১৯৯০ সালে আজকের এই দিনটি ছিল যেন বিরাট খুশির দিন। দেশের সকল স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা খুশীতে রাস্তায় নেমে এসেছিল। প্লে-কার্ড, ফেস্টুন সহকারে ছেলেরা অলি-গলিতে মিছিল-মিটিং করছিল। ব্যাংক-বীমা, অফিস-আদালত থেকে কর্মকর্তারা বেরিয়ে এসে নিজেদের চেহারা দেখিয়ে জানান দেয়, তারাও এতদিন দমবন্ধ করা পরিবেশে হাঁফিয়ে উঠেছিলেন। সারা দেশের রাজপথ বিএনপি, আওয়ামীলীগ, জামায়াত সমর্থিত ২৩ দলীয় ঐক্য জোটের দখলে। সেদিনের স্মৃতি দেখলে মনে হবে বাংলাদেশে যেন দলীয়-আন্তঃদলীয় কোন্দল, হানাহানির ঘটনা কোনকালেই ছিলনা। সারা দেশে যেন ঈদের আনন্দ বয়ে যাচ্ছিল। সড়কের এক পাশ দিয়ে আওয়ামীলীগের মিছিল যাচ্ছিল তো অন্য পাশে বিএনপির! বাংলাদেশে এ ধরনের বিরল দৃশ্য শুধু এই দিনই দেখা গেছে। কেননা গতকালই জগদ্দল পাথরের মত মাথায় বসে থাকা স্বৈরাচারী এরশাদের পতন হয়েছে। তিনি অধিকতর স্বাবলম্বী, সুখী-সমৃদ্ধশালী একটি বাংলাদেশ উপহার দেবার জন্য আট বছর আগে রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে, একটি নির্বাচিত সরকার থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিলেন। দিনে তার ব্যর্থতার পাল্লা ভারী হতে থাকে বরং দেশের অবস্থা পূর্বের চেয়েও খারাপ-তর হতে থাকে। তাই দিনে দিনে তার বিরুদ্ধে প্রবল জনমত গড়ে উঠতে থাকে। দেশের সকল দল ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাকে, ১৯৯০ সালের ৬ ই ডিসেম্বর তাকে ক্ষমতা থেকে নামিয়ে আনেন। ৭ ই ডিসেম্বর যেন সারা দেশে ঈদের আনন্দ বইতে থাকে। এরশাদ পালাতে চেয়েছিলেন কিন্তু ব্যর্থ হলেন। সারা দেশের জনতার চোখে খুশির ঝিলিক “এবার রাজার বিচার হবে’!
চট্টগ্রাম শহরে যেতে হলে, শহরের আতুরার ডিপো পার হয়ে যেত হত। সেখানে ছিল ট্যানারি। রাস্তার পাশেই চামড়া কারখানা, রাস্তাতেই চামড়া শুকানো হয়। বাসে করে এই জায়গা পাড়ি দেবার সময় আমার বমি হয়ে যেত। ফলে বমি ধরে রাখার জন্য পলিথিন ব্যাগ সাথে রাখতে হত।
যখন ছাত্রজীবন শেষ হয়ে যায়, তখনো এরশাদ ক্ষমতায়। আন্দোলন তুঙ্গে। রাতদিন কারফিউ, দিনের পর দিন। সারা শহর ভূতুরে নগরীতে পরিণত হয়। তারপরও সাহসী যুবকেরা চূড়ান্ত ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় নামত। প্রতিবাদ মিছিলের কোন সময় নাই, যখনই কোন মিছিল নামত, সে মিছিলে যোগ দিতাম। কার মিছিল, কোন দলের মিছিল সেটা ভাবা-ভাবির সময় নাই। সারা দেশের প্রতিটি শহরেরই দৃশ্য এমন। ঢাকায় নূর হোসেনের মৃত্যুতে ছাত্র-জনতা রাস্তায়। তার উপরে ডা. মিলন নিহত হলে সরকার সারা দেশে নিয়ন্ত্রণ হারায়। রাস্তায় যে নেমেছে অথচ পুলিশী নির্যাতন, বিডিআরের লাটির আঘাত খায়নি এমন তরুণ খুবই কম।
