফেয়ী (রহঃ) এর যথেষ্ট খ্যাতি ছিল। তবে তিনি খুবই সতর্কতার সাথে কবিতা রচনা করতেন। যেহেতু কাব্য ছিল আরববাসীদের প্রকৃতিগত গুণ তাই কাব্য ছিল ইমাম শাফেয়ী (রহঃ)-এর জন্য অতি সহজ ব্যাপার। তিনি অনায়াসে কবিতা রচনা করতে পারতেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে কবিসূলভ সকল গুণই দান করেছেন।

আব্বাস আজরাক নামক জনৈক কবি ইমাম সাহেবের খিদমতে এসে বলল, হে আবু আব্দিল্লাহ! আমি কবিতার কয়েকটি পংক্তি আবৃত্তি করছি। আপনিও তদনুরূপ কয়েকটি পংক্তি যদি আবৃত্তি করতে পারেন তবে আমি কবিত্ব ত্যাগ করব। এরপর কবি কয়েকটি পংক্তি আবৃত্তি করল যার সারমর্ম হচ্ছে, এই শত্রুর সাথে সংগ্রাম ব্যতীত আমার মধ্যে আর কোন সাহস বাকী নেই। যমানা পুরাতন হয়ে গিয়েছে। কিন্তু আমার সাহস পুরাতন হবার মত নয়। মানুষের দৃষ্টি ধনীদের মধ্যে সীমিত হয়ে গিয়েছে। বুদ্ধি এবং বোকামীর পার্থক্য বুঝার ক্ষমতা তাদের মধ্যে নেই। সাহসিকতা যদি সম্পদের উৎস হত তবে তা আমাকে আকাশের কিনারায় পৌঁছিয়ে দিত।

এর প্রত্যুত্তরে ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) কবিতা আকারে যা বললেন, তার সারমর্ম হচ্ছে এই

যাকে আল্লাহ তাআলা বিশেষ কোন ক্ষমতা দিয়েছেন সে যদি এজন্য কোন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করে এবং আল্লাহ তাআলার শোকর আদায় না করে তবে সে দুর্ভাগা। হতভাগারা বন্ধ দুয়ারগুলো খুলে দেয়। আর সৌভাগ্যবানেরা তাকে প্রত্যেক দরজার নিকটে পৌঁছিয়ে দেয়। কাজেই তুমি যদি শুনতে পাও যে, কোন সৌভাগ্যবান ব্যক্তি একটি শুষ্ক কাষ্ঠ হাতে নিয়েছে এবং তা তার হাতের সংস্পর্শে এসে তলোয়ারে পরিণত হয়ে গেছে তবে তা বিশ্বাস করবে। আর যদি শুনতে পাও যে কোন হতভাগা পানি পান করতে গিয়ে পানিতে ডুবে মারা গেছে তবে তাও তুমি নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করে নিবে।

আব্বাস আজরাফ এ সমস্ত কবিতা শুনে বিস্ময়ের সাথে বললেন, এগুলো কি কবিতা না অমৃতবাণী? অতঃপর তিনি ইমাম শাফেয়ী (রহঃ)-এর কৃতিত্ব স্বীকার করতঃ প্রকাশ মুখর হয়ে প্রস্থান করেন।

ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) মিশর গমন করলে সেখানকার অধিবাসীরা তাঁকে খুব সম্মান দেখান। তারা ছিল ইমাম মালেক (রহঃ)-এর পরম ভক্ত। কোন কোন মাসয়ালায় যখন ইমাম মালেক (রহঃ)-এর সাথে তাঁর মতবিরোধ দেখা দিল তখন ইমাম শাফেয়ী (রহঃ)-এর ভক্তিতে ভাটা দেখা দিল। এতে তিনি একটি কবিতা রচনা করলেন। যার সারমর্ম হচ্ছে,

উলুবনে মুক্তো ছড়ানো বুদ্ধিমত্তার পরিচয় নয়। আল্লাহর দয়ায় কোন জ্ঞানী ব্যক্তি যদি সে পথের পথিক হন তখন হয়ত সে মুক্তা দ্বারা সমাদৃত হবে। নচেৎ নিষ্ফলে যাবে। মুখকে যে ইলম শিক্ষা দেওয়া হয়, সেই ইলম বিফলে যায়।

