মাইজভাণ্ডার এর অনুসারীরা সহজেই নিজদের সুন্নি হিসেবে দাবী করে। মূলত চট্টগ্রাম অঞ্চলে সুন্নি হিসেবে বিবেচিত হবার জন্য কিছু বৈশিষ্ট্যের দরকার হয়। আমাদের কাছে সে সকল বৈশিষ্ট্যের সবই মজুত ছিল বরং একটু বেশিই ছিল। সপ্তাহে কয়েকবার আমাকে আমাদের পারিবারিক খামার বাড়ীতে যেতে হত।
পথে আছে এক পাগলা মামার দরগাহ। ওরস হয়, সিন্নি হালুয়া মানুষ মানত করে। এসবে আমার বাবারও পৃষ্ঠপোষকতা ছিল। এই দরগাহের পাশ দিয়ে আসা-যাবার সময় সেটার প্রতি সালাম জানাতে হত, কিভাবে সালাম জানাতে হবে কোন গাইড লাইন ছিল না। হিন্দুরা পাশ দিয়ে যাবার সময় প্রণাম করে, আমরাও ভাবতাম এটাই মোটামুটি সুন্দর নিয়ম, ফলে আমরাও সেভাবে সম্মান করতাম। ওরসের দিন দরগাহ খোলা থাকত। এলাকায় হুজুর হিসেবে পরিচিত, তারা সেদিন দরগাহে গিয়ে পবিত্র কোরআন পাঠ করত। আর তাদের সামনেই মানুষ অনবরত একটি কবরে সেজদা দিতেন, কোন উচ্চবাচ্য করতেন না। আমিও বহুবার সম্মানার্থে সেজদা করেছি। (আল্লাহ আমাকে এই চরম জুলুম থেকে ক্ষমা করুন)
মাইজভাণ্ডারের নাম নিশ্চয়ই অনেকেই শুনে থাকবেন। মোগল আমল থেকেই এই জায়গাটি খুবই প্রসিদ্ধ হয়ে উঠে। তখনও এটা মাইজভাণ্ডার হয়ে উঠেনি। লোকমুখের বিক্ষিপ্ত ইতিহাস থেকে জানা যায় মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের আক্রমণে টিকতে না পেরে, ঈসা খাঁ সহ ভুঁইয়াদের কয়েকজন সৈন্য, তাদের অনুসারী দলবল সহ এই এলাকায় কিছুকাল ঠাই নেন, যাতে করে পরবর্তী প্রতি আক্রমণের জন্য প্রস্তুতি নিতে পারে। তাই মাইজভাণ্ডারের আশে পাশের এলাকাগুলোর নামও ভূঁইয়াদের সাথে আসা বড় বড় কর্মকর্তাদের নামে পরিচিতি লাভ করে। ঈসা পুর, মুসা পুব, ইব্রাহীম পুর সহ নানা পুরে বিস্তৃত এই অঞ্চল। এরা সবাই ভূঁইয়াদের উচ্চপদস্থ সামন্ত। ছোটকাল থেকেই মাইজভাণ্ডার আমার স্বপ্নে লালিত একটি স্থানের নাম। তাই এ সম্পর্কিত কোন লেখা দেখলেই লুফে নিয়ে পড়তাম। এ ধরনের এক বইতে পড়েছিলাম, যার নাম ঠিক এই মুহূর্তে মনে করতে পারছিনা। আফগান থেকে আগত পাঠানদের একটি পাড়া ও ভারতীয় মালদহ থেকে আগত মানুষদের দুটি পাড়ার মধ্যে ছিল মাইজ (মধ্যম) পাড়ার অবস্থান। এই পাড়ার বাসিন্দা ছিলেন সৈয়দ আহমেদ উল্লাহ (রহ) বাবার বাড়ি। পরবর্তীতে এই মাইজ পাড়াটিই বর্তমানে মাইজভাণ্ডার হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। পাড়া কিভাবে ভাণ্ডার হল, তার যথেষ্ট উপকরণ মাইজভাণ্ডারী গানের ভিতের লুকিয়ে আছে। অর্থাৎ এখানে একবার কেউ আসলে, সে খালি হাতে ফিরে যায়না, এই অফুরন্ত ভাণ্ডার শেষ হবার নয়। কৌতূহলের বিষয় হল, মাইজভাণ্ডারের দুই পাশে সেই পাঠান পাড়া ও মালদার (মালদহের) পাড়া আজো বিদ্যমান।
এই ধরণের একটি প্রাণচঞ্চল অঞ্চলের খ্যাতিমান ব্যক্তি ছিলেন, সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (রহ. ১৮২৬-১৯০৬)। উইকিপিডিয়ার সূত্র মতে, তিনি ছিলেন উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তি এবং কলিকাতা আলীয়া মাদ্রাসা থেকেই পাশ করা। তখন ভারত বর্ষে ব্রিটিশের শাসন চলছিল। বাংলা, আরবি, উর্দু, ফার্সি ভাষায় পারদর্শী সৈয়দ আহমেদ উল্লাহ কলিকাতা আলিয়া থেকে বের হয়ে, যশোর অঞ্চলের