পুলিশ বিডিয়ারের চোখে পড়ে যাই। শহরের পরিচিত এলাকা থেকে পালাতে হবে। পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিলাম, ছিন্নমূল বস্তিবাসীদের ওখানে। সেখানে বিপদ আরো বেশী। সবাই যেন গুপ্তচর। লুকাতে আশ্রয় পেলাম ট্যানারির ভিতরে। সেই ট্যানারি যার পাশ দিয়ে গেলেই বমি আসে। এখন সেখানে বসবাস করছি। দেখলাম অবলীলায় এখন খানাও খেতে পারছি! বিপদে পড়ে অভ্যাস রপ্ত হয়েছে। আমি আজীবন এই ব্যক্তিকে ঘৃণা করেছি কিন্তু মৃত্যুর এই কঠিন সময়ে নয়।
গ্রামের মা-বাবা কেউ জানেনা, তরুণেরা কতটুকু রিস্ক নিয়ে লড়ছে। আমিও তাদের সহযোদ্ধা। কারণ একটাই এরশাদ মুক্ত বাংলাদেশ চাই। কল্পনায় ছবি আঁকতাম এরশাদ মুক্ত ভিন্ন আরেকটি বাংলাদেশের ছবি। যে সমাজে জুলুম থাকবে না, হানাহানি থাকবে না, রাষ্ট্রীয় লুণ্ঠন থাকবে না, মারামারি, হানাহানি চিরতরে মিঠে যাবে, ছাত্ররা নির্ভয়ে লেখাপড়া করতে পারবে। মানুষ দলীয় প্রভাব মুক্ত চাকুরী পাবে (যদিও তখন সহনীয় ছিল) ঘুষ থাকবে না, দুর্নীতি থাকবে না, শোষণ থাকবে না, কড়া শাসন থাকবে না।
তাই এরশাদের পতনের আজকের দিনটা ছিল আমাদের কাছে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় খুশির দিন! আনন্দে কেঁদে ফেলেছিলাম! এখন ভাবী একটি সুন্দর বাংলাদেশের প্রত্যাশায় যেভাবে লড়েছি, তার পুরোটাই ভুল ছিল। চোখের সামনে জ্বলন্ত সাক্ষ্য যে, এরশাদ মুক্ত যে রাষ্ট্রের কথা ভেবে আমরা লড়েছিলাম তা সবই পণ্ডশ্রম, ব্যর্থকাম। কেননা এরশাদ পরবর্তী ত্রিশ বছরের জমানাকে যেভাবে দেখছি তা এরশাদের জমানার চেয়ে মোটেও উত্তম হয়নি। অনেক স্থানে উন্নতর বিবেচনায় সমানও হয়নি।
অত্যাচারী হাজ্জাজ বিন ইউসুফের জুলুমের প্রতিকার চাইতে এক ব্যক্তি বিখ্যাত তাবীঈ হাসান আল বসরী (রঃ) কাছে এসেছিলেন। তিনি বললেন, আজকের দিনটি সুন্দর ভাবে কাটাতে পারার জন্য আল্লাহর কাছে শোকরিয়া করো। দিন যেটা চলে যায়, সেটা ভালই, মন্দ দিনটি হল আগামী কাল। ঠিক এ ধরনের একটি বাণী স্বয়ং রাসুল (সা) দিয়েছিলেন। আশ্চর্যের বিষয় হল, বিগত ত্রিশ বছর ধরে জাতি শুধু মন্দ যুগের প্রতিধ্বনিকে লম্বা হতে দেখেছে। পরবর্তীতে দেখা গেছে, যে নতুন দিনটাকে লড়াই করে আনা হয়েছে, তার চেয়ে পূর্বের বিতাড়িত দিনটি অপেক্ষাকৃতই ভাল ছিল। এভাবে মানুষ ভালোর আশায় লড়ছে, মন্দের ভয়ে দৌড়াচ্ছে। মূলত একটি জাতির বেশীর ভাগ জনগোষ্টি ভাল না হলে, কেউ কাউকে ভাল বানাতে পারে না। মানুষের চরিত্র যত খারাপ হয়, অরাজকতার পরিধি তত দীর্ঘ হয়।
চট্টগ্রাম শহরে যেতে হলে, শহরের আতুরার ডিপো পার হয়ে যেত হত। সেখানে ছিল ট্যানারি। রাস্তার পাশেই চামড়া কারখানা, রাস্তাতেই চামড়া শুকানো হয়। বাসে করে এই জায়গা পাড়ি দেবার সময় আমার বমি হয়ে যেত। ফলে বমি ধরে রাখার জন্য পলিথিন ব্যাগ সাথে রাখতে হত।