নবী পরিবারের প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধা প্রকাশ করে একটি কবিতা পাঠ করেন। তার অর্থ হচ্ছে এই

হে নবী বংশ! আপনাদের প্রতি ভালবাসা প্রদর্শন করা কালামুল্লাহ দ্বারা প্রমাণিত। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি যে ব্যক্তি দুরূদ পাঠ করে না তার নামায কবুল হয় না। আমি প্রকাশ্যেই বলছি যে, নবী বংশের প্রতি ভক্তি প্রদর্শন করলে যদি মানুষ রাফেযী হয়ে যায়, বিশেষ করে হযরত আলী (রাঃ)-এর প্রতি ভক্তি প্রদর্শনের কারণে আমি যদি রাফেযী আখ্যা পাই; সিদ্দীকে আকবরের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করলে কেউ যদি আমাকে অন্য কিছু আখ্যা প্রদান করে তবে আমি এসব কিছু স্বতঃস্ফুর্ত মেনে নিলাম। আর এ বিশ্বাস নিয়ে আমি কবরে চলে যেতেও রাজী আছি। একে আমি নিজের জন্য সৌভাগ্য মনে করি। 

অন্য এক কবিতায় তিনি লিখেছেন,

যিনি পরহেজগার ও বুদ্ধিমান, তাঁর নেকী তাকে মানুষের কুৎসা রটনা হতে এভাবে ফিরিয়ে রাখে যেমন কঠিন পীড়া কোন রোগীকে অন্যান্য রোগীর রোগ সম্বন্ধে উদাসীন করে রাখে। হিংসুক আমার দৃষ্টির বাইরে চলে গেলে কুৎসা ও নিন্দা বর্ণনা করতে থাকে। আর সে যখন আমার সম্মুখে আসে তখন আমার ভূয়সী প্রশংসা শুরু করে দেয়। 

যে ব্যক্তি নিজের সম্মান নিজে বুঝে না আল্লাহর ভয় তার অন্তরে স্থান লাভ করে না। লোক লজ্জা যার নেই তার অধঃপতন অনিবার্য। 

হে আমার মন! আমার নিকট যদি একদিনেরও জীবিকা থেকে থাকে তবে জীবিকা নির্বাহের জন্য কোন প্রকার চিন্তা করো না। আগামীকাল আমার আহার

কি হবে সে চিন্তা আমি করি না। কারণ আমি জানি, আগামীকালের জন্য নতুন জীবিকা রয়েছে। আল্লাহর মর্জিতেই আমি পরিতুষ্ট। আমার সকল ইচ্ছাকে তার ইচ্ছার সামনে বিলীন করে দিয়েছি।

সমভাবাপন্ন ভাইদের সাথে আমি মানবতা রক্ষা করে থাকি। তাদের সাথেও মানবতা রক্ষা করে থাকি যারা আমার সৎকাজগুলোকে পছন্দ করে মহৎ জীবন-যাপনে আমাকে সাহায্য করে। আমার মৃত্যুর পরও আমাকে স্মরণ করে। স্বীয় স্বার্থে আমি ভাই বন্ধুদের অনুসন্ধান করেছি। কিন্তু এমন ভাই বন্ধু খুব কম পেয়েছি যারা সংকট সময়ে সাহায্য করবে। এমনটি যদি পেতাম তাহলে আমার সমস্ত সম্পদ তার জন্য উৎসর্গ করে দিতাম।

হে দুনিয়ার ধোকা ও প্ররোচনা কবলিত লোকেরা! তোমরা স্মরণ রেখো যে, বাড়ী এবং বাড়ী প্রস্তুতকারী কালে উভয়কেই ধ্বংস করে দিবে। দুনিয়ার গৌরব এবং জাঁকজমক যাদের নিকট পছন্দনীয় তাদের জেনে রাখা উচিৎ এ গৌরব শীঘ্রই নিঃশেষ হয়ে যাবে। স্মরণ রেখো! দুনিয়ার ভাণ্ডার পূর্ণ হয়ে থাকে সোনা-রূপা দ্বারা কিন্তু তোমার হৃদয় ভাণ্ডারকে ভরতে হবে ঈমান ও আমল দ্বারা। 

