হিংসা একটি ধ্বংসাত্মক বিষ। এটা নিয়ে একটি সুন্দর ঘটনা আছে। একদা হিংসুক ও অলস দুই বিপদগ্রস্ত ভাইয়ের সাহায্যে আসমান থেকে হাজির হলেন এক ফেরেশতা।
তিনি দুই ভাইকে লক্ষ্য করে বলেন, তোমাদের মনের আশা পূরণ করা হবে। শর্ত হল তোমাদের কিছু না কিছু চাইতেই হবে এবং তোমাদের একজন যা চাইবে, অন্যজন তার দুইগুণ পাবে! প্রথম ভাই ভাবল তার দরকার একটি বাড়ী! যা চাইলে তার ভাই পেয়ে যাবে দু- দু’টি বাড়ি! ভাবল এটা হবে একটি ক্ষতিকর চাওয়া। সে একটি বাড়ী চাওয়া মাত্র চির শত্রু ভাই পেয়ে যাবে দুটি বাড়ী!
মানা অসম্ভব, নিজের উপকারের সাথে সাথে ভাইয়ের উপকার হবে, তা আবার দ্বিগুণ! তাই এমন উপকার সে গ্রহণ করবে না। অন্য ভাইয়ের দরকার এক বস্তা স্বর্ণের মোহর কিন্তু চাইলেই অপর ভাই পেয়ে যাবে পুরো দু’বস্তা মোহার। শত্রুর প্রতি অকল্পনীয় উপকার, মানা যায়না! সে ও সাহায্য নেবে না! উভয়ের মাথায় হিংসে চেপে বসে।
কেউ সুখী হউক তারা মানতে পারছিল না তবে দুঃখী হউক এটাই মনের কামনা। তাই প্রথম ভাই চাইল, “আমার একটি পা ভেঙ্গে দেওয়া হউক”! ফলে তার অপর ভাইয়ের দুটি পা পঙ্গু হয়ে গেল। সেই পঙ্গু ভাইকে ফেরেশতা বলল, তুমি কি চাও? সে কান্না করে বলল “আমি চাই আমার এক চোখ কানা হয়ে যাক”।
ফলে তার ভাইয়ের দু’টি চোখই কানা হয়ে গেল! হিংসার জ্বালায় দুই ভাই ধনী ও স্বাবলম্বী হবার চেয়ে চির পঙ্গুত্বকে বরণ করে নিন। গল্পের উৎস স্মরণ করতে পারছিনা, সম্ভবত লিউ টলষ্টয় কর্তৃক লিখিত নতুবা ইশপের বই থেকে পাওয়া। হিংসার উপমা বুঝার জন্য এর চেয়ে সেরা গল্প মনে হয় বিশ্ব সাহিত্যে নেই।
উপরের গল্পটি হচ্ছে হিংসার পরিণতি নিয়ে। হিংসার সৃষ্টি ও উৎপত্তি কেন এবং কিভাবে হয় সে সম্পর্কে অনেকের ধারণা ভাসা ভাসা। অনেকেই হিংসা আর ঈর্ষার মাঝে তালগোল পাকিয়ে ফেলেন!। তাই হিংসার ধরণ এবং হিংসা কাকে বলে সম্পর্কে সম্যক ধারণা পেতে একটু গভীরে মনোনিবেশ করা দরকার।
মূলত হিংসার মানে হচ্ছে, কোন ব্যক্তির বিশেষ কোন অনুগ্রহ পাবার সুযোগ হলে, অন্য ব্যক্তি সেটা সহ্য করতে পারে না। সে চেষ্টা তদবির করতে থাকে যাতে করে সেই অনুগ্রহ সেই ব্যক্তি না পাক বরং সেটা তারই অনুকূলে চলে আসুক।
যদি দেখে যে, সেটা তার অনুকূলে আসবে না, তাহলে সে চেষ্টা করে যাতে সে অনুগ্রহ ঐ ব্যক্তির হস্তগত না হউক। যখন দেখে যে, অবশেষে তা তার হস্তগত হয়েই গেছে, তখন সে চেষ্টা করে সেটা জিনিষটা তারই দখলে চলে আসুক।
