এটি একটি প্রবাদ বাক্য। এই বাক্যটি সে সব মানুষকে লক্ষ্য করেই প্রয়োগ করা হয়, যারা নিজের বেলায় যেমন উদাসীন তেমনি অন্যের বেলাতেও খামখেয়ালীপনা দেখায়। যেমন বাঁশ বেতের একটি ক্ষুদ্র কুড়ে ঘর বানাতেও চারটি খুঁটির দরকার হয়। দুর্যোগে নড়বড়ে একটি ক্ষণস্থায়ী ঘর বানাতেও সে ধরনের চারটি ঠেলার দরকার পড়ে। তিন ঠেলা দিয়েও নিজের মাথা গোজার মত কিছু একটা বানানো যেতে পারে কিন্তু সেটা পরিবার পরিজনকে নিরাপদ রাখতে যথেষ্ট হয় না। তিন ঠেলার ঘর, খোদা রক্ষা কর ও তকদিরের ভর
সমাজে অনেক খামখেয়ালী অকর্মণ্য মানুষ আছে, যারা তাদের অকমর্ণ্যতাকে দুর্ভাগ্য ও তকদিরের উপর তুলে দেয়। নিজে তো অলস তার উপরে সে তার অধীনস্থ কিংবা সমাজের সকল স্তরের মানুষের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে উঠে। পরিশেষে তার ভাগ্যের পরিবর্তন না হবার জন্য আল্লাহর সমালোচনা করে। সে এ কথাটি মুখে এত জোড়ে প্রচার করতে থাকে যে, নিজে এত করার পরও শালার ভাগ্যের পরিবর্তন আসল না। আবার কিছু মানুষ আরো আগ বাড়িয়ে বলতে থাকে যে, এত ধনী আত্মীয় স্বজন আছে, তারা যদি সাহায্যের যন্ত্রপাতি দিয়ে একটু ধাক্কা দিত তাহলে সেও এতদিনে ধনী হয়ে উঠত! মূলত কেউ কাউকে ধাক্কায়ে উপরে তুলতে পারেনা যদি না সে হাত দিয়ে নিজেও উপরে উঠতে না চায়। এসব ব্যক্তি রাজদরবারের খাজাঞ্চিখানার রক্ষক হলেও কোনদিন ধনী হতে পারে না। কেননা, আজীবন গরীব থাকার উপাদান তার রক্ত-মাংস ও চরিত্রে লুকায়িত আছে। এখানে ভাগ্য, তকদির কোনটাই মূল বিষয় নয়।
এসব মানুষ মানুষ ধার্মিক হলেও প্রকৃত ধার্মিকের বিপদ বাড়ে। তারা তাদের আলসেমীপনা, জ্ঞানের অকালপক্বতার ভার তকদিরের উপরে তুলে দিয়ে নিজে দায় এড়িয়ে বাঁচতে চায়। পরিশেষে তার এই পণ্ড-কর্মের দায় স্বয়ং আল্লাহর উপর তুলে দিয়ে নিজেকে দায়মুক্ত করতে চায়। এসব কাণ্ডজ্ঞানহীন মানুষ তকদির নিয়ে এমন সব আস্থাশীল কথা বলবে, পরিবেশ বিপক্ষে চলে যাবার ভয়ে, কখনও জ্ঞানী আলেম পর্যন্ত মুখ বন্ধ করতে বাধ্য হয়।
এদেরকে পরীক্ষা করার জন্য যদি বিষ মিশ্রিত পানি পান করতে দেওয়া হয়; নির্ঘাত মৃত্যুর ভয়ে তারা কেউ পান করবে না! তখন যদি প্রশ্ন করা হয় কেন বিষ পান করলে না? সোজা উত্তর দিবে, মারা যাবার ভয়ে! দুনিয়ার সকল মানুষ জানে যে, বিষ পানে মানুষ মারা যায়। তাহলে তারা তকদিরে বিশ্বাসী হল কোথায়? রাসুল (সা) জীবন চরিত থেকে আমরা কি দেখি? ইহুদীর রান্না করা গোশতে বিষ মাখানো হয়েছে, এটা জেনেও তো রাসুল (সা) সেই গোশত খেয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে তিনি মরেন নি! কেননা আল্লাহ আগেই বলেছিলেন যে, তোমার আনিত বাণী আরব ছড়িয়ে, সিরিয়া পেরিয়ে, রোম নগরীরে পৌছবে। তাই আজ যদি বিষ খায়ও তাহলেও তিনি মরবেন না। যদিও এই গোশত অন্যজনে খেয়ে মারা গিয়েছিলেন! এটাই তকদিরে বিশ্বাসীদের দৃঢ়তার পরীক্ষা। আমরা কি সে মানের মানুষ!
করোনা ভাইরাসের ব্যাপারটিও ঠিক বিষ পানের ঘটনার মত। আমাদের আস্তা বিশ্বাস যখন দুর্বল, তাই তকদিরের নাম দিয়ে বিষ পান না করা উত্তম। তার চেয়েও ভয়ঙ্কর কথা নিজের বেআকলির কারণে না হয় নিজের প্রাণ খোয়ালাম কিন্তু পরিবার-পরিজন, স্বজন, প্রতিবেশীর প্রাণ সংহার করার অপরাধে সোজা জাহান্নামে যেতে হবে। তকদিরের এই পরিণামের কথা কি বুঝি? সে জন্য নিজের পক্ষ থেকে শতভাগ সতর্কতার যেন ঘাটতি না থাকে। কোন একটি ছিদ্রও যাতে খোলা না থাকে যেখান দিয়ে শত্রু হানা দিবে। নিজের সর্বাত্মক পরিপূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে কঠিন বিপদ মোকাবেলা করার নাম আরবিতে তাওয়াককুল তথা নির্ভরতা। আবার এ ধরনের প্রস্তুতির পরও কেউ যদি নিহত হয়, সেটারই নাম তকদির। অর্থাৎ বেচে থাকার সম্ভাবনা ছিল শতভাগ কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। সু-সংবাদ এদের জন্য।
পাঠক নিশ্চয়ই তিন ঠেলার মাহাত্ম্য বুঝে ফেলেছেন! যারা কোন মতে তিন ঠেলার খুঁটির উপরে নিজের সর্বস্ব লটকিয়ে বাকি খুঁটির দায়িত্ব তকদিরের উপর ছেড়ে দেয়, তাদের যেভাবে সর্বনাশ হবার সম্ভাবনা শতভাগ নিশ্চিত; সেভাবে গোঁয়ার্তুমি-হঠকারিতা নির্বুদ্ধিতা করে মহামারির সাবধানতা এড়িয়েও, নিজের সর্বনাশ এড়ানো সম্ভব নয়। এ কথাটিও বুঝে নেওয়া। পরবর্তীতে এটাকে তকদিরের ফায়সালা বলে আল্লাহর উপর দায় চাপানোর যেন কারণ না ঘটে।

Discussion about this post