যখন তুমি কারও সঙ্গে সফরে বের হও তখন সফরসঙ্গীদের সাথে ভ্রাতৃসুলভ আচরণ করো। জ্ঞানী এবং বুদ্ধিমান ব্যক্তি নিজের দোষত্রুটির উপর কড়া দৃষ্টি রাখে। সে স্বীয় সাথীদের দোষত্রুটিও গোপন রাখতে সচেষ্ট হয়।

তুমি সবার দোষ প্রচার করে বেড়াবে তা কখনো কাম্য নয়। বরং তাদেরকে সৎপথে পরিচালনা করতে চেষ্টা করবে। তুমি যদি তাদের দোষ প্রচার করতে থাক তবে তোমার বন্ধু বান্ধবের সংখ্যা হ্রাস পেয়ে যাবে। অতএব এমন সময় আসবে যখন তোমার পাশে একজন বন্ধুকেও দেখতে পাবে না। লোভকে পরাজিত করে আমি প্রশান্তি অনুভব করেছি। লোভ লালসা যতই বৃদ্ধি পেতে থাকবে লাঞ্চিত হবার আশংকাও ততই বৃদ্ধি পেতে থাকবে। অল্পে তুষ্ট মানুষের সংখ্যা অতি নগন্য। অল্পে তুষ্টিকে আমি স্বাগত জানিয়েছি। এটাই আমার জীবনকে গৌরবান্বিত করেছে। লোভ যখন মানুষের অন্তরে স্থান পেয়ে যায় তখন প্রতিদিনই লাঞ্চিত ও অপমানিত হতে থাকে।

নির্জনবাসের সময় কখনো ভেবো না যে, তুমি একাকী রয়েছ। বাস্তব সত্য হলো এই যে, প্রত্যেকের উপরই একজন পরিদর্শক রয়েছেন। মূহুর্তের জন্যও অন্তরে এ কথা স্থান দেওয়া বৈধ হবে না যে, আল্লাহ তোমার সম্বন্ধে উদাসীন রয়েছেন। তাঁর নিকট কোন পাপ বা দোষ মোটেই গোপনীয় নয়।

আল্লাহর কসম! মানুষ যখন গাফেল থাকে তখন প্রতি পদে পদে পাপ তাকে পরাস্ত করে ফেলে। হায় আফসোস! আল্লাহ যদি আমার পাপকে ক্ষমা করে আমার তওবা কবুল করে নিতেন, তবে কতইনা আনন্দবোধ করতাম।

কালের বায়ু যদি তোমার অনুকূলে প্রবাহিত হতে থাকে তবে তুমি তা পরম সৌভাগ্য বলে মনে করবে। সব প্রচেষ্টারই একদিন সমাপ্তি ঘটবে। তাই ভাল কাজ করতে মোটেই অলসতা করো না। তোমার সময় কখন শেষ হয়ে যাবে তা কেউ বলতে পারে না। 

তুমি নিজেও যখন কোন বিষয়ে জ্ঞাত নও, জ্ঞাত ব্যক্তিদের নিকটও জিজ্ঞাসাবাদ করনা, এমতাবস্থায় তোমার জানার বা বুঝার কোন উপায় নেই। তুমি যদি জ্ঞাত থাকতে বা জানার চেষ্টা করতে তবে জেনে শুনে কখননা জ্ঞানীদের বিরোধিতা করতে না।

সৌভাগ্যশীলদের অনেক প্রশংসা করা হয়ে থাকে। এমন কি তার মধ্যে যে গুণ নেই সেগুণের জন্যও তার প্রশংসা করা হয়। আর দুর্ভাগা ও হতভাগাদের যদি কোন দোষ পরিলক্ষিত হয়, তবে সে করে নাই এমন হাজারো দোষ তার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়।

