দিল্লী জামে মসজিদ সারা বিশ্বের ইতিহাস খ্যাত একটি মসজিদ, অন্যতম মুসলিম স্থাপনা ও ঐতিহ্য। বিরাটকায় লাল পাথরের গাঁথুনি আর সাদা পাথরের কারুকার্য খচিত এই মসজিদটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৬৫০ সালে। রাত-দিন সাড়ে পাঁচ হাজার শ্রমিকের সাত বছরের অবিরত পরিশ্রমের ফসল এই অনবদ্য কীর্তি। এখানে এক সাথে পঁচিশ হাজারের বেশী মানুষ নামাজ পড়তে পারে। বিশাল আয়তনের এলাকা নিয়ে এই মসজিদটি দিল্লী শহরের একেবারে হৃদপিণ্ডের মত জায়গায় অবস্থান করছে। এই মসজিদের আঙ্গিনা একটি বিশালকায় স্টেডিয়ামের মত। ভূমি থেকে বহু ধাপ উপরে নতুন করে উঠান বানিয়ে, সেখানেই বানানো হয়েছে মসজিদের মূল আঙ্গিনা। প্রচারিত ছবিতে এই আঙ্গিনায় সালাত পড়া মুসল্লিদের দেখা যায়। অনুমানে বুঝার জন্য বলা যায়, আঙ্গিনার উচ্চতা থেকে কেউ নিচে পড়লে সে মানুষ আহত কিংবা নিহত হতে পারে। চারিদিকে বিরাট খাড়া দেওয়াল তুলে সেখানে শত শত টন মাটি ভরেই বানানো হয়েছে মসজিদের মুল অবকাঠামো। শত শত বছরে চেপটা হয়ে বসে যাওয়া মাটি, আজো ধ্বসে পড়েনি! দেওয়ালে ফাটল ধরে নি।
মসজিদ থেকে লাল কেল্লার দূরত্ব প্রায় এক কিলোমিটারের বেশী। মাঝখানে রয়েছে সেই উন্মুক্ত ময়দান। মসজিদের সামনেই রয়েছে বিশাল বাজার। মোগল আমল থেকেই এ বাজার এখানে এভাবে এই অবস্থায় আজো রয়েছে! সাধারণ মানুষ, আমির-ওমরাহ সবাই এখান থেকে বাজার করতে পারতেন। আবার দূর-দূরান্ত থেকে আনিত মাল সামান এখানে সহজে পৌঁছত এবং প্রদর্শিত হত। ফলে সকালে সন্ধ্যায় বাজার সরগরম থাকত। আমাদের দেশের বাজার গুলোতে আজো যেভাবে, হাজারো মানুষের বহু ধরণের ব্যবসার পসরা সাজানো হয়। দিল্লীতে সেটা মোগলদের আগে থেকেই চালু ছিল। দিল্লীতে প্রকাশ্যে যাদুকরী, হাতির নাচ, ঘোড়ার নাচ, সার্কাস, কসরত সহ বহুবিধ রঙ্গ-তামাসার প্রসার সাজাতে বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা নিজ চোখে দেখেছেন। এখানকার মানুষ বৈশিষ্ট্যগত ভাবে রঙ্গ-তামাশার প্রতি আকৃষ্ট। তাই মোগল আমলেও বাজারের বৈশিষ্ট্যই ছিল এমন বরং ‘পাদশাহ হুমায়ুন’ এগুলোকে আরো জমিয়ে তুলছিলেন। যা আজো ভারতের সর্বত্র দেখা যায়। মসজিদের আঙ্গিনার উচ্চতা আর লাল কেল্লার বাদশাহের ভাষণ দেবার মঞ্চের উচ্চতার সমান একই। অর্থাৎ বাদশাহ লাল কেল্লার উপরে দাঁড়ালে বহু দুরে অবস্থিত জামে মসজিদের উপস্থিতি দেখতে পাবেন। মসজিদ কমপ্লেক্সে ঢুকার জন্য ডানে-বামে এবং সামনের দিকে বিশাল সিঁড়ি রয়েছে। এসব সিঁড়ি দেখতে রাজ তোরণের মত। তদানীন্তন সময়ে দিল্লীতে ঢুকার সময় বহু মাইল আগ থেকেই মসজিদের সূ-উচ্চ তোরণ নজরে পড়ত। এসব সিঁড়ি সামরিক দিক দিয়েও নিরাপদ। নিরাপত্তার জন্য রাখা হয়েছে অভিনব ব্যবস্থা। শত শত মানুষ এক সাথে উঠতে নামতে পারে। সিঁড়ি ব্যতীত মসজিদের আঙ্গিনায় কেউ ঢুকার অন্য কোন রাস্তা নেই। অন্য কথায় বলা যায়, কোন শত্রু দেশ কর্তৃক আক্রান্ত হলে এই মসজিদের মুসল্লিদের সংখ্যার চেয়েও অনেক বেশী গুন মানুষ নিরাপদে আশ্রয় নিতে পারবে। তখন পুরো মসজিদ একটা দুর্গের মত কাজ দিবে। এই মসজিদের এটাই ভিন্ন বৈশিষ্ট্য।

মসজিদের সামনে পাথর নির্মিত বিশাল মাঠে দাঁড়ালে আশে পাশের ছোট ভবন গুলোর ছাদ দেখা যায়। মসজিদের চারিদিকে উঁচু প্রাচীর পরিবেষ্টিত। প্রাচীর যথেষ্ট প্রশস্ত, দুই জন মানুষ অনায়াসে দৌড়াতে পারবে। সেখানেও নামাজ পড়া যায়। এই প্রাচীরের উপরে দাঁড়ালে পাশের সাত তলা ভবন গুলোর ছাদ নজরে আসে! মসজিদে রয়েছে বিশাল আকৃতির সুউচ্চ মিনার। মিনারের উপরে দাঁড়ালে বর্তমান ভারতের রাজধানীর প্রান্ত সীমানা অবধি নজরে আসবে। এই মিনারের একটির তলদেশ দিয়ে লাল কেল্লার সাথে সংযোগ টানেল বানানো ছিল। আমি নিজেই দেখেছি, একটি মিনারের নিচে নামার জন্য সিঁড়ির ব্যবস্থা রয়েছে। তবে সেটি সিল গালা করে বন্ধ করে রাখা হয়েছে। ফলে বিস্তারিত দেখা সম্ভব হয়নি আসলেই সেটি কোথায় গিয়েছে? কথা চালু আছে, এক কিলোমিটার লম্বা এই টানেল দিয়েই সম্রাট নিয়মিত নামাজ পড়তে আসতেন। বর্তমানে মসজিদের আঙ্গিনায় হাজার হাজার কবুতর চড়তে দেখা যায়। পর্যটকেরা তাদের খেতে দেয়। এই মসজিদের মুসল্লিদের দেওয়া খাবার খেয়ে বেঁচে থাকে। কোন লোহা, সিমেন্টের গাঁথুনি ছাড়াই বিরাট আয়তনের পাথরকে একটির উপর অন্যটিকে বসিয়ে যেভাবে শক্ত গাঁথুনির সৃষ্টি করা হয়েছে তা সত্যিই এক আশ্চর্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী!