বিভাগীয় কাজি হিসেবে যোগ দেন। অনেক সময় কাজীদেরকে সরকারী নির্দেশ মেনে চলে হয়। সম্ভবত এই চরিত্রের সাথে তিনি মানিয়ে উঠতে পারছিলেন না, তাই ব্রিটিশের কাজি পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে মুন্সেফী বিষয়ে অধ্যয়ন শুরু করেন। এই বিষয়েও তিনি সর্বোচ্চ মেধার স্বাক্ষর রাখেন। একই সময়ে তিনি কলিকাতার মুন্সী বু আলী মাদ্রাসায় প্রধান মোদাররেছ হিসেবে যোগদান করে। জীবনে আর মুন্সেফের চাকুরী করেছেন কিনা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তিনি ছাত্র জীবনে খুবই মেধাবী ছিলেন এবং কথায় তাঁর বাগ্মিতা ফুটে উঠত। কলিকাতায় থাকা কালেই তিনি বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে গিয়ে ওয়াজ করতেন পরবর্তীতে একজন নামকরা ওয়ায়েজীন ও বক্তা হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। উপরোক্ত ক্ষুদ্র উপসংহার থেকেই আমার বুঝতে পারি। সৈয়দ আহমেদ উল্লাহ (রহ) ক্ষুন্নিবৃত্তি মেটানোর লোভে দুনিয়াকে বিক্রি করার মত মানুষ ছিলেন না। নতুবা তিনি ব্রিটিশের কাজী পদেই থাকতেন। প্রকাশ্যে জন সমাবেশে ওয়াজ মাহফিল করা ও ধর্মীয় বক্তা হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার মাধ্যমে বুঝা যায়, তিনি শতভাগ আন্তরিকতা পূর্ণ একজন বিচক্ষণ, মেধাবী সামাজিক মানুষ ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে সেই আহমেদ উল্লাহ (রহ) তার ভক্ত বৃন্দের কাছে কিভাবে একজন সুফি দরবেশ হয়ে গেলেন বুঝা কষ্টকর। ইসলামের পবিত্রতার নামে তাঁর মাজারে এখন যা হয়, তা কোন প্রকৃত মুসলমান করতে পারে না। অধিকন্তু তারা এটা সৈয়দ আহমেদ উল্লাহ (রহ) নামে চালিয়ে দেন!
আমার পীড়াপীড়িতে একদা আমার মা, এক গ্রাম্য জেঠার সাথে মাইজভাণ্ডারে পাঠিয়েছিলেন। কেননা মাইজভাণ্ডার আমাদের বাড়ী থেকে পঁচিশ মাইলের পথ। এই জেঠা ছিলেন বড় পরহেজগার মানুষ, সঠিক সময়ে নামাজ পড়তেন, ঝগড়া বিবাদের আশে পাশেও থাকতেন না। মা আমার তার মত এক গ্রহণযোগ্য ব্যক্তির হাওলা করে দিলেন যাতে করে ভাণ্ডার শরীফের পবিত্র স্থান গুলো আমাকে দেখান।
মাইজ ভাণ্ডারের মত এত আলোর বর্ণচ্ছটা আমি ইতিপূর্বে দেখিনি। তিনি আমাকে দুটো আলী-শান মাজারে নিয়ে গেলেন তার একটি সৈয়দ আহমেদ উল্লাহ (রহ) এর। জেঠা মহোদয়ের পরামর্শ অনুযায়ী, দুটো কবরেই বহুবার সেজদা দিলাম এবার তিনি আমাকে মাইজভাণ্ডারীদের বসত বাড়ীর এমন একটি দালানে নিয়ে গেলেন, যেটা দেখতে প্রায় যাদুঘরের মত লাগছিল। সেখানে রাখা নির্মিত শতভাগ রক্তচন্দনের একটি খাটের সামনে সেজদা দিলেন, আমিও দিলাম। এভাবে তাদের ব্যবহার্য তৈজসপত্রের সামনেও সেজদা চলছিল। এক পর্যায়ে একটি সুন্দর হুক্কা দেখে তিনি তাতেও সিজদা করলেন। এবার আমি আকলের আঘাত খেলাম ও থমকে দাঁড়ালাম। এখানে সেজদা দেবার কি যুক্তি আছে? ঘটনাক্রমে তখনকার গদিনশীন পীর ঠিক সে সময়ে আমাদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। এভাবে প্রকাশ্যে, দিন-দুপরের, মুখে দাড়ি, মাথায় টুপি টুপি পরিহিত নিজেদেরকে মুসলমানদের রক্ষাকর্তা পরিচয় দেবার মানুষ গুলো কেউ বাধা দিচ্ছে না যে, ইসলামে এটা গর্হিত, জুলুম ও নিন্দনীয় কাজ!