রচনাবলী

ইমামদের মধ্যে যারা অনেক কিতাব রচনা করেছেন ইমাম শাফেয়ী তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য একজন। অল্প বয়সেই তিনি উছুলে ফিকাহশাস্ত্রে ‘কিতাবুল উম্ম’ এর মত গুরুত্বপূর্ণ কিতাব রচনা করেন। তীর নিক্ষেপ এবং ঘোড় সওয়ারী সম্পর্কিত বিষয়েও সে সময়েই কিতাব লিখেন। অনেক বড় বড় কবি ও সাহিত্যিক তাঁর রচনাশৈলীর স্বীকৃতি দিয়েছেন। অবশ্য ইমাম সাহেবের মর্যাদা এরও অনেক উর্ধ্বে। জাহেয বলেন,

আমি ইমাম শাফেয়ীর কিতাব দেখেছি। সেগুলো যেন গ্রথিত মোতি। এর চেয়ে সুন্দর রচনা আমি আর দেখিনি।

ইবনে নদীম লিখেন, ফিকাহ শাস্ত্রে ইমাম সাহেবের একটি বিস্তৃত কিতাব রয়েছে। এ কিতাবটি তাঁর নিকট থেকে রবী বিন সুলাইমান এবং যাফরানী রেওয়ায়েত করেছেন। এ কিতাবটিতে অমুক অমুক অধ্যায় রয়েছে। এতে প্রায় একশ চারটি অধ্যায়ের নাম উল্লেখ করেন। এ সবগুলোর সমষ্টির নাম ‘কিতাবুল উম্ম’। এছাড়া মুসনাদে শাফেয়ী এবং তাঁর রচিত আরো বহু কিতাব রয়েছে।

বিভিন্ন শাস্ত্রে ইমাম সাহেবের পাণ্ডিত্য 

ইমাম মুহাম্মদ বিন ইদ্রীস শাফেয়ী (রহঃ) দীর্ঘ বিশ বৎসর যাবৎ ভাষা নিয়ে সাধনা করেন। মুবাররদ ছিলেন ভাষাবিদ ও সাহিত্য-বিশারদ। তিনি ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) সম্পর্কে বলেন, ভাষা সম্বন্ধে ইমাম শাফেয়ীর জ্ঞান অপরিসীম এবং তা প্রমাণ ও দলীল স্বরূপ।

সাহিত্য-বিশারদ হাফেজ বলেন, ইমাম শাফেয়ীর লেখার চেয়ে সারগর্ভ লেখা আমি আর কারো দেখি নাই। তাঁর লেখার ধারা ছিল চমৎকার। তাকে অমৃতবাণী বললেও অত্যুক্ত হবে না। 

আবুল আব্বাস বলেন, ইমাম শাফেয়ীকে শব্দকোষ বলা যেতে পারে। তাঁর লিখার ভঙ্গিমা এত চমৎকার যে তা পড়লে শব্দের মর্ম এবং উদ্দেশ্য উপলদ্ধি করতে কোন অসুবিধা হয় না।

ইমাম আবু মনসুর যিনি ভাষার উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। তিনি বলেন, এ সম্বন্ধে ইমাম শাফেয়ীর জ্ঞানের গভীরতা প্রগাঢ়। তিনি ইমাম শাফেয়ীর প্রচলিত শব্দ সম্বন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তা কিতাবরূপে পরিচিতি লাভ করেছে। তা বর্ণনা করেছেন ইমাম শাফেয়ী; যিনি ভাষা ও সাহিত্য জগতে অদ্বিতীয় লোক ছিলেন।

আইয়ামে জাহেলিয়াতের কবিতা তাঁর চেয়ে অধিক আর কেউ অবগত ছিলেন না। 

আবু সুলাইমান ভাষা সম্বন্ধে যথেষ্ট জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। তিনি ইমাম শাফেয়ীর একজন প্রিয় এবং প্রসিদ্ধ ছাত্র ছিলেন। তিনি বলেন, ইমাম সাহেবের ভাষা ছিল অত্যন্ত মধুর এবং লেখা ছিল হৃদয়গ্রাহী। তাঁর প্রকাশভঙ্গীও ছিল তুলনাহীন।