সেটাও যদি হবার মত না হয়, তাহলে সে চেষ্টা করে যাতে করে, সে জিনিষটা হারিয়ে ফেলুক কিংবা নষ্ট হয়ে যাক।
মানব চরিত্রের এই প্রবৃত্তির নাম হিংসা। এটা বাস্তবায়নে অনেক মানুষ অর্থ-কড়ি খরচ করে। চরম কৃপণ মানুষ পর্যন্ত একাজে অগ্রগামী হয়ে যায়। হিংসার তেজ মানুষ লুকিয়ে রাখতে পারেনা। সবার কাছে দৃশ্যমান হয়ে যায়।
এতে কারে হিংসুকের অর্থকড়ি ও স্বাস্থ্য নষ্ট হয়ে যায়। অনেকে আরো আক্রমণাত্মক হয়ে খুনা-খুনির কারণ পর্যন্ত ঘটিয়ে থাকে। যার প্রতি হিংসা সে যদি সবল হয় তাহলে যাদু-টোনা, তাবিজ, মন্ত্রের আশ্রয় নিয়ে হলেও তাকে ঘায়েল করার চেষ্টা চলতে থাকে।
হিংসার আরেকটি পর্যায় আছে,, আল্লাহ কোন ব্যক্তিকে শ্রেষ্ঠত্ব বা কোন স্পেশাল গুণাবলী দিয়ে থাকলে অন্য ব্যক্তি তার মনের মধ্যে বিষ-জ্বালা অনুভব করে। প্রতিনিয়ত সে ব্যক্তির অকল্যাণ কামনা করতে থাকে। সাধ্যমত চেষ্টা চালাতে থাকে যাতে যাতে করে ঐ ব্যক্তির সেই গুণাবলীতে বদনাম আসে।
মানুষ তাকে নিয়ে হাসি তামাশা করে। তার চারিত্রিক কার্যাবলী নিয় ঠাট্টা-মশকরা করে। এত কিছু করার পরও যদি তার ক্ষতি করতে না পারে তাহলে হিংসুক মানুষ চরম আগ্রাসী হয়ে উঠে। হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে কখনও নিজের ইজ্জতকে বলী দিতে কার্পণ্য করেনা। মাত্রাতিরিক্ত হিংসার পরিণামে পুরুষ তো বটেই মহিলা পর্যন্ত নিজেকে, নিজের কন্যাকে ধর্ষিতা সাজাতেও দ্বিধা-বোধ করেনা! শত্রুকে ফাঁসাতে নিজের নিষ্পাপ সন্তান হত্যা করার বহু ঘটনা তো আমাদের সমাজ চিত্রে হর হামেশা দেখা যায়। এগুলো সবই হিংসার প্রতিফলন।
হাদিস শরীফে আছে, “মরিচা যেভাবে লোহাকে নষ্ট করে ফেলে, সেভাবে হিংসা মানুষের অন্তরকে নিঃশেষ করে দেয়”। হিংসার উপাদান হিংসুককে জাহান্নামে পৌছিয়েই ক্ষান্ত হয়। কোন মানুষের হৃদয়ে হিংসা ঢুকে পড়লে সে আর মানুষ থাকেনা ইতর প্রাণীর চেয়েও নগণ্য হয়ে যায়।
রাষ্ট্রনায়ক, রাজ্য বিজেতা, জন নায়ক কখনও মানব থেকে দানবে পরিণত হয়। পৃথিবীর বহু জাতি কারো আক্রমণ ব্যতিরেকে নিজেরাই ধ্বংস হয়েছ, হিংসুটে নেতৃত্ব-পনার কারণে। পৃথিবীর বহু শক্তিশালী রাষ্ট্র নষ্ট হয়েছে হিংস্মাত্মক জাতীয়তাবাদী নীতির কারণে। হিংসুক রাজার কারণে নিজের রাজ্য বিরান হয়েছে এমন নজীর ইতিহাসে ভুরি ভুরি। দুটি বিশ্বযুদ্ধ সহ ইউরোপের আন্তঃরাষ্ট্রিয় সংঘাত, ইরান-আরব যুদ্ধ সহ মধ্যপ্রাচ্যের হানাহানি সবই হিংসার কারণেই সৃষ্টি হয়েছে।