যখন ছাত্রজীবন শেষ হয়ে যায়, তখনো এরশাদ ক্ষমতায়। আন্দোলন তুঙ্গে। রাতদিন কারফিউ, দিনের পর দিন। সারা শহর ভূতুরে নগরীতে পরিণত হয়। তারপরও সাহসী যুবকেরা চূড়ান্ত ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় নামত। প্রতিবাদ মিছিলের কোন সময় নাই, যখনই কোন মিছিল নামত, সে মিছিলে যোগ দিতাম। কার মিছিল, কোন দলের মিছিল সেটা ভাবা-ভাবির সময় নাই। সারা দেশের প্রতিটি শহরেরই দৃশ্য এমন। ঢাকায় নূর হোসেনের মৃত্যুতে ছাত্র-জনতা রাস্তায়। তার উপরে ডা. মিলন নিহত হলে সরকার সারা দেশে নিয়ন্ত্রণ হারায়। রাস্তায় যে নেমেছে অথচ পুলিশী নির্যাতন, বিডিআরের লাটির আঘাত খায়নি এমন তরুণ খুবই কম।
পুলিশ বিডিয়ারের চোখে পড়ে যাই। শহরের পরিচিত এলাকা থেকে পালাতে হবে। পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিলাম, ছিন্নমূল বস্তিবাসীদের ওখানে। সেখানে বিপদ আরো বেশী। সবাই যেন গুপ্তচর। লুকাতে আশ্রয় পেলাম ট্যানারির ভিতরে। সেই ট্যানারি যার পাশ দিয়ে গেলেই বমি আসে। এখন সেখানে বসবাস করছি। দেখলাম অবলীলায় এখন খানাও খেতে পারছি! বিপদে পড়ে অভ্যাস রপ্ত হয়েছে। আমি আজীবন এই ব্যক্তিকে ঘৃণা করেছি কিন্তু মৃত্যুর এই কঠিন সময়ে নয়।
গ্রামের মা-বাবা কেউ জানেনা, তরুণেরা কতটুকু রিস্ক নিয়ে লড়ছে। আমিও তাদের সহযোদ্ধা। কারণ একটাই এরশাদ মুক্ত বাংলাদেশ চাই। কল্পনায় ছবি আঁকতাম এরশাদ মুক্ত ভিন্ন আরেকটি বাংলাদেশের ছবি। যে সমাজে জুলুম থাকবে না, হানাহানি থাকবে না, রাষ্ট্রীয় লুণ্ঠন থাকবে না, মারামারি, হানাহানি চিরতরে মিঠে যাবে, ছাত্ররা নির্ভয়ে লেখাপড়া করতে পারবে। মানুষ দলীয় প্রভাব মুক্ত চাকুরী পাবে (যদিও তখন সহনীয় ছিল) ঘুষ থাকবে না, দুর্নীতি থাকবে না, শোষণ থাকবে না, কড়া শাসন থাকবে না।
তাই এরশাদের পতনের আজকের দিনটা ছিল আমাদের কাছে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় খুশির দিন! আনন্দে কেঁদে ফেলেছিলাম! এখন ভাবী একটি সুন্দর বাংলাদেশের প্রত্যাশায় যেভাবে লড়েছি, তার পুরোটাই ভুল ছিল। চোখের সামনে জ্বলন্ত সাক্ষ্য যে, এরশাদ মুক্ত যে রাষ্ট্রের কথা ভেবে আমরা লড়েছিলাম তা সবই পণ্ডশ্রম, ব্যর্থকাম। কেননা এরশাদ পরবর্তী ত্রিশ বছরের জমানাকে যেভাবে দেখছি তা এরশাদের জমানার চেয়ে মোটেও উত্তম হয়নি। অনেক স্থানে উন্নতর বিবেচনায় সমানও হয়নি।
অত্যাচারী হাজ্জাজ বিন ইউসুফের জুলুমের প্রতিকার চাইতে এক ব্যক্তি বিখ্যাত তাবীঈ হাসান আল বসরী (রঃ) কাছে এসেছিলেন। তিনি বললেন, আজকের দিনটি সুন্দর ভাবে কাটাতে পারার জন্য আল্লাহর কাছে শোকরিয়া করো। দিন যেটা চলে যায়, সেটা ভালই, মন্দ দিনটি হল আগামী কাল। ঠিক এ ধরনের একটি বাণী স্বয়ং রাসুল (সা) দিয়েছিলেন। আশ্চর্যের বিষয় হল, বিগত ত্রিশ বছর ধরে জাতি শুধু মন্দ যুগের প্রতিধ্বনিকে লম্বা হতে দেখেছে। পরবর্তীতে দেখা গেছে, যে নতুন দিনটাকে লড়াই করে আনা হয়েছে, তার চেয়ে পূর্বের বিতাড়িত দিনটি অপেক্ষাকৃতই ভাল ছিল। এভাবে মানুষ ভালোর আশায় লড়ছে, মন্দের ভয়ে দৌড়াচ্ছে। মূলত একটি জাতির বেশীর ভাগ জনগোষ্টি ভাল না হলে, কেউ কাউকে ভাল বানাতে পারে না। মানুষের চরিত্র যত খারাপ হয়, অরাজকতার পরিধি তত দীর্ঘ হয়।

Discussion about this post