আরবী ভাষা ও সাহিত্যের জ্ঞানধারা ছিলেন আল্লামা যমখশরী। তিনি বলেন, ইমাম শাফেয়ী আলেমদের শিরোমনি ছিলেন। তিনি শরীয়তের আলেম এবং মুজতাহিদদের অনুসৃত নেতা ছিলেন। তাঁর লেখা পড়েই বুঝা যেতো যে, এটা ইমাম শাফেয়ীর লিখা। তিনি কোথা হতে কথা বলেন তা চিন্তা করেও বুঝা যেত না। তার লিখা বা বলায় কখনো কোন ভুল হতো না। আরবী ভাষায় তাঁর অসাধারণ দক্ষতা ছিল। তিনি জ্ঞান-সমুদ্র। ভাষার কোন কিছু তার অজানা ছিল না।

ইমাম রাযী বলেন, ভাষাবিদগণ এতে একমত যে, ইমাম শাফেয়ী এ শাস্ত্রের নেতা। হাতেমের দানশীলতা, হযরত আলী (রাঃ)-এর বীরত্বের ন্যায় ইমাম শাফেয়ীর ভাষা, সাহিত্য ও ব্যাকরণ শাস্ত্রের জ্ঞান সর্বজন গৃহীত ও মান্য।

আরবী সাহিত্যকে যদি আরবের ইতিহাস বলা হয় তবে তা ভুল হবে না। কারণ আরবের অজ্ঞযুগের কবিতাবলী পাঠ করলে আরবের ইতিহাস জানার কিছুই বাকী থাকবে না। ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) আরবী সাহিত্যে যথেষ্ট প্রজ্ঞা অর্জন করেন। এর ফলশ্রুতিতে তাকে নির্দ্বিধায় একজন আরব ইতিহাসবিদ বলা যেতে পারে। জনৈক বিজ্ঞলোক বলেছেন, ইমাম শাফেয়ী আরবের ইতিহাস সম্বন্ধে সবচেয়ে অধিক জ্ঞাত ছিলেন। 

ইমাম শাফেয়ী এবং ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ)-এর মধ্যে তর্কযুদ্ধ হয়েছিল। খলীফা হারুনুর রশীদের নিকট সে সংবাদ পৌঁছলে তিনি ইমাম শাফেয়ীকে ডেকে কোরআন-হাদীছ সম্বন্ধে অনেক প্রশ্ন করেন। ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) সেগুলোর. সন্তোষজনক উত্তর দিলেন। অতঃপর খলীফা তাঁকে আরবী সাহিত্য ও ভাষা সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি জবাবে বললেন, আরবের মাটি থেকেই আমাদের জন্ম। এর ভাষা আমাদের রক্ত মাংসের সাথে বিজড়িত।

তিনি একজন স্বনামধণ্য চিকিৎসক ছিলেন। জালিনুস এবং অন্যান্য চিকিৎসকদের বই পুস্তক অতি মনোযোগ সহকারে অধ্যায়ন করেন। তিনি বলতেন, মানুষের দেহ ও আত্মা রয়েছে। কাজেই জ্ঞানও দু’প্রকার। ধর্মীয় জ্ঞান ও চিকিৎসা জ্ঞান। তিনি প্রায়ই আক্ষেপ প্রকাশ করে বলতেন, মুসলমানগণ চিকিৎসাশাস্ত্র পরিত্যাগ করে দিয়েছে। তারা ধর্মীয় জ্ঞান হাতে রেখে ইয়াহুদী এবং নাসারাদের অর্ধেক জ্ঞান দিয়ে দিয়েছে। তিনি বলতেন, যে শহরে কোন আলেম কিংবা চিকিৎসক নেই, সে শহরে বসবাস করাও পাপ। তৎকালীন সময়ে যমানায় তাঁকে সর্বশ্রেষ্ঠ চিকিৎসক হিসাবে গন্য করা হত।

মৃত্যু

ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) ১৫০ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ২০৪ হিজরীর রজবের শেষদিন বৃহস্পতিবার (দিবাগত শুক্রবার রাত্রে) মিশরে ইন্তিকাল করেন। তখন তার বয়স ছিল চুয়ান্ন বৎসর। ইমাম সাহেবের অছিয়ত অনুসারে অসুস্থতার সময় তাঁকে আব্দুল্লাহ বিন আব্দিল হাকামের বাড়ীতে রাখা হয় এবং সেখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর ছেলেরাই দাফন-কাফন করেন এবং মিশরের আমীর তার জানাযার নামায পড়ান। মুকাত্তাম পাহাড়ের নিকট ‘কারাফায়ে ছোগরা’ নামক স্থানে তাকে সমাহিত করা হয়।