পরিবারের পুরুষ কর্তা হিংসুক হলে, সম্পদশালী পরিবার রাস্তায় নামে। ভাইয়ে ভাইয়ে খুনোখুনি চলে। পরিবারের কোন গৃহিণী হিংসুক হলে, তার হাত ধরে পরবর্তী কয়েক পুরুষ হিংসুক প্রজন্ম সৃষ্টি করবে। সাথে সাথে তার নিজের সংসার হয়ে উঠবে একটি চলমান দোযখের মত। সে সংসারের সন্তানেরা প্রথমেই বাবা-মাকে ঘায়েল করে হিংসুটে আচরণ রপ্ত করতে শিখে।
হিংসুক অভিভাবক যতই জ্ঞানী হউক, যতই ধনাঢ্য হউক, , যতই খ্যাতিমান ও যশস্বী হউক না কেন, অপমান-লাঞ্ছনা তাকে তাড়িয়ে বেড়াবেই।
হিংসুকের হিংসা এতটাই ক্ষতিকর যে, তা থেকে বাচার জন্য আল্লাহ পবিত্র কোরআনে, সুরা নাস ও সুরা ফালাক নামে দুটো সুরাই উৎসর্গ করেছেন। সকাল-সন্ধ্যায় এসব পাঠ করতে রাসুল (সা) নির্দেশ দিয়েছেন। সমাজ, পরিবার ও রাষ্ট্রে হিংসা ছড়িয়ে পড়লে মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়ে সেটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়না।
অধিকন্তু হিংসার উৎস ও তার কার্যকারণ গুলো শয়তান মানুষের কাছে লোভনীয়, শোভনীয় ও পছন্দনীয় করে তুলে। মানুষ তলে-তলে, দলে-দলে হিংসার বীজ বুনতে থাকে। আজকের দিনের নাটক-সিনেমাতে যত না জাতি গঠন মূলক প্রোগ্রাম তৈরি হয় তার চেয়ে হিংসা বিস্তারের অনুষ্ঠান বেশী পরিচালিত হয়।
মানুষ এগুলো পছন্দ করে, ধনীরা পেট্রোনাইজ করে আনন্দ পায়। পাল্টা-পাল্টি ওয়াজ-নসিহতে অনুসারীরা খুবই আনন্দ পায়। ঝগড়াটে, খিস্তি-খেউর করা বক্তার কদর বাড়ে। খোটা দিয়ে দান করা, শাসন করে ক্ষমা করা, গালি দিয়ে উপদেশ দেয়া, কুৎসিত বাক্যে শিক্ষাদান করা সহ হাজারো বিশ্রী উপাদানে ভরে উঠে সমাজ।
এটার মূলেই থাকে হিংসা। শুরুতে অন্যের অকল্যাণ কামনা করতে করতে, পরবর্তীতে নিজের মন-মেজাজ সবই অকল্যাণ ধর্মী হয়ে উঠে। নিজে ছাড়া জগতের সবাইকে পাপী ঠাওরাতে থাকে। যাবতীয় অকল্যাণেই মানসিক তৃপ্তি পেতে থাকে। এ ধরনের সমাজ একবার গতি প্রাপ্ত হলে, আসমানি সাহায্য ছাড়া কিংবা আসমানি কিতাবের অনুসরণ ছাড়া কোনদিনই সে হিংসার সমাজ বিলুপ্তি করা যায়না।


Discussion about this post