হিং নিয়ে একটি পোষ্ট দিয়েছিলাম। এটি পাঠক মহলে এতটা সমাদৃত হবে ভাবিনি। দীর্ঘদিন ধরে ভাবছিলাম আমাদের দেশীয় গাছ-গাছড়া ও ভেষজ গুলো পরিচিত করাতে কিছু একটা দরকার। অন্তত আমি যা জানি সেটাকে পূঁজি করে যদি কাজটি শুরু করি, তাহলে অন্যরা যা জানে সেটাও সেখানে উঠে আসবে। এতে করে আল্লাহ আমাদের কত ধরনের সম্পদ দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছেন কিছুটা হলেও উপলব্ধি করতে পারব। আমাদের দেশ সবুজ-শ্যামল দেশ, এদেশে যত্রতত্র গাছ-পালা হয়। কবির ভাষায়, “এই দেশেতে হাটতে গেলে দলতে হয়রে দূর্বা কমল”। কবির এই ছোট্ট কথাটি আমাকে বারে বারে আঘাত দেয়, এটা নিয়ে আমি ভাবতাম। তাই “গাছের ছায়া” নাম দিয়ে একটি ফেসবুক গ্রুপ খুলেছি, যেখানে শুধুমাত্র গাছ-পালা নিয়েই কাজ করা হবে। পাঠশালা আমার প্রিয় গ্রুপ। এখানে প্রচুর শিক্ষিত, দেশপ্রেমিক মানুষের আনাগোনা। পাঠশালার অবদান অনেক বেশী। তাই আমার সকল পোষ্ট আগে পাঠশালাতে পোষ্ট করি। এখানে প্রকাশিত হবার পরে কিংবা প্রকাশ না করা হলে, আমার টাইমলাইনে পোষ্ট করি।
আমাদের দেশে পথে ঘাটে অগণিত গাছ জন্মাবার কারণে আমাদের কাছে এটা নিয়ে কোন উৎসাহ তৈরি হয়না। অথচ এটার মধ্যে লুকিয়ে আছে আমাদের জন্য ভাগ্য, ঐতিহ্য। চিকিৎসা উপকরণ সহ আরো কত কি? হাজারো ব্যস্ততার মাঝে সময় করতে পারিনা। তারপরও একটু সময় পেলে লিখতে থাকি। কোনটা রেখে কোনটাকে আগে অগ্রাধিকার দেই, এটা নিয়েও সমস্যায় পড়ে যাই। ভাগ্যিস আমার গৃহিণী এ ধরনের কাজে অনেক রহমদিল। নতুবা এটা ওটা লিখা কোনদিন সম্ভব হতো না। সংসারে অর্থ কড়ি আসেনা এমন বেকার কর্মে গৃহিণীদের সায় থাকেনা। অথচ সেই আমি, সংসার জীবনে কবে আমার নিজের কাপড় ধুয়েছি, রান্নায় সহযোগিতা করেছি; আমি ঠিক মনে করতে পারছিনা। আলহামদুলিল্লাহ, এটা আল্লাহর করুণা। তবে কিছু পাঠক এসব লিখা কপি করে নিজেদের টাইমলাইনে পোষ্ট করে দেন সংগৃহীত বলে। আমার ম্যাসেঞ্জার ও হোয়াটর্স অ্যাপে, গুরুত্বপূর্ণ সংগৃহীত লিখাটি পড়ার অনুরোধ করে অনেকে পাঠিয়ে থাকেন। যখন দেখি এটা আমারই লিখা তখন খুবই খারাপ লাগে। আমি মনে করি এটা অনুচিত।
মূল কথা হিং নিয়ে। আমার পোষ্টে যত কমেন্ট এসেছে, তার চেয়ে বহুগুণ বেশী ম্যাসেজ এসেছে ম্যাসেঞ্জারে। অনেকে আমার কাছে রোগ সম্পর্কে প্রশ্ন করেছেন? এ ব্যাপারে সংক্ষিপ্ত উত্তর হল, আমি চিকিৎসা করিনা। নিতান্ত জানার জন্য, কৌতূহল মেটানোর তরে কলেজ জীবনে শিক্ষার পাশাপাশি ইউনানি নিয়ে পড়েছিলাম কিন্তু কোনদিন চিকিৎসা করিনি। চট্টগ্রাম ইউনানি তিব্বীয়া কলেজের সম্মানিত প্যান্সিপ্যাল আমার বন্ধু ও সাথী। সিলেট কলেজের প্যান্সিপ্যাল আমার শিক্ষক। হয়ত লেগে থাকলে সেদিকে কোথাও স্থান হত কেননা ছাত্র হিসেবে আমি খুবই সবার আন্তরিক সহযোগিতা পেতাম। তারপরও যদি কারো কোন প্রশ্ন থাকে, সেটা হামর্দদ ল্যাবরেটরি থেকে জেনে নেওয়া যাবে। উল্লেখ্য হামদর্দ ল্যাবটেরীর প্রতিটি শহর শাখায় দুই-একজন করে চিকিৎসক আছেন। তারা বিনা মূল্যে চিকিৎসা দেন এবং রোগের জন্য ঔষধের নাম লিখে দেন। এখানেই হার্বালের উত্তম চিকিৎসা পাওয়া যায়। আরো উল্লেখ্য হামদর্দ ল্যাবরেটরি উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠতম ইউনানি চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকে। তাদের মেডিক্যাল কলেজ রয়েছে, ইউনিভার্সিটি রয়েছে তাই তারা প্রতিবছর বহু ডাক্তার সৃষ্টি করে। ভারতে হার্বাল ডাক্তারদের কদর বেশী আমাদের দেশের সংস্কৃতি এখনও এমন হয়নি। হামদর্দ ইউনানি চিকিৎসায় যথেষ্ট পরিমাণ সহযোগিতা দিয়ে থাকে। প্রতিষ্ঠানটি দুঃস্থ মানবতার জন্য ওয়াকর্ফ করে দেওয়া তাই এটি সরাসরি সরকারী তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়।
পাঠক হয়ত ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছেন, হিংয়ের কথা বলে আপনাদের পোষ্টে রেখে অন্য কথা বলা শুরু করেছি। হিং শব্দটি উর্দু। একই শব্দ হিন্দি, বাংলাতেও ব্যবহার হয়ে থাকে। হিংয়ের তেজ বেশী এবং কিছুটা বিদঘুটে বিশ্রী গন্ধযুক্ত। কষ্ট করে খেলেও সারাদিন নাক দিয়ে হিংয়ের গন্ধযুক্ত নিঃশ্বাস বের হয়। আমি এটা খেতে পারি এবং এই গন্ধে আমার কোন সমস্যা হয় না। অর্থাৎ ব্যাপারটি কে কিভাবে নেয় সেটার উপর নির্ভর করে থাকে। অনেকেই খেতে পারেনা। যেই অফিসারকে নিয়ে আমার হিং কাণ্ড ঘটে যায়, আমাদের সেই কমার্শিয়াল অফিসার নিজেও আর হিং খেতে পারে নি।
ব্যবসায়ীরা এটার সুযোগ নিয়েছে শতভাগ। তারা কাচা হিংয়ের সাথে এরারুট, ভুট্টার গুড়ো মিশিয়ে নূতন একটি হিং কম্পাউণ্ডের জন্ম দিয়েছে। এটা মূলত গৃহিণীদের মসল্লা হিসেবেই ব্যবহৃত হয়। এই হিংয়ের কার্যকারিতা শতকরা দুই ভাগ থাকবে কিনা আমার সন্দেহ আছে। তবে এই পদ্ধতিতে ব্যবসায়ীরা গৃহবধুদের হাতে হিং ধরিয়ে দিতে পেরেছে! এটাই বড় সফলতা। এটাই বা কম কিসে। আসল হিংয়ের গন্ধ নাকে পেলে কোন মহিলাই সেই হিং আর রান্নার তরকারীতে দেবার সাহস পাবেনা। তবে এখন দিচ্ছে! কারণ একটাই, এটার সাথে নানা ধরনের জিনিষ মিশিয়ে সহ্য ক্ষমতার উপযোগী করা হয়েছে। এসব মসলা দেখতে কোনটা হলুদ বর্ণের কোনটা সাদা। মূলত এটা হিংয়ের প্রকৃত বর্ণ নয়। হিং দেখতে আমাদের দেশের ইক্ষু গুড়ের মত। কতগুলো গাঢ় লাল, কতগুলো হালকা সাদা, কতগুলো এই দুইয়ের মাঝামাঝি। এটা গাছের বয়স, উত্তোলন কাল, স্থানীয় আবহাওয়া, জন্মের স্থান ও হিংয়ের বয়সের কারণে হয়ে থাকে। সুতরাং এককথায় হলুদ ও সাদা গুড়োর মসলা খেলে হিংয়ের প্রকৃত উদ্দেশ্য সফল হবেনা। তবে মসলার জন্য এটাই ব্যবহার করা উত্তম।
প্রতিটি শহরেই কিছু হার্বাল-মসলার দোকান থাকে। এসব দোকান থেকে কবিরাজ ও হাকিমেরা মাল কিনে থাকে। এসব দোকানেই আসল হিং পাওয়া যাবে। চট্টগ্রাম শহরের বক্সীর হাটে পীতাম্বর শাহের দোকান আছে। ব্রিটিশ আমল থেকে তারাই এসব জিনিষের মূল আমদানি কারক। ঢাকা সহ সারাদেশে এদের ব্যবসা ছড়িয়ে আছে। এক সময় বিহারীরাও এই ব্যবসা করত। বাঙ্গালীরা এই ব্যবসায়ে তেমন একটা চতুর নয়। কেননা এ ধরনের ব্যবসা করার জন্য, সারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের তথ্য লাগে, যোগাযোগ করা লাগে। যাযাবর শ্রেণীর মানুষেরাই এই কাজে চতুর হয়। তারা যতটুকু যায়গা ঘুরে অন্তত ততটুকু জায়গার উপকরণ সম্পর্কে ভাল জ্ঞান রাখে। সে হিসেবে বিহারীরা জানত আর বর্তমানে জানে ইহুদীরা। কেননা ইহুদিরা হল দুনিয়ার সবচেয়ে বড় যাযাবর গোত্র।




Discussion about this post