রবী বিন সুলাইমান মুরাদী বলেন, দাফন শেষে ফিরে আসার পথে আমি শাবানের চাঁদ দেখেছি। রাত্রে ইমাম সাহেবকে স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহ তাআলা আপনার সাথে কিরূপ ব্যবহার করেছেন। তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলা আমাকে নূরের কুর্সীতে (চেয়ারে) বসিয়েছেন।

ইমাম সাহেবের পুত্র উছমান বলেন, মৃত্যুর সময় আমার পিতার বয়স ছিল আটান্ন বৎসর।

রবী বর্ণনা করেন, ইমাম সাহেবের ইন্তিকালের পর আমরা দরসী হালকায় বসা ছিলাম। এক গ্রামীন লোক এসে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করল, এ হালকার চন্দ্র-সূর্য কোথায়?

আমরা বললাম, তাঁর মৃত্যু হয়ে গেছে। এ কথা শুনে সে অঝোরে কাঁদল এবং এ কথা বলে চলে গেল।

আল্লাহ তা’আলা তাঁকে দয়া করুক এবং ক্ষমা করুক। কত সুন্দরভাবে দলীলের সমস্যাগুলো তাঁর বয়ান দ্বারা বিশ্লেষণ করে দিতেন। তাঁর প্রতিপক্ষকে স্পষ্ট দলীল দ্বারা পথ দেখাত। (হেদায়েত করত) লজ্জিত মুখমণ্ডল থেকে অপমান ধুয়ে ফেলতেন। ইজতেহাদ দ্বারা মাসয়ালার রুদ্ধদ্বার খুলে দিতেন।

সন্তান-সন্ততি

ইমাম সাহেবের সন্তান-সন্তুতি সম্পর্কে ইবনে হযম লিখেন, তাঁর দুটি পূত্র ছিল। একজন আবু হাসান মুহাম্মদ যিনি কুন্নাসরীন এবং আওয়াছেম এর কাযী ছিলেন। তার কোন সন্তান ছিল না। দ্বিতীয়জন উছমান। ইনি ইমাম আহমদ বিন হাম্বল থেকে শিক্ষা লাভ করেন। তিনিও নিঃসন্তান ছিলেন। সুবকী ‘তবাকাতে শাফেয়ীয়া’ কিতাবে লিখেন, ইমাম সাহেবের দু’পুত্র ছিল। একজন কাযী আবু উছমান মুহাম্মদ, অপরজন আবুল হাসান মুহাম্মদ। আবু উছমান সবার বড় ছিলেন। ইমাম সাহেবের মৃত্যুর সময় তিনি মক্কায় ছিলেন। তিনি তার পিতা, সুফিয়ান বিন উয়াইনা, আব্দুর রাযযাক এবং আহমদ বিন হাম্বল থেকে হাদীছ রেওয়ায়েত করেন। জযীরা এবং অন্যান্য স্থানের কাযী ছিলেন। হলবেও তিনি কাযী ছিলেন। তার তিন সন্তান ছিল। আব্বাস, আবুল হাসান বাল্যকালেই মারা যায় এবং কন্যা ফাতেমা। তার কোন সন্তান নেই। আবু উছমান ২৪০ হিজরীতে জয়ীরায় মৃত্যুবরণ করেন। দ্বিতীয় ছাহেবজাদা আবুল হাসান মুহাম্মদ ‘দানানীর’ নামক দাসীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাল্যকালেই তার পিতা অর্থাৎ ইমাম সাহেবের সাথে মিশর আগমন করেন। সেখানেই ২৩১ হিজরীর শাবান মাসে মৃত্যুবরণ করেন। যয়নাব নাম্নী ইমাম সাহেবের এক কন্যা ছিল। তার গর্ভে আবু মুহাম্মদ, আহমদ বিন মুহাম্মদ বিন আব্দিল্লাহ বিন আব্বাস, উছমান বিন শাফে জন্মগ্রহণ করেন।

তিনি তার পিতার মাধ্যমে তার নানা ইমাম শাফেয়ী থেকে হাদীছ বর্ণনা করেন। বলা হয়, শাফেয়ীর বংশে ইমাম সাহেবের পর তার মত অন্য কোন আলেম জন্ম নেয়নি। তিনি তার নানার বরকত পেয়েছিলেন।

