জ্বালানী তেলের মুল উপাদান খনি থেকে তোলা হয়। এটা দেখতে ঘন আলকাতরার মত। কুয়েতের উপকুলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে, বিশাল আলকাতরার কাল পাতন মাটির উপরে ভেসে থাকত। মানুষের চলাফেরায় কষ্ট কত।
কুয়েতের বিখ্যাত বুরগান তেলক্ষেত্র, আবিষ্কারের আগে সেখানকার মানুষ একটি নির্দিষ্ট জায়গাকে ‘কালো পাহাড়’ বা ‘পিচের স্তূপ’ হিসেবে চিনত। সেখানে ক্রুড অয়েল বালুর সাথে মিশে এতটাই শক্ত হয়ে গিয়েছিল যে স্থানীয় যাযাবর বা বেদুইনরা সেই শক্ত বিটুমিন দিয়ে, তাদের নৌকার তলার ছিদ্র বন্ধ করত এবং
উটের পায়ের ঘা রোগ সারাতে প্রলেপ দিত। তার মানে জ্বালানী তেল কোন যাদু দিয়ে পাওয়া যায়নি। ওটা আগে থেকেই ছিল কিন্তু আরবের বেদুইনেরা এ সবের ব্যবহার জানত না। এর ব্যবহার আবিষ্কার করে, ইউরোপীয় ও আমেরিকান ইঞ্জিনিয়ারেরা। যাক, বেশী বলতে গেলে কিছু কথা গায়ের উপরে এসে যাবে।
ইরান ও কুয়েতের অনেক জায়গায় মাটির ফাটল দিয়ে, কাল গাঢ় তেল বেরিয়ে আসত। ইঞ্জিনিয়ারেরা তার আশে পাশে মাটির গভীরে পাইপ ঢুকিয়ে আলকাতরা সদৃশ অপেক্ষাকৃত নরম তেল তুলে, সেটাকে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জ্বালানী উপযোগী তেল বানানো হয়। যেখান থেকে আলকাতরা সদৃশ তেল তুলে, সেটাকে বলে কুপ। আর যেখানে এসব আলকাতরা সদৃশ তেল কে পরিশোধন করা হয়, সেটাকে বলে রিফাইনারি। আর এই কাঁচা তেলকে বলা হয় ‘ক্রুড অয়েল’।
যেসব দেশে তেলের কুপ নাই, সে সব দেশে রিফাইনারি থাকতে পারে। তারা অন্য দেশের কাঁচা ক্রুড অয়েল কিনে নিজেদের দেশে পরিশোধন করে জ্বালানী তেল বানায়, নিজেরা ব্যবহার করে এবং অন্যের দেশে বিক্রয় করে। ১৯৬৩ সালে পাকিস্তান গভর্নমেন্ট, চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ERL) নামে বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার বানায়। যেটা দিয়ে আমাদের চাহিদা পূরণ করা হয়। ভাগ্যিস রাজাকার ফাকিস্তান একটি কারখানা বানিয়ে রেখেছিল, নচেৎ ১৮ কোটি মানুষ পাঁদ (উদরস্থ বায়ু) দিয়ে গ্যাস বানানো ছাড়া ভিন্ন কিছু করার ছিল না। স্বাধীনতার পরে আর কোন কারখানা হয়নি। এখানে দাদাবাবুরা নাকি বাধা দেয়, তারা চায় বাঙ্গালেরা যেন, তাদের শোধনাগারের তেল কিনে দাসত্বের বাতাবরণ তৈরি করে। যাক, কি বলতে কি শুরু করলাম! আমরা স্বাধীন জাতি, আমাদের কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না।
উল্লেখ্য, এই একটি মাত্র ক্রুড অয়েল থেকে কেরোসিন, ডিজেল, অকটেন (পেট্রোল), এলপিজি, গ্যাস এবং বিটুমিন, লুব্রিকেন্ট তৈরি করে। যার কারণে এর এত দাম, এত কদর, এত প্রয়োজন। দেখা যাক এসব কিভাবে তৈরি হয়।
ক্রুড অয়েলকে একটি বিশালাকার জারের ভিতরে ঢুকিয়ে, প্রেশার কুকারের মত ৪০০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা হয়। ফলে ক্রুড অয়েল গলে বাষ্প হতে থাকে। সেই বাষ্পগুলো পর্যায়ক্রমে ঠাণ্ডা হবার জন্যে, একটি খাড়া চিমনি দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সে সব বাষ্প,
– ২৫০ থেকে ৩৫০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডে তরল হয় সেগুলো হয় ডিজেল
– ২০০ থেকে ২৫০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডে তরল হয় সেগুলো হয় কেরোসিন
– ৪০ থেকে ২০০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডে তরল হয় সেগুলো হয় পেট্রোল/অকটেন
– ৪০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডে তরল হয় সেগুলো হয় এলপিজি গ্যাস, এটাও প্রোপেন-বিউটেন নামে দুই প্রকার।
– যে সব ক্রুড অয়েল ময়লা হিসেবে নীচের পড়ে থাকে সেটা হয় বিটুমিন, যা রাস্তার পিচ হিসেবে কাজে লাগে।
এই তথ্য ও পরিসংখ্যান থেকে বুঝা যায়। একটি মাত্র ক্রুড অয়েল থেকে কত ধরনের বস্তুর সৃষ্টি হয়। এবং ক্রুড অয়েল থেকে নির্গত সকল ধরণের উপাত্তের মূল্য বাংলাদেশের বাজারে আছে।
সিঙ্গাপুরে কোন তেল কুপ নাই কিন্তু ক্রুড অয়েল সংগ্রহ পূর্বক রিফাইনারি আছে ৩ টি। সে কারণে উড়ো জাহাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাব হয়েছে সিঙ্গাপুর। তারা বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় করে এই শিল্প থেকে।
ভারতে আছে সর্বমোট ২৩টি রিফাইনারি। পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম মিলে সর্বমোট ৫টি রিফাইনারি রয়েছে। নুয়ালীগড় রিফাইনারি থেকে পাইপ লাইনের মাধ্যমে দিনাজপুরের পার্বতীপুর ডিপোতে ডিজেল আসে।
বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থান সুবিধা জনক হওয়া এবং আরব বিশ্বের সাথে ভাল সম্পর্ক থাকায় রিফাইনারিতে বাংলাদেশ আরো বেশী সুবিধাজনক অবস্থানে থাকার কথা। কিন্তু সেই পাকিস্তান আমলের একটি রিফাইনারি থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোন রিফাইনারি আজো গড়ে উঠেনি।


Discussion about this post