আমি কি করি, এই প্রশ্নটির মুখোমুখি সর্বদা হতেই হয়। দীর্ঘক্ষণ সময় নিয়ে বুঝানোর পরে যখন প্রশ্নকর্তার মাথা নড়ে তখন বুঝি কিছুটা বুঝেছে। কিন্তু শতকরা ৮০ জন যে বুঝেনা তা অন্তত হলফ করে বলতে পারি। আমিরাত দেশটি এমন যে, এখানে সবকিছুই পরিকল্পিত ভাবে তৈরি করা হয়। ইঞ্জিনিয়ারিং জগতে এমন অনেক কিছু দেখার জিনিষ আছে, যা বহুজনকে অধ্যয়ন করে উদ্ধার করতে হয়। কিন্তু এখানে যারা থাকে তারা নিজ চোখে দেখেই অনেক কিছু বুঝতে পারে।
বাবা আমার চিঠিতে লিখতেন, আমি কি কাজ করি? তা যেন এমন ভাবে লিখি, যাতে করে তিনি পড়া মাত্রই বুঝতে পারেন এবং কোন প্রশ্ন কর্তা জিজ্ঞাসা করা মাত্রই যেন তিনি নিজের ভাষায় বুঝাতে পারেন। আট-দশ পৃষ্ঠার কত লিখা লিখেছি তার কোন ইয়ত্তা নাই; যখন সাক্ষাতে প্রশ্ন করলাম, কিছু বুঝেছেন? তিনি মাথা নাড়িয়ে বললেন, ভাসা ভাসা বুঝেছেন! মানে আমার কষ্ট অনুপাতে বুঝেন নি। কম্পিউটার তখন খুবই দামী বস্তু। ১৯৯৬ সালে অনেক টাকা কাস্টমস দিয়ে, তার মধ্যে আমার কাজ ঢুকিয়ে, বাবাকে দেখানোর জন্য দেশে নিয়ে গিয়েছিলাম। সুইচ দেবার তিন মিনিটের মাথায় দেশীয় বিদ্যুৎ ভোল্টের উঠানামার আঘাতে চোখের সামনেই কম্পিউটার জ্বলে গেল! আফসোস, বাবাকে দেখানো-বুঝানো কোনটাই সম্ভব হয়নি! এখন ডিজিটাল যুগ, বহু অসম্ভব সম্ভব হয়েছে। তাই হঠাৎ মাথায় একটা কথা চিন্তা আসল, কিছু ছবি দিয়ে হয়ত ব্যাপারটি বুঝানো সহজ হবে। তাই ছবিগুলো পোষ্ট করলাম।
এটি একটি ভবনের ছাদ। সেখানে বহু ধরনের আধুনিক মেশিনারিজ রয়েছে। ম্যাকানিক্যাল, ইলেক্ট্রিক্যাল ও পাইপের সংমিশ্রিত কাজ। এসি মেশিন, তাজা বাতাস সাপ্লাইয়ের মেশিন, সোলার প্যানেল, গ্যাস লাইন, পানির পাম্প, ওয়াটার ট্যাঙ্ক, সেন্ট্রাল ওয়াটার হিটার, ইলেকট্রিক্যাল প্যানেল, কন্ট্রোল রুম, লিফট মেশিন আরো কত কি? সবই কম্পিউটার সফটওয়ারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। যদিও এই কাজটি ছোট্ট পরিসরের। এই কাজটিতে বেশীর ভাগ কাজ বাংলাদেশী রেমিটেন্স যোদ্ধারাই করেছে।
কাজটি শুরুর আগেই কম্পিউটারে অঙ্কন করতে হয়। যা আমি আগেই করেছিলাম। ড্রয়িং মত কাজটি হয়েছে কিনা তা দেখার জন্য আসতে হয়েছিল। ইঞ্জিনিয়ারিং যন্ত্রপাতিকে যথাযথ স্থানে নিখুঁত ভাবে স্থাপন করার কাজটি একটি জটিল ব্যাপার। কোন জিনিষ কোথায় স্থাপন করতে হবে, কিভাবে কোন স্থানে রাখা হবে, তার সম্ভাব্যতা যাচাই করেই, ক্লায়েন্ট-কনসালটেন্টের কাছে ড্রয়িং উপস্থাপন করতে হয়। ম্যাকানিক্যাল, ইলেক্ট্রিক্যাল, পাইপিং ও সিভিল ইঞ্জিনীয়ারিং কাজ সুচারুরূপে সম্পন্ন হলেই বিরাটকায় যন্ত্রপাতি গুলো স্থাপন করা হয়। পরিকল্পিত কাজ পরিকল্পনা মাফিক করার জন্য হাজারো ইঞ্জিনিয়ার হাজারো রকম ফিল্ডে ব্যস্ত আছে এদেশে। রাস্তায় একটি গাছের চারা কিংবা রান্না ঘরের একটি ফ্রিজ রাখা কিংবা দোকানের একটি দরজাও চিত্রাঙ্কনের মাধ্যমে পূর্বেই সমাধা করতে হয়।
এসব ইঞ্জিনিয়ারিং ফিল্ডে কাজ করে অন্যান্য জাতির মানুষের সাথে আমাদের দেশের প্রবাসী কর্মীবৃন্দ। একাজে তাদের দক্ষতা প্রবল, বাংলাদেশীরা মিশুক, উপস্থিত বুদ্ধিতে চতুর, ভাষা জ্ঞানে অপূর্ব হিসেবে পরিচিত, তাই এদের চাহিদা কখনও ভারতীয়দের চেয়েও বেশী। বর্তমানে প্রায় দেশেই বাংলাদেশীদের জন্য ভিসা বন্ধ। মূলত এটার পিছনে অন্যদেশের ষড়যন্ত্রও কম দায়ী নয়। ভাগ্যের পরিহাস এখানে এত দক্ষতা অর্জন করেও এসব প্রবাসীরা বাংলাদেশের বেকারত্বের জীবন কাটায় কেননা আমাদের দেশ এতটা উন্নতি হয়নি, যাতে করে এসব দক্ষ শ্রমিক মেহনতি মানুষের হাতকে কাজে লাগাতে পারে।






















Discussion about this post