ইমাম শাফেয়ী (রহঃ)-এর জন্য হুযুর (সাঃ)-এর শাফায়াত

আল্লামা ইবনুল জাওজী স্বীয় স্বপ্ন বর্ণনা করে বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নযোগে দেখতে পেয়ে আরজ করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার চাচার বংশধরের মধ্যে মুহাম্মাদ বিন ইদ্রীস শাফেয়ী মৃত্যুবরণ করেছেন। হুযুরের শাফায়াত কি তার নসীব হয়েছে?

হুজুর ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি আল্লাহর কাছে এ বলে আরজ করেছি যে, হে বিশ্ব প্রতিপালক! হে জগৎস্বামী! মুহাম্মদ বিন ইদ্রিস শাফেয়ীকে বিনা হিসাবে ক্ষমা করে দাও।

আমি আরজ করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি তাঁর কোন আমলের বদৌলতে এরূপ শাফায়াৎ করেছেন?

হুজুর ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, শাফেয়ী আমার উপর এমন দরূদ পাঠ করত যা অন্য কেউ কখনও পাঠ করে নাই। আমি আরজ করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! এটি কোন দরূদ? হুজুর ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সেটি হচ্ছে এই দরূদ,

হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি রহমত বর্ষণ করুন। যখন স্মরণকারীরা তাঁকে স্মরণ করে। তাঁর প্রতি রহমত বর্ষণ করুন যখন গাফেলরা তাঁর থেকে গাফেল থাকে।

লিখা সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য:

এই ইতিহাস সংগ্রহ করা হয়েছে “চার ইমামের জীবনী” গ্রন্থ থেকে। বইটি লিখেছেন, মাওলানা মতিউর রহমান, জামেয়া আরাবিয়া ফরিদাবাদ, ঢাকা। এটি প্রকাশ করেছে, মোহাম্মদী লাইব্রেরী, চকবাজার ঢাকা। এখানে আমার কোন মন্তব্য, তথ্য সংযোজন কিংবা বিয়োজন করা হয়নি।

Tags: জীবনী
Previous Post

স্ন্যাক লিলি Snake lily দেখতে অপূর্ব

Next Post

ইমাম মালেক বিন আনাস আছবাহী (রহঃ)

Discussion about this post

নতুন লেখা

  • জ্বালানী তেল যেভাবে তৈরি হয়
  • শাহ পদবীটা বিরাট অদ্ভুত
  • তীর তথা ক্ষেপণাস্ত্র শক্তিতে বলিয়ান হতে স্বয়ং রাসুল (সাঃ) নির্দেশ দিয়েছেন।
  • তসবিহ দানা বৃত্তান্ত!
  • হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী দেওবন্দি ও বেরেলভী আকিদার সূত্রপাত

এই সপ্তাহের জনপ্রিয় লেখা

No Content Available

নজরুল ইসলাম টিপু

লেখক পরিচিতি । গাছের ছায়া । DraftingCare

Facebook Twitter Linkedin
© 2020 Nazrul Islam Tipu. Developed by Al-Mamun.
No Result
View All Result
  • মুলপাতা
  • ধর্ম
    • ইসলাম
    • কোরআন
    • হাদিস
    • ডায়েরি
    • জীবনী
  • সাহিত্য
    • গল্প
    • রচনা
    • প্রবন্ধ
    • রম্য রচনা
    • সামাজিক
  • পরিবেশ
    • উদ্ভিদ জগত
    • প্রাণী জগত
    • ভেষজ হার্বাল
    • জলবায়ু
  • শিক্ষা
    • প্রাতিষ্ঠানিক
    • মৌলিক
    • ইতিহাস
    • বিজ্ঞান
    • ভ্রমণ
    • শিশু-কিশোর
  • বিবিধ
    • ঘরে-বাইরে
    • জীবন বৈচিত্র্য
    • প্রতিবেদন
    • রাজনীতি
    • তথ্যকণিকা
  • লেখক পরিচিতি

© 2020 Nazrul Islam Tipu. Developed by Al-Mamun.