প্রেমিক জুটি এখানে দাড়িয়ে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে ফটো তুলে, ফটোগ্রাফার সর্বোচ্চ মাত্রার ধারালো ছবি উপহার দিবে, সতর্ক গৃহিণী এই ছবি ঘরে টাঙ্গিয়ে আনন্দ উপভোগ করবে। তাদের মূল্যায়ন অতটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তবে, এই ইমারত যখন কোন আর্কিটেক্ট, সিভিল ও ম্যাকানিকেল ইঞ্জিনিয়ারেরা দেখে থাকে, তখন তাদের চোখ কপালে উঠে! তাদের কাছে এসবে রয়েছে বড় বিস্ময়। অমসৃণ খসখসে বিরাটকায় পাথরকে কিভাবে নান্দনিক রূপ দেওয়া হয়েছে! কিভাবে পাথরগুলো পাশাপাশি সাজিয়েছে! এটা দেখে আর্কিটেক্ট বহুবার ভাববে। কত লক্ষ ঘট ফুট মাটিকে শক্ত করে, নতুন মাটির দৃঢ় পাটাতন তৈরি করে তার উপরে হাজারো টন ওজনের ভার বসিয়েছে! কত দূর থেকে ভারী পাথরকে বহন করে আনা হয়েছে এবং অনেক উপরে সাঁটানো হয়েছে! শত বছর পরেও তা অবিকল অবিকৃত অবস্থায় আছে! তা দেখে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ভাবতে বসবে! কোন ম্যাকানিজম কাজে লাগিয়ে অনেক উচ্চতায় ভারী পাথর তোলা হয়েছে? এসবকে বিভিন্ন আঙ্গিকে ঘুরানো হয়েছে এটা ম্যাকানিকেল ইঞ্জিনিয়ারকে ভাবিয়ে তুলবে! এটাই হল এসব ইমারতের মূল কৃতিত্ব। তখনকার দিনের বিশ্বসেরা প্রকৌশলীদের আগমন ঘটেছিল দিল্লীতে। ফলে দিল্লী শাহী জামে মসজিদ সারা দুনিয়ার জন্য একটি আদর্শ মসজিদ ভবন হিসেবে বিবেচিত। মুসলিম স্থাপত্য হিসেবে সারা দুনিয়ায় স্বীকৃত। পরবর্তী কালে সারা দুনিয়াতে যত বড় মসজিদ সৃষ্টি করা হয়েছে প্রায় সবগুলোতেই এই মসজিদের গাঁথুনি, স্থিতি, পরিসংখ্যানকে গ্রহণ করা হয়েছে। যেমন বর্তমান বিশ্বের সেরা আধুনিক নান্দনিক মসজিদ হল, আবুধাবি শেখ জায়েদ মসজিদ। যারা দিল্লী শাহী মসজিদ আর তাজ মহল দেখেছে তারা উপরোক্ত দুটো স্থাপত্য শৈলীর মিশ্রণ দেখতে পাবেন আবুধাবির এই বিশ্বখ্যাত ইমারতে! অনেকে হয়ত বলবে ইসলামে অপচয় নিষেধ, মসজিদের অলঙ্কারিত্ব নিষেধ। এখানে সে বিশ্লেষণ কম খাটবে! কেননা দিল্লী বরাবরই ভৌগলিক ভাবে অনিরাপদ শহর হিসেবে চিহ্নিত ছিল। ফলে বহুবার এই নগরীর হাত বদল হয়েছে বিভিন্ন জাতির নরপতিদের হাতে। সম্ভবত শাহজাহানের আমলেই দিল্লীর মানুষ মানসিক ভাবে বেশী নিরাপত্তা লাভ করেছিল। কেননা যখনই শত্রু সৈন্য দিল্লীতে হানা দিক না কেন। দিল্লীর সকল মানুষকে লাল কেল্লা আর শাহী জামে মসজিদের আঙ্গিনা নিরাপত্তা দিতে যথেষ্ট ছিল।
Discussion about this post