আমার গ্রাম্য জেঠার বদনাম করার জন্য কথাগুলো তুলে ধরি নি। তখনকার সময়ের একজন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজি ব্যক্তির কার্যক্রম তুলে ধরার জন্যই এ কথাগুলো লিখা। যাকে মানুষ পরহেজগার হিসেবে বিবেচিত করে। যিনি সুযোগ পেলে ইসলাম নিয়ে মানুষকে কিছুটা পরামর্শ দিতেন। এটা হল তখনকার ইসলাম প্রিয় একজন মানুষের এবাদতের নমুনা। বর্তমানের এই মাইজভাণ্ডার আর অতীতের সৈয়দ আহমেদ উল্লাহর (রহ) সেই মাইজভাণ্ডার নেই। বরং বর্তমানে যারা এর নিয়ন্ত্রণ কর্তা এরাই উল্টো আল্লাহর দুষমন হিসেবে বিবেচিত হয়ে যায় কিনা তাই দেখার বিষয়।
আপনি যদি নিজেকে মুসলমান দাবী করে থাকেন, তাহলে কিছু গান ও তথ্যর দিকে চোখ রাখুন। তারপর বুঝবেন সমস্যা গুলো কোথায়। আমি ছাত্র জীবন থেকেই মাইজভাণ্ডারী গানের অনুরক্ত ছিলাম। বহু গানের কথা আজো মনে আছে। এসব ইসলাম ধর্মের ভালবাসার কারণেই শিখেছিলাম। তার একটি গান লিখেছেন রমেশ চন্দ্র শীল, যেটায় কণ্ঠ দিয়েছেন প্রখ্যাত সংগীত শিল্পী শেফালী ঘোষ। এরা দুজনেই বহু ভাণ্ডারী গানের রচয়িতা, তারা বাবা ভাণ্ডারীর প্রতি আজীবন শ্রদ্ধাশীলতার কথা বলে গেছেন, যদিও তাদের কেউ মুসলমান হননি! তার একটি সেরা গানের কলি,
আউয়ালে আখেরে তুমি,
জাহেরে বাতেনে তুমি,
কবরে হাশরে তুমি,
বাবা মাওলানা
নূরের পুতুলা বাবা মাওলানা
আল্লাহ বলেছেন,
“তিনিই আদি (আরবিতে আউয়াল) তিনি অন্ত (আরবিতে আখের) এবং তিনিই প্রকাশিত (আরবিতে জাহের) তিনিই গোপন (আরবিতে বাতেন) তিনি সব বিষয়ে অবহিত” সুরা হাদিদ-৩
মূলত এই গুনগুলো আল্লাহর শক্তির পরিচয়, এই কথা বিশ্বাস করা ইসলামে ফরজ, না মানলে কাফের। রমেশ শীল ঠিকই লেখাপড়ার মধ্যে কায়দা করে পবিত্র কোরআনে আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট গুণাবলীর গুলোর যোগ্যতা তিনি মাইজভাণ্ডারের মানুষগুলোর উপর তুলে দিয়েছেন। একেবারে মুড়ে ঝাঁটার ফলা দিয়ে, কাটা তোলার দশা! আর মুসলমানেরা চোখ বন্ধকরে এসব গান গেয়ে নিজেকে সুন্নি পরিচয় দিত। কিংবা আজো যারা নিজেদের সুন্নি বলে পরিচয় দেয়, তারাও এসবের প্রতিবাদ করেনা। উপরন্তু তারা নিজেরা তাদের সাথে মিশে এসবকে সমর্থন দিয়ে যায়। এ ধরনের একটি গান গাইলে সত্তর বছর নামাজ পড়া, সারা জীবনভর হজ-ওমরা করা, লাখে লাখে মানুষকে মেজবান খাওয়ালেও, সে মুসলমান থাকেনা। বরং দুনিয়া পূজারী কাফের, মুশরীক হিসেবে বিবেচিত হবে। মৃত্যুর পরে সে সরাসরি জাহান্নামের অধিবাসী হবে। বড় দুর্ভাগ্য যে, এক সময় না বুঝে আমরাও এমন প্রকৃতির সুন্নি ছিলাম। আর সুন্নি আলেম হিসেবে, আমাদের যারা পরামর্শ দিত, তারাও কোরআন হাদিস পড়ে এসব কোনদিন জানাত না।